বাংলাদেশের ৫০ এবং নারীর পথচলা

  ফাহমিদা হক

২৮ নভেম্বর ২০২১, ২১:৩৭ | অনলাইন সংস্করণ

ফাহমিদা হক
৫০ বছরের পথচলায় দুর্দান্ত গতিতে এগিয়ে চলছে দেশ। দরিদ্র আর দূর্যোগের বাংলাদেশ এখন উন্নয়নশীল দেশের কাতারে। “তলাবিহীন ঝুড়ির” দেশ থেকে এক আত্মপ্রত্যয়ী বাংলাদেশ যেন। এই ৫০ বছরে বাংলাদেশের অর্জন অনেক। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, নারীর ক্ষমাতায়ন, মাথাপিছু আয় বৃদ্ধিসহ আর্থ-সামাজিক প্রতিটি সূচকে এগিয়েছে বাংলাদেশ। সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে এদেশের নারীরাও আজ রান্না ঘরে সীমাবদ্ধ নেই।

নারীরা পৌঁছে গেছেন বিমানের ককপিট থেকে পর্বতশৃঙ্গে। কিন্তু এতো কিছুর পরও এদেশের সকল নারীর জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন কতটুকু হয়েছে? নারী কি এখনও শৃঙ্খলমুক্ত, নির্ভয়ে স্বকীয়তা বজায় রেখে কাজ করে যেতে পারেন কি স্বাধীন পুরুষের মতো? শোষণ আর বঞ্চনার হাত থেকে রক্ষা পেতে পরাধীনতার শৃঙ্খলমুক্ত হয়েছিল এদেশের মানুষ। মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা ছিল, একটি বৈষম্যহীন সমাজ গঠন, যা বাংলাদেশের সংবিধান দ্বারা স্বীকৃত। কিন্তু আজ স্বাধীনতার ৫০ বছরেও কি আমরা তা বাস্তবায়ন করতে পেরেছি? এদেশের নারীদের জীবনেও অনেক পরিবর্তন এসেছে, কেবল নারীমুক্তির প্রশ্নে তা থমকে গেছে।

৫০ বছরে সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নয়নের মূলধারার সাথে এগিয়ে গেছে নারীরা। নারীকে এগিয়ে যেতেই হবে। যে দেশের অর্ধেক নারী, সেই অর্ধেক জনশক্তিকে বাদ দিয়ে কোন দিন দেশ এগিয়ে যেতে পারে না। অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, শিক্ষা, সংস্কৃতিসহ সকল ক্ষেত্রে নারীর এগিয়ে যাওয়ার চিত্র লক্ষ্য করলে দেখতে পাই- শিক্ষা অধিদপ্তরের ‘ অ্যানুয়াল রিপোর্ট অন পাবলিক ইন্সট্রাকশন ফর দ্য ইয়ার ‘১৯৭০-৭১’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, সে সময়ে দেশের মোট শিক্ষার্থীর মধ্যে ছাত্রী সংখ্যা ছিল ২৮ শতাংশের কিছু বেশী। সরকারের শিক্ষা তথ্য পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) ২০১৯-২০ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রাথমিক শিক্ষায় মোট শিক্ষার্থীর মধ্যে যা বর্তমানে (ছাত্রীর সংখ্যা প্রায় ৫১ শতাংশে উন্নীত হয়েছে) এবং মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকের সর্বমোট শিক্ষার্থীর প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থী ছাত্রী। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে এ সংখ্যা কমে সর্বমোট সংখ্যার ৩৮ শতাংশ আছে ছাত্রী। বাংলাদেশে নারী শিক্ষার হার ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশই দক্ষিন এশিয়ায় প্রথম দেশ হিসেবে সর্বপ্রথম  প্রাথমিক শিক্ষায় লিঙ্গ সমতা অর্জন করেছে। এমনকি মাধ্যমিক শিক্ষায়ও আমাদের এই সাফল্য রয়েছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গমনোপযোগী শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১৮ মিলিয়নের মধ্যে ৯৭.৯১ শতাংশ বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে, যাদের ৫০.৯ শতাংশ আবার মেয়ে। আর মাধ্যমিক শিক্ষায় মেয়েদের অংশগ্রহণের হার ৫৩ শতাংশ। বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে তাকালেও দেখা যায়, মেয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা উন্নতির দিকে। সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ২০০৯ সাল থেকে ২০২০ সালের মধ্যে মেয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা দ্বিগুন হয়েছে। ২০২০ সালে মোট শিক্ষার্থীর ৪৫.২৭ শতাংশ ছিল মেয়ে শিক্ষার্থী। আমাদের কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ৪৬ শতাংশ নারী বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন, যা জাতীয় পর্যায়ের চেয়ে বেশী। একটা সময় ছিলো মেয়েরা কেবল বিলেত ফেরত স্বামীর কাছে ইংরেজীতে  চিঠি লিখবার জন্যে পড়ালেখা করেছে। বর্তমানে মেয়েরা নিজের জন্যে পড়ালেখা করে। নিজ পায়ে দাঁড়াতে, পুরুষের সমানতালে হাঁটতে নারীরা উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হচ্ছে। মেধা আর প্রজ্ঞা দিয়ে নারীরা ঘরে বাইরে নিজেদের অবস্থান পরিস্কার করেছে যে, সুযোগ পেলে নারীরাও সব পারে।

অর্থনৈতিকভাবে নারীর অগ্রযাত্রা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য - দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের যতগুলো খাত আছে তার প্রায় সবকটিতেই বিশেষ করে, কৃষি ও পোশাক শিল্প খাতে নারীর অবদান সবচেয়ে বেশী।দেশের রপ্তানী শিল্পে ৯০ ভাগই নারী শ্রমে অর্জিত। সম্প্রতি এক জরিপে দেখা যায়, শুধু কৃষি ক্ষেত্রে ৬০ শতাংশ নারী কাজ করছে। আরেক গবেষনায় দেখা গেছে, শিক্ষা, চিকিৎসাসহ বেশ কিছু পেশায় ভালো মানের কাজের জন্যে  নারীরা পুরুষদের ছাড়িয়ে গেছেন। কর্ম ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ আগের তুলনায় বেড়েছে। বাংলাদেশে প্রায় ৫ কোটি ৪১ লাখ কর্মজীবী মানুষের মধ্যে ১ কোটি ৬২ লাখ নারী। প্রায় ১৬ হাজার৭০০ নারী ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প উদ্যোক্তা। বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের ৮০ শতাংশের বেশী নারী। স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের ৫৪ হাজার জনবলের মধ্যে ২৮ হাজার নারী। তৃণমূল পর্যায়ে ২৩ হাজার পরিবার পরিকল্পনা সহকারী এবং সাড়ে চার হাজার পরিদর্শিকা নিরাপদ প্রসবসেবা নিশ্চিতের জন্যে কাজ করছেন। পাশাপাশি মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের সাথে সমন্বয় করে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর নারীদের বাল্য বিবাহ রোধ সহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় বিষয়ে কাউন্সেলিংয়ের কাজ করে যাচ্ছে। স্বাধীন দেশের শ্রম বাজারে ধীরে ধীরে বেড়েছে নারীর অংশগ্রহণ। গত ৫০ বছরে নারী দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। সিপিডি’র গত বছরের এক গবেষনায় বলা হয়েছে, দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) নারীর অবদান ২০ শতাংশ। তবে সংসারের ভেতর ও বাইরের কাজের মূল্য ধরা হলে নারীর অবদান দাঁড়াবে ৪৮ শতাংশ। এর অর্থ হলো, দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে নারী- পুরুষের অবদান বলা যায় সমান সমান। বিবিএসের সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, ১ কোটি ৮৭ লাখ নারী কৃষি, সেবা ও শিল্প - অর্থনীতির বৃহত্তর তিন খাতে কাজ করছেন। বাকিরা শিক্ষকতা, চিকিৎসা, ব্যাংকিংসহ নানা রকম ব্যবসা বানিজ্য সম্পৃক্ত কাজের সাথে যুক্ত। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শীর্য নির্বাহী সহ বিভিন্ন উচ্চপদেও দায়িত্ব পালন করছেন নারীরা। তবে শ্রমবাজারের সবচেয়ে বড় একটা  অপ্রাতিষ্ঠানিক কাজে নিয়োজিত কেবল নারীরা।যাদের কোনরকম গণায় ধরা হয় না। অর্থনৈতিক উন্নয়নকে যথাযথ ভাবে বুঝতে হলে নারীদের অবৈতনিক শ্রমকেও হিসাবের মধ্যে আনা জরুরী।

রাজনৈতিকভাবে বাংলাদেশের নারীর তাৎপর্যপূর্ণ উন্নয়ন হয়েছে- বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেত্রী, স্পিকার নারী। জাতীয় সংসদে নির্বাচিত ২২ জন নারী সাংসদ রয়েছেন। নারীদের জন্যে ৫০ টি আসন সংরক্ষিত। প্রতি উপজেলায় একজন করে নারী ভাইস চেয়ারম্যান এবং সংরক্ষিত আসনে তিনজন করে সদস্য রয়েছেন নারী। এছাড়া বর্তমানে সকল রাজনৈতিক দলেই তৃনমূলের রাজনীতিতেও নারীর অংশগ্রহণের সুযোগ রয়েছে আগের চেয়ে বেশী। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বড় গলায় আওয়াজ দিয়েই যোগ্য নারীদের রাজনীতিতে সুযোগ করে দেয়ার পক্ষে।

বাংলাদেশের মেয়েরা খেলাধুলায় এখন আগের চেয়ে অনেক এগিয়ে। বিশ্বকাপ ক্রিকেটে বাংলাদেশের নারীদের অবস্থান উল্লেখ করার মতো। ফুটবল সারাবিশ্বে জনপ্রিয় খেলা। বাংলাদেশ জাতীয় চ্যাম্পিয়ানশিপে এখন ৪৪-৪৫ টি টিম অংশ গ্রহণ করে। অনুর্ধ্ব ১৫ নারী ফুটবল দল সাফ অনুর্ধ্ব ১৫ চ্যাম্পিয়ান হয়।

সংবাদপত্র, মিডিয়া ইত্যাদি চ্যালেঞ্জিং কাজে নারীদের পূর্বের তুলনায় অনেক বেশী অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পায়। সাহিত্য, সংস্কৃতির সকল শাখায় নারীর উপস্হিতি উল্লেখ করার মতো। (বিবিএস) -এর তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৪ সালে দেশে কর্ম ক্ষেত্রে নারী ছিল ৪ শতাংশ। এই হার ১৯৮০ সালের দিকে ৮ শতাংশ ও ২০০০ সালে ২৩.৯ শতাংশ, তবে শ্রমবাজারে অংশগ্রহণে ২০১০ সালে বেড়ে ৩৬ শতাংশ হয়। সর্বশেষ ২০১৬-১৭ জরিপে নারী হিস্যা ৩৬.৩ শতাংশ ।

বাংলাদেশ সরকার অনেকগুলো নারী বান্ধব আইন করেছে, যার ফলে নারীর ক্ষমতায়ন হয়েছে। এজন্য তাদের কিছুটা অগ্রগতি হয়েছে, কিছু আইন নারীকে সন্মান এনে দিয়েছে। নারীর উন্নয়নে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে আরো ক্ষমতায়ন প্রয়োজন, যে ক্ষমতার দ্বারা নারী তার উপর অর্পিত কাজটা সঠিক ভাবে করতে পারবে।

কর্মক্ষেত্রে আইন করে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানো হয়েছে, যেমন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৬০ শতাংশ নারীর নিয়োগ দেয়া। সকল শিশুদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতি আকর্ষনীয় করে তুলতে নানারকম সুবিধা প্রধান করছে সরকার, এতে করে মেয়ে শিশুদের সবচেয়ে বেশী উপকার হয়েছে। প্রান্তিক নারীরা আর্থ-সামাজিকভাবে বেশী অবহেলিত, সেখানে সরকার ছাড়াও বিভিন্নরকম এনজিও’র মাধ্যমে সুবিধা বন্চিতদের শিক্ষার ব্যবস্হা এবং তাদের সচেতন করা হচ্ছে কিন্তু সমসুযোগের বিষয়টি নিশ্চিত গুরুত্বের সাথে দেখতে হবে।

বস্তিবাসী শিশুদের মধ্যে নারী পুরুষের বৈষম্য তীব্র। মেয়েদের বেশীরভাগ ক্ষেত্রে স্কুলে যেতে দেয়া হয় না।

বাংলাদেশে সর্বত্র নারীর অংশগ্রহন বাড়লেও বেশকিছু প্রতিবন্ধকতা এখনো বিদ্যমান। নারীর অংশগ্রহণ মূলক পরিবেশ এখনো সমমাত্রায় উন্নয়ন করা সম্ভব হয়নি। কর্মক্ষেত্রে পেশার বৈষম্য তীব্র ভাবে বিরাজমান। উচ্চস্তরের সামাজিক প্রতিবন্ধকতা কিছুটা দূর হলেও প্রান্তিক পর্যায়ে এর তীব্রতা এখনো বিরাজমান। কর্মক্ষেত্রে এখনো নারীরা কিছু ক্ষেত্রে যেমন বিবাহের কারণে, সন্তান জন্মদানের কারণে ছুটি না পেয়ে চাকরীচ্যুত হয়। উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও নিন্মবিত্ত সকল ক্ষেত্রে এই সমস্যা রয়েছে। নারীর আরো উন্নয়ন ও অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে নারীর এমন আত্মোৎসর্গ একটি বড় বাধা।

সমাজে প্রতিবন্ধী মানুষের জন্যে সরকারের নীতিমালা থাকলেও আশা জাগানিয়া বাস্তবতা নেই, ফলে প্রতিবন্ধী নারীদের পিছিয়েই থাকতে হচ্ছে। তাদের জন্যে পরিবেশ বান্ধব শিক্ষাব্যবস্হা, প্রশিক্ষণর ব্যবস্হা, এবং উপযোগী পরিবেশ একান্ত দরকার, সর্বোপরি নারীর টেকসই উন্নয়নের জন্যে নারীর সক্ষমতা বৃদ্ধি করা জরুরি। এক্ষেত্রে প্রান্তিক নারীর ক্ষমতা উন্নয়ন সবচেয়ে বেশী গুরুত্বপূর্ণ।

সমাজ এখনো নারীকে ভিন্ন চোখে দেখে, পরিবারে মেয়েরা ছেলেদের চেয়ে কম সুযোগ সুবিধা পায়, মেয়েরা তর্ক করলে বলা হয়, মেয়েদের তর্ক করা ভালো না। ছেলেদের তর্ককে বিবেচনা করা হয় বিচার বুদ্ধিসম্পন্ন হিসেবে। মেয়েদের মিছিলের সামনে রাখা হয় অবলা নারীকে পুলিশ মারবে না এই ভাবনায়, কিন্তু যোগ্যতার বিচারে কখনো সামনে স্হান দিতে রাজি না। এখনো পারিবারিক পর্যায়ে পুরুষ সদস্যকে জ্ঞানচর্চাকারী, নেতৃত্বদানকারী, উপার্জনকারী হিসেবে ধরে নেয়া হয়। আর নারীকে ভাবা হয় সেবিকা ও উৎসাহদানকারী। এসব দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাতে হবে।

বর্তমানে প্রায় সকল ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ রয়েছে কিন্তু সিদ্ধান্ত গ্রহনের ক্ষমতা কম। বাংলাদেশের গণমাধ্যমে নারীর সংখ্যা বাড়লেও নারী সম্পাদকের সংখ্যা বাড়েনি। নারী অংশগ্রহণ বাড়লেও কেন সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর্যায়ে নারী আসতে পারেনা তা প্রথমে ভাবা দরকার। সকল ক্ষেত্রে সচেতনতা গড়ে তুলতে পরিবারের চেয়ে রাষ্ট্রের ভূমিকা বেশি থাকা উচিত। নারী শিক্ষিত কিংবা কর্মজীবী হলেই পুরোপুরি উন্নয়ন ঘটবে এমন ধারণা আংশিক সত্য। নারী উন্নয়নের জন্যে সবার আগে নারীকে আত্মসচেতন হতে হবে।

সংসারের পিছনে নারীর যে শ্রম তার মূল্যায়ন হওয়া দরকার। গৃহকর্মে নিয়োজিত নারীর আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি নেই। সকল ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে কিন্তু ক্ষেত্র বিশেষ হিসেবে সমস্যা কমছে না, যেমন নিয়মিত বেতনে চাকরীর ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমতা আসেনি।

টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রায় ১৭টি লক্ষ্যের ৫ম লক্ষ্যটি হচ্ছে লিঙ্গ সমতা। কিন্তু কোথায় দেশের লিঙ্গ সমতা? এই লিঙ্গ বৈষম্য দূর করতে হলে শিক্ষাস্তরের প্রাথমিক পর্যায় থেকে পাঠ্যক্রমের আওতায় এনে লিঙ্গ সমতা অর্জনের মানসিকতা সম্পন্ন সমাজ গড়তে হবে। নারী বান্ধব পরিবেশ গঠন করার কোন বিকল্প নেই।নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। কর্মক্ষেত্রে সংকোচ বোধ থাকলে নারীর কাজ সহজ হয় না। নারীর সকল সংকোচ দূর করারব ব্যবস্থা করতে হবে।

জ্ঞানীজনের কথা, আমাকে সুস্হ মা দাও, আমি তোমাদের সুস্হ্য জাতি দিবো। সুস্হ মা পেতে হলে বাল্য বিবাহ রোধ করতেই হবে, সুস্হ্ শিশু জন্মদান করা কেবল সুস্হ মায়ের পক্ষে সম্ভব, সুস্থ্য শিশু আগামীর ভবিষ্যত। 

ধর্ষণ, নারী নির্যাতন, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য, পরিবারে কম গুরুত্ব পাওয়া, সংসারে অবহেলিত, স্বাস্হ্য, পুষ্টি, শিক্ষা সকল ক্ষেত্রে অনাদরে বেড়ে উঠা নারী সুস্হ ভাবে বড় হয়ে উঠে না। মানসিক, শারীরিক নানান অদেখা সমস্যা নিয়ে বড় হওয়া নারী সফল হলেও তার ক্ষত সমাজে, সংসারে, কর্মক্ষেত্রে পড়তে বাধ্য।

নারীর সার্বিক অধিকারের সমতা এবং নারী উন্নয়নের কথা বলতে গেলে নারীবাদিতা চলেই আসে। উনিশ শতাব্দীর শেষের দিকে নারীবাদ শব্দটি উচ্চারিত হতে থাকে যদিও তার বহু আগে থেকে নারী তার অধিকারের কথা বলে আসছে। নিজেদের অবস্হা পরিবর্তনের দাবী নারী শত শত বছর ধরে করে আসছে।নারী তার বিভেদ বৈষম্যের কথা বলছে বহু আগে থেকে, কিন্তু যে বৈষম্য পুরুষতন্ত্রের সৃষ্টি তা এতো সহজে নারী একা লড়াই করে দূর করতে পারবে না।

নারীর অধিকার নিয়ে কথা বলতে, নারীবাদী হওয়ার দরকার নেই, নারীবাদ একটি তত্ত্ব, একটি দর্শন, একটি বোধ, একটি সামাজিক অবস্হান। যাকে এক লাইনে জটিল করার কিছু নেই। যেই নারীবাদের জন্ম হয়েছে লিঙ্গ বৈষম্য দূর করতে, সেই নারীবাদ মূলত মানবতাবাদ। মানবতাবাদের দাবী আর নারীবাদের আর্জি মূলত এক। তাই যে বৈষম্য পুরুষতান্ত্রিক সমাজকর্তিৃক সৃষ্ট, সেখানে নারীর সমঅধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এই শক্তিকে নারী পুরুষ সকলে মিলে নিজেদের মধ্যে ধারণ করে তার বিরুদ্ধে লড়তে হবে।

নারীবাদ কেবল শহরে শিক্ষিত সুবিধাপ্রাপ্ত নারীদের জন্য নয়, পুরুষের বিরুদ্ধে বলবার জন্যে নয়। অবহেলিত, সুবিধাবন্চিত সকল নারীর মৌলিক অধিকারের জন্য এক হয়ে কথা বলাই নারীবাদির কাজ হওয়া দরকার। মানবতাপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠাই নারীবাদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।

প্রায় এক শতাব্দী  পথ পেরিয়ে এদেশের নারীরা যতদূর অর্জন করতে পেরেছে, তার বেশীর ভাগ আবার উপরের স্তরের নারীদের গন্ডি পেরিয়ে প্রত্যন্ত গ্রাম গন্জে তেমন সুধিধা করতে পারেনি। নারীবাদ যেন শুধু শহরের অবস্থাপন্ন, সুবিধাপ্রাপ্ত শ্রেণীর নারীদের জন্যে না হয়। মাথায় রাখা দরকার, যেন তাদের শিক্ষা, স্বাধীনতা, প্রগতিশীলতা সকল সুধিধাবন্চিত নারীদের অধিকার আদায়ে সহায়তা করে সকল নারীর উড়ানের বিশাল ক্ষেত্র তৈরি করে। নারীবাদের দর্শন পরিবর্তনমূখী রুপান্তরের আদর্শে গড়া, পুরুষেরসাথে যুদ্ধ করা নয়, এই সত্যটা নারী যতদিনই লাগুক পুরুষকে বুঝাতে হবে। নারীকে তার ঘর থেকে শুরু করতে হবে একাজ। বেগম রোকেয়া জীবনের শেষদিন পর্যন্ত কাজ করে গেছেন নারীদের নিয়ে, তাই অধিকারপ্রাপ্ত নারীরা, নারীবাদিরা, সকলে মিলেই সমাজের সকল স্তরের নারীদের নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্যে। তবেই সম্ভব নারীমুক্তি।

বেগম রোকেয়ার শুরু করা প্রচেষ্টায়, উঁনার দেখিয়ে দেয়া পথে হেঁটে বাংলার নারীরা যতটুকু সফলতা অর্জন করেছে তা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে খুব একটা নগণ্য নয়। তবে এই অল্প পথ পাড়ি দিতে আমাদের লেগে গেছে এক শতাব্দী। নারী আজ অন্ধকারে হেঁশেল থেকে বাইরে বের হয়ে এসেছে। ঘরে বাইরে সমান তাদের পথ চলা। দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখছে আজকের নারীরা। পুরুষের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সমান তালে কায়িক পরিশ্রম করছেন সব ক্ষেত্রে।

বৈষম্যে, শোষণ ও বন্চনার শিকার না হয়ে মুক্ত স্বাধীন জীবনের জন্যে যে যুদ্ধ জয় করে স্বাধীন দেশ , সেই দেশের অর্ধেক সংখ্যক মানুষ নারী কেন আজও বৈষম্যের শিকার? যে মূলমন্ত্রে দিক্ষিত হয়ে আমরা সেদিন চেয়েছিলাম একটি পুণ্যভূমি, এতো এতো মানুষের আত্মত্যাগের বিনিময়ে যে দেশ, সে দেশে আজও কেন নারী তার প্রাপ্য অধিকার পায় না, ধর্ষণের শিকার হতে হয়, সঠিক বিচার পায় না কেন নারীরা?  যে স্বপ্ন বীজ রোপিত হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর ভাষণে তার ফল আজ ৫০ বছরের স্বাধীন বাংলাদেশ। কিন্তু ৫০ বছরেও কেন নারীমুক্তি এলো না।

পরিশেষে বলতে চাই বাংলাদেশের সংবিধানের ২৮(১) অনুচ্ছেদে যে নারী পুরুষের সমতার কথা বলা হয়েছে তা রক্ষা করা হোক। ১৯৮১ সালের ৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ কতৃর্ক নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য নিরসনের জন্যে যে সনদ, যা ‘সিডও’ সনদ হিসাবে গৃহীত হয়। সিডও সনদ নারীর সব সব ধরনের মানবাধিকার রক্ষার দলিল। এই সনদের সুবিধা যেন ভোগ করতে পারে নারী। সর্বত্র নারী অংশগ্রহণ বাড়ালে চলবে না, গুণগত উন্নয়ন জরুরি, আনুষ্ঠানিক কাজের অর্থনৈতিক মূল্যায়ন, লিঙ্গসমতা, নারীবান্ধব নিরাপদ পরিবেশসহ সকল বৈষম্য দূর করতে পারলে তবেই নারীর যথাযোগ্য মর্যাদা এরং সমঅধিকার প্রদানের মাধ্যমেই কেবল দেশের উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনসহ সকল অর্জনের সাথে সফলতার পথে হাঁটা সম্ভব। অর্ধেক জনসম্পদকে বাদ দিয়ে দেশ সাফল্যের লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবে না। বৈষম্যমুক্ত দেশ হোক বাংলাদেশ, সকলের মিলিত কর্মযজ্ঞের ফলে উন্নত সমৃদ্ধ সোনার বাংলা হোক

আমার প্রিয় জন্মভূমি।

লেখক: নিউ মিডিয়া কোঅর্ডিনেটর, সিজিএস; পরিচালক, সিসিএন।

এই বিভাগের আরো সংবাদ
ksrm