আজকের শিরোনাম :

ইসরায়েলি স্পাইওয়্যার কোম্পানির বিরুদ্ধে অ্যাপলের মামলা

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ২৫ নভেম্বর ২০২১, ১৩:৩০

ইসরায়েলি স্পাইওয়্যার কোম্পানি এনএসও এবং তাদের মূল প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অ্যাপল এ অভিযোগ এনে মামলা করেছে যে, তারা তাদের হ্যাকিং সরঞ্জাম ব্যবহার করে আইফোন ব্যবহারকারীদের ওপর নজরদারি চালাচ্ছে।

এনএসও কোম্পানির পেগাসাস সফটওয়্যার আইফোন এবং অ্যানড্রয়েড দুই ধরনের ফোনেই ভাইরাস ঢুকিয়ে হ্যাক করতে পারে। এই প্রযুক্তি দিয়ে ফোন ব্যবহারকারীর মেসেজ, ফটো এবং ইমেল তারা হাতিয়ে নিতে পারে এবং গোপনে ব্যবহারকারীর অজান্তে তার ফোনের মাইক ও ক্যামেরা চালু করে দিতে পারে।

এনএসও গ্রুপ বলছে, তাদের হ্যাকিং প্রযুক্তির লক্ষবস্তু সন্ত্রাসী ও অপরাধীরা।

কিন্তু অভিযোগ আছে এই সফটওয়্যার ব্যবহার করে অধিকার কর্মী, আন্দোলনকারী, রাজনীতিক ও সাংবাদিকদের ফোনও হ্যাক করা হচ্ছে।

এনএসও গ্রুপের দাবি, যেসব দেশে মানবাধিকারের রেকর্ড ভাল, তাদের সেনা বাহিনী, আইন প্রয়োগকারী এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকেই শুধু তারা এই হ্যাকিং প্রযুক্তি সরবরাহ করে থাকে।

তবে এ মাসের গোড়ায় আমেরিকান কর্মকর্তারা এই কোম্পানিটিকে তাদের বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে কালো তালিকাভুক্ত করেছিল। তাদের যুক্তি ছিল এই সফটওয়্যার ‘বিদেশি কিছু সরকারকে তাদের নিজস্ব সীমানার বাইরেও দমন পীড়ন চালানোর সুযোগ করে দিয়েছে, যেটা ভিন্নমতাবলম্বী ব্যক্তি, সাংবাদিক এবং আন্দোলন কর্মীদের লক্ষ্যবস্তু করতে কর্তৃত্বপরায়ণ সরকারগুলোর জন্য একটা হাতিয়ার হিসাবে কাজ করেছে।’

অ্যাপলের কেন এই পদক্ষেপ?
অন্যান্য প্রযুক্তি সংস্থা যেমন মাইক্রোসফট, মেটা প্ল্যাটফর্মস (যার আগের পরিচয় ফেসবুক নামে), গুগল মালিকানাধীন অ্যালফাবেট এবং সিসকো সিস্টেমের কাছ থেকে এ নিয়ে সমালোচনা আসার পর অ্যাপল এই পদক্ষেপ নিয়েছে।

আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়া রাজ্যের আদালতে মামলা দায়ের করার ঘোষণা দিয়ে অ্যাপল একটি ব্লগ পোস্টে জানিয়েছে, ‘অ্যাপল ব্যবহারকারীদের টার্গেট করে তাদের ওপর গোপন নজরদারি চালানোর জন্য দায়বদ্ধ করতে’ তারা এনএসও গ্রুপ এবং তাদের মূল প্রতিষ্ঠান ওএসআই টেকনোলজিসের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে চায়।

‘অ্যাপল ব্যবহারকারীদের যাতে ভবিষ্যতে ক্ষতি এবং হয়রানি করা না হয়, তার জন্য এনএসও যাতে অ্যাপল কোম্পানির কোনরকম সফটওয়্যার, বা তাদের সেবা ব্যবস্থা ও অ্যাপলের কোন ডিভাইস ব্যবহার করতে না পারে তার জন্য অ্যাপল স্থায়ী ইনজাংশানের (নিষেধাজ্ঞা) আবেদন জানিয়েছে,’ অ্যাপলের এই ব্লগ পোস্টে জানানো হয়েছে।

উত্তর আমেরিকায় বিবিসির প্রযুক্তি বিষয়ক সংবাদদাতা জেমস ক্লেইটন জানাচ্ছেন- অ্যাপল ব্যক্তিগত স্বাধীনতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল বলে গর্ব করে থাকে। তাদের ডিভাইসগুলো বিক্রির পেছনে এটা একটা বড় বিষয় হিসেবে কাজ করে থাকে।

কাজেই, ক্লেইটন বলছেন, যে স্পাইওয়্যার প্রতিষ্ঠান অ্যাপল-এর নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে পাশ কাটিয়ে তাদের ডিভাইসগুলো হ্যাক করছে বলে অভিযোগ, সেই সংস্থার প্রতি অ্যাপল-এর মত বিশাল প্রযুক্তি কোম্পানি রুষ্ট হবে তাতে অবাক করার কিছু নেই।

তবে অ্যাপলের এই পদক্ষেপ নেবার একমাত্র কারণ সেটাই নয়।

এনএসও দাবি করে তাদের কাছ থেকে এই পেগাসাস সফটওয়্যার কিনছে সরকারগুলোও, অ্যাপল যাদের পদক্ষেপকে চিহ্ণিত করছে ‘রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায়’ নেয়া পদক্ষেপ হিসেবে।

এনএসও আরও দাবি করছে যেসব সরকারের মানবাধিকার রেকর্ড ভাল তারা শুধু তাদের সাথেই কাজ করে। বিবিসির সংবাদদাতা বলছেন এখানে এনএসও বোঝাতে চাইছে সব হ্যাকাররাই মন্দ নয়- যারা পরিচয় গোপন রেখে অন্ধকার দুনিয়ায় বসে হ্যাকিং করে, তাদের সাথে এনএসও-র তফাত রয়েছে।

ক্লেইটন বলছেন, এখানে অ্যাপলের যুক্তি হচ্ছে এদের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। তাদের বক্তব্য আপনি যদি চুরি করে কারো ফোনে বা ডিভাইসে আড়ি পাতেন, সেখান থেকে তথ্য ব্যবহারকারীর অজ্ঞাতে হাতিয়ে নেন, তাহলে সেটাও অপরাধ।

অ্যাপলের অভিযোগপত্রে কী বলা হয়েছে?
অ্যাপল তাদের অভিযোগ দায়ের করেছে আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়ার ডিস্ট্রিক্ট আদালতে। তাতে অ্যাপল বলছে, এনএসও তাদের সফটওয়্যার প্রযুক্তি ব্যবহার করে ‘২০২১ সালে অ্যাপল কোম্পানির ভোক্তাদের লক্ষ্য করে হামলা চালাতে সমন্বিত উদ্যোগ নিয়েছে’ এবং ‘মোবাইল ফোনে এনএসও-র স্পাইওয়্যার দিয়ে আমেরিকান নাগরিকদের ওপর গোপন নজরদারি চালানো হয়েছে। এই স্পাইওয়্যার এমনকি আন্তর্জাতিক সীমানা লংঘন করে এ হামলা চালাতে সক্ষম এবং তা করেছে।’

অ্যাপল অভিযোগ করেছে যে এনএসও গোষ্ঠী একশর বেশি ভুয়া অ্যাপল আইডি সৃষ্টি করে এসব হামলা চালিয়েছে।

এই বিশাল প্রযুক্তি সংস্থাটি বলেছে তাদের সার্ভারের ওপর কোন হামলা চালানো হয়নি, কিন্তু এনএসও অ্যাপল ব্যবহারকারীদের ওপর হামলা চালাতে তারা সংস্থাটির সার্ভারের অপব্যবহার করেছে এবং সার্ভারকে তাদের কাজে ব্যবহার করেছে।

অ্যাপল আরও অভিযোগ করেছে, এই স্পাইওয়্যারটি কীভাবে ব্যবহার করতে হয়, তার পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হিসাবেও সরাসরি কাজ করেছে এনএসও গ্রুপ। কিন্তু এনএসও বলে আসছে তারা খদ্দেরদের কাছে শুধু তাদের সফটওয়্যারটি বিক্রি করেছে মাত্র।

অ্যাপল বলছে, এনএসওর সাথে তারা ক্রমাগত একটা অস্ত্র-যুদ্ধে নামতে বাধ্য হয়েছে। কারণ তাদের ভাষায় ইসরায়েলি প্রতিষ্ঠানটি ‘অ্যাপলের নিজস্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে ডিঙিয়ে অ্যাপল ডিভাইসে ঢুকতে যেভাবে সমানে তাদের ম্যালওয়্যার বা হ্যাকিং প্রযুক্তিকে উন্নত করেছে, অ্যাপলকে তার সাথে ক্রমাগত পাল্লা দিতে হয়েছে।’

আইফোন প্রস্তুতকারী অ্যাপল বলছে, এই মামলা থেকে আদায় করা ক্ষতিপূরণের অর্থ, সেইসাথে তাদের নিজস্ব তহবিল থেকে ১০ মিলিয়ন ডলার সিটিজেন ল্যাব নামে সাইবার নজরদারি বিষয়ক একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানে দান করবে।

টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন এই গবেষণা প্রতিষ্ঠানই প্রথম এনএসও-র কার্যকলাপ উদঘাটন করে।

এনএসও কী বলছে?
এনএসও গ্রুপ তাদের জবাবে বলছে, ‘এনএসও গ্রুপের তৈরি এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে হাজার হাজার মানুষের জীবন বাঁচানো সম্ভব হয়েছে।’

‘প্রযুক্তির নিরাপদ জগতে শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতনকারীরা এবং সন্ত্রাসীরা অবাধে বিচরণ করতে পারে। তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করার বৈধ অস্ত্র আমরা সরকারগুলোর হাতে তুলে দিয়েছি। এনএসও গ্রুপ সত্য তুলে ধরতে তাদের কাজ চালিয়ে যাবে।’
খবর বিবিসি

এবিএন/সাদিক/জসিম

এই বিভাগের আরো সংবাদ
ksrm