ফেসবুক মেসেঞ্জারে সাংকেতিক বার্তা বিনিময় ব্যবস্থা নিয়ে কেন এত বিতর্ক

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ২১ জানুয়ারি ২০২২, ১৯:৪৮

ফেসবুক যেন তাদের মেসেঞ্জারে বার্তা পাঠানোর কাজটি এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত পর্যন্ত সাংকেতিকভাবে না করে (এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপশন) সেই আহ্বান জানিয়েছে যুক্তরাজ্য সরকার এবং শিশু কল্যাণ সংস্থাগুলো।

এদের আশংকা, ফেসবুক যদি এরকম কঠোর গোপনীয় এবং নিরাপদ বার্তা আদান-প্রদান ব্যবস্থা চালু করে, তাহলে অনলাইনে শিশুরা ঝুঁকিতে পড়বে। বিশেষ করে অনলাইনে বিচরণ করা শিশু নিপীড়কদের দিক থেকে।

ফেসবুকের এই উদ্যোগ নিয়ে মানুষের মধ্যে ব্যাপক বিতর্ক হবে বলে মনে করা হচ্ছে। ব্যক্তিগত গোপনীয়তার সুরক্ষার জন্য আন্দোলনকারীরা এবং প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর যুক্তি হচ্ছে, মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং তথ্যের সুরক্ষার জন্য এর দরকার আছে।

যুক্তরাজ্যে এই প্রশ্নে যে বিতর্ক শুরু হয়েছে, তার ওপর বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার নজর রাখছে। কারণ অনেক দেশের সরকারই আসলে এক প্রান্ত হতে আরেক প্রান্ত পর্যন্ত সাংকেতিক-ভাবে বার্তা পাঠানোর ব্যবস্থা বন্ধ করতে চায়।

বহু বছর ধরেই যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, নিউজিল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত এবং জাপানসহ ইন্টারপোল এবং যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সির মতো প্রতিষ্ঠানগুলো এই প্রযুক্তির সমালোচনা করে আসছে।

বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষ কিন্তু এখন হোয়াটসঅ্যাপ, আইমেসেজ বা সিগন্যালে এরকম প্রযুক্তিই ব্যবহার করেন।

এনক্রিপশন কি?

এনক্রিপশন বলতে বোঝায় এমন এক পদ্ধতি যার মাধ্যমে কোন বার্তার তথ্য উলটপালট করে এমনভাবে দুর্বোধ্য করে তোলা, যাতে করে এর অর্থ অন্য কেউ বুঝতে না পারে। অর্থাৎ বার্তাকে সাংকেতিক রূপ দেয়া।

আমরা কিন্তু এখনই প্রতিদিন এরকম এনক্রিপশন প্রযুক্তি ব্যবহার করি, যদিও আমরা সেটি টের পাই না।

যেমন, আপনার ইন্টারনেট ব্রাউজারের উপরে যে তালা চিহ্নটি দেখতে পাচ্ছেন, সেটির মানে হচ্ছে বিবিসির এই সাইটে থাকার সময় আপনি সার্ভারে যে তথ্য পাঠাচ্ছেন, এবং যে তথ্য আপনার কাছে এসে পৌঁছাচ্ছে, তার পুরোটাই সাংকেতিক-ভাবে হচ্ছে। তার মানে, কেউ যদি মাঝপথে এই তথ্য পেয়েও যায়, তারা এর কিছুই বুঝতে পারবে না। ব্যাংকিং বা ইমেইলের মতো স্পর্শকাতর সেবার বেলায় এটা কিন্তু খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

এটি কাজ করে এভাবে- একটি ওয়েবসাইট বা অ্যাপের সঙ্গে আমাদের ব্যবহৃত ডিভাইসের একটি গোপন কোডের ব্যাপারে বোঝাপড়া থাকে। আমরা কোন ওয়েব সার্ভিসে অনলাইনে কোন তথ্য পাঠানোর আগে সেই তথ্যকে সাংকেতিক ভাষায় রূপান্তরিত করা হয়।

যে কোম্পানির মাধ্যমে আমরা বার্তাটি পাঠাচ্ছি, যখন সেটি তাদের কাছে পৌঁছায়, তারা এই সংকেত ভেঙ্গে বার্তাটিকে আবার সেই গোপন কোডের ভিত্তিতে পাঠযোগ্য রূপ দেয়।

এধরনের এনক্রিপশনকে সবাই স্বাগত জানায়, কারণ এটি হ্যাকার বা অপরাধীদের কাছ থেকে আমাদের সুরক্ষা দেয়। তবে যে কোম্পানির মাধ্যমে আমরা বার্তাটি পাঠাচ্ছি, তারা যেহেতু বার্তাটি পড়তে পারে, তাই কোনো দেশের নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা বা পুলিশ চাইলে তাদের কাছ থেকে এই তথ্য দাবি করে বসতে পারে।

বিশ্বের অনেক দেশে পুলিশ কিন্তু এভাবেই অপরাধের তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করে, এভাবেই তারা সন্দেহভাজন অপরাধীদের ধরে, তাদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করায়।

এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপশন কি?

এক্ষেত্রে গোপনীয়তার ব্যাপারটা আরও একধাপ বেশি। যে গোপন কোড বা সংকেতের ভিত্তিতে প্রেরকের কাছ থেকে প্রাপকের কাছে বার্তা পাঠানো হয়, তা এতটাই গোপনীয় যে, যে কোম্পানির মাধ্যমে বার্তা যাচ্ছে, তারাও এটার পাঠোদ্ধার করতে পারবে না।

এর মানে হচ্ছে একমাত্র প্রাপকই তার কাছ পাঠানো বার্তা, ছবি বা ফোন কলের মানে বুঝতে পারবে।

কিভাবে এই ব্যবস্থা কাজ করে তার একটা উদাহরণ দেয়া যেতে পারে: ধরা যাক, আপনার কাছে ডাকযোগে কেউ একটা চিঠি পাঠাচ্ছে। কিন্তু এই চিঠি এমন ভাষায় লেখা হবে, যেটি কেবল আপনি পড়তে পারবেন, আর কেউ বুঝতে পারবে না।

আপনি কারও কাছে এমন একটি বক্স পাঠাতে পারেন, যেটির চাবি কেবল আপনার কাছেই আছে। এখন যিনি আপনাকে চিঠি লিখবেন, তিনি এই বক্সের ভেতর চিঠিটি ফেলবেন। এরপর যখন বক্সটি বন্ধ করা হবে, তখন এটি তালাবদ্ধ হয়ে যাবে। এরপর বক্সটি আপনার কাছে এসে পৌঁছানোর পর আপনি চাবি দিয়ে খুলে চিঠিটি পড়বেন।

এরকম একটি তালাবদ্ধ বক্সের ডিজিটাল ভার্সনের নাম হচ্ছে 'পাবলিক চাবি, আর এই বক্সের যে চাবি আপনার কাছে আছে, সেটির নাম 'প্রাইভেট চাবি।'

যারা ব্যক্তিগত গোপনীয়তার ব্যাপারে খুবই সতর্ক, তারা এই ব্যবস্থাটা বেশ পছন্দ করেন, কারণ এতে তাদের তথ্য সুরক্ষিত থাকে। যে মেসেজিং কোম্পানির মাধ্যমে আপনি বার্তা আদান-প্রদান করছেন, তারাও কিন্তু আপনার বার্তার অর্থ বুঝতে পারবে না।

কিন্তু কর্তৃপক্ষ এ ধরনের বার্তা আদান-প্রদানের ব্যবস্থা পছন্দ করে না, কারণ তারা যদি সন্দেহ করে যে কোন অপরাধ তৎপরতা চলছে, সেক্ষেত্রে তারা বার্তা পড়তে পারে না, ফোন কল শুনতে পারে না, বা ছবি দেখতে পায় না।

এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপশন কি বিপদজনক?

যুক্তরাজ্যে এ ধরনের গোপনীয় ব্যবস্থার বিরুদ্ধে যে আন্দোলন চলছে, তা মূলত শিশুদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে।

যেমন, 'নো প্লেস টু হাইড' বলে একটি সংস্থা বলছে, এন্ড-টু-এন্ড-এনক্রিপশন চালু হওয়ার মানে দাঁড়াবে বাতি নিভিয়ে দেয়ার মতো, কারণ এর ফলে অনলাইনে যারা শিশুদের যৌন নিপীড়ন করে, তাদের আর চিহ্নিত করা যাবে না।

তাদের যুক্তি হচ্ছে, এরকম শিশু নিপীড়নকারীরা যখন শিশুদের কাছে ফেসবুক মেসেঞ্জারে বার্তা পাঠাবে, সেগুলো পুলিশ তখন আর পড়তে পারবে না।

সংস্থাটির একজন মুখপাত্র বলেন, "আমরা সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোর প্রতি আহ্বান জানাই, তারা যেন কেবল তখনই এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপশন চালু করেন, যখন তারা নিশ্চিত হবেন যে, এমন প্রযুক্তি তাদের কাছে আছে, যার ফলে শিশুদের নিরাপত্তা কোনভাবেই ঝুঁকিতে পড়বে না।"

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সেন্টার ফর মিসিং এন্ড এক্সপ্লয়টেড চিলড্রেন (এনসিএমইসি) নামের একটি সংস্থার হিসেবে, ২০২০ সালে সোশ্যাল মিডিয়ায় শিশু যৌন নিপীড়ন সংক্রান্ত বিষয়বস্তু আদান-প্রদানের দুই কোটি ১৭ লাখ রিপোর্ট তাদের কাছে এসেছিল।

এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপশনের বিরোধীরা বলছেন, যদি এই ব্যবস্থা চালু হয়, তাহলে প্রতি বছর এরকম এক কোটি ৪০ লাখ ঘটনাই হয়তো অজানা থেকে যাবে।

তারা আরও বলছেন, শিশুদের সুরক্ষা এবং গোপনীয়তা রক্ষায় তারা প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর সঙ্গে একযোগে কাজ করতে চান।

এ ব্যাপারে ফেসবুক কী বলছে?

শিশুদের নিরাপত্তা বিষয়ক সংস্থাগুলোর চাপের মুখে ফেসবুক মেসেঞ্জার এবং ইনস্টাগ্রামের মূল মালিকানা সংস্থা মেটা এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপশন ব্যবস্থা চালু ২০২৩ সাল পর্যন্ত বিলম্বিত করে।

মেটা'র নিরাপত্তা বিষয়ক প্রধান অ্যান্টিগোনে ডেভিস তখন বলেছিলেন, "বিশ্ব জুড়ে কোটি কোটি মানুষকে যুক্ত করছে আমাদের কোম্পানি এবং আমরা এই প্রযুক্তির নেতৃত্বে আছি। লোকজনের ব্যক্তিগত যোগাযোগের গোপনীয়তা রক্ষা করা কিংবা তাদের অনলাইনে নিরাপদ রাখতে আমরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।"

শিশুদের নিরাপদ রাখতে যেসব ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে, তার একটি তালিকা দিয়েছে ফেসবুক। এর মধ্যে আছে, বার্তা আদান-প্রদানের অস্বাভাবিক ধরন চিহ্নিত করতে মেশিন লার্নিং ব্যবহার করা এবং ১৮ বছরের কম বয়সীদের একাউন্ট কেবলমাত্র 'প্রাইভেট' বা 'ফ্রেন্ডস অনলির' মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা।

দু'পক্ষকেই সন্তুষ্ট করার উপায় কি আছে?

২০১৭ সালে এই বিতর্ক যখন শুরু হয়েছিল, তারপর হতেই বিভিন্ন দেশের সরকার এবং এনজিওগুলো দাবি জানাচ্ছিল, এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপশনকে পাশ কাটিয়ে নিরাপত্তা সংস্থাগুলো যেন বার্তা পড়তে পারে, সেরকম একটা ব্যবস্থা তৈরি করা।

কিন্তু অনেক সাইবার সিকিউরিটি বিশেষজ্ঞ যুক্তি দিচ্ছেন যে, এই প্রযুক্তির মূল ভিত্তিকে দুর্বল না করে নিরাপত্তা ব্যবস্থায় এরকম একটা 'ফাঁক' খুঁজে বের করা বেশ কঠিন।

এক্ষেত্রে ব্যবহারকারীদেরকে নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর ওপর এরকম আস্থা রাখতে হবে যে, তারা এই গোপনীয় কোডের অপব্যবহার করবে না।

যেসব দেশে সেন্সরশিপ এড়ানোর জন্য এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপশন হচ্ছে একমাত্র ভরসা, সেসব দেশে নিরাপত্তা সংস্থাকে এই সুযোগ দিলে তা হবে বেশ উদ্বেগের ব্যাপার।

যুক্তরাজ্য সরকার যদি মেটা'কে নতুন ধরনের কোন ব্যবস্থা উদ্ভাবনে রাজী করাতে পারে, তখন এটি নিশ্চয় বিশ্বজুড়ে এই অ্যাপ ব্যবহারকারী শত কোটি মানুষের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়বে।

এবিএন/মমিন/জসিম

এই বিভাগের আরো সংবাদ