বিষয় : আওয়ামী লীগ

  সুভাষ সিংহ রায়

২৩ জুন ২০২২, ১০:৫২ | অনলাইন সংস্করণ

সুভাষ সিংহ রায়
এক

“১৪ বছর আগে জার্মানি থেকে ফেরার পথে আমার বিমানসঙ্গী ছিলেন চট্টগ্রামের ইস্পাহানি সাহেব। সেকালের নামকরা বণিক ইস্পাহানির পুত্র। ফ্রাঙ্কফুট থেকে আমরা ‘Lufthansha’ বিমানে উঠি ও পাশাপাশি বসি। ‘ব্যবসা-বাণিজ্যের দিক থেকে পার্টিশন একটা সর্বনাশা ব্যাপার। আমাদের কারবারের পরিধি ছিল অনেক বিস্তৃত কিন্তু তা টুকরো করতে হয়েছে। পূর্ব পাকিস্তানের ভার পড়েছে আমার ওপর। ওইটুকু গণ্ডির ভেতর প্রসারণের পরিসর কোথায়?’ তিনি আপসোস করেন।

অর্থনীতির প্রসঙ্গ থেকে আমরা রাজনীতির প্রসঙ্গে আসি। তিনি বলেন, ‘আইয়ুব খান যে বেসিক ডেমোক্রেসির প্রবর্তন করতে যাচ্ছেন তার ফল ভালো হবে না। মাত্র ৮০ হাজার ভোটার। টাকা ছড়িয়ে ৪১ হাজার ভোটারকে হাত করা অতি সহজ। আইয়ুব চান চিরস্থায়ী হতে।’

আমি জিজ্ঞাসা করি তার নিজের মতে কী করা উচিত। তিনি এর উত্তরে বলেন, ‘রাজনীতিকদের হাতে ক্ষমতা ফিরিয়ে দিলেই হয়। আগেকার মতো প্রত্যক্ষ নির্বাচনে যারা জিতবেন তারাই সরকার চালাবেন।’

কিন্তু সরকার চালানোর মতো যোগ্য লোক কি পূর্ব পাকিস্তানে আছেন? আমার নিজের মনেই সংশয় ছিল।

‘কেন? শেখ মুজিবুর রহমান।’ তিনি নিঃসংশয়ে উচ্চারণ করেন।

আমার পাল্টা প্রশ্ন, শেখ মুজিবুর রহমান কি পারবেন একটা প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী হতে?

‘কেন পারবেন না? তাকে একটা সুযোগ দিলে ক্ষতি কী?’ তিনি শেখ মুজিবকে চিনতেন ও তার ওপর আস্থাবান ছিলেন। ইস্পাহানি বাঙালি নন। মুজিব বাঙালি। কিন্তু লক্ষ্য করলাম তার মধ্যে প্রাদেশিকতা নেই। তার কারণ বোধহয় তিনি ইরান দেশের আগন্তুক। পাকিস্তানি নাগরিক হলেও তার মানসিকতা পূর্ব পাকিস্তানি সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে। কলকাতাতেই তিনি ভালো ছিলেন। হিন্দু-মুসলমানের ঝগড়া তিনি পছন্দ করেন নি।”

কবি অন্নদা শঙ্কর রায় ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন এভাবেই তাঁর প্রবন্ধ ‘ইন্দ্রপাত’ শুরু করেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাংলাদেশ সৃষ্টি যে অনিবার্য ছিল সেটাই তিনি বলতে চেয়েছিলেন।

বাংলাদেশের অভ্যুদয় নিয়ে এখনও কেউ কেউ বিভ্রান্তির জাল বিস্তার করছে। সে জন্য একটু পেছনে যাওয়া দরকার। মূলত ১২০০-১৭৫৭ সাল সময়কালে বাংলার অভ্যুদয় ঘটে। ওই সময়কালকেই প্রাচীন বাংলা বলা হয়।

ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, এই বাংলাদেশের মাটিতে নানারকম শাসনকাল ছিল। মুসলিম শাসন, তুর্কি শাসন, স্বাধীন সুলতানি শাসন, ইলিয়াস শাহী বংশের শাসন, গণেশ বংশের শাসন, আবার ইলিয়াস শাহী বংশের শাসন, হাবশী শাসন, হুসেন শাহী বংশের শাসন, আফগান শাসন, বারো ভূঁইয়াদের শাসন, মুঘল শাসন, সুবাদারি শাসন, নবাবী শাসন।

তাছাড়া প্রকৃত অর্থে বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসের ধারাবাহিক বিবরণ পাওয়া যায় পাল রাজাদের শাসনকাল থেকে। একমাত্র বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন ১৯৪৭ সালে ১৫ আগস্টের অন্তত দু’তিন মাস আগ থেকে। আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের মাটিতে ঐতিহ্যে, সংস্কৃতিতে, কৃষ্টিতে ও সর্বোপরি স্বাধীনতায় একাকার হয়ে আছে। এ দেশের মানুষের জন্য রাজনৈতিক প্রজ্ঞা নিয়ে প্রথমে এই একটি রাজনৈতিক দল গঠিত হয়, যা বাংলাদেশের সীমারেখায় বাংলার জনগণের গভীরে শেকড়ে ছড়িয়ে ক্রমে ক্রমে মহীরুহ রূপ ধারণ করেছে। ভারতের জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্যামলী ঘোষ পিএইচডি ডিগ্রি লাভের জন্য The East Pakistan Awami League, ১৯৫৮-৭১ শীর্ষক যে অভিসন্দর্ভটি রচনা করেছিলেন সেখান থেকে কয়েকটি লাইন পাঠকদের জন্য উপস্থাপন করছি।

‘ওয়াকিবহাল মহল সূত্রে জানা যায় যে, ভাষা আন্দোলন বিতর্কে অংশগ্রহণ ছাড়াও পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ কর্মীরা ১৯৫১ সালের আদমশুমারি চলাকালে গণনাকারীদের কাছে জনগণ যাতে তাদের উর্দু ভাষার জ্ঞানের কথা স্বীকার না করে সে কথা বোঝানোর জন্য নীরব অভিযান চালায়। তারা যে এ ব্যাপারে কিছুটা সফলকাম হয়েছিল সেন্সাস কমিশনের মন্তব্য থেকে তা জনা যায়।’

এই মাটিতে আওয়ামী লীগ কত কষ্ট করে মানুষের আস্থা অর্জন করেছে তা আজকের প্রজন্মের অনেকেই জানেন না। শেখ মুজিব একদিনে কিংবা কয়েক বছরে বঙ্গবন্ধু হননি। প্রচণ্ড পরিশ্রমী ছিলেন। খুব ছোটবেলা থেকে কারও বেশি ধার ধারতেন না। তাকে যে কাজ দেওয়া হতো সেটির নিষ্ঠার সাথে পালন করতেন। সে জন্য শেখ মুজিব কড়া কথা বললেও কেউ তাকে কিছু বলত না।

বঙ্গবন্ধু তাই যথার্থ বলেছিলেন, ‘যথার্থ নেতৃত্ব আসে সংগ্রামের প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। কেউ আকস্মিকভাবে একদিনে নেতা হতে পারে না। তাকে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আসতে হবে। তাকে মানুষের মঙ্গলের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করতে হবে। নেতার আদর্শ থাকতে হবে; নীতি থাকতে হবে। এসব গুণ যার থাকে, সেই মাত্র নেতা হতে পারে।’

আজকের দিনে বিদ্যমান বাস্তবতায় বঙ্গবন্ধুর এসব কথা আরও অনেক বেশি মূল্যবান মনে হয়। ১৯৪৯ সালের ২৩ ও ২৪ জুন ঢাকার টিকাটুলির কাজী মুহাম্মদ বশীর হুমায়ুনের (১৯২১-৮২) রোজ গার্ডেনের বাসভবনে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ নামে একটি নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। ‘আওয়াম’ শব্দের অর্থ জনগণ। অর্থাৎ অভিজাত শ্রেণির নয়, জনগণের মুসলিম লীগ। গঠিত হয় একটি প্রস্তুতি কমিটি যার সভাপতি ছিলেন মাওলানা ভাসানি আর ইয়ার মুহাম্মদ খান সম্পাদক। সভায় ৩০০ প্রতিনিধি যোগ দিয়েছিলেন।

পরদিন নতুন দলের প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় নারায়ণগঞ্জের মরহুম খান সাহেব ওসমান আলীর বাসভবনে এবং সেখানেই ৪০ সদস্য বিশিষ্ট কার্যনির্বাহী পরিষদের নাম ঘোষণা করা হয়। মাওলানা ভাসানিকে মনোনীত করা হয় এই নতুন দলের সভাপতি। সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন শামসুল হক। এ সময় তরুণ শেখ মুজিব জেলে ছিলেন। জেলে থাকা অবস্থায় শেখ মুজিব যুগ্মসাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রগতিশীল নেতারা উপলব্ধি করেছিলেন মুসলিম লীগের অদূরদর্শী রাজনৈতিক চিন্তাধারা হতে যদি বের হয়ে আসা সম্ভব না হয় তা হলে বাঙালির মুক্তি কখনও সম্ভব হবে না।

১৯৪৭ সালের ডিসেম্বর মাসে পাকিস্তানের তৎকালীন রাজধানী করাচিতে মুসলিম লীগের এক সভায় সোহরাওয়ার্দী প্রস্তাব দেন যে পাকিস্তানের কল্যাণের জন্য দেশে একাধিক অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দল থাকা উচিত। তিনি সেদিন তার পক্ষে মাত্র ১০ জন সমর্থক জোগাড় করতে পেরেছিলেন। পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগে এই ইস্যু নিয়ে প্রচণ্ড মতবিরোধও দেখা দিয়েছিল। কিছুদিন পর টাঙ্গাইলের একটি উপনির্বাচনে পরিবর্তন বা সোহরাওয়ার্দীপন্থি মুসলিম লীগের পক্ষে তরুণ ছাত্র নেতা শামসুল হক মুসলিম লীগের মূল প্রার্থী খুররম খান পন্নীর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিপুল ভোটে বিজয় লাভ করেন। এরপর থেকেই মুসলিম লীগের ভাঙন শুরু হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলার মাটিতে প্রগতিশীল গণমুখী রাজনৈতিক দলের জন্ম দিয়েছেন এবং তা জনমানুষের কাছে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। যারা নিজেদের ক্ষুদ্র স্বার্থের জন্য বঙ্গবন্ধুবিরোধী হয়েছেন তারাও বঙ্গবন্ধুকে স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন। এসব জ্ঞানপাপীরা ইতিহাস নির্ভর বই লিখতে গিয়ে কোনো জায়গায় বঙ্গবন্ধুকে অস্বীকার করতে পারেননি। আবার এরাই বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বাঁচিয়ে রেখেছিল।

বঙ্গবন্ধু এই জাতীয় লোকদের ‘evilgenius’ আখ্যায়িত করতেন। যেমন ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ ১৯৮৩ সালে একটা বই লেখেন ‘Bangladesh: Era of Sheikh Mujibur Rahman’ নামে। পরবর্তীতে বাংলায় লেখেন ‘শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনকাল’। দ্বাদশ অধ্যায়ে মওদুদ আহমদ লেখেন এভাবে-‘শেখ মুজিবের আবির্ভাব বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ঘটনা। তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে তার সমাধি রচিত হয়ে যায়নি। তিনি ছিলেন বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রতীক, যা এক সর্বব্যাপী আন্দোলনের রূপ পরিগ্রহ করে বাংলাদেশে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের সোপান রচনা করে দিয়েছিল। পরবর্তীকালে বাংলাদেশের সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে যতই পরিবর্তন আসুক না, আর অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কে পটপরিবর্তনের যত লীলাখেলাই চলুক না কেন, জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রধানতম নেতার আসন থেকে শেখ মুজিবকে বিচ্যুত করা যাবে না।’

সত্যি সত্যি তার মৃত্যুর পরে সব ধরনের চেষ্টা করেও শেখ মুজিবকে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রধানতম নেতার আসন থেকে বিচ্যুত করা যায় নি। আওয়ামী লীগ গঠনের পর থেকে শেখ মুজিবকে ধীরে ধীরে বাঙালি জাতিসত্তার প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে দেখা গেছে। বলতে গেলে একাই সব প্রতিকূল পরিবেশ মোকাবিলা করেছেন। আওয়ামী লীগের প্রারম্ভিক গঠনে অনেক বড় বড় নেতা যুক্ত থাকলেও জনমানুষের দল হিসেবে প্রতিষ্ঠার পেছনে তার নেতা সোহরাওয়ার্দী ও শেখ মুজিবের অবদান অনস্বীকার্য। পরবর্তীকালে তিনি আওয়ামী লীগকে দেশের প্রায় সব মানুষের দলে পরিণত করেন। একটি কমিউনাল পার্টিকে ন্যাশনাল পার্টিতে রূপান্তরিত করা চাট্টিখানি কথা নয়। বারবার জেলে গিয়ে বারবার মৃত্যুর মুখোমুখি হয়ে তিনি একদিন সত্যি সত্যি পেয়ে যান তার স্বপ্নের বাংলাদেশ।

অন্নদা শংকর রায়ের লেখার অংশবিশেষ দিয়ে লেখাটা শুরু করেছিলাম। সেই অন্নদা শংকর রায়ের কাছে বঙ্গবন্ধু স্বীকার করেছিলেন এভাবে-‘‘দিল্লি থেকে খালি হাতে ফিরে এলেন সোহরাওয়ার্দী ও শরৎ বোস। কংগ্রেস বা মুসলিম লীগ কেউ রাজি নয় তাদের প্রস্তাবে। তারা হাল ছেড়ে দেন। আমিও দেখি যে আর কোনো উপায় নেই। কিন্তু ঢাকায় এসে নতুন করে আরম্ভ করি। তখনকার মতো পাকিস্তান মেনে নিই। কিন্তু আমার স্বপ্ন কেমন করে পূর্ণ হবে এই আমার চিন্তা। হবার কোনো সম্ভাবনাও ছিল না। লোকগুলো যা কমিউনাল। বাংলাদেশ চাই বললে সন্দেহ করত। হঠাৎ করে একদিন রব উঠল, আমরা চাই বাংলা ভাষা। আমিও ভিড়ে যাই ভাষা আন্দোলনে। ভাষাভিত্তিক আন্দোলনকেই একটু একটু করে রূপ দিই দেশভিত্তিক আন্দোলনে। পরে এমন একদিন আসে যেদিন আমি আমার দলের লোকদের জিজ্ঞাসা করি, আমাদের দেশের নাম কী হবে কেউ বলে পাক বাংলা, কেউ বলে পূর্ব বাংলা। আমি বলি, না, বাংলাদেশ। এই বাংলাদেশের জন্যে শেখ মুজিবকে তাই বারবার জেলে যেতে হয়েছে।’’

পদে পদে ফাঁসির কাষ্ঠে চড়ার ঝুঁকি জেনে-শুনেই নিয়েছেন। প্রসঙ্গত, এখানে দেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর একটি লেখার অংশবিশেষ উল্লেখ করছি। তার একটি প্রবন্ধের নাম ‘দুই বাঙালির লাহোর যাত্রা’। দুজন বাঙালি, এ কে ফজলুল হক ও শেখ মুজিবুর রহমান, লাহোর গিয়েছিলেন রাজনৈতিক কাজে। একটি রাষ্ট্রের উত্থান ও পতনের সঙ্গে তাদেরও ভিন্ন যাত্রা যুক্ত ছিল। অস্বাভাবিক ছিল কি ওই দুটি কাজ-ওই দুটি প্রস্তাব উত্থাপন অর্থাৎ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব এক বাঙালির, ভাঙার প্রস্তাব আরেকজনের? না হক সাহেবের কাজটা মোটেই অস্বাভাবিক ছিল না। তিনি ছিলেন স্রোতের সঙ্গে। ওই প্রস্তাব উত্থাপন তার জন্য কোনো বিপদ ডেকে আনেনি। কিন্তু শেখ মুজিবের কাজটা ছিল বিপজ্জনক। লাহোর শহর তার ৬-দফার কথা শোনার জন্য মোটেই প্রস্তুত ছিল না। আইয়ুব তো সঙ্গে সঙ্গেই গর্জন করে উঠেছিলেন। শেখ মুজিবকে জেলে যেতে হয়েছে, ঝুঁকি নিতে হয়েছে ফাঁসিকাষ্ঠে চড়বার। তবে, হ্যাঁ, ওই প্রস্তাব তাকে জনপ্রিয় করেছিল বাঙালিদের মধ্যে। যেমন হক সাহেবের প্রস্তাব জনপ্রিয় করেছিল তাকে মুসলমানদের মধ্যে। ওইখানেই মূল পার্থক্য। পাকিস্তান প্রস্তাব মুসলমানের, ৬ দফা বাঙালির। ১৯৪০-এ একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্রের প্রস্তাবকে মনে করা হয়েছিল ভারতীয় মুসলমানদের জন্য মুক্তির সনদ, ঠিক তেমনিভাবে ১৯৬৬-এ ৬-দফা হয়ে উঠেছিল পাকিস্তানবাসী বাঙালির জন্য মুক্তির পক্ষে পদক্ষেপ।

দুই

যদিও কেউ কেউ সত্য স্বীকারে দ্বিধায় থাকেন; এ দেশের মানুষের জন্য উল্লেখযোগ্য ভালো কাজগুলো আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় হয়েছে। এমনকি আমাদের নিত্যদিনের রাজনৈতিক জীবনাচরণে অনেক কিছু পালন করি, তাও আওয়ামী লীগের সৃষ্টি। আমরা এখন শোক দিবসে যে কালো পতাকা উত্তোলন করি এবং কালো ব্যাজ ধারণ করি তাও আওয়ামী লীগের কাছ থেকে পেয়েছি। পৌরসভায় ইউনিয়ন পরিষদের যে সরাসরি ভোটে নির্বাচনী ব্যবস্থা সেটিও আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্টের সময় চালু হয়।

১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান গণপরিষদের প্রথম সভায় শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেওয়ার দাবি উত্থাপন করেন। আর শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৪৮ সালের ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠনের প্রস্তাব পাস করান। শেখ মুজিবের ছিল সঠিক সময়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দারুণ এক ক্ষমতা।

১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে মুসলিম লীগকে পরাজিত করে। তার দু’বছর আগে ’৫২-র ভাষা আন্দোলন দেশের মানুষকে লোকায়ত চেতনায় জাগ্রত করেছিল। মূলত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সেই সময়টার অপেক্ষায় ছিলেন। যে কারণে ১৯৫৫ সালের ২১-২৩ অক্টোবর অনুষ্ঠিত কাউন্সিল অধিবেশনে দলের নাম হতে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দিয়ে দলকে সকল ধর্ম ও মতের মানুষের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠার সময় সংগঠনের নামকরণে বিতর্ক হয়েছিল। তখন নাম ছিল পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ।

অলি আহাদসহ কয়েকজনের প্রস্তাব ছিল ‘মুসলিম’ শব্দ বাদ দিয়ে নামকরণের পক্ষে। কিন্তু শেখ মুজিবই ভালো করে জানতেন উপযুক্ত সময়ের অপেক্ষায় থাকতে হবে। তা না হলে মুসলিম লীগ বিভ্রান্তির কালো মাকড়সার জাল বিস্তার করবে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনকে ঘিরে একটা বিশাল সাংস্কৃতিক জাগরণ ঘটেছিল, তখন শেখ মুজিব আর অপেক্ষা করেন নি। পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ হয়ে উঠল অসাম্প্রদায়িক ‘পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ’। সেভাবেই ’৫৪-র যুক্তফ্রন্টের বিশাল বিজয়ের পরে আওয়ামী লীগ হয়ে দাঁড়াল পরিপূর্ণ লোকায়ত চেতনাসমৃদ্ধ জনমানুষের সংগঠনে। তারপরও সবসময় এ দলটির ভিতরে নেতারা এক থাকতে পারেননি।

১৯৫৭ সালের ৭-৮ ফেব্রুয়ারি টাঙ্গাইলের কাগমারিতে দলের ভিতরে নেতারা এক থাকতে পারেন নি। ১৯৫৭ সালের ৭-৮ ফেব্রুয়ারি টাঙ্গাইলের কাগমারিতে দলের বিশেষ সম্মেলনে নেতাদের মধ্যে বিরাজমান মতদ্বৈততাকে কেন্দ্র করে ভেঙে গিয়েছিল আওয়ামী লীগ।

মওলানা ভাসানির নেতৃত্বে ১৯৫৭ সালের ২৫-২৬ জুলাইয়ে বিশেষ সম্মেলনের মাধ্যমে গঠিত হলো ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি। ওই সময়কার পত্র-পত্রিকার একটা বড় অংশ ছিল আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে। বঙ্গবন্ধু তার স্মৃতিকথায় এসবের ব্যাখ্যাও দিয়েছেন।

‘‘দৈনিক আজাদই ছিল একমাত্র বাংলা খবরের কাগজ, যা মুসলিম লীগ ও পাকিস্তান আন্দোলনকে সমর্থন করত। এই কাগজের প্রতিষ্ঠাতা ও মালিক মাওলানা আকরম খাঁ সাহেব ছিলেন বাংলা প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সভাপতি। তিনি আবুল হাশিম সাহেবকে দেখতে পারতেন না। আবুল হাশিম সাহেবকে শহীদ সাহেব সমর্থন করতেন বলে মওলানা সাহেব তার ওপর ক্ষেপে গিয়েছিলেন। আমাদেরও ওই দশা। তাই আমাদের কোনো সংবাদ সহজে ছাপা হতো না। মাঝে মধ্যে মোহাম্মদ মোদাব্বের সাহেবের মারফতে কিছু সংবাদ উঠত। পরে সিরাজুদ্দিন হোসেন (পরবর্তীতে দৈনিক ইত্তেফাকের ছিলেন বার্তা সম্পাদক) এবং আরও দু’একজন বন্ধু আজাদ অফিসে চাকরি করত। তারা ফাঁকে ফাঁকে দু’একটা সংবাদ ছাপাত। দৈনিক মর্নিং নিউজের কথা বাদই দিলাম। ওই পত্রিকা যদিও পাকিস্তান আন্দোলনকে পুরোপুরি সমর্থন করত, তবু ওটা একটা গোষ্ঠীর সম্পত্তি ছিল, যাদের শোষক শ্রেণি বলা যায়। আমাদের সংবাদ দিতেই চাইত না।’’

বলতে দ্বিধা নেই এখনকার সময়ও আওয়ামী লীগের ছিদ্রান্বেষণে বড় মাপের মিডিয়া ওঁত পেতে থাকে। ১৯৯৬-২০০১ সময়কালে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় মূল্যস্ফীতি ছিল মাত্র ১.৫২। এটাকে এক কথায় বলা যায় স্বর্ণযুগ। তারপরও ২০০১ সালের ১ অক্টোবরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রক্ষমতায় আসতে পারেনি। আওয়ামী লীগ সরকার সেই সময় চালের দাম অর্ধেক করে এনেছিল। অথচ সেই সময় পত্র-পত্রিকায় আওয়ামী লীগের সাফল্যের কথা খুবই কম লেখা হয়েছিল। দেশের চার-পাঁচটি জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কথা সবচেয়ে বড় ইস্যু করা হয়েছিল। আওয়ামী লীগের সৃষ্টিলগ্ন থেকে লক্ষ্য করা গেছে, যারা আওয়ামী লীগের কট্টর সমালোচক তারাও আওয়ামী লীগের কাছ থেকে ভালোটাই আশা করে থাকেন। আবার কেউ কেউ আওয়ামী লীগ করেও আওয়ামী লীগ করেন না। ইদানীং আবার একই পরিবারের মধ্য কয়েকটা দল থাকে। একের বিপদে অন্যে এগিয়ে আসে। একই প্রবণতা আগেও ছিল। এই উদাহরণ এখন অনেক বেশি।

বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তেও এ বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। তিনি লিখেছেন, ‘‘প্রথমে লাল মিয়া সাহেব কংগ্রেস করতেন, মোহন মিয়া সাহেব মুসলিম লীগ করতেন। আবার মুসলিম লীগে যখন যোগদান করলেন, এক ভাই রইলেন শহীদ সাহেবের দলে, আরেক ভাই নাজিমউদ্দিনের দলে। আবার পাকিস্তান আমলে আইয়ুবের মার্শাল ল’ আসলে, এক ভাই আইয়ুব খান সাহেবের দলে, আরেক ভাই বিরোধী দলে। যে দলে থাকুক না কেন, তাদের ক্ষমতা ঠিকই থাকে। এই অপূর্ব খেলা আমরা দেখেছি জীবনভর। দুই ভাই এক, নিজেদের স্বার্থের বেলায় মুহূর্তের মধ্যেই এক হয়ে যান।’’

লক্ষ করে থাকবেন এই দেশে আওয়ামী লীগ-বিরোধীরা খুব সহজে বিখ্যাত হয়ে যান। ভারতের রাজনৈতিক বিশ্লেষক অমলেশ ত্রিপাঠীর একটি বিখ্যাত গ্রন্থের নাম ‘স্বাধীনতা সংগ্রামে ভারতের কংগ্রেস’। এই গ্রন্থের মুখবন্ধে লেখা হয়েছে, ‘যখনই বিপ্লবী দল কমিউনিস্ট পার্টি স্বাধীনতা আন্দোলনে কংগ্রেসের সহযোগিতা করেছে বা বিরোধিতা করেছে, তখনই পাদপ্রদীপের আলো তাদের ওপর পড়েছে।’ বাংলাদেশের আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রে এই কথাগুলো অক্ষরে অক্ষরে সত্য। আইয়ুবের সামরিক শাসন জারির পর শুরু হয় ভিন্নমাত্রার বিভিন্নমুখী আন্দোলন। ওই সময়ে বা পরবর্তীতে সশস্ত্রভাবে বাংলাদেশর স্বাধীনতার জন্য কয়েকটি গোপন সংগঠনের খবর জানা যায়, যার মাঝে ছিল-ইস্ট বেঙ্গল লিবারেশন পার্টি-পূর্ব বাংলা লিবারেশন ফ্রন্ট, জন সংঘ, বঙ্গ বাহিনী ইত্যাদি। কিন্তু সরকার তাদের সহজেই দমন করতে সক্ষম হয়।

সম্ভবত, তারা জনসমর্থন ছাড়াই তাদের কাজ করতে গিয়ে ও বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়। ৬-দফার প্রশ্নে আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতাদের অনেকে দল ছেড়ে চলে গেলেও বঙ্গবন্ধু ও ছাত্রলীগ নেতাদের দৃঢ়তার সামনে ৬-দফা বানচালের সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। আওয়ামী লীগ ৬-দফাকে কেন্দ্র করে আরও শক্তিশালী হতে থাকে। দীর্ঘকাল কিছুটা নিশ্চুপ থেকে ৬-দফা না মানলেও মওলানা ভাসানি ১৯৬৮ সালে এসে বঙ্গবন্ধুর মুক্তির দাবিতে গর্জে ওঠেন। পশ্চিমা শক্তিও এই আন্দোলনে যুক্ত বিভিন্ন দফা ও দাবি থেকে সরানোর চেষ্টা করা হয়।

বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব ও ছাত্রলীগের দৃঢ়তার কারণে এটাও ব্যর্থ হয়। তারপরে আসে ১১-দফা। এক্ষেত্রে বাম প্রগতিশীল ঘরনার কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। মণি সিং-এর অনুসারী কমিউনিস্ট পার্টি, ন্যাপ ও ছাত্র ইউনিয়ন ও তাদের সমর্থক বুদ্ধিজীবীরা বাঙালি সাহিত্য সংস্কৃতির উন্নয়নের মাধ্যমে বাঙালি জাতীয়তাবোধ সৃষ্টিতে ব্যাপক অবদান রাখলেও, স্বাধীনতার পর বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনা ধরে রাখতে ও তার উন্নয়ন ঘটাতে বিশাল অবদান রাখলেও এবং এখনও তা চলমান রেখে চললেও স্বাধীনতার পূর্বে তারা ছিল দোদুল্যমান। একবারও ৬-দফাকে সমর্থন না দেওয়া, নির্বাচনের সময় বঙ্গবন্ধু ও ৬-দফার সমালোচনা করা, জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের বিপরীতে কথাবার্তা বলা, পাকিস্তানভিত্তিক শক্তিশালী দল না থাকা (ওয়ালী খান ছিলেন তাদের অন্যতম) ইত্যাদি কারণে তারা বাঙালি জনগণের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হয়। মার্চে এসে এই দলটি স্বাধীনতা আন্দোলনে যুক্ত হলেও নেতৃত্বে আসতে পারেনি।

ভাসানিপন্থিরা বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত হয়ে কেউ কেউ ১৯৬৭-৬৮ সাল থেকে স্বাধীনতার পক্ষে বক্তব্য দিলেও জনগণকে তাদের সাথে সম্পৃক্ত করতে নিদারুণভাবে ব্যর্থ হয়। স্বাধীনতার সপক্ষে বক্তব্য দিয়ে তাদের অনেকে কারাবরণ করলেও তা জনসমর্থনে ধন্য হয়নি। তা ছাড়া ভাসানিপন্থি অনেকে (ভাসানী নন) সরাসরি স্বাধীনতার বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। এখনও এদের উত্তরসূরিরা আওয়ামী লীগের খুঁত ধরার জন্য মরিয়া হয়ে থাকেন। এই দেশে কেউ কেউ আওয়ামী লীগের বিরোধিতা করে বিখ্যাত হয়েছেন। হয়তো যারা বিরোধিতা করেছেন তাদের ওপর পাদপ্রদীপের আলো বেশি করে পড়েছে। এই জাতীয় সূত্র এ দেশের যুগ যুগ ধরে ক্রিয়াশীল রয়েছে। এজন্য বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগ নেতৃত্বকে সব সময় সজাগ থাকতে বলেছেন। আত্ম-সমালোচনা আত্মসংযম করতে বলছেন। তিনি আত্মশুদ্ধি করার কথা বারবার বলতেন।

তার স্পষ্ট বক্তব্য ছিল- ‘দুই চারটা পাঁচটা লোক অন্যায় করে, যার জন্য এতো বড় প্রতিষ্ঠান-যে ইতিহাস সৃষ্টি করেছে, যে প্রতিষ্ঠান স্বাধীনতা এনেছে, যে প্রতিষ্ঠানের লক্ষ লক্ষ কর্মী জীবন দিয়েছেন, যে প্রতিষ্ঠান ২৫ বছর পর্যন্ত ঐতিহাসিক সংগ্রাম করেছে তার বদনাম হতে দেয়া চলে না।’

তিন

প্রখ্যাত লেখক আহমদ ছফা বলেছিলেন, ‘আওয়ামী লীগ যখন জয়লাভ করে তখনও সে একা জয়লাভ করে, কিন্তু যখন পরাজিত হয় তখন সমগ্র জাতি পরাজিত হয়।’

কথাটা সর্বাংশে সত্য না হলেও এবং একটা বাস্তবিক পরিণতি আছে। কেননা আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতায় থাকে দেশের সব মানুষের কল্যাণে অনেক কিছু কাজ হয়। দলমত নির্বিশেষে সব মতের মানুষ ফল ভোগ করে থাকে। তারপর বলা যায় আহমেদ ছফার বক্তব্যের প্রতিফলন ঘটেছে। যতবার আওয়ামী লীগ পরাজিত হয়েছে ততবারেই দেশের মানুষের ওপর মুসিবত নেমে এসেছে। কেননা আওয়ামী লীগবিহীন সরকারে প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী দারুণভাবে সক্রিয় থাকে।

আহমদ ছফা বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকা অবস্থায় তার সমালোচনা করতে দ্বিধা করেন নি। তাই বলে বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে বিবৃতি দেননি। বরং এখন যারা আওয়ামী লীগের অনেক ঘনিষ্ঠজন বলে পরিচিত হওয়ার চেষ্টা করেন তাদের অনেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে বিবৃতি দিয়েছিলেন। এই আওয়ামী লীগ গঠন করতে গিয়ে বঙ্গবন্ধুকে কতই না বাঁধার সম্মুখীন হতে হয়েছে।

বঙ্গবন্ধু তার নিজের লেখাতে উল্লেখ করেছেন, “আমার কয়েকটা জেলার কথা মনে আছে। কামরুদ্দিন সাহেব ঢাকা জেলা, শামসুল হক সাহেব ময়মনসিংহ, খোন্দকার মোশতাক আহমদ কুমিল্লা, একরামুল হক খুলনা এবং আমাকে ফরিদপুর জেলার ভার দেয়া হয়েছিল। আমরা রওনা হয়ে চলে এলাম সাইকেল, মাইক্রোফোন, হর্ন, কাগজপত্র নিয়ে। জেলা লীগের নেতাকর্মীরা আমাদের সঙ্গে সহযোগিতা করবে। আমরা প্রত্যেক মহকুমায় ও থানায় একটা করে কর্মীশিবির খুলব। আমাকে কলেজ ছেড়ে চলে আসতে হলো ফরিদুপুরে। ফরিদপুর শহরে মিটিং করতে এসেছি মাঝে মধ্যে, কিন্তু কোনোদিন থাকি নাই। আমাকে ভার দেয়ার জন্য মোহন মিয়া সাহেব ক্ষেপে যান। সবাইকে সাবধান করে দেন, কেউ যেন আমাকে বাড়ি ভাড়া না দেয়। তিনি মুসলিম লীগের সভাপতি, কিন্তু আমাকে চান না। আমি আবদুল হামিদ চৌধুরী ও মোল্লা জালালউদ্দিনকে সব কিছু দিয়ে পাঠিয়ে দিলাম। হামিদ ও জালাল ফরিদপুর কলেজে পড়ত, তাদেরও লেখাপড়া ছেড়ে আসতে হলো। শহরের ওপরে কেউই বাড়ি দিতে রাজি হলো না। আমার এক দূরসম্পর্কের আত্মীয় শহর থেকে একটু দূরে তার একটা দোতলা বাড়ি ছিল, ভাড়া দিতে রাজি হলো। বাধ্য হয়ে আমাকে সেখানে থাকতে হলো। সেখানে আমরা অফিস খুললাম।”

বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগকে সাধারণ মানুষের সংগঠন হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন। বাঙালির কৃষ্টি সংস্কৃতির ধারাকে মানুষের সামনে উপস্থাপন করেছিলেন। ডেভিড ফ্রস্ট যখন বঙ্গবন্ধুর সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন তার আগে বঙ্গবন্ধুর বাসভবন ঘুরে দেখেন। তার গ্রন্থে তিনি লিখেছেন, টেবিলের ওপর স্যার আইভর জেনিংস-এর ‘কনস্টিটিউশনাল প্রবলেমস অব পাকিস্তান’ নামক গ্রন্থটি পড়ে থাকতে দেখেন। বইটি তার শিক্ষক জুবেরি তাকে উপহার দিয়েছিলেন।

বইয়ের ভেতরে জুবেরি লিখেছিলেন, ‘রাজনীতিকে অবলম্বন করে এগিয়ে যাওয়া যায় ক্ষমতার দিকে, তবে জ্ঞানও হচ্ছে ক্ষমতা।’

বঙ্গবন্ধু স্পষ্ট করে বুঝেছিলেন জ্ঞানও ক্ষমতা। এ জন্য বঙ্গবন্ধু সুদূরপ্রসারী চিন্তা-ভাবনা করে ‘গণতান্ত্রিক যুবলীগ’ গড়ে তুলেছিলেন। এই প্রতিষ্ঠানে যে কোনো দলের লোক যোগদান করতে পারতেন। সক্রিয় রাজনীতি থেকে যতখানি দূরে রাখা যায় তার চেষ্টা করা হয়েছিল। এই প্রতিষ্ঠানকে সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবেই গণ্য করা হতো। অন্যতম কর্মসূচি ছিল সাম্প্রদায়িক মিলনের চেষ্টা, যাতে কোনো দাঙ্গা-হাঙ্গামা না হয়, হিন্দুরা দেশ ত্যাগ না করে-যাকে ইংরেজিতে বলে ‘কমিউনাল হারমনি’, তার জন্য চেষ্টা করা। বঙ্গবন্ধু মনে-প্রাণে বিশ্বাস করতেন পাকিস্তানি সাম্প্রদায়িক দ্বি-জাতিতত্ত্বের বিপরীতে বাঙালির জাতীয় চেতনার ভিত্তিতে অসাম্প্রদায়িক উদার গণতান্ত্রিক আদর্শ প্রতিষ্ঠার জন্য সংস্কৃতির উন্মেষ ঘটাতে হবে। যে কারণে ছাত্রলীগের বিভিন্ন শাখার মাধ্যমে রবীন্দ্র-নজরুল জয়ন্তী পালন করার ব্যবস্থা করেছিলেন।

১৯৫২ সালের ২৮ মে সাপ্তাহিক ইত্তেফাক পত্রিকার প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় দফতর (১৫০ নং মোগলটুলি)-এ ২৩ শুক্রবার বিকেল ৫টায় রবীন্দ্র নজরুল উদযাপিত হয়েছিল। আগের দিন শেখ মুজিবুর রহমান করাচি যাত্রা করেছিলেন। কিন্তু তিনি সেই অনুষ্ঠানের জন্যে একটি প্রবন্ধ রেখে গিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথের স্বদেশী চেতনা ও বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুলের বৈপ্লবিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে তার প্রবন্ধে বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়েছিল ইতিহাসের পাঠকদের নিশ্চয় স্মরণে থাকবে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুলের ‘ভাঙ্গার গান’ কাব্যগ্রন্থের ‘পূর্ণ অভিনন্দন’ কবিতা থেকে জয়বাংলা শব্দটি নিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর লোকায়ত চেতনার আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে যারা সংগঠনের পতাকাতলে সমবেত হয়েছিলেন তারা সকলেই ছিলেন সমাজের ঋদ্ধিমান মানুষ। যেমন-যশোর জেলায় আওয়ামী লীগের অবিসংবাদিত নেতা ছিলেন জননেতা রওশন আলী। তিনি যশোর ইনস্টিটিউট পাবলিক লাইব্রেরির একটানা ১৮ বছর (১৯৫৭-৭৫) সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। সমগ্র বাংলাদেশের সব জেলা শহরগুলোতে দেখা যাবে আওয়ামী লীগের নেতারা ছিলেন সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর প্রধান পৃষ্ঠপোষক। কেননা বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগের নেতাদের ভিতরে সংস্কৃতির সেই সুরের ধারা সঞ্চারিত করতে পেরেছিলেন। ‘আমার সোনার বাংলা’ বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হবে তা ষাটের দশকে ঠিক করে রেখেছিলেন। নানা সময়ে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন সমাবেশ ও সামাজিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে ‘আমার সোনার বাংলা গানটি গাওয়ানো হতো। বিখ্যাত সংগীতশিল্পী সনজিদা খাতুনের নানা লেখায় ও আলাপচারিতায় তা বেরিয়ে আসে। বিশেষ করে প্রয়াত রবীন্দ্র সংগীত শিল্পী জাহিদুর রহিমকে ‘আমার সোনার বাংলা’ পরিবেশন করাতেন। কেননা বঙ্গবন্ধু সবসময় বলতেন এটিই হবে স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত।

চার

আজকের দিনের ছাত্রছাত্রীরা বঙ্গবন্ধুর ‘৭০-এর নির্বাচনের আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার পর্যালোচনা করে দেখতে পারেন। বাংলাদেশের মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির কথা সবসময় ভাবতেন। এটাকেই তিনি বলতেন শোষিতের গণতন্ত্র। বঙ্গবন্ধু নিজেই লিখেছেন, যেটা ভালো মনে করতেন তাই খুব দ্রুত করে ফেলতেন। “আমি অনেকের মধ্যে একটা জিনিস দেখেছি, কোনো কাজ করতে গেলে শুধু চিন্তাই করে। চিন্তা করতে করতে সময় পার হয়ে যায়, কাজ আর হয়ে ওঠে না। অনেক সময় করব কি করব না, এইভাবে সময় নষ্ট করে এবং জীবনে কোনো কাজই করতে পারে না। আমি চিন্তাভাবনা করে যে কাজটা করব ঠিক করি, তা করেই ফেলি। যদি ভুল হয়, সংশোধন করে নেই। কারণ, যারা কাজ করে তাদেরই ভুল হতে পারে, যারা কাজ করে না তাদের ভুলও হয় না।”

আরেকটি বড় গুণ ছিল অসম্ভব সততা। বঙ্গবন্ধু অসৎ মানুষদের বিরুদ্ধে সবসময় লড়াই করেছেন। প্রয়োজনে তিনি অসম্ভব কঠোরও হতে পারতেন। ১৯৭২ সালের ৬ এপ্রিল দুর্নীতি ও দেশবিরোধী কর্মকান্ডের জন্য তার দলের ১৬ সংসদ সদস্যকে বহিষ্কার করেছিলেন। ৯ এপ্রিল ৭ জন এবং ২২ সেপ্টেম্বর আরও ১৯ সংসদ সদস্যকে তিনি বহিষ্কার করেন। অথচ ঢালাওভাবে বলা হয়, বঙ্গবন্ধু অনেক বড় নেতা ছিলেন; কিন্তু দুর্বল প্রশাসক ছিলেন। এমন বক্তব্য কি স্ববিরোধী নয়? বঙ্গবন্ধু ১৯৭৪ সালের ১৮ জানুয়ারিতে আওয়ামী লীগের দ্বি-বার্ষিক কাউন্সিলে উদ্বোধনী ভাষণ রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টদের জন্য ভাবনা-চিন্তার বিশেষ বিষয় হতে পারে।

“আজ বাংলা নিভৃত কোণে আমার এক কর্মী পড়ে আছে, যার জামা নাই, কাপড় নাই, তারা আমার কাছে আসে না। আপনাদের অনেকেই এখানে। কিন্তু আমি যদি চর কুকরীমুকরী যাই, আমার ঔ ধরনের কর্মীকে দেখি। এদের সাথে আমার রক্তের সম্বন্ধ । আজো আমি দেখি তার পরনে ছেঁড়া লুঙ্গি। আজো আমি দেখি, সেই ছেঁড়া পায়জামা, ছেঁড়া শার্ট, পায়ে জুতা নাই। বাংলাদেশে আমার এ ধরণের লক্ষ লক্ষ কর্মী পড়ে আছে। কিন্তু কিছু কিছু লোক যখন মধু-মক্ষিকার গন্ধ পায় তখন তারা এসে আওয়ামী লীগে ভিড় জমায়। আওয়ামী লীগের নামে লুটতরাজ করে। পারমিট নিয়ে ব্যবসা করার চেষ্টা করে। আওয়ামী লীগ কর্মীরা, আওয়ামী লীগ থেকে তাদের উৎখাত করে দিতে হবে; আওয়ামী লীগে থাকার তাদের অধিকার নাই।” বঙ্গবন্ধুর সেই অমোঘ উচ্চারণ আজও দারুণভাবে প্রাসঙ্গিক।

পাঁচ
আজকে পৃথিবীতে ধনী রাষ্ট্র ও দরিদ্র রাষ্ট্র বৈষম্যের বিরুদ্ধে অনেক বিশ্বনেতা সোচ্চার হয়েছেন। কিন্তু চার দশক আগে বঙ্গবন্ধু সেই কথা বিশ্ববাসীকে জানিয়ে গেছেন। এখন অনেকে অস্ত্র প্রতিযোগিতা বন্ধের কথা বলছেন। কিন্তু সেই সময় বঙ্গবন্ধুর মতো করে অনেকে ভাবেন নি। তিনি স্পষ্ট করে বলেছিলেন, ‘আমি বৃহৎ শক্তিবর্গের প্রতি অস্ত্র প্রতিযোগিতা হ্রাস করে সে অর্থ দিয়ে দরিদ্র দেশের সাহায্যে এগিয়ে আসার আহ্বান জানাচ্ছি। বর্তমানে অস্ত্র প্রতিযোগিতায় ব্যয় করা বিপুল অর্থের এক-দশমাংশও যদি জনগণের জন্য খরচ করা হয় তবে পৃথিবী থেকে দারিদ্র্য মুছে যাবে এবং তাতে বৃহৎ ব্যক্তিবর্গের মর্যাদাই বৃদ্ধি পাবে।’

সিংহপুরুষ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব দেশে ফিরে এসে দেশের দায়িত্ব নিয়েছিলেন বলে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ বিশ্বসভায় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে ছিল। এটা অবশ্যই গবেষণার বিষয় বঙ্গবন্ধু ছাড়া অন্য কেউ একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের নেতা হিসেবে শর্তহীন বহিঃসাহায্যের কথা বলতে পারতেন কি-না? তার দৃঢ়কণ্ঠের সেই আত্মপ্রতয়ী উচ্চারণ গোটা বাঙালি জাতিকে সবসময় পথ দেখাবে। ‘দেখ গড়ার কাজে কেহ সাহায্য করতে চাইলে তা আমরা গ্রহণ করব। কিন্তু সে সাহায্য অবশ্যই হতে হবে নিষ্কন্টক ও শর্তহীন। আমরা জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও সব জাতির সমমর্যদার নীতিতে আস্থাশীল। আমাদের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে কেউ হস্তক্ষেপ করবেন না, এটাই আমাদের কামনা।’

এটাই স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূলকথা। এর বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। ফারাক্কার পানি বণ্টনে বঙ্গবন্ধু সরকার শুষ্ক মৌসুমে পেয়েছিল ৪৪ হাজার কিউসেক পানির নিশ্চয়তা। আর বঙ্গবন্ধুর মহাপ্রয়াণের পর বাংলাদেশ পেয়েছিল ৩৩ হাজার কিউসিক পানি। বঙ্গবন্ধুর রাজনীতির উদ্দেশ্য ছিল খুবই পরিষ্কার ও স্বচ্ছ। অসাম্প্রদায়িকতার বাইরে তিনি একবিন্দুও যাননি। এক আশ্চর্য সাবলীলতায় শত প্রতিকূলতার মাঝেও বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশকে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন।

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন, ‘ডিপ্লোম্যাসি অর্থে যে কপটাচরণ বুঝিতে হইবে এমন কথা নাই। তাহার প্রকৃত মর্ম এই, নিজের ব্যক্তিগত হৃদয়বৃত্তি দ্বারা অকস্মাৎ বিচলিত না হইয়া কাজের নিয়ম ও সময়ের সুযোগ বুঝিয়া কাজ করা।’

বঙ্গবন্ধু সেটাই বিশ্বাস করতেন বলে ১৯৭২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি কলকাতার ইন্দিরা গান্ধী প্রদত্ত নৈশভোজ সভায় তিনি একটি ঐতিহাসিক উক্তি করেছিলেন; ‘আমার একান্ত কামনা, উপমহাদেশে অবশেষে শান্তি সুস্থিরতা আসবে। প্রতিবেশীদের মধ্যে পারস্পরিক বিরোধিতার বন্ধ্যানীতির অবসান হোক। আমাদের জাতীয় সম্পত্তি অপচয় না করে আমরা যেন তা আমাদের দেশের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে ব্যবহার করতে পারি। দক্ষিণ এশিয়াকে একটি শান্তিপূর্ণ অঞ্চলে পরিণত করায় আমরা সচেষ্ট রইব। যেখানে আমরা সুপ্রতিবেশী হিসেবে পাশাপাশি বাস করতে পারি। যদি আমরা সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হই, ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না।’

এমনকি যে চীন আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় বিরোধিতা করেছিল অথচ সেই চীন মুক্তিযুদ্ধের ১৮ বছর আগে বঙ্গবন্ধুকে ভীষণ সমাদর করেছিল। ১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনের আট মাস পরে বঙ্গবন্ধু চীনে গিয়েছিলেন। সে বছর ২ অক্টোবর পিকিংয়ে একটি আন্তর্জাতিক শান্তি সম্মেলন শুরু হয়েছিল। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান থেকে পাঁচজন যোগ দিয়েছিলেন। আতাউর রহমান খান, ইত্তেফাক সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া, খন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াস ও বঙ্গবন্ধু। সেখানেও বঙ্গবন্ধু বাংলায় বক্তৃতা দিয়েছিলেন। ভাষার জন্য বাংলার দামাল ছেলেরা প্রাণ দিয়েছিল সেটিও বঙ্গবন্ধুর বক্তৃতার মধ্যে উঠে আসে। বিশ্বের ৩৭টি দেশের ৩৭৮ প্রতিনিধির এ সম্মেলনে শেখ মুজিব বাঙালি জাতির আত্মপ্রত্যয়ের কথা ব্যক্ত করেছিলেন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বঙ্গবন্ধু কতখানি প্রভাব বিস্তার করতে পারতেন তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশের বন্যার সময় সৌদি আরব পর্যন্ত ১০ মিলিয়ন ডলার অনুদান দিয়েছিল।

ছয়
১৯৮০ সালের ডিসেম্বর মাসে সিদ্ধান্ত হয়েছিল ১৯৮১ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হবে। পুরনো পত্রিকা ঘাঁটলে দেখা যায়, কাউন্সিলকে সামনে রেখে দেশের বিভিন্ন স্থানে নেতা ও কর্মীদের মধ্যে বিভেদ ও অনৈক্য ভয়ঙ্করভাবে প্রকট হয়ে পড়ে। প্রথমে নারায়ণগঞ্জ, তারপর চট্টগ্রামে সাংগঠনিক জেলা কাউন্সিল দুদল কর্মীর মধ্যে মারামারি হানাহানির ফলে পণ্ড হয়ে যায়। চট্টগ্রাম, রাজশাহীসহ কয়েকটি স্থানে জেলা কমিটির পাল্টা জেলা কমিটি গঠিত হয়। মারামারি হানাহানির ঢেউ ঢাকায়ও এসে লাগে। এমনকি অধিবেশনের দুদিন আগে দলের অঙ্গসংগঠন মহিলা আওয়ামী লীগ দুভাগে বিভক্ত হয়ে যায় পাল্টাপাল্টি কমিটি গঠনের মাধ্যমে।

১৯৮১ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার সংবাদ প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, নানারকম ষড়যন্ত্রের মধ্য দিয়ে সেই কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়েছিল। অভ্যর্থনা কমিটির চেয়ারম্যান আবদুস সামাদ বলেছিলেন, কাউন্সিল অধিবেশন শুরু হওয়াতে এটা প্রমাণিত হয়েছে আমরা শত্রুদের একটি ঘৃণিত চক্রান্তকে ব্যর্থ করতে পেরেছি। তবে তিনি এ প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক মহলের এ দেশীয় সাঙ্গতরা আমাদের মধ্যে আত্মঘাতী মূঢ়তার শক্তিকে নানাছলে উসকানি দিয়ে চলেছে (১৫ ফেব্রুয়ারি, দৈনিক ইত্তেফাক)।

দৈনিক ইত্তেফাকের ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৮১ সালের সংখ্যা থেকে জানতে পারি কীভাবে শেখ হাসিনা ওই সময়ে ঐক্যের প্রতীক হিসেবে কাজ করেছেন। সেই সংবাদের শিরোনাম ছিলো ‘আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে এগিয়ে যান’।

শেখ হাসিনার একটি বার্তা সাধারণ আবদুর রাজ্জাক সম্মেলনে পাঠ করে শোনান। তোফায়েল আহমেদ টেলিফোনে শেখ হাসিনার সঙ্গে শেখ সেলিমের আলোচনার কথা উল্লেখ করে ইতোপূর্বে ঘোষণা করেন, ‘একটি সুসংবাদের অপেক্ষায়’ তারা আছেন। শেখ হাসিনা তার বার্তায় সর্বপ্রকার দ্বন্দ্ব-বিভেদ ভুলে আত্ম-সমালোচনা ও আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে কাউন্সিলর ও নেতাদের বঙ্গবন্ধুর কর্মসূচি বাস্তবায়নের আহ্বান জানান। আর সুসংবাদটি হচ্ছে শেখ হাসিনা সর্বসম্মতিক্রমে আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। ঐতিহাসিক হোটেল ইডেনে অনুষ্ঠিত কাউন্সিল অধিবেশনে বৈরুত থেকে আগত ফিলিস্তিনি মুক্তি সংস্থার রাজনৈতিক শাখার পরিচালক জাকারিয়া আবদুর রহিম তার শুভেচ্ছা বক্তৃতায় শেখ মুজিবের মৃত্যুকে সারাবিশ্বের সংগ্রামরত জনগণের জন্য বেদনাবহ ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। এক দশক দুই দশক পরে হলেও বাংলাদেশে শেখ মুজিবের উত্তরসূরি আবার ক্ষমতায় আসবে; এ কথাও তিনি বলেছিলেন। তাঁর কথা শেষ পর্যন্ত বাস্তব রূপ পেয়েছে। এখন শেখ হাসিনার নেতৃত্বে প্রগতিশীল আত্মপ্রত্যয়ী সমৃদ্ধ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম চলমান।

শেখ হাসিনা দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে আওয়ামী লীগের প্রাপ্ত ভোট ২৫ শতাংশ থেকে ৪৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। (যদিও বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর জাতীয় নির্বাচনগুলোতে আওয়ামী লীগের ভোট প্রাপ্তি কমিয়ে দেওয়ার নানাবিধ চক্রান্ত হয়েছে। ’৭৯ সালের সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রাপ্ত ভোট ২৪.৬ শতাংশ, ’৮৬ সালে ২৬.১৫ শতাংশ, ’৯১ সালে ৩৩.৩ শতাংশ, ’৯৬ সালে ৩৭.৪ শতাংশ, ২০০১ সালে ৪০.১ শতাংশ এবং ২০০৮ সালে ৪৯ শতাংশ।

এমনকি আওয়ামী লীগের ঘোর সমর্থকও অনেকে ধরে নিয়েছিলেন আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ খুব অন্ধকার; আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রক্ষমতায় আসবে, তা যেন এক দুঃস্বপ্নের মতো লাগতো। শেখ হাসিনা দলের দায়িত্ব নেতয়ার পর থেকে আওয়ামী লীগকে চার - চারবার ক্ষমতায় এনেছেন। বাংলাদেশকে তিনি সমৃদ্ধির বাংলাদেশের পথে নিয়ে গেছেন। শেখ হাসিনা বাংলাদেশের দেশপ্রেমের রাজনীতির Cementing Bond কোনো বাঁধা ধরা তত্ত্বে নিজেকে আটকে রাখেননি। খোলা মনে খোলা চোখে শক্ত মাটিতে দাঁড়িয়ে সবকিছু তিনি যাচাই করে দেখেছেন আর সেই সঙ্গে পুরনোকে ছাড়িয়ে নতুনের দিকে বাড়িয়েছেন তাঁর হাত।

বিশেষত, বিশ্বায়নের যুগে বাংলাদেশ কীসের সঙ্গে সম্পর্ক, সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে পথচলা ইত্যাদি ভাবনা ও লক্ষ্যভেদী পরিকল্পনা তাঁকে অনন্য সাধারণে পরিণত করেছে। বিশ্বব্যাংকও বলছে, দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা দ্রুত কমছে। গত ১৩ বছরে বাংলাদেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা প্রায় দু’কোটি কমেছে। প্রবৃদ্ধির সুফল আগের চেয়ে মানুষ আরো অনেক অনেক বেশি পাচ্ছে। এমনকি আঞ্চলিক বৈষম্যও অনেক কমে আসছে। উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে মানব উন্নয়ন সূচকে।

সবচেয়ে আশার সংবাদ, শহর থেকে গ্রামে ফেরা মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। উৎপাদনের পথিকৃৎ এখন বাংলাদেশ। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ যখন রাষ্ট্রক্ষমতায় আসে তখন দেশের খাদ্য ঘাটতি ছিল ৪০ লক্ষ মেট্রিক টন। ২০০১ সালে শেখ হাসিনা যখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করেন তখন দেশের খাদ্য উদ্বৃত্ত ছিল প্রায় চল্লিশ লক্ষ মেট্রিক টন। বিশ্বের অর্থনৈতিক টালমাটাল সময়েও মূল্যস্ফীতি ছিল ১.৫২।

২০০১ সালে জামাত-বিএনপি ক্ষমতাকালীন সময়ে আবার খাদ্য ঘাটতির দেশে পরিণত হয়। কিন্তু ২০০৯ সালে শেখ হাসিনা দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে আবার শুরু হয় খাদ্য উৎপাদনের এগিয়ে চলা। ধান, গম ও ভুট্টা জাতীয় খাদ্য-শস্যে বিশ্বের গড় উৎপাদনকে পেছনে ফেলে ক্রমেই অগ্রসরমান বাংলাদেশ। বর্তমান বিশ্বে প্রতি হেক্টর জমিতে গড় উৎপাদন প্রায় ৩ টন আর বাংলাদেশের তা ৪ দশমিক ১৫। ফসলের জাত উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান : ১ম; পাট রপ্তানিতে বাংলাদেশের অবস্থান : ১ম; পাট উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান : ২য়; সবজি উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান : ৩য় ;ধান ও চাল উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান : ৪র্থ;চা উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান : ৪র্থ ;আলু উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান : ৭ম; আম উৎপাদনে বাংলাদেশে অবস্থান : ৭ ম; পেয়ারা উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান : ৮ম; ফল উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান : ২৮ তম।

১৯৮১ সালের ১৭ মে শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আসার আগে জিয়াউর রহমানের নির্দেশে ‘শেখ হাসিনা আগমন প্রতিরোধ কমিটি’ গঠন করা হয়েছিল। বাংলাদেশকে পিছন দিকে টেনে নেওয়ার জন্যে সেই প্রতিরোধ কমিটি সদস্যরা এখনও সক্রিয়। ইতিহাসের পাঠক মাত্রই জানে নবাব সিরাজউদ্দৌলার সময়কালে তথাকথিত সুশীল সমাজের একটি অংশে ইয়ার লতিফের নেতৃত্বে এক বিভ্রান্তির জাল বিস্তার করেছিল। এখনকার ইয়ার লতিফরা খুবই সক্রিয়। আওয়ামী লীগের সর্বস্তরের নেতাদের এ ব্যাপারে সদা জাগরূক থাকতে হবে।

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন, “আমরা সকল কাজে পরের প্রত্যাশা করি কিন্তু পরের ত্রুটি লইয়া আকাশ বিদীর্ণ করি”। তেমন করে বলাই যায়, আমরা দেশবাসী আওয়ামী লীগের কাছ থেকে সবচেয়ে ভালোটা প্রত্যাশা করি কিন্তু আওয়ামী লীগের সামান্য ত্রুটি লইয়া আকাশ বিদীর্ণ করে থাকি। যারা আওয়ামী লীগের চরম বিরোধী, যারা কোনোদিন আওয়ামী লীগকে ভোট দেয়নি এবং কোনোদিনও আওয়ামী লীগকে ভোট দেবে না তারাও আওয়ামী লীগের কাছ থেকে সর্বোচ্চ পাওয়ার চেষ্টা করে। শুধু জনমানুষের জন্যে কাজ করার জন্যই আওয়ামী লীগের জন্ম হয়েছে। আওয়ামী লীগের প্রয়াত সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলেছিলেন, “আওয়ামী লীগ একটি অনুভূতির নাম”। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন এই দলের জন্ম; সেই সময়টা ছিল বড় জটিল এক সময়। মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতি হলেও মূলত এই দলটি গড়ে উঠেছে শেখ মুজিবুর রহমানের আত্মত্যাগ, সততা, দেশপ্রেম ও সৃজনশীলতার অভাবনীয় সমন্বয়ের কারণে।

আওয়ামী লীগের নেতা কর্মীরা জন্মসূত্রে আত্ম উৎসর্গীকৃত হয়ে থাকে। ইতিহাস সেটারই সাক্ষ্য দেয়। এখনকার সময়ে আওয়ামী লীগের ভিতরের দুর্বিনীত ছদ্মবেশী আওয়ামী লীগারদের কার্যক্রম দেখে আওয়ামী সর্মথকরা বিষণ্নতায় ভোগে। সর্বশেষ ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সে নীতি গ্রহণ’ (ইস্তেহারের ৩.৫) করার কথা খুবই স্পষ্ট করে বলেছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে এভাবে, “দুর্নীতি একটি বহুমাত্রিক ব্যাধি। পেশিশক্তির ব্যবহার ও অপরাধের শিকড় হচ্ছে দুর্নীতি। যার ফলে রাষ্ট্র ও সমাজ জীবনের অবক্ষয় বা পচন শুরু হয় এবং অর্থনীতি, রাজনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রশাসন প্রভৃতি কোনো ক্ষেত্রেই ইপ্সিত লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হয় না। দুর্নীতি দমনে রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও আইনের প্রয়োগ মুখ্য হলেও তা শুধু সরকারের দায় নয়, জনগণেরও দায় রয়েছে। আমরা মনে করি, দুর্নীতি দমনে প্রয়োজন সরকার ও জনগণের সমন্বিত উদ্যোগ।”


লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক; সাবেক সহ-সভাপতি- বাংলাদেশ ফার্মেসি কাউন্সিল, প্রধান সম্পাদক- সাপ্তাহিক বাংলা বিচিত্রা ও এবিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডট কম।

এই বিভাগের আরো সংবাদ