স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সুবর্ণ জয়ন্তী

  সুভাষ সিংহ রায়

০২ মে ২০২১, ১৭:৩৮ | অনলাইন সংস্করণ

১.

২০২১ সালের ১০ এপ্রিল ছিল স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ সরকারের সুবর্ণ জয়ন্তী। আগামী ২ মে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সুবর্ণ জয়ন্তী। অর্থাৎ ২০২১ সালের ওই দিনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ৫০ বছর পূর্ণ হবে। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাত ১২ টা ২০ মিনিটে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। স্পষ্ট করে ঘোষণা করেছিলেন ‘আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন’। তার এক ঘণ্টা ১০ মিনিট পরে বঙ্গবন্ধুকে ৩২ নম্বর বাসা থেকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাওয়া হয়। বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর পরামর্শও ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের সরকার গঠন করা হয়।

স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের প্রথম সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায়, যা এখন মুজিবনগর নামে পরিচিত। নানা প্রশাসনিক দায়িত্ব বণ্টন, পদায়ন ইত্যাদি নিয়ে সেই সরকারের মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭১ সালের ২ মে । একুশে পদক প্রাপ্ত সাংবাদিক অজয় দাশগুপ্তের লেখার শিরোনাম ছিল এরকম। ‘আমবাগানের শপথের আয়োজন ছিল বঙ্গভবনের মতোই’। শপথ অনুষ্ঠানে বিপুল সংখ্যক দেশি-বিদেশি অতিথি ও সংবাদকর্মীর উপস্থিতিতে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করা হয়, জাতীয় পতাকা ওড়ানো হয়, জাতীয় সংগীত গাওয়া হয়। অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি বীর মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দলের গার্ড অব অনার গ্রহণ করেন।

বঙ্গভবনে শপথ গ্রহণ হলে যে সব আয়োজন থাকত, পাকিস্তান বর্বর আর্মি বাংলাদেশ ভূখণ্ডকে বধ্যভূমিতে পরিণত করলেও আমবাগানে কোনও কিছু বাদ পড়েনি। বাংলাদেশে প্রথম সরকারের কাজ ছিল দেশের নিয়মিত সরকারের মতোই; মন্ত্রণালয়ভিত্তিক কার্যক্রমে ছিল দক্ষতা ও ন্যায়নিষ্ঠতার ছাপ। সেই সময় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের হাতেই ছিল। আহত মুক্তিযোদ্ধা ও অগণিত শরণার্থীর চিকিৎসা দেওয়ার যে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করা হয়েছিল তা স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিল (তৃতীয় খণ্ড) পাঠ করলেই বুঝতে পারি।

মুক্তিযুদ্ধের সময় কারা কারা এ চিকিৎসাসেবা দিয়েছেন এবং কীভাবে দিয়েছেন তা নতুন প্রজন্মকে জানানো প্রয়োজন। ২০১৯ সালের ৬ মে ‘দৈনিক প্রথম আলো’তে শাহাদুজ্জামান ও খায়রুল ইসলাম যৌথভাবে ‘মুক্তিযুদ্ধের চিকিৎসা সেনারা বিস্মৃতির পথে’ শিরোনামে একটা চমৎকার লেখা লিখেছিলেন। মূলত সে লেখাটির পাঠ থেকে আমার এ লেখার তাগিদ। স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের প্রথম সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল। নানা প্রশাসনিক দায়িত্ব বণ্টন, পদায়ন ইত্যাদি শেষে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকে চিকিৎসক তোফাজ্জল হোসেন যিনি টি হোসেন নামে পরিচিতি ছিলেন, তাকে ডিরেক্টর জেনারেল অব হেলথ সার্ভিসেস হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। সে সময় তাজউদ্দীন আহমদ প্রধানমন্ত্রীর পদ ছাড়াও শিক্ষা, স্থানীয় সরকার, স্বাস্থ্য, সমাজকল্যাণসহ বেশ কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করতেন।

তাজউদ্দীন আহমদ লিখেছিলেন, “বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সূচনা হয়েছিল ১৯৭১ সালের মে মাসের ২ তারিখে ডা. টি হোসেনকে (এমএস, এফআরসিএস) মহাপরিচালক নিয়োগের মাধ্যমে। সরকার গঠনের সময় ডা. হোসেন আমাদের সহচর হিসেবে ছিলেন। পাক সেনাবাহিনীর সেই অভিযানের পরে দুই সপ্তাহের জন্য আমাদের মন্ত্রিসভার কিছু সদস্য তার ক্লিনিকে আশ্রয় নিয়েছিল। ঢাকায় প্রায় ছয় লাখ টাকা মূল্যমানের সরঞ্জামসহ তার নার্সিংহোম ফেলে তিনি এসেছিলেন। তিনি স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে আমাদের সহযোগিতা করতে এসেছিলেন। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা হতে বঙ্গবন্ধু মুক্তি পাওয়ার পর থেকেই আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের সঙ্গে তার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। তার নার্সিংহোম থেকে আমরা সকলেই চিকিৎসা নিতাম। কলকাতায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছাত্রজীবনের প্রস্তুতির সময় থেকেই তিনি তার রাজনৈতিক বন্ধু ছিলেন। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ হতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর চালু করতে চিকিৎসা পেশায় বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্যদের মধ্যে একমাত্র ডা. হোসেনকেই পাওয়া গিয়েছিল।”

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মাধ্যমে প্রায় ১ হাজার ৪০০-রও বেশি চিকিৎসাকর্মীকে তখন নিয়োগ দেওয়া হয়। উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিবর্গের মধ্যে ছিলেন ডা. কে এ জামান, ডা. আহমেদ আলি, ডা. মহম্মদ ফরিদ, ডা. সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী, ডা. কাজী মেজবাহুন নাহার, ডা. তাহেরা খাতুন, ডা. ফারুক আহমেদ শায়ক, ব্রিটেন থেকে আগত ডা. মোশাররফ হোসেন জোয়ারর্দার ও ডা. বরকত আলি চৌধুরী, আমেরিকা থেকে আগত ডা. হাসান আহমেদসহ কৃতিমান মানুষরা। (তথ্যসূত্র: Bangladesh Documents 1971, A S M Shamsul Arefin , part 2 , page no 17, 18)

জানা যায়, উদ্বাস্তুদের সংখ্যা ৬০ লাখে পৌঁছানো পর্যন্ত ডা. হোসেন পশ্চিমবঙ্গের প্রায় সব উদ্বাস্তু শিবিরই পরিদর্শন করেছিলেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের প্রথমদিকে যুদ্ধের প্রয়োজনেই সীমান্তের কাছাকাছি অনেক জায়গায় হাসপাতাল গড়ে তুলতে হয়েছিল। এর একটি উদাহরণ রামগড় হাসপাতাল। এপ্রিল-মে মাসে রামগড় বেসামরিক হাসপাতালকে জরুরিভাবে সামরিক হাসপাতালে রূপান্তর করা হয়। রামগড়ের মহকুমা মেডিকেল অফিসার (SDMO) ডা. সিরাজুল ইসলাম অক্লান্ত পরিশ্রম করেছিলেন, ওষুধ এবং অস্ত্রোপচারের প্রয়োজনীয় সামগ্রীর অপ্রতুলতা সত্ত্বেও হাসপাতালে দিনরাত চিকিৎসা চালিয়ে গেছেন। বিশেষভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন স্থানীয়ভাবে পূর্বাঞ্চলে ত্রিপুরা-কুমিল্লা সীমান্ত বরাবর ফিল্ড-হাসপাতাল স্থাপন করেছিলেন স্বেচ্ছাসেবক ডাক্তার ও আওয়ামী লীগের নিবেদিতপ্রাণ কর্মীরা। এর মধ্যে মেলাঘর হাসপাতালটি সবার দৃষ্টি কেড়েছিল। সেক্ষেত্রে বর্তমানে আওয়ামী লীগ সরকারের বিশেষ সমালোচক ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীরও অবদান ছিল। তাকে আঞ্চলিক প্রশাসক কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ (সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার) প্রচুর সাহায্য করেছিলেন। ওখানে সেক্টর কমান্ডার ছিলেন মেজর খালেদ মোশাররফ। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রথম সরকার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ে কাজ পরিচালনার জন্য কিছুসংখ্যক ব্যক্তিকে বাছাই করে নিযুক্ত করা হয়েছিল। দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের নির্দিষ্ট পদমর্যাদাও দেওয়া হয়েছিল। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনক্রমে এ অধিদপ্তরের একটি সাংগঠনিক কাঠামো ছিল। কাঠামো ছিল নিম্নরূপ: স্বাস্থ্যসেবার মহাপরিচালক ছিলেন (Director General of Health Service) ১ জন, উপমহাপরিচালক (প্রশাসন) ছিলেন (Dy. Director General, Administration) ১ জন, ছিলেন অফিস তত্ত্বাবধায়ক (Office Superintendent) ১ জন। সেখানে করণিক (Clerks) হিসেবে কর্মরত ছিলেন ২ জন এবং ১ জন অফিস সহকারীও ছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ক্যাবিনেট সেক্রেটারি ছিলেন সদ্য প্রয়াত এইচ টি ইমাম। বাংলাদেশের প্রথম সরকার ও স্বাধীনতা পরবর্তী সরকার নিয়ে দুটি বই লিখেছিলেন। বলা যায় বই দুটি ইতিহাস পাঠকদের কাছে আকরগ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত হবে। এইচ টি ইমামের বর্ণনা থেকে আমরা জানতে পারি, পূর্বাঞ্চল, পশ্চিমাঞ্চল ও উত্তরাঞ্চলের প্রত্যেক দপ্তরের জন্য বিভিন্ন পদমর্যাদার কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিযুক্ত করা হয়েছিল এবং সাংগঠনিক কাঠামোর এসব পদ প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক অনুমোদিত ছিল। এ তিনটি আঞ্চলিক দপ্তরের প্রধান ছিলেন উপমহাপরিচালক (Dy. Director General), অফিস তত্ত্বাবধায়ক (Office Superintendent)-১, হিসাবরক্ষক (Accountant)-১, ভান্ডার-রক্ষক (Store Keeper)-১, করণিক-কাম-মুদ্রাক্ষরিক (Clerk-Cum-Typist)-১, পিয়ন-১, গাড়িচালক (Driver)-১ জন।

২.

চিকিৎসা ও অন্যান্য সেবা প্রদান করতে বাংলাদেশ সরকারকে বিপুল ব্যয়ের ধাক্কা সামলাতে হয়েছিল। এসব কাজ করতে সরকার প্রয়োজনীয় অর্থ-সংস্থানের ব্যবস্থা করে। সে সময়ের বাজারমূল্যে প্রায় দশ লাখ রুপি (ভারতীয় মুদ্রায়) অর্থ-সংস্থান করা হয়েছিল। (তথ্য সূত্র: বাংলাদেশ সরকার ১৯৭১, লেখক এইচ টি ইমাম, আগামী প্রকাশনী) এছাড়া বেসরকারি খাতে বাংলাদেশের সকল শ্রেণির নাগরিককে চিকিৎসা-সুবিধা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং তা বাস্তবায়নে করা হয়। এ কাজের জন্য প্রাথমিকভাবে প্রায় ৯ লাখ ৫০ হাজার রুপি বরাদ্দ দেওয়ার কথা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের পাতায় লিপিবদ্ধ হয়ে আছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের যেসব চিকিৎসক সীমান্ত অতিক্রম করে শরণার্থী-শিবিরে অথবা আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবদের নিকট আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন এবং সীমান্তের অভ্যর্থনা শিবিরে তাদের নাম-ঠিকানা লিপিবদ্ধ করা হত, তাদের প্রায় সবাইকেই বাংলাদেশ সরকারের কাজে নিযুক্ত করা হয়েছিল। ১৮ এপ্রিল ১৯৭১-তারিখে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিপরিষদের সভায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদকে অন্যান্য দপ্তরের সঙ্গে স্বাস্থ্য ও সমাজকল্যাণ বিভাগের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছিল। ১৯৭১ সালের ২ মে তারিখে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিপরিষদের সভায় তাকে নিয়োগদানের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল। (সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তের কথা পূর্বেই ‘মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ’ শীর্ষক অধ্যায়ে উল্লেখ করা হয়েছে) মুক্তিযুদ্ধের সময় চিকিৎসা-সংক্রান্ত সরকারি সকল ব্যবস্থাপনায় ডা. টি হোসেনের সুদক্ষ তদারকি অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসে। আর সেসময়কার স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এমবিবিএস চিকিৎসকদের জন্য দৈনিক ভাতা ১৫ রুপি (ভারতীয় মুদ্রায়) এবং এলএমএফ চিকিৎসকদের জন্য দৈনিক ভাতা ১০ রুপি নির্ধারণ করা হয়েছিল।

পরবর্তীতে ভারতীয় রেডক্রসের ব্যানারেও অনেক চিকিৎসাকর্মীকে কাজে নিয়োগ দেওয়া হয়। সব মিলিয়ে প্রায় ২ হাজার বাংলাদেশি চিকিৎসাকর্মী শরণার্থী শিবিরের চিকিৎসাসেবায় এবং রণাঙ্গনের বিভিন্ন হাসপাতালে ও ড্রেসিং স্টেশনে কাজ করেছেন। অর্থের প্রাথমিক সংস্থান কীভাবে হয়েছিল তা আমরা জানতে পারি বাংলাদেশের প্রথম সরকারের প্রথম সচিব হিসেবে (২৪ শে এপ্রিল ১৯৭১) নুরুল কাদের সাহেবের ‘একাত্তর আমার’ গ্রন্থ থেকে। ১৯৭০ সালের শেষের দিকে তিনি পাবনার জেলা প্রশাসক ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার সাথে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী ব্যাটেলিয়ান শক্তিতে পাবনা আক্রমণ করেছিল। ডিসি নুরুল কাদের পূর্বেই আচ করতে পেরে অধীনস্ত পুলিশ, আনসার ও ছাত্র রাজনৈতিক কর্মীদের সংগঠিত করে আক্রমণ প্রতিহত করেছিলেন। ১৭টি খণ্ডযুদ্ধে হানাদার বাহিনীকে পর্যুদস্ত করা হয়েছিল। ব্যাংক থেকে সংগৃহীত সকল টাকার হিসেব বিবরণী গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রীর কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে সমর্পণ করেছিলেন, যা ছিল পরবর্তীকালে প্রথম সরকার পরিচালনার অন্যতম আর্থিক অবলম্বন। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার প্রথম থেকেই স্বাস্থ্য মহাপরিচালক পদটি সচিবের পদমর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছিল। পরবর্তীতে একাত্তরের জুলাই মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে শিলিগুড়ি সম্মেলনের আগে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের পরিকল্পনার খসড়া অনুমোদনের পাশাপাশি নিজ হাতে লিখে ডা. টি হোসেনকে স্বাস্থ্য মহাপরিচালকের দায়িত্বের অতিরিক্ত হিসেবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবে নিয়োগ দেন।

৩.

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতির ওপর দাঁড়িয়েও স্বাধীন বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের মতো জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দেখেছেন এবং এ কারণে দেশের বৃহত্তর গরীব জনগোষ্ঠীর জন্য স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে জাতীয়করণ করেছিলেন। বিখ্যাত ফরাসি দার্শনিক আঁদ্রে মালরো আমাদের মুক্তি সংগ্রামের দিনগুলোতে বিশ্বব্যাপী জনমত গঠনে ভীষণ রকমের অবদান রেখেছিলেন। তিনি বাংলাদেশের প্রথম সরকারের কাছে ইচ্ছে ব্যক্ত করেছিলেন মুক্তিযুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে চান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে তার গেরিলা যুদ্ধের অভিজ্ঞতা ছিল। সে সময় তার বয়স ছিল ৭১ বছর। শেষ পর্যন্ত তিনি বিশ্বব্যাপী জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আঁদ্রে মালরো বাংলাদেশে এসেছিলেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে একজন প্রশ্ন করেছিলেন, ‘আপনি মনে করেন শেখ মুজিব দেশটাকে ঠিকঠাক করে তুলতে পারবে?’ আঁদ্রে মালরোর তাৎক্ষণিক উত্তর ছিল ‘অবশ্যই পারবেন, যদি আপনাদের মতো শিক্ষিত লোকেরা তাকে মেরে না ফেলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আমরা ফরাসীরা একটা রুটির জন্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতাম। আর বাংলাদেশে এসে দেখলাম ধ্বংসস্তুপের ওপরে এত অল্প সময়ের মধ্যে সব নাগরিক সুবিধা দাঁড় করিয়ে ফেলেছেন। থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স পর্যন্ত গড়ে তুলেছে।”

আমরা জেনে থাকব পাকিস্তান আমলে চিকিৎসকরা সরকারি চাকরিতে প্রথম শ্রেণির মর্যাদা পেতেন না। বঙ্গবন্ধু চিকিৎসকদের প্রথম শ্রেণির মর্যাদা প্রদান করেছিলেন। ‘আমরা দেখে আনন্দিত হলাম, মেয়ে-শ্রমিকরা যখন কাজে যায় তখন তাদের ছেলে-মেয়েদের দেখাশোনা করার জন্য মিলের সাথে নার্সিং হোম আছে। কাজে যাওয়ার সময় ছেলে-মেয়েদের সেখানে দিয়ে যায় আর বাড়ি যাবার সময় নিয়ে যায়। যে-সমস্ত শ্রমিক বিবাহ করে নাই তাদের জন্য বিরাট বিরাট বাড়ি আছে। শ্রমিকদের জন্য আলাদা হাসপাতাল আছে। অসুস্থতার সময় বেতনসহ ছুটি দেওয়া হয়। বৎসরে তারা একবার ছুটি পায়। যারা বাড়ি যেতে চায় তাদের বাড়িতে যেতে দেওয়া হয়, আর যারা স্বাস্থ্যনিবাসে যেতে চায় তাদেরও ব্যবস্থা করা হয়।’ (আমার দেখা নয়াচীন, ৫৯ পৃষ্ঠা, প্রকাশক: বাংলা একাডেমি)। কারাগারে বসে বঙ্গবন্ধু ডায়েরিতে যা লিখেছিলেন তাতে একটা বড় অংশ ছিল ১৯৫২ সালে নয়াচীনে আর্ন্তজাতিক শান্তি সম্মেলনে যোগদান করতে গিয়ে যে বিষয়গুলো তরুণ শেখ মুজিবকে ভাবনার জগতে রেখাপাত করেছিল, তারমধ্যে অন্যতম ছিল নয়াচীনের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা। বঙ্গবন্ধুর আপামর জনগণের জন্যে স্বাস্থ্যচিন্তা করেছেন সবসময়। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে ১৯৭২ সালের জুন মাসে Bangladesh College of Physicians and Surgeons (BCPC)-কে একটি আইনগত কাঠামো করে সাংগঠনিক রূপদান করা হয়।

বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জনের সময় ১৯৭২ সালে সারা দেশের হাসপাতাল ছিল মাত্র ৬৭টি, যা ছিল খুবই অপ্রতুল। গরিব জনগোষ্ঠী ঠিকমতো চিকিৎসা নিতে পারত না। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে বঙ্গবন্ধু সরকারি চিকিৎসা ব্যবস্থাকে জনগণের দোরগোড়ায় নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে প্রতি থানায় একটি করে হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ নেন। বঙ্গবন্ধু সারা দেশে ৩৭৫টি থানা কমপ্লেক্স হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। জাতীয় অধ্যাপক ডা. নুরুল-ইসলামকে আহ্বায়ক করে ওষুধ নিয়ন্ত্রণ বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করেন, যার লক্ষ্য ছিল ক্ষতিকর, অপ্রয়োজনীয় ও বেশি দামি ওষুধ আমদানি বন্ধ এবং ওষুধের যৌক্তিক ও নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করা। ক্ষতিকর অনেক ওষুধও তিনি বাতিল করেছিলেন। সেই সঙ্গে তিনি ওষুধের উৎপাদন ও মান নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে ওষুধ প্রশাসন পরিদপ্তর গঠন করেন। বহুজাতিক ওষুধ কোম্পানিগুলো কর্তৃক মামলা করার ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও তিনি ওষুধের পেটেন্ট আইন না মানার ঘোষণা দেন।ফলে মানুষ কম দামে ওষুধ পেত, যা আজও অব্যাহত রয়েছে।

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের ২১ বছর পর বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লড়াই শুরু করেছিলেন। ১৯৯৬ সালে সরকার পরিচালনায় এসে শেখ হাসিনা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স হাসপাতালগুলোকে ৩১ শয্যা থেকে ৫০ শয্যায় উন্নীত করেছিলেন। ফলে বিশেষত গরিব মানুষ উন্নত সেবা পেতে থাকে। বাংলাদেশে প্রতি ৬ হাজার মানুষের জন্য একটি করে কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন শুরু করেন। এখন ১৪০০০ এর অধিক কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। ২০১১ সালের ১৫ নভেম্বরে জাতিসংঘের তৎকালীন মহাসচিব বান কি মুন বাংলাদেশে এসে মৌলভীবাজারে এক কমিউনিটি ক্লিনিক দেখতে এসেছিলেন। মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার কমিউনিটি ক্লিনিকটি পরিদর্শন শেষে তিনি যা বলেছিলেন, তাতে আমি অবাক। জাতিসংঘে ফিরে গিয়ে বক্তৃতায় তিনি বলেছিলেন, ‘স্বল্পখরচে গ্রামীণ পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার যদি কোনও চিন্তাভাবনা কারও থাকে, তা হলে বাংলাদেশে গিয়ে দেখে আসতে হবে।’ কিডনি, হার্ট, নিউরোসায়েন্স ইন্সটিটিউটও করা হয়েছে। ৫০ বছরের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ সেন্টার অব মেডিকেল এক্সিলেন্স বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়। এ ছাড়াও রাজশাহী, চট্টগ্রাম এবং সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ শুরু হয়েছে। সম্প্রতি খুলনা মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে ১০৫টি মেডিকেল কলেজ করা হয়েছে। প্রতিটি জেলায় নার্সিং কলেজ এবং নার্সিং ইন্সটিটিউট প্রতিষ্ঠা হয়েছে। নার্সদের দ্বিতীয় শ্রেণির পদমর্যাদা দেওয়া হয়েছে। কোথাও কোথাও প্রথম শ্রেণিরও। হেলথ টেকনোলজিস্টদের অনেক পদ তৈরি হয়েছে। প্রায় ১২টি হেলথ টেকনোলজিস্ট ইন্সটিটিউট স্থাপন করা হয়েছে। এ সবকিছুই গত ৫০ বছরে আমরা পর্যায়ক্রমে পেয়েছি। এবং বিশেষত যা কিছু হয়েছে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়েই তা কার্যকরী হয়েছে। এভাবে এখন প্রতি বছর সারা দেশে ১০ হাজার চিকিৎসক স্বাস্থ্যসেবায় যোগ দিতে পারবেন। সব জেলা হাসপাতালকে তিনি ২৫০ শয্যা, যেগুলো ২৫০ শয্যার ছিল সেগুলোকে ৫০০ শয্যা এবং ৫০০ শয্যার হাসপাতালকে ১ হাজার শয্যায় রূপান্তরিত করেছেন। নতুন ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ১৩৬টি। দেশে এই প্রথম জেলা হাসপাতালগুলোতে কার্ডিয়াক কেয়ার ইউনিট (সিসিইউ) প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। যেখানে শুধু ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২৫ শয্যার একটিমাত্র বার্ন ইউনিট ছিল, এখন সেখানে নতুন একটি শেখ হাসিনা বার্ন ইন্সটিটিউট ও হাসপাতালে উন্নত ও সম্প্রসারিত চিকিৎসা সেবাদানের জন্য কার্যক্রম শুরু করেছে।

এছাড়া প্রতিটি সরকারি ও বেসরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং জেলা হাসপাতালে বার্ন ইউনিট খোলা হচ্ছে। নতুন একটি শেখ রাসেল গ্যাস্ট্রোলিভার ইন্সটিটিউট ও হাসপাতাল নির্মিত হয়েছে। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি, সুপেয় পানি ও স্যানিটেশনের সফলতায় বাংলাদেশ বিশ্বে উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। স্বাধীনতা উত্তরকালে বঙ্গবন্ধুর সরকারই প্রথম এ দেশের পল্লী অঞ্চলের সাধারণ মেহনতি মানুষের স্বাস্থ্যসেবার কথা বিবেচনা করে চিকিৎসাসেবাকে থানা পর্যায়ে পৌঁছে দেয়ার উদ্দেশ্যে থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স চালু করেন, চিকিৎসকদের সরকারি চাকরিতে সম্মান ও মর্যাদার কথা বিবেচনা করে চিকিৎসকদের পযদমর্যাদা দ্বিতীয় শ্রেণি থেকে প্রথম শ্রেণিতে উন্নীত করেছিলেন; যা দেশের চিকিৎসক সমাজ চিরদিন শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ৫০ বছর পূর্তিতে অনেকগুলো বিষয় আমাদের সামনে এসেছে। কতখানি অগ্রগতি হওয়া উচিৎ ছিল; আর কতখানি অর্জিত হয়েছে এটা বিশ্লেষণ করা খুবই জরুরি। জন মানুষের জন্যে সরকার যে অর্থ বরাদ্দ করে তার যথাযথ ব্যবহার করা হচ্ছে কিনা সেটা বর্তমান স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জন্যে বড় একটা চ্যালেঞ্জ।

তথ্যসূত্র:

১. ‘বাংলাদেশ সরকার ১৯৭১‘, লেখক: এইচ টি ইমাম, আগামী প্রকাশনী

২. বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিল পত্র তৃতীয় খণ্ড, আগামী প্রকাশনী

৩. তাজউদ্দীন আহমদের ডায়েরি; প্রথমা প্রকাশন

৪. ‘ইনভলভমেন্ট ইন বাংলাদেশস স্ট্রাগল ফর ফ্রিডম’ লেখক: ডাক্তার টি হোসেন

৫. ‘মুক্তিযুদ্ধের চিকিৎসা সেনারা বিস্মৃতির পথে’ (প্রথম আলো, ৬ মে, ২০১৯); লেখক: শাহাদুজ্জামান ও খায়রুল ইসলাম

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক; সাবেক সহ-সভাপতি- বাংলাদেশ ফার্মেসি কাউন্সিল, প্রধান সম্পাদক- সাপ্তাহিক বাংলা বিচিত্রা ও এবিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডট কম। 

সৌজন্যে: বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডট কম

এই বিভাগের আরো সংবাদ