‘সাংবাদিকতার গুরুত্ব দেশের সকলের উপলব্ধি করার প্রয়োজন আছে’

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ২৭ মে ২০২১, ১২:৪২

গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতার প্রবীণ অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক ২০০৯ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত প্রায় ৯ বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) চেয়ারম্যান এবং বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। বিদ্যমান বাস্তবতায় বাংলাদেশে সংবাদ মাধ্যমের বর্তমান পরিস্থিতি, অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, তথ্য অধিকার আইন এবং জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট তথ্য প্রকাশ (সুরক্ষা) আইনসহ প্রাসঙ্গিক বিষয়গুলো নিয়ে দেশ রূপান্তরের সঙ্গে কথা বলেছেন অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আহমেদ মুনীরুদ্দিন।

প্রশ্ন : অ্যাকাডেমিকভাবে বলা হয়ে থাকে সাংবাদিকতার দায় একমাত্র জনসাধারণের কাছে। কিন্তু এই দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে সাংবাদিকতাকে বস্তুনিষ্ঠতার পাশাপাশি স্বাধীন থাকতে হয়। এই পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের বর্তমান সময়ে সাংবাদিকতার চর্চাকে কীভাবে দেখছেন?

আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক : শুধু সাংবাদিকতাই জনগণের কাছে দায়বদ্ধ নয়, সাংবাদিকতা যেমন জনগণের মঙ্গলের জন্য তেমনি সরকার, প্রশাসন, আইন ও বিচারব্যবস্থা সবকিছুই জনগণের মঙ্গলের জন্য; সবাই জনগণের কাছে দায়বদ্ধ। কারণ বাংলাদেশের সংবিধান জনগণকে প্রজাতন্ত্রের মালিক হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। অতএব সবকিছুই কিন্তু জনগণকে ঘিরেই কেন্দ্রীভূত। সেই কারণে সাংবাদিকতা বলি আর রাষ্ট্রের অন্যান্য কর্মকান্ড সবকিছুই কিন্তু একটি অন্যটির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার জন্য যেমন স্বাধীনতা প্রয়োজন তেমনি রাষ্ট্রে কোথাও কোনো অসংগতি ঘটলে তার প্রতিকারের জন্য বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতাও প্রয়োজন। যে কারণে আজ যে পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে আমরা যাচ্ছি সেটা অনুধাবনের জন্য সবকিছুকে সামগ্রিকভাবে দেখা প্রয়োজন, বিচ্ছিন্নভাবে বা খন্ডিতভাবে এটা দেখলে প্রকৃত অবস্থাটা বোঝা যাবে না। এখানে একটা কথা বলা প্রয়োজন যে, সাংবাদিকতার গুরুত্ব দেশের আইনপ্রণেতা, জনপ্রতিনিধি, আমলা, বিচারক, ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষের উপলব্ধি করার প্রয়োজন আছে। এখানে প্রখ্যাত মার্কিন যোগাযোগবিদ ও সাংবাদিক ওয়াল্টার লিপমানের একটা গুরুত্বপূর্ণ উক্তি এখানে স্মরণ করছি। বহু আগেই তিনি বলেছিলেন“The present crisis of Western democracy is a crisis of journalism”। অর্থাৎ, সেই সময়ে পশ্চিমা দুনিয়ায় গণতন্ত্রের যে সংকট সেটা সাংবাদিকতায় সংকটের কারণেই ঘটছে বলে তিনি মন্তব্য করেছেন। এর অর্থ হলো, সাংবাদিকতা যদি স্বাভাবিকতা থেকে বিচ্যুত হয়, স্বাধীন ও মুক্ত সাংবাদিকতা যদি বাধাগ্রস্ত হয় তাহলে তা সারা দেশের জন্যই সংকট বয়ে আনে এবং গণতন্ত্রের জন্যও সংকট তৈরি হয়।     

প্রশ্ন : গণমাধ্যমকে রাষ্ট্রের আদর্শিক হাতিয়ার বলা হয়। নাগরিক এবং ভোক্তাদের পক্ষ থেকে প্রশ্ন তোলা; রাষ্ট্র ও সরকারের অসংগতি, অব্যবস্থাপনার কথা তুলে ধরা সে সবকে প্রশ্ন করা গণমাধ্যমের কাজ। আমাদের দেশে সাংবাদিকরা এই চর্চা কতটুকু করতে পারছেন বলে মনে করেন?

আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক : গণমাধ্যমের কার্যাবলি যখন আমরা সাংবাদিকতার ছাত্রছাত্রীদের পড়াই তখন সাংবাদিকতার অনেক ধরনের কাজের কথাই আলোচনা করা হয়। এখানে আলোচনাটা মূলত জনগণের তথ্যের অধিকার নিয়ে। জনগণ তো প্রজাতন্ত্রের মালিক। ফলে রাষ্ট্রীয় তথ্য জানার অধিকার যে জনগণের আছে সেটা আর আলাদা করে ব্যাখ্যার দরকার পড়ে না। এখন কথা হলো তথ্য জানার অধিকার জনগণের আছে কি না? সেই অধিকার স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধানে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানই দিয়ে গেছেন। যৌক্তিক কিছু শর্ত ও বিধিবিধানের ব্যতিক্রম ছাড়া সব তথ্যের অধিকারই জনগণের আছে। 

প্রশ্ন : জনগণের তথ্য জানার অধিকার রক্ষায় তো ‘রাইট টু ইনফরমেশন’ বা ‘তথ্য অধিকার আইন’ আছে। এই আইনে তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করার মাধ্যমে রাষ্ট্র ও সরকারের কাজকর্মের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা, দুর্নীতি হ্রাস এবং সুশাসন অর্জনের আশা করা হয়েছিল। সেটা কতটা হচ্ছে?

আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক : আসলে তথ্যের অধিকার সংবিধান স্বীকৃত হলেও রাষ্ট্রীয় নানা কর্মকান্ড, নানা ঘটনায় জনগণের এই অধিকার বিঘ্নিত হতে পারে। এই কারণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রশাসন ২০০৯ সালে তথ্য অধিকার আইন প্রণয়ন করেছে এবং পরে তথ্য কমিশন গঠন করেছে। এসব কিন্তু জনগণের তথ্য অধিকার নিশ্চিত করা তথা সাংবাদিকরা যাতে জনগণের কাছে রাষ্ট্রের তথ্য তুলে ধরতে পারে, জনগণকে সচেতন করতে পারে সেসব নিশ্চিত করতেই করা হয়েছে। পরে শেখ হাসিনা প্রশাসন ২০১১ সালে জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট তথ্য প্রকাশ (সুরক্ষা) আইন-২০১১ প্রণয়ন করে। এই আইনগুলো সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার কথা। তাই আমরা আশা করব স্বাধীন ও মুক্ত সাংবাদিকতা থেকে সাংবাদিকদের বিরত রাখা কিংবা সাংবাদিকতার কাজে কোনো প্রকার বাধাদানের চেষ্টা করা হবে না।      

প্রশ্ন : কিন্তু এসব আইন সত্ত্বেও বিগত বেশ কয়েক বছর ধরেই বাংলাদেশে সাংবাদিকতা একটি মারাত্মক বিপজ্জনক পেশা হয়ে উঠেছে। এক্ষেত্রে ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন’-কে সাংবাদিক নিপীড়নের অন্যতম হাতিয়ার মনে করা হয়। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের হিসাবে, বাংলাদেশে এই  ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অধীনে প্রায় ৯০০টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে এই আইনে আটক হয়েছেন ৩৫০ জনের বেশি। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে এই আইনের অপপ্রয়োগ হচ্ছে বলে মনে করেন কি?

আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক : আসলে আইন বিষয়ে মতামত দেওয়া আমার ঠিক হবে না। তবে একজন নাগরিক হিসেবে বলতে পারি, এই আইনটি ডিজিটাল বাংলাদেশ নির্মাণের প্রক্রিয়ারই একটি অংশ। আজ করোনাভাইরাস মহামারীর মধ্যে বিরাজমান এক মহাস্থবিরতার মধ্যেও দেখা যাচ্ছে, ডিজিটাল তথ্যপ্রযুক্তি কীভাবে জরুরি প্রয়োজনসহ অনেক কর্মকান্ড সচল রাখার প্রধান হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। এটা ডিজিটাল বাংলাদেশের সুফল। একইসঙ্গে এটাও বলতে হবে তথ্যপ্রযুক্তির শক্তি যেমন আজকের দুনিয়াকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে তেমনি এর নানা অপব্যবহারও হচ্ছে। এখন তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহার রোধে জনগণের জন্য কিছু নির্দেশাবলি বা গাইডলাইন থাকা জরুরি। আবার তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহার ঘটলে সেটা রোধ করা কিংবা তার শাস্তিবিধানের জন্যও ব্যবস্থা থাকতে হবে। অতএব, ডিজিটাল সিকিউরিটি বা তথ্যপ্রযুক্তির নিরাপত্তা বিধানের জন্য আইনকানুনের দরকার আছে। পৃথিবীর অনেক দেশেই এমন আইন আছে। কিন্তু যেটা জরুরি সেটা হলো, জনগণের তথ্য জানার অধিকার নিশ্চিত করতে কাজ করা সাংবাদিক কিংবা স্বাধীন  সাংবাদিকতায় অন্তরায় সৃষ্টির জন্য যাতে এই আইনের অপপ্রয়োগ না হয় সেটা নিশ্চিত করাও আইন প্রণেতাদের দায়িত্ব।

প্রশ্ন : সারা দেশে এখন আলোচনা চলছে প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক রোজিনা ইসলামের বিরুদ্ধে প্রশাসনের দায়ের করা মামলা নিয়ে। আপনি এই ঘটনাকে কীভাবে দেখছেন?

আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক : অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা করতে গিয়ে রোজিনা ইসলাম যে ঘটনাপ্রবাহের মুখোমুখি হয়েছেন সেটা নিঃসন্দেহে অনভিপ্রেত এবং খুবই দুঃখজনক। রোজিনা সচিবালয়ে গিয়েছিলেন তথ্য সংগ্রহের জন্য। কিন্তু সেখানে তাকে ছয় ঘণ্টা আটকে রেখে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের যে সংবাদ ও ভিডিওচিত্র আমরা দেখেছি সেটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। যে কথাটি আগেই বলছিলাম, তথ্যপ্রযুক্তি আজ আমাদের যে যুগে নিয়ে এসেছে সেখানে কোনো অপরাধ করে পার পাওয়া বা একেবারে ধামাচাপা দেওয়া সহজ নয়। সচিবালয়ের একটি মন্ত্রণালয়ের কক্ষের ভেতরে কী ঘটেছে সেটাও কিন্তু লুকিয়ে রাখা যায়নি। দেশবাসী সবই দেখেছে। বিষয়টি এখনো বিচারাধীন। আমরা আশা করব নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্তের মধ্য দিয়ে রোজিনার জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হবে। তবে, সাংবাদিকতার জন্য একজন সাংবাদিক সচিবালয়ের মতো জায়গায় এমন হেনস্তা ও নির্যাতনের শিকার হবেন, তার বিরুদ্ধে এভাবে মামলা দেওয়া হবে এবং কারাগারে পাঠানো হবে এগুলো কোনোভাবেই একটা সভ্য সমাজে গ্রহণযোগ্য নয়।

প্রশ্ন : সাংবাদিক রোজিনা ইসলামের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে ১৯২৩ সালের ‘অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টে’। উপনিবেশবিরোধী আন্দোলন দমনের জন্য ব্রিটিশরা এই আইনটি করেছিল। প্রায় একশ বছর পর স্বাধীন দেশে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে এই আইনের ব্যবহার এবং আইনটি নিয়ে এখন তুমুল বিতর্ক হচ্ছে।

আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক : আগেও বলেছি আইন নিয়ে আমি বিশেষজ্ঞ মতামত দিতে পারি না। আমার জানামতে ১৯১১ সালে ব্রিটেন নিজেদের দেশে সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য এই আইনটি প্রণয়ন করে। ১৯২৩ সালে ভারতে এই আইন প্রণয়নের উদ্দেশ্যও ছিল মূলত ভারতীয় বংশোদ্ভূত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যাতে রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা লংঘন করতে না পরে সেজন্য। কালের পরিবর্তনে ব্রিটেন নিজেই ১৯৮৯ সালে এই অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট সংশোধন করে। প্রতিবেশী ভারতসহ পৃথিবীর বহু দেশেই এমন আইন আছে। কিন্তু সেটা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্যই। কিন্তু এক্ষেত্রে যেটা গুরুত্বের সঙ্গে বলা প্রয়োজন সেটা হলো যে ব্রিটিশরা এই আইনটি করেছিল তারা কিন্তু নিজ দেশে কিংবা ভারতীয় উপনিবেশেও কখনোই এই আইনটি কোনো সাংবাদিকের বিরুদ্ধে প্রয়োগ করেনি। ভারতে সাংবাদিকের বিরুদ্ধে এই আইনে মামলা করা হলেও সর্বোচ্চ আদালত তা বাতিল করে দেয়। এখন বাংলাদেশে একজন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে এই অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টে মামলা হলো যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। অথচ তথ্য অধিকার আইন এবং জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট তথ্য প্রকাশ (সুরক্ষা) আইনে কিন্তু বলা আছে যে কোন তথ্য প্রকাশ করা যাবে আর কোন তথ্য প্রকাশ করা যাবে না। আর দুনিয়ার ইতিহাসে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় তথ্য সংগ্রহের জন্য সাংবাদিকরা কতদূর যেতে পারেন কী করতে পারেন সেটা নিয়ে বিস্তর উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা জনস্বার্থ নিশ্চিত করতে কতটা ভূমিকা রাখতে পারে তারও উদাহরণ প্রচুর। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াটার গেইট কেলেঙ্কারি এই বিষয়ের একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ। আমাদের নীতিনির্ধারক এবং সংশ্লিষ্ট সবারই এই বিষয়গুলো মাথায় রাখা প্রয়োজন। এটাও স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে, বাংলাদেশেও আগামী দিনে সাংবাদিকতা ও আইন অধ্যয়নে সাংবাদিক রোজিনা বনাম রাষ্ট্রের এই মামলা পাঠ করতে হবে।

সৌজন্যে: দৈনিক দেশ রূপান্তর

এবিএন/জনি/জসিম/জেডি

এই বিভাগের আরো সংবাদ