উত্তরাখণ্ডের মাদ্রাসায় কেন সমীক্ষা চালাচ্ছে বিজেপি সরকার

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২২, ২১:০০

উত্তরপ্রদেশের পরে এবার প্রতিবেশী রাজ্য উত্তরাখন্ডেও মাদ্রাসাগুলোয় সমীক্ষা চালানোর নির্দেশ দিয়েছে ওই রাজ্যের বিজেপি সরকার। সাড়ে চার মাস আগে ওই নির্দেশ জারি করা হলেও এখনো সমীক্ষা শুরু হয়নি।

দেরাদুনের ক্লেমেন্ট টাউন সেনাছাউনীর চওড়া রাস্তার শেষে হঠাৎই সরু গলির মধ্যে ঢুকে পড়েছিলাম। চিন্তা হচ্ছিল অত সরু গলি দিয়ে গাড়ি ঢুকবে তো!

গাড়ি ঢুকেই গিয়েছিল, আর আমি হাজির হয়েছিলাম মাদ্রাসা আবুল কালাম আজাদের দরজায়। তবে বাইরে লাগানো ইংরেজি হরফে লেখা বোর্ডে কোথাও এটিকে মাদ্রাসা বলা হয়নি।

রাজ্য সরকারের স্বীকৃতি প্রাপ্ত একটা ইংরেজি মাধ্যম স্কুল লেখা ছিল ওই বোর্ডে।

উত্তরাখণ্ড মাদ্রাসা বোর্ডের ডেপুটি রেজিস্টার আমাকে বলেছিলেন যে এটা বাকি সব মাদ্রাসার কাছে একটা উদাহরণ স্বরূপ।

মাদ্রাসা পরিচালকদের কোনো আপত্তি ছিল না সমীক্ষায়
ঘটনাচক্রে, উত্তরাখণ্ড সরকার রাজ্যের মাদ্রাসাগুলোতে যে সমীক্ষা চালাচ্ছে, তা নিয়ে কিন্তু মাদ্রাসা পরিচালকদের কোনো আপত্তি ছিল না। তারা তো এটাকে স্বাগতই জানিয়েছিল। কিন্তু উত্তরপ্রদেশের মতোই উত্তরাখণ্ডের মাদ্রাসাগুলোয় সমীক্ষা করা নিয়ে রাজনৈতিক উত্তাপ বেড়ে গেছে।

বিজেপির সাবেক মুখপাত্র শাদাব শামস সম্প্রতি উত্তরাখণ্ড ওয়াকফ বোর্ডের সভাপতি হওয়ার পরে তিনিই এ সমীক্ষার কথা বলেছিলেন।

পরে মুখ্যমন্ত্রী পুষ্কর সিং ধামিও মাদ্রাসা-সমীক্ষার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।

এসবেরও আগে, প্রায় সাড়ে চার মাস আগেই উত্তরাখণ্ডের সমাজকল্যাণমন্ত্রী এই সমীক্ষার লিখিত আদেশ দিয়েছিলেন।

মাদ্রাসা সার্টিফিকেটের স্বীকৃতির সমস্যা
উত্তরাখণ্ডে মাদ্রাসা বোর্ড তৈরি হয়েছিল ২০১২ সালে। মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন হরিশ রাওয়াত বোর্ডকে সরকারি স্বীকৃতি দেন।

২০১৬ সালে ওই মাদ্রাসা বোর্ড রাজ্যে ৪১৯টি মাদ্রাসাকে স্বীকৃতি দেয়, কিন্তু চারটি মাদ্রাসা পরে বোর্ডের স্বীকৃতি ফিরিয়ে দিয়ে বিদ্যালয় শিক্ষা বোর্ডের অধীন চলে যায়।

ওই চারটি মাদ্রাসার মধ্যে একটা ছিল মৌলানা রিসালুদ্দিন হাক্কানির মাদ্রাসাও। বিদ্যালয় শিক্ষা বোর্ডের স্বীকৃতি নিয়ে তারা এখন দেরাদুনেই আজাদ এডুকেশন অ্যাকাডেমি নামে একটা স্কুল চালাচ্ছে।

মৌলানা রিসালুদ্দিন বিবিসিকে বলছিলেন, সবথেকে বড় সমস্যা হল মাদ্রাসা বোর্ডের কোনও সিলেবাস নেই। তাই মাদ্রাসা বোর্ডের দেওয়া সার্টিফিকেটগুলো নিয়ে ২০১৫ সাল থেকে মামলা চলছে।

মাদ্রাসা বোর্ড বারে বারেই দাবী তুলছে যে পঞ্চম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত তাদের দেওয়া সার্টিফিকেটগুলোকে বিদ্যালয় শিক্ষা বোর্ডের সমান স্বীকৃতি দেওয়া হোক।

সংখ্যালঘুদের নিয়ে লাগাতার লিখে চলেছেন, এমন একজন সাংবাদিক শাহ নজর বলছেন, ‘উত্তরপ্রদেশ, বিহার, রাজস্থান, মহারাষ্ট্রের মতো রাজ্যে মাদ্রাসা থেকে পাশ করা ছাত্রদের শিক্ষা বোর্ডের সমতুল্য স্বীকৃতি রয়েছে। কিন্তু উত্তরাখণ্ডে তা নেই। সেজন্য মাদ্রাসা থেকে পাশ করা ছাত্ররা অন্য স্কুল বা কলেজে ভর্তি হতে পারে না।’

মৌলানা রিসালুদ্দিনও বলছেন যে সব থেকে বড় সমস্যা এটাই। সে জন্যই তিনি তার নিজের মাদ্রাসাটাকে স্কুলে পরিবর্তন করে নিয়েছেন, যাতে ছাত্রদের ভবিষ্যৎ খারাপ না হয়ে যায়।

মাদ্রাসাছাত্ররা বিশ্ববিদ্যালয়তেও ভর্তি হয়
মাদ্রাসা বোর্ডের ডেপুটি রেজিস্টার আব্দুল ইয়ামিন অবশ্য বলছেন যে এটা একটা ভুল ধারণা।

‘মাদ্রাসা বোর্ডের সার্টিফিকেটের অস্থায়ী স্বীকৃতি তো সেই ২০১৫ সাল থেকেই আছে। কিন্তু মাদ্রাসা বোর্ডের কর্মকর্তাদের ভুলের জন্য এই কথাটা প্রচার পেয়ে গেছে যে মাদ্রাসা বোর্ডের সার্টিফিকেট বিদ্যালয় শিক্ষা বোর্ডের সমতুল্য নয়। ফল ভুগতে হচ্ছে হাজার হাজার ছাত্রদের,’ জানাচ্ছিলেন ইয়ামিন।

তার কথায়, ‘এর বিপরীতে মাদ্রাসায় পড়া ছাত্রদের অন্য স্কুলে বা আলিম সার্টিফিকেট পাওয়ার পরে কলেজে ভর্তি হতে কোনো সমস্যা থাকার কথা নয়। মাদ্রাসাগুলোতে তো এনসিইআরটির সিলেবাসই পড়ানো হয়। একটাই ফারাক যে এগুলো হিন্দি বা ইংরেজির বদলে উর্দুতে লেখা হয়। সিলেবাসের বাইরে শুধু ধর্ম শিক্ষা আর উর্দু পড়ানো হয়।’

তিনি আরও জানিয়েছেন যে কিছুদিন আগেই মাদ্রাসা থেকে পাশ করা বেশ কয়েকজন ছাত্র কুমায়ূন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে।

সমীক্ষা নিয়ে রাজনীতি
উত্তরাখণ্ড ওয়াকফ বোর্ডের দায়িত্ব নেওয়ার পরে রাজ্য বিজেপির মুসলিম নেতা শাদাব শামস দলীয় এজেন্ডা অনুযায়ী কাজ করতে শুরু করে দেন। রুড়কির বিখ্যাত দরগা পিরান কালিয়ারকে নেশা করার জায়গা আর সেখানে দেহব্যবসা চলে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

এ নিয়ে বিতর্ক শুরু হলে তিনি নিজের বয়ান বদলে ফেলে বলেন যে তিনি দরগার কথা বলেন নি, ওই বিধানসভা এলাকা আর গ্রামটির কথা উল্লেখ করেছিলেন।

এরপরেই তিনি বলেন যে উত্তরপ্রদেশের মতোই উত্তরাখণ্ডেও মাদ্রাসাগুলোতে সমীক্ষা চালানো দরকার। পরের দিনই মুখ্যমন্ত্রী পুষ্কর সিং ধামিও সেই কথায় সায় দেন।

মুখ্যমন্ত্রী এও বলেন যে অনেকের কাছ থেকে তিনি মাদ্রাসাগুলোর ব্যাপারে অভিযোগ পেয়েছেন। সেজন্যই বাস্তব পরিস্থিতিটা জানার জন্যই মাদ্রাসা সমীক্ষা করাতে চান তিনি। কিন্তু সেই সমীক্ষার সরকারি নির্দেশ অনেক আগে, এপ্রিল মাসেই দিয়েছিলেন সমাজকল্যাণমন্ত্রী চন্দন রামদাস।

ছাত্রদের ভবিষ্যতের কথা ভেবেই সমীক্ষা?
রামদাস বিবিসিকে জানিয়েছেন, ‘মাদ্রাসা থেকে পাশ করা ছাত্রদের সার্টিফিকেটের কোনো স্বীকৃতি না থাকায় ছাত্রদের ভবিষ্যৎ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সে জন্যই মাদ্রাসায় সমীক্ষা করার আদেশ দেওয়া হয়েছে। মাদ্রাসাগুলোকে বলা হয়েছে যে হয় তারা বিদ্যালয় শিক্ষা বোর্ডের স্বীকৃতি নিক, অথবা ছাত্রদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত রাখতে অন্য কোনো উপায় অবলম্বন করুক।’

তিনি এও বলেন যে সমীক্ষা শুধু সেই ১৯২ মাদ্রাসাতেই চালানো হবে, যারা রাজ্য বা কেন্দ্র সরকারের সহায়তা পায়।

মন্ত্রীর আদেশ দেওয়ার সাড়ে চার মাস পরেও সমীক্ষা শুরু হয়নি।

কর্মকর্তারা বলছেন মন্ত্রীর নির্দেশ অনুযায়ী সমীক্ষার কাজ খুব তাড়াতাড়ি শুরু হবে।

আধুনিক মাদ্রাসা
ফিরে যাই সেই মৌলানা আবুল কালাম আজাদ মাদ্রাসায়। মাদ্রাসাটির ভাইস প্রিন্সিপাল বিলকিস জাহাঁ উত্তরাখণ্ড মাদ্রাসা শিক্ষক সমিতির মিডিয়ার দায়িত্বপ্রাপ্ত নেত্রী।

তিনি বলছিলেন সার্টিফিকেটের স্বীকৃতির সমস্যার জন্য তারা ২০১৭ সালে ওপেন স্কুল থেকে দশম আর দ্বাদশ শ্রেণির স্বীকৃতি নিয়ে নিয়েছেন।

আর যেহেতু এখন ইংরেজি মাধ্যমে পড়ানো হয়, সঙ্গে উত্তরাখণ্ড শিক্ষা বোর্ডের সিলেবাস মেনে চলা হয়, তাই ছাত্রদের পরে অন্য কোথাও ভর্তি হতে কোনো সমস্যা হয় না বলে জানালেন তিনি।

তাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে পাঁচজন ছাত্রী উত্তরাখণ্ডে শীর্ষ স্থান অধিকার করেছে। খুব তাড়াতাড়ি তারা স্মার্ট ক্লাসরুমও চালু করতে চলেছেন।

‘এটা মুসলমান অধ্যুষিত এলাকা। কাছাকাছি পাঁচটা স্কুল আছে। কিন্তু যাদের মনে হয় যে ছেলে মেয়েকে ধর্ম শিক্ষা দেওয়াবেন, তারাই মাদ্রাসায় পাঠান সন্তানদের,’ বলছিলেন বিলকিস জাহাঁ।

তার কথায়, ‘মাদ্রাসাকে মাদ্রাসা বলতে কারও লজ্জা পাওয়ার কিছু তো নেই। আসলে মাদ্রাসার যে পুরনো ভাবমূর্তিটা মানুষের মনে রয়েছে, সেটার বদল দরকার।’

ঘটনাচক্রে এই মাদ্রাসায় যে হিন্দুশিক্ষক বিজ্ঞান পড়ান, তিনি এখান থেকেই আলিম পাস করেছেন, যাতে তিনি মাদ্রাসার পরিবেশটা আরও ভালো করে অনুধাবন করতে পারেন।
খবর বিবিসি বাংলা

এবিএন/এসএ/জসিম

এই বিভাগের আরো সংবাদ