১৯৯৬ সালে জাতিসংঘের ৫১তম অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর পূর্ণাঙ্গ ভাষণ

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৭:১৩ | আপডেট : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৭:২৪

১৯৯৬ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ৫১তম অধিবেশনে ভাষণ প্রদানকালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ছবি: এবিনিউজ
১৯৯৬ সালের ২৪ অক্টোবর প্রথমবার জাতিসংঘে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পূর্ণাঙ্গ ভাষণ এবিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডট কম পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হল:

পরম করুণাময় আল্লাহর নামে শুরু করছি।

জনাব সভাপতি,
আমি আপনার এবং জাতিসংঘের ৫১তম সাধারণ অধিবেশনের সম্মানিত প্রতিনিধিবৃন্দের জন্য বাংলাদেশের জনগণের প্রাণঢালা শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন বয়ে এনেছি।
আপনার মতো বিশ্বখ্যাত একজন কূটনীতিকের আজকের এই অধিবেশনে সভাপতির দায়িত্ব পালন নিঃসন্দেহে গভীর সন্তুষ্টি ও আনন্দের বিষয়। এতে কোনোই সন্দেহ নেই যে, আপনার ব্যাপক অভিজ্ঞতা এবং সুগভীর প্রজ্ঞা জাতিসংঘের এই সাধারণ অধিবেশনের সকল আলোচনার সফল সমাপনে কার্যকর অবদান রাখবে।

জনাব সভাপতি,
আজ থেকে ২২ বছর আগে ১৯৭৪ সালের ২৫শে সেপ্টেম্বর আমাদের মহান নেতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের জনগণের পক্ষ থেকে এ মঞ্চে দাঁড়িয়ে সাধারণ পরিষদের এক মহান অধিবেশনে ভাষণ দিচ্ছিলেন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে, জাতির জনকের কন্যা হিসেবে এই অনন্য বিশ্ব ফোরামে বক্তব্য রাখার বিরল সম্মান ও সুযোগ আমাকে আবেগাপ্লুত করে তুলেছে। এর মধ্যে বিশ্বে অনেক নাটকীয় পরিবর্তন ঘটেছে, পুরনো আদর্শভিত্তিক বিভক্তি ভেঙে পড়েছে, আঞ্চলিক সহযোগিতার সম্পর্ক গভীরতর হয়েছে এবং এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বিগত দুই দশকে দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়নের ফলে নতুন শক্তিশালী ভূ-রাজনৈতিক জোটের উদ্ভব হয়েছে।
বাংলাদেশেও এ সময়ে অনেক পরিবর্তন ঘটেছে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু এবং তার পরিবারের অধিকাংশ সদস্যকে নৃশংসভাবে হত্যার মধ্য দিয়ে আমাদের ইতিহাসকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার প্রচেষ্টা চালানো হয়। খুনিরা আমার ১১ বছরের শিশু ভাইটিকেও রেহাই দেয়নি। আমার পিতা, মাতা, ভ্রাতৃগণের নির্মম হত্যাকা- আমার জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি, আর জাতির জন্য তা বয়ে আনে এক মহাবিপর্যয়। দীর্ঘ সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে যে গণতান্ত্রিক অবকাঠামো আমরা গড়ে তুলেছিলাম, তা মুহূর্তের মধ্যে ধ্বংস করা হয় এবং জাতি এক অনিশ্চয়তা ও সংঘাতময় পরিস্থিতিতে নিপতিত হয়। শুরু হয় সামরিক অভ্যুত্থান, হত্যা, ভোট ডাকাতির এক নৈরাজ্যের কাল। বাংলাদেশের মানুষকে তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার ভোগের সুযোগ থেকে সুপরিকল্পিতভাবে বঞ্চিত করা হয়। জনগণ ভোটের অধিকার হারায়, নির্বাচন পদ্ধতিকে জালিয়াতি-কারসাজির মাধ্যমে এক লজ্জাজনক পরিহারে পরিণত করা হয়, জবাবদিহিতার সকল পদ্ধতিকে উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে উপেক্ষা করা হয়।

এই অন্ধকারময় পটভূমিতে আমার দল অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তিকে সাথে নিয়ে নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে এক গণ-আন্দোলনের সূচনা করে। সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন নিশ্চিত করার জন্য অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে এ ছিল অত্যন্ত জরুরি। বাংলাদেশের স্বাধীনতাপ্রিয় জনগণের জন্য এটি অত্যন্ত গর্বের বিষয় যে, তারা কারচুপি ও জালিয়াতির নির্বাচনের ফলাফল গ্রহণে সম্পূর্ণ অস্বীকৃতি জানায়। নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি আদায়ের সিদ্ধান্তে জনগণ অটল থাকে। অবশেষে আমাদের দেশের সাধারণ নারী-পুরুষের ইচ্ছার জয় হয় এবং এ বছরের ১২ই জুন সুষ্ঠু, অবাধ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনে শতকরা ৭৩ জন ভোটার ভোট প্রদান করেন। দেশে ও বিদেশে প্রশংসিত অত্যন্ত সুষ্ঠু ও অবাধ এ নির্বাচন জাতির জীবনে শান্তি ও স্থিতিশীলতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছে। এখন আমরা জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জনের লক্ষ্যে এক নতুন সংগ্রামের পথে যাত্রা শুরু করেছি। এক আনন্দঘন ঘটনাক্রমে জাতিসংঘ তার পঞ্চাশ বর্ষপূর্তি উদযাপন করার পরপরই আমরা বাংলাদেশের জনগণ স্বাধীনতার রজতজয়ন্তী বর্ষ উদযাপন করছি। বাংলাদেশে এক নতুন গণতান্ত্রিক যুগের- আশা ও অগ্রগতির যুগের সূচনা হয়েছে।

জনাব সভাপতি,
বাইশ বছর আগে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে ইস্যুসমূহ এখানে উত্থাপন করেছিলেন, সেসব এখনও বিদ্যমান। তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি মানবিক ঐক্যবোধ ও ভ্রাতৃত্ববোধের পুনর্জাগরণে পারস্পরিক নির্ভরশীলতার স্বীকৃতি প্রদান করে মানব সভ্যতাকে বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষার যুক্তিপূর্ণ সমাধান ও জরুরি কর্মসূচি গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছিলেন। তিনি বলিষ্ঠ যুক্তি উত্থাপন করে বলেছিলেন, জাতিসংঘের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে একটি ন্যায়সংগত আন্তর্জাতিক অর্থব্যবস্থা গড়ে তুলতে যুক্তির শক্তি যোজনা। এ ব্যবস্থায় স্বীয় প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর প্রতিটি দেশের সার্বভৌম অধিকারের নিশ্চয়তা থাকবে। একটি স্থিতিশীল ন্যায়সংগত অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় বিশ্বের সকল দেশের সাধারণ স্বার্থের ভিত্তিতে গড়ে উঠবে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বাস্তব কাঠামো।

জনাব সভাপতি, 
বিশ্ব বিগত দুই দশক রাজনীতির দৃশ্যপটে বহু পরিবর্তনের সাক্ষী। স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের ফলে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে মৌলিক এবং ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। বহু ঐতিহাসিক পরিবর্তন সত্ত্বেও আমাদের জাতির পিতা এখানে যে উৎকণ্ঠা অত্যন্ত বলিষ্ঠভাবে উত্থাপন করেছিলেন তা অনেকাংশে আজও এই মহান ফোরামে সমাধানের অপেক্ষায় রয়েছে।  বিেশ্বর অধিকাংশ মানুষ এখনও দারিদ্র্য, ক্ষুধা, রোগ ও অপুষ্টিতে ভুগছে। বিশ্বের সর্বত্র বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ থেকে আজও মিলিয়ন মানুষ বঞ্চিত। স্বল্পোন্নত দেশসমূহের তালিকাভুক্ত বাংলাদেশ গত দু-দশকে উন্নয়ন গতি ছিল শ্লথ। জনসংখ্যা বিস্ফোরণের কারণে আমাদের সফলতা অর্জন ব্যাহত হয়েছে। তাই আমাদের সরকার দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি ত্বরান্বিত করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আমাদের সর্বোচ্চ অঙ্গীকার হলেও সমতা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার বিষয়টিও আমাদের কাছে গুরুত্ববহ। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সব সময় দরিদ্র, দুর্বল এবং নির্যাতিত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। সে জন্যেই সমতা ও সামাজিক ন্যায়বিচারভিত্তিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আমাদের জাতীয় লক্ষ্য।

জনাব সভাপতি,
আমাদের সরকার এমন একটি রাজনৈতিক পদ্ধতিতে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে, যা আইনের শাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতাকে নিশ্চিত করবে। এ জন্য আমরা জাতীয় সংসদকে জাতীয় রাজনৈতিক কর্মকা-ের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছি, যেখানে সকল গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হচ্ছে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এবং জনগণের মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়েছে। নারী, শিশু এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অধিকার প্রতিষ্ঠাকে আমাদের সরকার পবিত্র দায়িত্ব হিসেবে গণ্য করে।
আমাদের সরকার দ্রুত আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য এক বাস্তবমুখী কর্মসূচি বাস্তবায়নের কাজ শুরু করেছে। দারিদ্র্য বিমোচন, স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধি, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং মানবসম্পদ উন্নয়নই হচ্ছে আমাদের উন্নয়ন কৌশলের মূল বৈশিষ্ট্য। বিশ্বের অধিকাংশ দেশের মতো আমরাও মুক্তবাজার এবং বহির্মুখী বাণিজ্য কৌশলের ভিত্তিতে উন্মুক্ত অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণ করেছি। অর্থনীতিতে প্রতিযোগিতা এবং স্থিতিশীলতা বজায় রাখার স্বার্থে আমরা উদার বাণিজ্য ব্যবস্থার আওতায় বাস্তবভিত্তিক রাজস্ব ও আর্থিক নীতি প্রণয়ন করেছি। আমরা আশা করছি, বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির সমকালীন স্থিতিশীলতা সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ উৎসাহিত করবে। আমরা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য বিনিয়োগ নিরাপত্তাসহ বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য উৎসাহব্যঞ্জক সুযোগ-সুবিধা প্রদান করছি।

জনাব সভাপতি,
বাংলাদেশের সার্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি খুব সন্তোষজনক না হলেও কয়েকটি ক্ষেত্রে অর্জিত সাফল্যের জন্য আমরা গর্ব অনুভব করতে পারি। আমরা পরিবার পরিকল্পনা এবং পরিবার কল্যাণের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছি। প্রকৃতপক্ষে, জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার হ্রাসের সুফল অর্জনের সাথে সাথে আমরা জনমিতিক ক্রান্তিকালে (demographic transition) উপনীত হয়েছি। সুপেয় পানীয় জল এবং খাবার সালাইনের ব্যাপক ব্যবহারের মাধ্যমে ডায়রিয়াসহ অন্যান্য পানিবাহিত রোগ প্রতিরোধে আমরা সাফল্য লাভ করেছি। সীমিত হলেও বালিকা ও নারী শিক্ষার ক্ষেত্রেও সাফল্য অর্জিত হয়েছে। নারীর ক্ষমতায়ন আজকের বাংলাদেশে উচ্চ অগ্রাধিকার পাচ্ছে। বাংলাদেশের নারীরা যাতে পুরুষের পাশাপাশি এগিয়ে যেতে পারে, তা নিশ্চিত করার জন্য আমরা বিভিন্ন সংস্কার কর্মসূচির বাস্তবায়নে কাজ করে যাচ্ছি। আমরা উৎসাহের সাথে লক্ষ করেছি যে, গত ১২ই জুন অনুষ্ঠিত নির্বাচনে নারী সমাজ বিপুল সংখ্যায় তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছে। পল্লী বিদ্যুতায়ন কার্যক্রম সাফল্য অর্জন করেছে। এক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধির হারকে আমরা আরও ত্বরান্বিত করতে চাই। বেসরকারি সংগঠনগুলো দেশের উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় বিশেষ করে তৃণমূল পর্যায়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বেসরকারি সংস্থাগুলোর সহায়তামূলক কর্মকা-কে আমাদের সরকার সমর্থন করে যাচ্ছে। বাংলাদেশের বেশ কিছু বেসরকারি সংস্থা নিজস্ব উদ্ভাবনী পদ্ধতি প্রয়োগে সাফল্যের জন্য বিশ^ব্যাপী স্বীকৃতি লাভ করেছে।

জনাব সভাপতি,
যে স্বল্প সাফল্য আমরা অর্জন করেছি, তার জন্য স্বস্তি অনুভবের কোনো সুযোগ নেই। আমাদের এখনও অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে। আমরা প্রায়ই খরা, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে নিপতিত হই। আমরা উপলব্ধি করছি, সুপরিকল্পিতভাবে পূর্ব থেকে প্রতিরোধ ও প্রতিরক্ষণমূলক ব্যবস্থা গড়ে তুলে এসব প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রতিকূল প্রতিক্রিয়া অনেকাংশে হ্রাস করা সম্ভব। এ ধরনের কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য প্রচুর বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে এবং আমরা এ জন্য প্রয়োজনীয় সম্পদ আহ্বানে আশাবাদী। এ প্রসঙ্গে আমি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বিশেষ করে বিশ্বের উন্নত দেশসমূহকে আমাদের প্রয়োজনের মুহূর্তে উদার সহযোগিতার হাত প্রসারিত করার জন্য আন্তরিক কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানাচ্ছি।

এ পরিপ্রেক্ষিতে সরকারি উন্নয়ন সহায়তার (ODA) ক্রমহ্রাসমান ধারার প্রতি আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। গত ২০ বছরের মধ্যে গত বছর এরূপ সহায়তার পরিমাণ ছিল সবচেয়ে কম, যা দাতাসমূহের অগ্রাধিকার পরিবর্তনেরই সংকেত বহন করে। ধনী দেশগুলোর মোট জাতীয় উৎপাদনের শূন্য দশমিক সাত শতাংশ সরকারি উন্নয়ন সহায়তা হিসাবে দেয়ার অর্ধেকের চেয়েও তা ছিল নিচে। সকল উন্নয়নশীল দেশ, বিশেষ করে স্বল্পোন্নত দেশের জন্য সরকারি উন্নয়ন সহায়তার এই ঋণাত্মক ধারা অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়। আমাদের দেশে উন্নয়নে গতিশীলতা আনার জন্য অধিক হারে বিদেশি ব্যক্তি বিনিয়োগ চাচ্ছি; কিন্তু অবকাঠামোগত উন্নয়নসহ অর্থনীতির কতিপয় খাতের উন্নয়নের জন্য আমাদের আরও কয়েক বছর সরকারি উন্নয়ন সহায়তার পর্যাপ্ত প্রাপ্তির ওপর নির্ভর করতে হবে। দ্বিপাক্ষিক উন্নয়ন সহযোগিতা কর্মসূচি নবায়নের সাথে সাথে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংঘ (IDA) এবং এশীয় উন্নয়ন তহবিলের (AD) সম্পদের পুনঃসরবরাহ এসব গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য অত্যন্ত জরুরি।

জনাব সভাপতি,
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্ব অর্থনীতিতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। এ সময়ে অনেক দ্বন্দ্বমূলক গতিপ্রবাহের মাঝেও বিশ্বব্যাপী ব্যাপকভিত্তিক পারস্পরিক নির্ভরশীলতার ধারাটি অত্যন্ত সুস্পষ্ট। এই সময়ে বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতাসমূহ কমে এসেছে, বাণিজ্যের প্রবাহ বৃদ্ধি পেয়েছে, নতুন উদ্ভাবিত প্রযুক্তিসমূহ ব্যবস্থাপনা ও যোগাযোগ ক্ষেত্রে বিপ্লব সাধন করেছে এবং এক দেশ থেকে অন্য দেশে ব্যক্তি-পুঁজির প্রবাহ বিপুলভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। অনেক কেন্দ্রীভূত পরিকল্পিত অর্থনীতি বৈদেশিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগের দরজা উন্মুক্ত করে দিয়ে উত্তরণের দুর্গম পথ বেছে নিয়েছে। বিশেষ করে ইউরোপ, এশিয়া এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে আঞ্চলিক সহযোগিতা প্রবাহ জোরদার হয়েছে। এসব পরিবর্তন বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার নতুন দিগন্ত উন্মুক্ত করেছে।

জনাব সভাপতি,
দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, স্বল্পোন্নত দেশসমূহ প্রবৃদ্ধি অর্জনের নবসৃষ্ট সুযোগসমূহের পুরোপুরি ব্যবহার করতে সমর্থ হয়নি। আমাদের ক্ষেত্রে জাতীয় পর্যায়ে আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও বিনিয়োগ কৌশলে পরিবর্তনের মাধ্যমে বিশ্ব অর্থনীতির গতিময় প্রকৃতি থেকে লাভবান হওয়ার চেষ্টা আমরাও করছি।

যেসব অভিন্ন সমস্যা আমাদের পেছনে টেনে রাখছে, তার অনেকগুলি দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক দাতাদের সক্রিয় সহযোগিতার সমষ্টিগতভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব। এসবের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আমাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবকাঠামোর দুর্বলতা- যা কাটাতে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ। শিক্ষার মতো কয়েকটি ক্ষেত্রে বিনিয়োগের বিপরীতে প্রাপ্য ফিরতির প্রকৃতির আলোকে ব্যক্তি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা দুষ্কর এবং সেজন্য এ সকল ক্ষেত্রে রেয়াতী অর্থায়ন অতীব প্রয়োজন।

চিন্তা ও প্রযুক্তি বিপ্লবের এই নবযুগে ব্যক্তি মালিকানা ও উদ্ভাবনী শক্তির দ্বারা সমাজের সম্পদ নির্ধারিত হবে। তাই মানবসম্পদ উন্নয়নে বিনিয়োগ না হলে স্বল্পোন্নত দেশগুলো আরও পিছিয়ে পড়বে।

জনাব সভাপতি,
বিশ্বব্যাপী পারস্পরিক নির্ভরশীলতা ও সংযোগের উন্নীত মাত্রা সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ এবং আন্তর্জাতিক আইনের ক্ষেত্রে আমাদের নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি করেছে। বেশ কিছু অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রতিক্রিয়া জাতীয় সীমানা অতিক্রম করেছে। অনেক বহুজাতিক সংস্থার এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আন্তর্জাতিক কর্মব্যাপ্তি অর্থনীতির জাতীয় নিয়ন্ত্রণ-ব্যবস্থাকে অকার্যকর করে ফেলছে। আঞ্চলিক সহযোগিতা-সমঝোতা জোটগুলো এসব সমস্যা সমাধানে সক্রিয় হলেও আমি মনে করি, বিশ্ব পরিসরে এগুলোর সমাধান হওয়া প্রয়োজন। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজারে স্বল্পমেয়াদি ব্যক্তি পুঁজিপ্রবাহের পরিমাণ ও গতিময়তা এতই শক্তিশালী যে, সবচেয়ে ধনী দেশগুলোও তাদের সংরক্ষিত সরকারি তহবিল নিয়ে এই পুঁজিবাজারে হস্তক্ষেপের চেষ্টা চালালে, তা পরাভূত হবে। সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত বাজার-ব্যবস্থায় সাধারণ হস্তক্ষেপ না করার নীতি গ্রহণ করা হলেও, যে কোনো বাজার বিপর্যয়ের সময় হস্তক্ষেপ করার পরিধি রাখতেই হবে।

জনাব সভাপতি,
জাতিসংঘ স্থায়ী ও ব্যাপকভিত্তিক শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে পারস্পরিক সমঝোতার কাঠামো নির্ধারণ ও উন্নয়নের জন্য সারা পৃথিবীর মানুষের প্রচেষ্টারই প্রতিনিধিত্ব করে। উন্নয়ন কৌশল নিয়ে আদর্শগত বিভেদ এখন অতীতের বিষয়। জাতিসংঘ অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে এখন তার সত্যিকারের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারে। জাতিসংঘের কাছে আমরা এ বিষয়ে শুধুমাত্র সক্রিয় ও সরাসরি ভূমিকাই প্রত্যাশা করি না, আমরা চাই জাতিসংঘ সকল আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার কার্যক্রমের সমন্বয় ও দিক-নির্দেশনা প্রদান করুক। আপনার উদ্বোধনী বক্তৃতায় আপনি বলেছেন, “জাতিসংঘ উন্নয়ন সম্পদের মুখ্য ভূমিকা না নিতে পারলেও এই সংঘকে উন্নয়নের মূল অনুঘটক হিসেবে স্বল্পতর গণতান্ত্রিক কাঠামোতে প্রতিষ্ঠিত অথচ সম্পদ আহরণে অধিকতর সম্ভাবনা সংবলিত সংস্থাগুলোর মধ্যে সামষ্টিক পর্যায়ে সমন্বয়ের জোরালো প্রভাব বলয় সৃষ্টি করতে সক্ষম হতে হবে। একই সূত্র অনুসরণ করতে হবে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে দেশসমূহের মধ্যে বিরাজমান সমস্যার সমাধান। এই সূত্র অনুযায়ী আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে পানিসহ সকল সাধারণ সম্পদের ন্যায্য বিভাজন আমাদের কাম্য।”


জনাব সভাপতি,
জাতিসংঘের ভূমিকা সম্পর্কে সাম্প্রতিক অনেক কথাই বলা হয়েছে। আমি এই বিশ্ব ফোরামে অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করতে চাই, জাতিসংঘ সনদে বর্ণিত কার্যাবলি ও নির্ধারিত দায়িত্বসমূহ পালনে এ বিশ্ব সংস্থার আরও শক্তিশালী ভূমিকাকে বাংলাদেশ জোরালোভাবে সমর্থন করবে। ইউএনডিপি, ইউনিসেফ, হু, ফাও, আইএলও, আঙ্কটাড, ইউএনএফপিএ, ইউএনএইচসিআর-এর মতো জাতিসংঘের অন্যান্য অঙ্গসংগঠনসমূহ মানবতার সেবায় যে মূল্যবান অবদান রেখেছে, তা আমি কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করছি। এসব এবং জাতিসংঘের অন্যান্য সংস্থাসমূহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আজকের বিশে^র জটিল বিষয়াদি ও সমস্যাদি নিরসনে অতি মূল্যবান সহযোগিতা প্রদান করেছে। বর্তমানে আমরা পৃথিবীর বিভিন্ন মহাদেশে আঞ্চলিক সহযোগিতার যে ধারা বিকশিত হওয়া প্রত্যক্ষ করছি, তার প্রাথমিক তাড়না সৃষ্টির জন্য জাতিসংঘের আঞ্চলিক অর্থনৈতিক কমিশনের নিকট এসব সংস্থাগুলো ঋণী। নিন্দুকের সমালোচনা সত্ত্বেও জাতিসংঘ গত ৫০ বছরে মানবগোষ্ঠীর স্বপক্ষে যে অবদান রেখেছে- তা এই প্রতিষ্ঠানকে বিশ্বশান্তি, স্থিতি ও উন্নয়নের সবচেয়ে বড় প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। শান্তি ও নিরাপত্তার সারথি হিসেবে অবদান রাখার জন্য আমি বাংলাদেশের তরফ থেকে জাতিসংঘকে অভিনন্দন জানাচ্ছি।

প্রাসঙ্গিকভাবে, আমি এখানে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনের মতো মহৎ ক্ষেত্রে আমাদের দেশের অবদানের কথা বিনয়ের সাথে উল্লেখ করতে চাই। নিরাপত্তা পরিষদ প্রণীত সনদ ও প্রস্তাবাবলী অনুযায়ী বাংলাদেশ জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে অবদান রাখার জন্য সৈন্য প্রেরণের আহ্বানে সাড়া দেয়। জাতিসংঘের সদস্য দেশ হিসেবে আমরা এ কাজকে আমাদের পবিত্র দায়িত্ব হিসেবে গণ্য করি। এটি আমাদের জন্য গভীর সন্তুষ্টির বিষয় যে, আমাদের সাহসী সৈনিকেরা বিশ্বের বিভিন্ন যুদ্ধ-সংঘাতময় স্থানে গিয়ে তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব নিষ্ঠা, মর্যাদা ও সম্মানের সাথে সম্পাদন করে সুনাম অর্জন করেছেন। আমরা আমাদের সৈনিকদের জন্য এ কারণে গর্ব অনুভব করি, তারা অত্যন্ত প্রতিকূল পরিস্থিতিতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তাদের দায়িত্ব পালন করছেন। জাতিসংঘ সনদের আওতায় শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে যখনই আমাদের আহ্বান জানানো হবে, তখনই সে আহ্বানে সাড়া দেয়ার ক্ষেত্রে আমরা আমাদের প্রস্তুতির কথা পুনর্ব্যক্ত করছি।

জনাব সভাপতি,
নিরস্ত্রীকরণ, বিশেষ করে পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য সর্বদাই প্রধান করণীয় বিষয়। ১৯৪৬ সালের জানুয়ারি মাসে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে গৃহীত প্রথম প্রস্তাবেই পারমাণবিক অস্ত্র নির্মূল করার আহ্বান জানানো হয়। একই বছরের শেষের দিকে, বারুচ পরিকল্পনাও প্রকৃত অর্থে পারমাণবিক মারণাস্ত্রকে নিষিদ্ধ ঘোষণা ও ধ্বংস করার একটি প্রস্তাব ছিল। এই অতুলনীয় প্রস্তাবটি এসেছিল এমন এক দেশ থেকে, যা সেই সময়ে এই ভয়ঙ্কর অস্ত্রের অধিকারী ছিল। ষাটের দশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তৎকালীন সোভিয়েট ইউনিয়ন (ইউএসএসআর) জেনেভাতে আঠারো জাতি নিরস্ত্রীকরণ কমিটির সামনে তাদের নিজ নিজ পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের পূর্ণাঙ্গ বা সাধারণ পরিকল্পনা পেশ করে। সাম্প্রতিক সময়ে ১৯৮৬ সালে তৎকালীন সোভিয়েট প্রেসিডেন্ট গর্বাচেভ থেকে পর্যায়ক্রমে পারমাণবিক অস্ত্র নির্মূল করার প্রস্তাব আমরা পেয়েছি। স্বাধীন ও অতীব সম্মানিত চিন্তা-যুথ (think-tank) নতুন চিন্তাধারার প্রতিষ্ঠানসমূহ, নিরপেক্ষ কমিশন এমনকি আন্তর্জাতিক আদালত এ ধরনের অস্ত্র নিষিদ্ধ করার অনুকূলে তাদের মত ঘোষণা করেছে। পারমাণবিক অস্ত্র নিদারুণ ঘৃণার ধারক এবং নিঃসন্দেহে এই সভ্য জগতে পারমাণবিক অস্ত্রের জন্য কোনো স্থান থাকতে পারে না। সারা পৃথিবীতে এই সচেতনতা সুস্পষ্টভাবে বিরাজমান। এই অস্ত্র নির্মূলের উপলব্ধিও দিন দিন তীব্রতর হচ্ছে। আশার কথা, পারমাণবিক যুদ্ধের আশঙ্কা বহুলাংশে কমে এসেছে। এখন যা প্রয়োজন তা হচ্ছে সাহস, বিশ্বাস, উদ্যোগ এবং সকল আন্তরিকতার সাথে পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের উদ্দেশ্যে সারা পৃথিবীকে উজ্জীবিতকরণ, পারমাণবিক শক্তিসমূহ নিজেরাও পারমাণবিক অবিচ্ছুরণ চুক্তির ৫ নম্বর অনুচ্ছেদের আওতায় তা করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

জনাব সভাপতি,
আমি আমার বক্তব্য শেষ করার আগে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুর প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। এই ইস্যু সকল দেশের জন্যই উদ্বেগের বিষয়। এই ইস্যু হলো আন্তর্জাতিক অভিবাসন বিষয়ক। খোলাখুলিভাবে বলতে গেলে বলা যায় যে, পৃথিবীব্যাপী মানুষের অভিবাসন প্রবাহ প্রকৃতপক্ষে অন্য যে কোনো কারণের চেয়ে অর্থনৈতিক কারণেই বেশি ঘটছে। যুগ যুগ ধরে সাচ্ছন্দ্যময় জীবনের আশায় অভিবাসনকারীরা জনবসতিহীন এলাকায় বসতি স্থাপন করতে তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রেখেছে। বহু দেশ এবং সংস্কৃতির উন্নয়নেও তাদের অবদান অনস্বীকার্য। অভিবাসনকারীরা সংহতায়িতভাবে সকলেই কর্মঠ, কঠোর ও দীর্ঘ পরিশ্রমের জন্য সদাপ্রস্তুত। এদের অনেকেই সংশ্লিষ্ট দেশের অভিবাসন আইন অমান্য করার কারণে প্রায়শ শোষণ এবং অপব্যবহারের শিকার হন। তারা রাজনৈতিক আশ্রয়লাভকারী ব্যক্তিদের ন্যায় আইনগত ও প্রথাগত নিরাপত্তা এবং সুযোগ পান না।

প্রায় ১২ কোটি ৫০ লাখ মানুষ স্বদেশের বাইরে বসবাস করছে বলে প্রাক্কলিত হয়েছে। এদের অর্ধেকেরই বেশি এক উন্নয়নশীল দেশ থেকে আরেকটি উন্নয়নশীল দেশে যাচ্ছে। এই বিষয়টি তাই সকল দেশ বা দেশগোষ্ঠীর জন্য উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই সমস্যাটির যথার্থ সমাধান না করা হলে ভবিষ্যতে এটি একটি বিশ্ব সমস্যা হয়ে দাঁড়াতে পারে। এজন্য আন্তর্জাতিক আইন-কানুন ও বিধি-বিধান প্রণয়ন করতে হবে, খুঁজে বের বা দূর করতে হবে অভিবাসন প্রবাহের মূল কারণ। এই ইস্যুটি একাধারে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও মানবিক। মানুষের নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও এর তাৎপর্য বিদ্যমান। অব্যাহত এই দুর্ভাগ্যজনক অবস্থার আলোচনার জন্য এই বিষয়ের ওপর একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।

বিশ্বব্যাপী পুঁজি, বাণিজ্য ও সেবা প্রবাহের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়ার অনুকূলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরাম এবং সেমিনারে জোরালো যুক্তি প্রদর্শন করা হয়। আমরা মনে করি, এর পাশাপাশি শ্রমিকদের গমনাগমনের ওপর বিধি-নিষেধের নিয়ন্ত্রণ শিথিল করার পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে। এ বিষয়টি নিশ্চিতভাবে খোলামনে কোনোরূপ বৈষম্য ছাড়াই যথেষ্ট গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা উচিত। ইতিহাস দৃঢ়ভাবে সাক্ষ্য দেয় যে, উন্নত জীবনের সন্ধানে অভিবাসনকারীরা স্ব-স্ব অভিবাসনের দেশকে দরিদ্র নয়; বরং বিত্তশালী করেছে, উন্নত করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে স্থাপিত প্রতীকটি যা ফ্রান্সের জনগণ যুক্তরাষ্ট্রকে উপহার দিয়েছিল, তা বিশ্বব্যাপী মুক্তির প্রতীক-মূর্তি হিসেবে স্বীকৃত। আমাকে বলা হয়েছে যে, মেঘমুক্ত দিনে জেএফকে বিমানবন্দরে অবতরণের সময় আকাশ থেকে এটি ক্ষণিকের জন্য দেখা যায়। এই মূর্তি-প্রতীকের একটি দিক আমেরিকার বাইরে ততটা সুবিদিত নয়। এই মূর্তির পাদদেশে রয়েছে একটি ভাঙা শিকল, যার প্রতীকী অর্থ হচ্ছে স্বাধীনতার পুনঃআবিষ্কার। এবং এর পাদদেশে একটি ফলকের ওপর Emmo Lazrus-এর The New Colossus থেকে একটি অমর বাণী খোদাই করা আছে। এই বাণীটি আমি উদ্ধৃত করছি-
“Give me your tired, your poor
Your huddled masses yerning to breath free,
The wretched refuse of your teeming shore,
Send these, the homeless, tempest tossed, to me,
I lift my lamp beside the golden door!”

তাই নিউইর্য়ক এবং এই বিশ্ব সংস্থা নিঃসন্দেহে বিশ্ব সম্প্রদায়ের সামনে আন্তর্জাতিক অভিবাসনের ইস্যুটি উপস্থাপন করার জন্য যথার্থ স্থান।

জনাব সভাপতি,
আমরা কেমন ভবিষ্যৎ প্রত্যাশা করি, মানস চক্ষে দেখি? বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠ কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বহু বছর আগে এ ধরনের এক গীতিময় ভবিষ্যৎ স্বপ্নের রূপরেখা তার কবিতায় মেলে ধরেছেন-

“চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির,
‘জ্ঞান যেথা মুক্ত, যেথা গৃহের প্রাচীর
আপন প্রাঙ্গণ তলে দিবস শর্বরী
বসুধারে রাখে নাই খ- ক্ষুদ্র করি’
যেথা বাক্য হৃদয়ের উৎসমুখ হতে
উচ্ছ্বসিয়া উঠে, যা নির্বারিত স্রোতে
দেশে দেশে দিশে দিশে কর্মধারা ধায়
অজস্র সহস্রবিধ চরিতার্থতায়-”

আমাদের তথা সকল উন্নয়নশীল দেশের সমস্যা হলো, আমরা কীভাবে এ স্বপ্ন বাস্তবায়িত করব। এক্ষেত্রে আমাদের সদিচ্ছার অভাব নেই, আমরা এর পরিধি ও বিশালতা সম্পর্কেও সম্পূর্ণ সচেতন। তবে যে বিশ্বাস, স্থিরতা ও দৃঢ়তা নিয়ে এক্ষেত্রে আমাদের এগিয়ে যাওয়া, ঈপ্সিত সেভাবে এখনও এগুতে পারিনি। আমরা সব সময়ই শুরু করি; কিন্তু কখনই তা অব্যাহত রাখি না, কখনই সম্মুখে এগোই না, কখনই পূর্ণ করি না এবং কখনই সমাপ্তি টানি না। প্রায়শ আমরা সঠিক পথে প্রথম পদক্ষেপ গ্রহণ করেই সন্তুষ্ট থাকি, কদাচিৎ দ্বিতীয় পদক্ষেপের দিকে অগ্রসর হই এবং প্রায় সবক্ষেত্রেই তৃতীয় পদক্ষেপ কখনই গ্রহণ করি না। শুরু শুরুর দিকের কয়েকটি পদক্ষেপ, যা প্রকৃতপক্ষে শুরু নয় এবং যা কোনো গন্তব্যেও নিয়ে যায় না, তা দিয়ে অর্থপূর্ণ অগ্রগতি অর্জন করা সম্ভব নয়।

এ মুহূর্তে আমাদের প্রয়োজন সেই দূরদর্শী জ্ঞান ও কল্পনাশক্তি, যার সাহায্যে আমেরিকার একজন বিখ্যাত প্রেসিডেন্ট এবং একজন খ্যাতিমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্ঞানালোকিত কংগ্রেসের সমর্থন নিয়ে বিশ্বযুদ্ধোত্তর ইউরোপের বিপর্যস্ত অর্থনীতির পুনরুজ্জীবনে বিশাল পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলেন ও দ্রুততার সাথে তা বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

জনাব সভাপতি,
শান্তি, নিরাপত্তা এবং উন্নয়নের লক্ষ্যে পূর্ণাঙ্গ বলিষ্ঠতা এবং সদিচ্ছা নিয়ে অনুসরণীয় এসব করণীয়র প্রতি আমি দৃষ্টি আকর্ষণ করছি -
১. উন্নয়নশীল দেশসমূহের মধ্যে দরিদ্রতমদেরকে বর্তমান নৈরাশ্যজনক অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য গৃহীত কর্মপরিকল্পনা জরুরিভিত্তিতে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।
২. পৃথিবীর সকল শিশুর নিরাপত্তা, উন্নয়ন এবং তাদের টিকিয়ে রাখার লক্ষ্যে ইতোমধ্যে গৃহীত পরিকল্পনা তা আমাদের যথাশীঘ্র বাস্তবায়ন করতে হবে।
৩. রিওডি জেনিরোতে ইউএনসিইডি-এর সময় আলোচিত ও গৃহীত চুক্তির বিষয়ে সকল পর্যায়ে সচেতনতা সৃষ্টি এবং একই সাথে সেগুলো দ্রুত বলবৎ ও বাস্তবায়ন করতে হবে।
৪. জাতীয় উন্নয়ন প্রক্রিয়ার ভিত্তি হিসেবে টেকসই উন্নয়ন কৌশলের ওপর আমাদের গুরুত্বারোপ করা প্রয়োজন হবে।
৫. বিশ্বব্যাপী মানবাধিকার উন্নয়নের বিশেষ করে সবচেয়ে দুর্দশাগ্রস্ত দল ও গোষ্ঠীর জন্য অনুসৃত কর্মপদ্ধতিগুলি আমাদের সুসংহত করতে হবে; এই দুস্থ দল ও গোষ্ঠীর লোকদের জন্য সেসব দেশে বা এলাকাতে অভিবাসনের অধিকার আদায় করতে হবে যেখানে তারা উন্নয়নে অবদান রাখতে পারবে এবং নিজেরাও সর্বাধিক আয় করতে সমর্থ হবে।
৬. জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমানোর লক্ষ্যে নারী শিক্ষা এবং নারীর ক্ষমতায়নের ব্যাপারে আমাদের ঐকমত্য গড়ে তোলা এবং তাকে জোরদার করা প্রয়োজন হবে।
৭. গত বছর কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত সামাজিক শীর্ষ সম্মেলনে দারিদ্র্য দূরীকরণে বিভিন্ন দেশের সরকারসমূহ যে প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছে, তা রক্ষা করা প্রয়োজন।
৮. বেইজিং-এ মহিলাদের ওপর বিশ্ব সম্মেলনে মেয়েদের সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের জন্য যে কর্মপরিকল্পনা নেয়া হয়েছে, তার পূর্ণ এবং দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।
৯. নবম আঙ্কটাড-এ গৃহীত ঘোষণা ও সুপারিশ অনুযায়ী বাণিজ্য বিষয়ে উন্নত এবং উন্নয়নশীল বিশ্বের মধ্যে বর্ধিত অংশীদারিত্ব এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে স্বল্পোন্নত দেশসমূহের মধ্যে আমাদের অধিকতর সমন্বয় সাধন করতে চাই।
১০. ইস্তাম্বুলে হেবিটাট সম্মেলন-এ গৃহীত বসতিমান উন্নয়নের বিশ^ কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে।
১১. আমাদের পারমাণবিক অস্ত্র চিরতরে নির্মূল করতে হবে।
১২. সর্বোপরি আমাদের বিশ্ব অর্থনীতিকে সামরিক থেকে সুশীল বলয়ে রূপান্তরিত করতে হবে। এই বলয়ে নিশ্চিত থাকবে ব্যক্তি অধিকার এবং সম্পদে বণ্টনে ন্যায্য ও সমতার বিভাজনে।

এতক্ষণ আমি যা বলেছি, তাতে খুব বেশি নতুন কথা নেই। আমার উত্থাপিত অনেক বিষয়ে ইতোমধ্যে সম্মত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। আমাদের যা প্রয়োজন তা হলো দ্বিতীয়, তৃতীয় এবং তৎপরবর্তী পদক্ষেপের দিকে এগিয়ে চলা। শান্তি, নিরাপত্তা এবং উন্নয়ন প্রয়াসে সুনিপুণ পদক্ষেপ গ্রহণের কোনো বিকল্প নেই। যতই স্ববিরোধী মনে হোক-না-কেন, সর্বক্ষেত্রে শান্তির জন্য আমাদের আগ্রাসী প্রচেষ্টাও চালানো উচিত।

জনাব সভাপতি,
বড় আশা নিয়ে শুরু হয়েছিল এই বিংশ শতাব্দী। কিন্তু এই শতাব্দীর শেষ প্রান্তে এসে অদম্য অপরাধ প্রবণতা, ঘৃণা, বর্বরতা এবং মানব ইতিহাসের কতিপয় জঘন্যতম নৃশংসতা- আমাদের প্রত্যাশার ভিতকে নড়িয়ে দিয়েছে।

আমি বিশ্বাস করি, আরেক নতুন শতাব্দীর দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণের মধ্য দিয়ে নতুন পৃথিবী নির্মাণের ঐতিহাসিক দায়িত্ব আমরা পালন করতে সক্ষম।
বিশ্ব সম্প্রদায়ের একজন সক্রিয় সদস্য হিসেবে বাংলাদেশ তার ভূমিকা পালন করে যাবে। আমরা ইতোমধ্যে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশের ১২ কোটি মানুষের উন্নত জীবনমান নিশ্চিত করার গুরুদায়িত্ব বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আমাদের আন্তরিক অগ্রযাত্রা শুরু করেছি।

জনাব সভাপতি,
আপনাকে ধন্যবাদ।
জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।
বাংলাদেশ দীর্ঘজীবী হোক।
জাতিসংঘ দীর্ঘজীবী হোক।
খোদা হাফেজ।

এবিএন/জনি/জসিম/জেডি

এই বিভাগের আরো সংবাদ
ksrm