শেখ হাসিনার স্বদেশপ্রত্যাবর্তন

তাঁর চেয়ে জ্যেষ্ঠ রাজনীতিবিদ আর কয়জন আছেন!

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ২৩ মে ২০২১, ০৯:২০

সহমর্মিতা ও মানবতার প্রেরণায় আমাদের হৃদয় উদ্দীপ্ত। ক্ষুধা, অপুষ্টি ও দারিদ্র্য নির্মূলের জন্য আমাদের সব ধরনের সুযোগ অবারিত করা, সকল বাধা অপসারণ, এবং একটি পরিবারের ন্যায় আমাদের সম্পদরাজি মানব কল্যাণে ব্যয় করা উচিত। এভাবে আমরা উত্তরাধিকার সূত্রে যা পেয়েছি তার চেয়ে সুন্দর এক পৃথিবী আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রেখে যেতে পারি।- শেখ হাসিনা।

(‘গ্লোবাল নিউট্রিশন ইভেন্ট’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে প্রদত্ত ভাষণ, লন্ডন, ১২ অগাস্ট ২০১২)

১৯৮১ সালে  ১৩ থেকে ১৫ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী  লীগের  ১৩ তম সম্মেলন হোটেল ইডেনে অনুষ্ঠিত হয়েছিল এবং সেই সম্মেলনে সর্বসম্মতিক্রমে শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। এ কারণে সে সময়কার সরকারের ভিতরে উদ্বিগ্নতার লক্ষণ দেখা দিয়েছিল। তার আগে আওয়ামী লীগ ব্রাকেটবন্দি হয়ে গিয়েছিল ; আওয়ামী লীগ (মালেক), আওয়ামী লীগ (মিজান)- ওরকমভাবেই পরিচালিত হচ্ছিল। বঙ্গবন্ধুর আর্দশের কর্মীরা দিশেহারা হয়ে যাচ্ছিলেন। তেমন একটি সময় ঐক্যবদ্ধ আওয়ামী লীগ গঠিত হওয়াকে তৎকালীন জিয়া সরকার মোটেই ভাল চোখে দেখেনি। 

তাই ১৯৮১ সালে জিয়া সরকার বংশবদদের দিয়ে ‘শেখ হাসিনা আগমন প্রতিরোধ কমিটি’ পর্যন্ত করিয়েছিল। দেশের মানুষ কখনওই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে ভোলেনি। তৎকালীন  সিভিল সোসাইটি বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার আওয়ামী  লীগের সভাপতি হওয়াটা সাদরে গ্রহণ করেছিল। যে কারণে ১৯৮১ সালের ১৭ মে সকল পত্রিকায় একটা খবর ছাপা হয়েছিল এইভাবে – ‘শেখ হাসিনা আগমন প্রতিরোধ কমিটি আপাতত তাদের কর্মসূচি স্থগিত করেছে’। 

আমরা হয়তো এখন কল্পনা করতে পারবো না কতটা দুর্বিষহ অবস্থার মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনাকে পথ চলতে হয়েছে। ১৯৮১ সালে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা দেশে ফিরে বুঝতে পেরেছিলেন- দিশেহারা এক বাঙালি জাতিকে, সাংগঠনিকভাবে বিপর্যস্ত আওয়ামী লীগ দলকে এবং বিভেদ ও অবিশ্বাসে প্রায় অকার্যকর নেতৃত্বকে। আর জিয়াউর রহমানের স্বৈরশাসনের কারণে রাজনীতিতে সামরিক গোয়েন্দা বিভাগের হস্তক্ষেপ, কালো টাকার প্রভাববিস্তার, অস্ত্র ও অপরাধের প্রয়োগ এবং সবচেয়ে বড় সর্বনাশ ছাত্ররাজনীতিতে টোপ ও ভোগের প্রচলন ঘটিয়ে একে আদর্শচ্যুত করে ত্যাগ ছেড়ে ভোগের পথে অভিষিক্ত করা হয়ে গিয়েছিল। 

এসবই তো সংক্রামক ব্যাধি, যা পরবর্তী স্বৈরশাসকের মাধ্যমে ছাত্ররাজনীতির সর্বাংশে কম-বেশি সংক্রমণ ঘটিয়েছে এবং তা আর রোধ করাই ভীষণ কষ্টকর কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার যে রাজনীতি তাতে বঙ্গবন্ধু এক ও অনন্য। দেশ গড়ার সংগ্রামেও বঙ্গবন্ধু ছিলেন অনন্য সাধারণ।  কিন্তু মনে হয়, শেখ হাসিনার যাত্রাপথ বাস্তবতার নিরিখে পিতার চেয়েও কঠিন ছিল। তিনিও দলের জ্যেষ্ঠ, বিজ্ঞ ও অভিজ্ঞ বলে পরিচিত নেতাদের ওপর সবসময় নির্ভর করে এগোতে পারেননি। এখন আমরা জানতে পেরেছি ছয়টি বছর কাটাতে হয়েছে অত্যন্ত অসহায়, বেদনাহতভাবে দুর্ভোগ নিয়ে। শেখ হাসিনা ছয় বছর নির্বাসিত জীবন শেষে যখন বাংলাদেশে ফেরেন তখন বাংলাদেশের পরিস্থিতি কেমন ছিল, তা সবারই জানা আছে। ‘আওয়ামী লীগ’ ও ‘বঙ্গবন্ধু’ উচ্চারণ করাটাও ছিল অপরাধের কাজ। কবিরা বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কবিতা লিখে জেল খেটেছেন। শিল্পী শাহাবুদ্দিন আহমেদের আঁকা বঙ্গবন্ধুর ছবি পর্যন্ত জেলখানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। এমনই ছিল সেসময়ের শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি।  

তবে মৃত বঙ্গবন্ধু জীবিত বঙ্গবন্ধুর মতোই শক্তিশালী ছিলেন। তার প্রমাণ পাওয়া যায় সেই সময়কার মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর বক্তব্য থেকে। এক্ষেত্রে ইতিহাসের পাতা থেকে কিছুটা পাঠ নেওয়া যেতে পারে। 

“সরকার চিকিৎসার জন্য তাকে লন্ডনে পাঠায়। চিকিৎসা শেষে ১২ সেপ্টেম্বর ১৯৭৬, ঢাকায় ফিরে ভাসানী বিমানবন্দরে অপেক্ষমান সাংবাদিকদের বলেন : “দেশের জনগণ এ মুহূর্তে নির্বাচন চায় না। এ দেশের জনগণ মুসিলম লীগ ও বিগত আওয়ামী লীগ আমলেও নির্বাচনের কোনো সুফল পায়নি। দেশের মানুষ এই মুহূর্তে নির্বাচন চায় কি না, গণভোটের মাধ্যমে তা যাছাই করা দরকার।… একটা ‘বাজে’ গণপরিষদ কর্তৃক জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া সংবিধান বাতিল করে সরকারের ভেতরের ও বাইরের বিশেষজ্ঞদের দিয়ে নতুন খসড়া সংবিধান তৈরির জন্য সরকারের উদ্যোগ নেওয়া উচিত। নির্বাচন হইলে হানাহানি-কাটাকাটি হইবে। ইহা শান্তিপ্রিয় জনগণ চায় না। এই ধরনের নির্বাচনে ইতিপূর্বে যাহারা ক্ষমতায় গিয়াছিল… আবার তাহারাই ক্ষমতায় আসিবে।” 

এ-মুহূর্তে নির্বাচন হলে আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় ফিরে আসবে, এ-রকম একটা ‘আশঙ্কা’ ছিল মওলানা ভাসানীর। তাই তিনি চেয়েছিলেন নির্বাচন যাতে না হয়। ভাসানীর এই দাবি ছিল সামরিক সরকারের ইচ্ছারই প্রতিফলন। (তথ্য সূত্র: বিএনপি সময়-অসময়, মহিউদ্দিন আহমেদ, প্রকাশক : প্রথমা প্রকাশন) । 

শেখ হাসিনা যখন দিল্লি থেকে দেশে ফিরে আসেন তখন ছোট বোন শেখ রেহানা  ছিলেন  লন্ডনে। শেখ রেহানা বয়স তখন মাত্র ১৭ বছর হবে, লেখাপড়া আর শেষ করতে পারেননি। ১৯৭৮ সালে লন্ডনে এক চাচার বাসায় তার বিয়ে হয়েছিল মা-বাবার মনোনীত পাত্র ড. শফিক সিদ্দিকীর সাথে । একটা  প্লেনের টিকিটের অভাবে শেখ হাসিনা সেই বিয়েতে উপস্থিত থাকতে পারেননি। সেরকম একটা সময়ে শেখ রেহানার পাসপোর্টের ভিসার মেয়াদ বাড়ানো জন্যে লন্ডনে বাংলাদেশ দূতাবাসে জমা দেওয়া হয়েছিল। জিয়াউর রহমানের নির্দেশে সে পাসপোর্ট বঙ্গবন্ধু কন্যা  শেখ রেহানাকে দেওয়া হয়নি ।   জানি না এখনকার সময়ে আওয়ামী লীগের পুরানো-নতুন মিলিয়ে নেতারা সেসময়কার পরিস্থিতি তা কতখানি  তা উপলব্ধি করতে পারছেন। 

১৯৮০ সালে লন্ডনের ইয়র্ক হলে বঙ্গবন্ধু সপরিবারে হত্যাকাণ্ড ও জেলখানায় চার জাতীয় নেতার হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবিতে বঙ্গবন্ধুর আর্দশের কর্মীদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান শেখ হাসিনা। তারই ধারাবাহিকতায় ‘শেখ মুজিব মার্ডার এনকোয়ারি অ্যান্ড প্রিলিমিনারি রিপোর্ট’ নামে ব্রিটিশ সংসদীয় কমিটি গঠিত হয়। সে কমিটিতে ছিলেন-  স্যার এমপি থমাস উইলিয়ামস, শ্যেন ম্যাকব্রাইড, জেফরি থমাস এবং আব্রে রোজ। 

তদন্ত কমিটির প্রতিনিধি দল বাংলাদেশে আসতে চেয়েছিলেন, কিন্তু জিয়াউর রহমান সরকার কোনভাবেই আসতে দিতে চায়নি। 

আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণের জন্য নয়াদিল্লী থেকে ঢাকা রওয়ানা হওয়ার কয়েকদিন আগে মার্কিন সাপ্তাহিক নিউজউইক পত্রিকার সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারকালে তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত কীভাবে গ্রহণ করেন এবং কোন্ উদ্দেশ্য সাধনে তা প্রয়োগ করবেন সে-সম্পর্কে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা এক হৃদয়গ্রাহী ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। ১১ মে তারিখে নিউজউইক-এ বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বক্স-আইটেম হিসেবে প্রকাশিত এক রিপোর্টে বলা হয়: 

১৯৭৫ সালে সামরিক চক্র কর্তৃক ক্ষমতাদখলকালে নিহত পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারী  হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য শেখ হাসিনা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তিনি নিহত হওয়ার আশঙ্কায় শঙ্কিত নন; এমনকি যে-সরকারের মোকাবিলা করবেন তার শক্তিকে তিনি বাধা বলে গণ্য করবেন না। তিনি বলেন, ‘জীবনে ঝুঁকি নিতেই হয়। মৃত্যুকে ভয় করলে জীবন মহত্ব থেকে বঞ্চিত হয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘যেসব কাজ অগ্রাধিকার পাওয়ার যোগ্য বলে আমি বিবেচনা করি তার মধ্যে থাকবে দেশের প্রত্যেকটি মানুষের পূর্ণ গণতান্ত্রিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। 

নিজের কর্তব্য পালনে তার পিতার অবদান সহায়ক হবে বলে শেখ হাসিনার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল। শেখ হাসিনা ভাল করেই জানতেন বঙ্গবন্ধুর প্রতি বাংলাদেশের জনগণের প্রীতি ও ভালোবাসা ছিল অপরিমিত।  সেদিন সাক্ষাৎকারে দৃঢ়তার সাথে বলেছিলেন, 

আমাকে (আওয়ামী লীগের) সভাপতি নির্বাচিত করে পরোক্ষভাবে তাঁকেই সম্মান দেখানো হয়েছে। আমি তাঁর অসমাপ্ত কর্মকা- সম্পন্ন করতে পারব। [নিউজউইক, ১১ মে ১৯৮১]। 

একবার ভাবুনতো ১৯৮১ সালের ১৭ মে শেখ হাসিনা যখন দেশে ফিরে আসেন তখন ওদিন রাতে শেখ হাসিনার থাকার জায়গা দলের নেতারা কী ঠিক করে রাখতে পেরেছিলেন? বঙ্গবন্ধু’র এক নিকট আত্মীয় সাবেক যুগ্ম সচিব সৈয়দ হোসেনের লালমাটিয়ায় দুই রুমের একটি বাসায় একটি কক্ষে শেখ হাসিনাকে থাকতে হয়েছিল।   শেখ হাসিনা তার বাবার বাড়ি ধানমণ্ডি ৩২ নম্বর বাড়িতে ঢুকতে পারেন নি। এমনকি মিলাদ পড়তে পর্যন্ত দেওয়া হয়নি। 

আমরা জানি যে, ১৯৭৫ সালের ১৫ অগাস্ট পরিবারের অধিকাংশ সদস্যসহ যখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নির্মমভাবে নিহত হন, তখন তার জ্যেষ্ঠকন্যা শেখ হাসিনা, বঙ্গবন্ধু জামাতা ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া ও বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠ কন্যা শেখ রেহেনা তৎকালীন পশ্চিম জার্মানিতে অবস্থান করছিলেন । বিদেশে ছিলেন বলেই তারা রক্ষা পেয়েছিলেন।

‘হাসিনা: এ ডটারস্ টেল’ ডকু-ফিল্মটা যারা দেখেছেন তারা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করতে পেরেছেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর বিশেষ আন্তরিক সহযোগিতায়  তারা ভারতে রাজনৈতিক আশ্রয় লাভ করেন। সে সময়কার ইতিহাস অনেক অনেক নির্মম, অনেক অনেক কষ্টের। বঙ্গবন্ধুর জামাতা ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া ও বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাকে দিল্লিতে মি. মজুমদার ও মিসেস মজুমদার ছদ্মনামে থাকতে হয়েছে। যে রাতে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়েছিল ঠিক সে সময়টাতে বঙ্গবন্ধু’র দুই কন্যাসহ বঙ্গবন্ধুর জামাতা বেলজিয়ামে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের বাসায় রাতের খাবারের আমন্ত্রণে গিয়েছিলেন। সে ইতিহাসও ভীষণ নিষ্ঠুর ও হদয় বিদারক। তৎকালীন জার্মান রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী ও তার সহধর্মিনীর আন্তরিক সহযোগিতা না পেলে  আরও ভয়াবহ পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হতো।   

১৯৮১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ভারতে অবস্থানকালে শেখ হাসিনা ঢাকায় অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগ কাউন্সিলের অধিবেশনে সর্বসম্মতিক্রমে সভাপতি নির্বাচিত হন। আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার কিছুদিন পর এক সাংবাদিক সাক্ষাৎকারে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা বলেছিলেন, তিনি শিগগিরই দেশে ফিরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকারীদের বিচারের জন্য একটি আন্দোলন গড়ে তুলবেন। বাঙালি জাতির মুক্তির জন্যে বঙ্গবন্ধু জীবন দিয়েছেন; বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করাই তার মূল লক্ষ্য।

ওরকম ভয়াবহ পরিস্থিতিতে দেশে ফেরা তার পক্ষে নিরাপদ হবে কিনা- জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, “সেই নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারে না। আমি হয়তো একটু ঝুঁকি নিচ্ছি। কিন্তু আমার বাবা যে-আদর্শের জন্য আজীবন সংগ্রাম করেছেন তা বাঁচিয়ে রাখতে হলে এই ঝুঁকি নিতেই হবে।”

বাংলাদেশ সরকার তার প্রত্যাবর্তন কী চোখে দেখবে জিজ্ঞেস করা হলে বঙ্গবন্ধু কন্যা বলেছিলেন, “তা আমি কী করে জানব? দেশে এখন সামরিক শাসন রয়েছে। যে-কোনো কিছু ঘটতে পারে।” আজ থেকে প্রায় চার দশক আগে আর্ন্তজাতিক গণমাধ্যমে শেখ হাসিনা খুবই দৃঢ়তার সাথে বলেছিলেন, “আদর্শের ক্ষেত্রে আমাদের কোনো দৈন্য নেই। কারণ, বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাংলাদেশের মানুষ দীর্ঘ সংগ্রামের মাধ্যমে যে-আদর্শ প্রতিষ্ঠা করেছে তা-ই আমাদের দিক-নিদের্শক। সেই পথ ধরেই বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশ-বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত কর্মকাণ্ডকে সফল করে তুলব।” 

দীর্ঘ ৪০  বছরে  শেখ হাসিনার ক্রমাগত সংগ্রাম ও ত্যাগ তিতিক্ষার মাধ্যমে পেয়েছি এক আত্মপ্রত্যয়ী, সমৃদ্ধির বাংলাদেশ । শেখ হাসিনা তার পিতার মতো দেশের মানুষের জীবনমান উন্নয়নের জন্যে নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এবং বারবার আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মনে করিয়ে দেন। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ২০ তম ত্রিবার্ষিক জাতীয় সমম্মেলনে প্রদত্ত ভাষণে স্পষ্টভাবে বলেছিলেন, “আমি রাজনীতি করি এদেশের মানুষকে ভালোবেসে। দেশের শহর, গ্রাম যেখানেই আমি সফরে যাই মানুষের দুঃখ কষ্ট মনকে দারুণভাবে আচ্ছন্ন করে রাখে। প্রকৃতির কাছে মানুষ যেমন অসহায়, আবার গোষ্ঠী স্বার্থের কাছে মানুষ অসহায়, নিগৃহীত ও শোষিত।… রাজনীতি করতে হলে ব্যক্তিগত চাহিদা, লোভ-লালসা ত্যাগ করতে হবে; মানুষের জন্য ভাবতে হবে, মানুষের মনের কথা বুঝে কাজ করতে হবে। মানুষের আস্থা ও ভালোবাসাই আমাদের শক্তি, সম্পদ।”

সামাজিক সূচকে বাংলাদেশের অগ্রগতি এখন অনেক দেশের জন্য উদাহরণ। একসময়ের “তলাবিহীন ঝুড়ি” ’বাংলাদেশ এখন মধ্যম আয়ের দেশের পথে। আমরা যেমন মধ্যম আয়ের দেশ হতে চাই, আকাঙ্ক্ষা উন্নয়নশীল দেশ হওয়ারও। 

আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারেও বলা আছে,আলোকোজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে পা বাড়িয়েছে বাংলাদেশ। শুরু হয়েছে দারিদ্র্য ও পশ্চাৎপদতা হতে মধ্যম আয়ের দেশে উত্তরণের ঐতিহাসিক কালপর্ব। উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হতে হলে অন্তত দুইটি সূচক পূরণ করতে হয় একটি দেশকে। স্বল্পোন্নত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশই প্রথম দেশ হিসেবে তিনটি সূচকের সব কয়টি পূরণ করে পরবর্তী ধাপে উন্নীত হয়েছে। চলতি ২০২১ সালে এক দফা পর্যবেক্ষণের পর ২০২৪ সালে জাতিসংঘের সাধারণ সভায় আনুষ্ঠানিকভাবে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় নাম উঠবে বাংলাদেশের।  

প্রভাবশালী মার্কিন সংবাদ মাধ্যম ব্লুমবার্গ প্রকাশিত ‘কোভিড রেজিলিয়েন্স র‌্যাংকিং’ -এ ডিসেম্বরে ২০তম অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। আর তালিকায় দক্ষিণ এশিয়ায় শীর্ষে বাংলাদেশ। ভারত-পাকিস্তানের ঠাঁই হয়েছে র‌্যাংকিংয়ের নিচের সারিতে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইতালি, সৌদি আরবের মতো দেশগুলোর চেয়েও এগিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ।

২.

শেখ হাসিনা জেনিভাতে ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা’র সমাবেশের ৬৪ তম অধিবেশনে প্রদত্ত ভাষণে তার দৃঢ অঙ্গীকারের কথা ব্যক্ত করেছিলেন- “বাংলাদেশকে নিয়ে আমার একটি দূরদর্শী পরিকল্পনা রয়েছে। আমরা চাই বাংলাদেশ আগামী এক দশকের মধ্যে একটি মধ্য-আয়ের দেশের পরিণত হবে, যেখানে দারিদ্র্য, ক্ষুধা, অসমতা এবং অনাচার থাকবে না; সবক্ষেত্রে আইনের শাসন ও সামাজিক ন্যায়বিচার বিরাজ করবে।” (জেনিভা, ১৭ মে ২০১১)। 

১৯৯৭ সালে মাইক্রোক্রেডিট সামিটে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অংশ নেন। সেই সময় তিনি হোয়াইট হাউসে প্রেসিডেন্ট ক্লিনটনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। হোয়াইট হাউসের ওই সাক্ষাৎ-অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা আমেরিকার প্রেসিডেন্টের কাছে দাবি করেছিলেন- বাংলাদেশ ওই সময় পর্যন্ত যে ঋণ নিয়েছিল তা যেন মওকুফ করে দেন। সেই সময় প্রেসিডেন্ট ক্লিনটন মোট ঋণের একাংশ মওকুফ করে দেন। সেই মওকুফ-করা অর্থ বাংলাদেশের পরিবেশ-সংরক্ষণসহ বনাঞ্চল ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।  

একটা তথ্য খুবই উল্লেখযোগ্য, ২০০৫-২০০৬ সালের জমির তুলনায় শতকরা বনভূমি ছিল ৭- ৮ শতাংশ্য। বর্তমানে শতকরা ১৭ দশমিক ৪৮ শতাংশে তা উন্নীত হয়েছে। ২০১৫ সালে শেখ হাসিনাকে জাতিসংঘ ‘চ্যাম্পিয়ন অব দ্য আর্থ’ পদকে ভূষিত করেছে। 

পরিবেশ-প্রতিবেশ, জীববৈচিত্র্য, জলজ প্রাণী সংরক্ষণ, পরিবেশদূষণ, গবেষণা, উদ্ভিদ জরিপ এবং বনজ সম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমে টেকসই পরিবেশ ও সবুজ শ্যামল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে ডেল্টা প্লান করেছেন শেখ হাসিনা। তিনি জাতিসংঘের ক্লাইমেট ভালনারেবল ফোরামের প্রেসিডেন্ট, যেটা আমাদের জন্যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও সম্মানের।

২০১১ সালে বাংলাদেশের সংবিধানে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সংযোজিত হয়েছে। তত্ত্ববধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল হয়েছে এটা আমরা সবাই জানি। কিন্তু পরিবেশ ও জীব-বৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও উন্নয়ন নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনী এসেছে সেটা আওয়ামী লীগের নেতারা খুব একটা উল্লেখ করেনি।  

(সূত্র: অনুচ্ছেদ ১৮ ক: “পরিবেশ ও জীব বৈচিত্র সংরক্ষণ ও উন্নয়ন।-  রাষ্ট্র বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নাগরিকদের জন্য পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করিবে এবং প্রাকৃতিক সম্পদ, জীব বৈচিত্র্য, জলাভূমি, বন ও বন্যপ্রাণির সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা বিধান করিবে।” ; প দশ সংশোধনী , ২০১১ )। 

পৃথিবীর একমাত্র সরকার প্রধান শেখ হাসিনা যিনি ২১০০ সালে বাংলাদেশ কিভাবে জলবায়ুর অভিঘাত মোকাবেলা করবে তার জন্যে  নেদারল্যান্ডস সরকারের সহযোগিতায় ‘ডেল্টা প্লান ’ করার দিকে এখনই উদ্যোগ নিয়েছেন। 

৩.

আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার কয়েকদিন পর নয়াদিল্লীতে এক সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনাকে জিজ্ঞেস করা হয়, “দীর্ঘদিন সক্রিয় রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার পর রাজনীতিতে ফিরে আসাকে তিনি কীভাবে দেখছেন?”

শেখ হাসিনার উত্তর ছিল, “রাজনীতি আমার রক্তে মেশানো। ছাত্রজীবনে আমি রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলাম। পরবর্তীকালে রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলাম, এটা ঠিক নয়। জন্মের পর থেকে আমি কর্মচঞ্চল রাজনৈতিক পরিবেশের মধ্যে ছিলাম। আমার পুরো জীবনটাই রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। রাজনীতির জন্যই মা-বাবা, ভাই ও আত্মীয়-স্বজন হারিয়েছি। আমি রাজনীতির সঙ্গেই আছি। নতুন করে রাজনীতিতে এসেছি বলতে পারেন না। নতুন করে রাজনীতিতে প্রবেশের প্রশ্ন ওঠে না।”  

শেখ হাসিনা এখন দৃঢ়তার সাথে বলেন, “৭৪ বছরের জীবনে ৬০ বছরই রাজনীতির সাথে যুক্ত।” সত্যিতো তার চেয়ে জেষ্ঠ্য রাজনীতিবিদ আর কয়জন আছেন!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক; সাবেক সহ-সভাপতি- বাংলাদেশ ফার্মেসি কাউন্সিল, প্রধান সম্পাদক- সাপ্তাহিক বাংলা বিচিত্রা ও এবিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডট কম। 

সৌজন্যে: বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডট কম

এই বিভাগের আরো সংবাদ