‘জনসাধারণের সহযোগিতা ছাড়া মুক্তিযুদ্ধে বিজয় সহজ হতো না’

  অয়নাংশ মৈত্র

১৭ ডিসেম্বর ২০২২, ০৯:১৯ | আপডেট : ২৪ ডিসেম্বর ২০২২, ১৩:৪৬ | অনলাইন সংস্করণ

ভারতীয় সেনাবাহিনীর ৫৭ ডিভিশনের মিলিটারি ইন্টেলিজেন্সের সাবেক কর্মকর্তা কর্নেল আর হরিহরণ
ভারতীয় সেনাবাহিনীর ৫৭ ডিভিশনের মিলিটারি ইন্টেলিজেন্সের সাবেক কর্মকর্তা কর্নেল আর হরিহরণ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করেছিলেন। পদব্রজে, নৌপথে ও কপ্টারে নানা দুর্গম জনপদে গিয়ে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করেছেন। তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ভারতীয় সাংবাদিক অয়নাংশ মৈত্র। সাক্ষাৎকারটি নিচে তুলে ধরা হল-

প্রশ্ন: ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তান কী ধরনের রণকৌশল নিয়েছিল? আপনার অভিজ্ঞতা বলুন।
আর হরিহরণ: স্ট্র্যাটেজিক মিসক্যালকুলেশন নয়, বরং 'অপারেশন সার্চলাইট' ছিল পাকিস্তানের জন্য একটা স্ট্র্যাটেজিক এরর বা কৌশলগত ভুল। আমি এবং ক্যাপ্টেন ঋষি ১৩০টি গণহত্যার কেস বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করি। এই গণহত্যার মধ্যে শিক্ষক, ব্যবসায়ী এবং বুদ্ধিজীবী ছিলেন। মোহাম্মদপুরে রাজাকারদের একটা জেরা কেন্দ্র ছিল। সেখানে নরকঙ্কাল ঝোলানো থাকত। আমরা এক পাকিস্তানি মিলিটারি ইন্টেলিজেন্স অপারেটিভকে নদী পার হয়ে অপহরণ করে এনেছিলাম। তার মাধ্যমে আমরা অনেক পাকিস্তানি অপারেটিভ সম্পর্কে জানতে পারি।

প্রশ্ন: ওই সময় আপনাদের ৫৭ ডিভিশনের কার্যক্রম সম্পর্কে বলুন।
আর হরিহরণ: আমাদের কাছে ২৩ হাজার যুদ্ধবন্দি ছিল। আমাদের কাছে একজন পাকিস্তানি স্টাফ ক্যাপ্টেন কোয়ার্টার মাস্টার সেনা কর্মকর্তা ছিলেন। ৫৭ ডিভিশন ৬১ জনকে চিহ্নিত করে। আমরা একজন বাঙালি পরমাণুবিজ্ঞানীকে পেয়ে দিল্লিতে নিয়ে আসি ডিব্রিফিংয়ের জন্য। সেই সময় পাকিস্তান পারমাণবিক ব্যাপারে গবেষণায় খুব প্রাথমিক অবস্থায় ছিল।

প্রশ্ন: মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে সামরিক গোয়েন্দারা কীভাবে কাজ করেছে?
আর হরিহরণ: মুক্তিযুদ্ধে আমরা গুপ্তচরের ব্যবহার করিনি বললেই চলে। স্থানীয়রাই ছিল যথেষ্ট। স্থানীয় মানুষের অকুণ্ঠ সহযোগিতা ছাড়া এ যুদ্ধ চালানো সম্ভব ছিল না। স্থানীয় বাঙালিরা আমাদের মিত্রবাহিনীদের জয় বাংলা বলে অভিনন্দন জানাত। ওদিকে অপারেশন সার্চলাইট শুরুর বেশ আগেই পাকিস্তানিরা তাদের সব সিনিয়র বাঙালি অফিসারকে বদলি করে দিয়েছিল। তারা এটা করেছিল এই ইউনিটগুলো যেন বিদ্রোহ না করে।

প্রশ্ন: মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে যাতায়াত করতেন কীভাবে?
আর হরিহরণ: স্বাভাবিকভাবেই যথাযথ পরিবহন ব্যবস্থা ছিল না। আবার হেলিকপ্টারের মতো যানবাহন আমাদের কাজের জন্য উপযুক্ত ছিল না। জেনারেল গুঞ্জালুস এমনকি রিকশা ব্যবহার করেছিলেন। আবার ভারতীয় বাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধারা যখন ঢাকার দিকে অগ্রসর হচ্ছিল, তখন আমরা যুদ্ধ করতে করতেই এগিয়ে যাচ্ছিলাম। সব ক্ষেত্রেই যে আমরা এয়ারলিফটেড ছিলাম, তা নয়। মনে পড়ে, ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে আশুগঞ্জ ও কুমিল্লা যাওয়ার রাস্তায় আমরা অনেক বন্দিকে জেরা করেছিলাম। ক্যাম্পে ক্যাম্পে গিয়ে ইন্টেলিজেন্স ইনপুট নিচ্ছিলাম।

প্রশ্ন: মুক্তিযুদ্ধের পর আপনাদের অবস্থান কী ছিল?
আর হরিহরণ: বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও ঢাকার ধানমন্ডিতে আমি বেশ কিছুদিন ছিলাম। পাকিস্তানের বাহিনী আত্মসমর্পণের সময়ও আমি ঢাকাতে ছিলাম। যুক্তরাষ্ট্রের সেকেন্ড সেক্রেটারি আমার পাশের ভবনেই থাকতেন। আমরা যে বাড়িটায় থাকতাম সেটা পাকিস্তানিদের ছেড়ে যাওয়া। বাংলাদেশ সরকার আমাদের সেখানে থাকার ব্যবস্থা করে। আমরা পিলখানা থেকেই কাজ চালাতাম।

প্রশ্ন: যুদ্ধের সময় সাংবাদিকদের সঙ্গে কীভাবে কাজ করেছেন?
আর হরিহরণ: আমরা যখন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলাম, বিদেশি সাংবাদিকরা আমাদের সঙ্গে থেকে তাঁদের কাজ করছিলেন। জার্মান বার্তা সংস্থা, টাইম ম্যাগাজিন, আমার পূর্বতন কিছু সহকর্মী, পিটিআইর রিপোর্টার- সবাই আমার পিছু পিছু ছিলেন। আমরা হেঁটে হেঁটে, কথা বলতে বলতে অনেক মেঠোপথ পেরিয়েছি।

প্রশ্ন: যুদ্ধের ভয়াবহতা সম্পর্কে কিছু মনে পড়ে?
আর হরিহরণ: একবার একজন ব্যাটালিয়ন কমান্ডারকে আমার একটি বার্তা দেওয়ার জন্য যাচ্ছিলাম। তখন সন্ধ্যা নেমে গেছে। পথে একটা সামরিক যান পড়ে থাকতে দেখি। কাছে গিয়ে দেখি সারি সারি ভারতীয় সেনার মৃতদেহ পড়ে আছে। আখাউড়ার কাছাকাছি কোথাও হবে। আমাদের আরেকজন অফিসার লেফটেন্যান্ট মজুমদারের মর্মান্তিক মৃত্যুও আরেকটি ভয়াবহ স্মৃতি। তিনি পাকিস্তানি একটি ট্যাঙ্কে গ্রেনেড লঞ্চ করতে যাচ্ছিলেন। তিনি ট্যাঙ্কের ওপর ওঠার মুহূর্তেই পাকিস্তান সেনাবাহিনী ট্যাঙ্কের ভেতর থেকে হামলা চালায়। যুদ্ধের ভয়াবহতা দেখেছি বাঙ্কার থেকে বাঙ্কারে। মৃতদেহ খুঁজতে গিয়ে পাকিস্তানি ও ভারতীয় সেনাদের মৃতদেহ আলাদাভাবে শনাক্ত করাই যাচ্ছিল না। এতটাই রক্তাক্ত ছিল যে, উর্দিও আলাদাভাবে বোঝার অবকাশ ছিল না।

প্রশ্ন: মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের আতিথেয়তা ও সহায়তা কেমন ছিল?
আর হরিহরণ: মেজর উপেন্দ্রকুমার ও আমি একজন বৃদ্ধ লোকের বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে থাকতাম। আমরা তাঁকে বলেছিলাম, এই ঝুঁকি কেন নিচ্ছেন? তিনি বলেছিলেন, আমি জীবনের অনেকটা অতিবাহিত করেছি। আপনারা আমাদের দেশের জন্য যুদ্ধ করছেন; আপনারা সুরক্ষিত থাকুন। যুদ্ধ করার সময় আমরা স্থানীয় মানুষদের অকুণ্ঠ সহযোগিতা পেয়েছি। তারা ডাল ও ভাত পরিবেশন করেছে। নিজেরাই বলেছে, আমরা আপনাদের মাংস পরিবেশন করব না। কেননা, আপনারা হিন্দু। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের সহযোগিতা ছাড়া মুক্তিযুদ্ধে বিজয় এত সহজে আসত না। আমরা দেখেছি সাধারণ সবজিওয়ালা, ফেরিওয়ালা কীভাবে সেনাবাহিনীকে সাহায্য করেছে।

প্রশ্ন: মুক্তিযুদ্ধ পাঁচ দশক পেরিয়েছে। আপনি এখনকার বাংলাদেশকে কীভাবে দেখেন?
আর হরিহরণ: বাংলাদেশ দুর্দান্ত সাফল্য লাভ করেছে নানা ক্ষেত্রে। পাকিস্তানের সঙ্গে তুলনা করেই দেখা যাক না কেন! কোথায় পাকিস্তান, আর কোথায় বাংলাদেশ এখন! কিন্তু সামনের কয়েকটা বছর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। বাংলাদেশ ইউরোপ এবং বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তে রেডিমেড গার্মেন্ট রপ্তানির জন্য প্রসিদ্ধ। ইউক্রেন যুদ্ধের আঁচে ইউরোপের অর্থনীতি ধুঁকছে। এদিকে বাংলাদেশ সম্প্র্রতি এলডিসি তালিকা থেকে উঠে এসেছে। এলডিসিভুক্ত দেশ হিসেবে যেসব সুযোগ-সুবিধা পেত, সামনে সেগুলো পাবে না। রেমিট্যান্স বা প্রবাসীদের পাঠানো আয়ের অংশ বাংলাদেশের অর্থনীতিকে সচল রাখে। ইউরোপের অর্থনীতি যখন মন্দার দিকে যাচ্ছে; যুক্তরাজ্যের অর্থনীতিও যখন খারাপ অবস্থায়; প্রবাসীদের পাঠানো অর্থও হ্রাস পাবে।

প্রশ্ন: বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নিয়ে কিছু বলবেন?
আর হরিহরণ: মোদির জমানায় একটি ভালো কাজ হয়েছে- বাংলাদেশের সঙ্গে সব ছিটমহল সমস্যা মিটিয়ে ফেলা হয়েছে। দু'দিক থেকেই সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করে তাদের সুরাহা করা হয়েছে। ট্রানজিটের ক্ষেত্রে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের যে চুক্তিগুলো হয়েছে, তা সুদূরপ্রসারী ফল রাখবে। ভারত বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ চুক্তি থেকে পশ্চিমবঙ্গ বিশেষ লাভবান হতে পারে।

প্রশ্ন: সময় দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ। এই সাক্ষাৎকার বাংলাদেশের বিজয় দিবসে প্রকাশ হবে। আপনাকে বিজয় দিবসের শুভেচ্ছা।
আর হরিহরণ: বাংলাদেশের মানুষের জন্যও ভারতীয় বন্ধুদের পক্ষ থেকে বিজয়ের শুভেচ্ছা।

 

সৌজন্যে : দৈনিক সমকাল।

এবিএন/জনি/জসিম/জেডি

এই বিভাগের আরো সংবাদ