বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন

জিংক সমৃদ্ধ ধানের চাষিরা পাবেন জামানতহীন ঋণ, কী আছে এই চালে

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ১২ জানুয়ারি ২০২২, ১১:৪৮

দেশীয় বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত জিংক সমৃদ্ধ ধানের চাষ উৎসাহিত করতে বাংলাদেশের সরকার সম্প্রতি বিশেষ প্রণোদনার ঘোষণা দিয়েছে। এর অংশ হিসেবে কোন কৃষক জিংক সমৃদ্ধ পুষ্টি ধান চাষ করলে তাকে বিনা জামানতে ঋণ দেয়া হবে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক।

বাংলাদেশের সরকারি তথ্য বলছে, দেশটির প্রায় সাড়ে ৪৪ শতাংশ শিশু এবং প্রায় সাড়ে ৫৭ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক নারী জিংকের অভাবজনিত রোগে ভুগছে।

শরীরে জিংকের ঘাটতি হলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায় এবং স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়।

এ কারণে করোনা মহামারি চলাকালে বিশ্বের অন্যান্য দেশের তো কোভিড-১৯ আক্রান্ত ব্যক্তিদের জিংক ট্যাবলেট সেবন করার পরামর্শ দিতে দেখা গেছে বাংলাদেশের চিকিৎসকদেরও।

জিংকের অভাবে প্রাপ্তবয়স্ক নারীর বন্ধাত্ব্য দেখা দিতে পারে।

জিংক সমৃদ্ধ চাল আসলে কী?
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইন্সটিটিউট ১৯৯৫ সালে জিংক সমৃদ্ধ ধান নিয়ে গবেষণা শুরু করে। কয়েক বছর ধরে দেশি ধানের জাত এবং মাটি পরীক্ষা ও চিহ্নিত করে শুরু হয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা।

দুই হাজার তের সালে প্রথম ব্রি-৬২ নামে জিংক সমৃদ্ধ একটি নতুন ধানের জাত উদ্ভাবনের ঘোষণা দেন ধান গবেষণা ইন্সটিটিউটের বিজ্ঞানীরা।

এরপর একে একে আসে ব্রি-৬৪, ব্রি-৭২, ব্রি-৭৪, ব্রি-৮৪ এবং ব্রি-১০০। দেশে এখন এই মোট ছয় জাতের জিংক সমৃদ্ধ ধানের উৎপাদন হচ্ছে।

ধান গবেষণা ইন্সটিটিউটের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আব্দুল কাদের বিবিসিকে বলেছেন, জিংক ধান উদ্ভাবনের জন্য তারা প্রথমে জিংকের জিন সমৃদ্ধ ধান বাছাই করেছেন। এসব জাতের ধান মাটি থেকে দানার মধ্যে জিংক স্থানান্তর করতে পারে। জিংকের জিন থাকে ধানের খোসার মধ্যে।

এর পর জিংক জিন সমৃদ্ধ ধানগুলোকে উচ্চ ফলনশীল জাতের সঙ্গে ক্রস অর্থাৎ শঙ্করায়ন করা হয়।

ব্রি-৭৪ ধানের চাল কিছুটা মোটা, এর দাম তুলনামূলক কম। ব্রি-১০০ নাজিরশাইল চালের মত চিকন এবং এর দাম কিছুটা বেশি।
>> বাংলাদেশে নতুন দুটি ধানের জাত উদ্ভাবন
>> জলবায়ু পরিবর্তন বাংলাদেশে নিয়ে এসেছে লবণাক্ততা
>> চারা গাছের আকৃতি বড় করার নতুন উপায় উদ্ভাবন

পুষ্টি ধান কোথায় হয়? কেমন মাটি লাগে?
বাংলাদেশের প্রায় সব অঞ্চলেই এই ধানের চাষ সম্ভব বলে জানিয়েছেন কৃষি গবেষকরা। তবে পাহাড়ি মাটি এবং লবণাক্ত মাটিতে এ ধান চাষ করা যাবে না।

ধান গবেষণা ইন্সটিটিউটের কাদের বলেছেন, জিংক সমৃদ্ধ চাল সাধারণত বেলে, দোআঁশ এবং এঁটেল মাটিতে ভালো হয়। এই মুহূর্তে বরিশাল, রংপুর এবং ময়মনসিংহ বিভাগে জিংক সমৃদ্ধ ধানের চাষ সবচেয়ে বেশি হচ্ছে।

এই ধানের উৎপাদন প্রযুক্তির সাথে প্রচলিত ধানের চাষে কোনো পার্থক্য নেই। আর উৎপাদন ব্যয়ও একই সমান। ফলে এটি কৃষকদের লাভবান করবে বলে মনে করেন গবেষকেরা।

কী কাজে লাগে?
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইন্সটিটিউটের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মুন্নুজান খানম বলছেন, মানুষের শরীরে জিংকের দৈনিক যে চাহিদা সেটি শুধু চালের মাধ্যমে সরবরাহ করা যাবে এমন নয়। তবে যেহেতু দেশের মানুষের প্রধান খাদ্য চাল, সেহেতু চালের মাধ্যমেই জিংক সরবারহ করা সহজ।

‘জিংক সমৃদ্ধ চালের মাধ্যমে বাচ্চাদের এবং মায়েদের শরীরের জিংকের ঘাটতি প্রায় ৬০ শতাংশ পর্যন্ত পূরণ সম্ভব,’ তিনি বলেন।

কৃষি তথ্য সার্ভিসে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে যেভাবে ভাত খাওয়া হয়, তাতে প্রতি ১০০ গ্রাম চাল থেকে প্রায় ১২৯ কিলোক্যালরি শক্তি পাওয়া যায়। এর মধ্যে জিংক থাকে ১ দশমিক ১ গ্রামের মত। বিজ্ঞানীরা বলছেন এই পরিমাণ কোনভাবেই চাহিদার সমান নয়।

কিন্তু বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইন্সটিটিউটের গবেষকেরা বলেছেন, জিংক সমৃদ্ধ ব্রি-৬২ ধানের প্রতি কেজিতে আছে প্রায় ২৩ মিলিগ্রামের মত জিংক।

ব্রি-৭৪ এ আছে ২৪ মিলিগ্রামের বেশি। এ বছর উদ্ভাবিত সর্বশেষ জাত ব্রি-১০০ তে আছে সাড়ে ২৫ মিলিগ্রামের বেশি জিংক।

একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের শরীরে জিংকের দৈনিক চাহিদা প্রায় ৮-১২ মিলিগ্রাম এবং শিশুদের দৈনিক চাহিদা ৩-৫ মিলিগ্রাম।

জিংক সমৃদ্ধ চাল মানুষের শরীরে জিংকের চাহিদার ৬০ ভাগ পর্যন্ত পূরণ করতে সক্ষম।

এবিএন/সাদিক/জসিম

এই বিভাগের আরো সংবাদ
ksrm