গণমাধ্যমকে ইসরায়েলি মুখপাত্রের ‘ধোঁকা’

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ১৫ মে ২০২১, ২১:১৭

শুক্রবার মধ্যরাতে আচমকা ইসরায়েলি সেনাবাহিনী ঘোষণা দেয় যে তাদের প্রতিরক্ষা বাহিনী গাজা ভূখন্ডে আক্রমণ করা শুরু করেছে। টুইটার বার্তায়, সাংবাদিকদের কাছে দেয়া খুদেবার্তায় এবং সেনাবাহিনীর একজন ইংরেজভাষী মুখপাত্রের দ্বারা অন দ্য রেকর্ডে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়।

বিবিসি, সিএনএন, দ্য নিউইয়র্ক টাইমসসহ বেশকিছু আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এই খবর বিশ্বাস করে বিশ্বজুড়ে তাদের পাঠকদের সাবধানবাণী জানায় যে গাজা দখল করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, যা কিনা ইসরায়েল-ফিলিস্তিনের মধ্যে শত্রুতার তীব্রতা চরমভাবে বৃদ্ধি করতে সক্ষম। 

কিন্তু নাটকীয়ভাবে কয়েক ঘন্টা পরেই গণমাধ্যমগুলোকে তাদের রিপোর্ট সংশোধন করতে হয়। কারণ জানা যায় যে গাজা দখলের কোনো প্রক্রিয়া চলছে না, বরং ইসরায়েলি সেনাবাহিনী নিজেদের সীমান্তের ভেতরে থেকেই গাজার দিকে গুলিবর্ষণ করেছে। সেই সঙ্গে আকাশপথ থেকেও যোদ্ধারা আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে। আর এই বিভ্রান্তির দায় নিয়েছেন ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর শীর্ষস্থানীয় এক মুখপাত্র। তিনি এই ঘটনার পেছনে 'ফগ অফ ওয়্যার' কে অভিযুক্ত করেছেন। 

কিন্তু শুক্রবারই শীর্ষস্থানীয় কিছু ইসরায়েলি গণমাধ্যম সূত্র জানায়, এই বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার কোনো ভুল ছিলনা। বরং এটি ইচ্ছা করেই করা হয়েছে যাতে হামাস গ্রুপ ধরে নেয় যে আসলেই গাজা আক্রমণ করা হয়েছে। এর ফলে হামাস যোদ্ধারা যে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতো তা ইসরায়েলকে নতুন করে আরো বিধ্বংসী একটি হামলা চালানো ও তাকে বৈধ দাবি করার সুযোগ করে দিতো।  

যদিও ইংরেজিভাষী মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট কর্নেল জোনাথন কনরিকাসের দাবি, এটি একান্তই তার নিজের ভুল। তিনি যুদ্ধের উত্তেজনাবশত যুদ্ধক্ষেত্র থেকে আসা খবর ঠিকমত যাচাই না করেই গণমাধ্যমকে দিয়েছেন বলে জানান। 

কিন্তু হিব্রুভাষী গণমাধ্যম জানায়, হামাস যোদ্ধাদের ইসরায়েলি বিমানবেষ্টিত একটি নেটওয়ার্ক টানেলে আসতে প্রলুব্ধ করায় প্রশংসিত হয়েছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। 

চ্যানেল ১২ বলে, 'এভাবেই গাজার সন্ত্রাসীদের জন্য টানেলগুলো মৃত্যুকূপ হয়ে দাঁড়ায়।' তারাও সাংবাদিকদের ভুল তথ্য দেয়াকে একটি সাজানো কৌশল বলে উল্লেখ করেছে।   

এই ঘটনায় কর্নেল কনরিকাসকে প্রশ্নবাণে বিদ্ধ করেছেন টাইমস, দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল, এএফপি, ওয়াশিংটন পোস্টের সাংবাদিকরা। তারা কনরিকাসের কাছে জানতে চেয়েছেন যে সাংবাদিকরা কি এখন সেনাবাহিনীর আনুষঙ্গিক হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছেন কিনা, আর কেনই বা বিবৃতির ভুল জানাতে কয়েক ঘন্টা সময় লাগলো? আগামী দিনগুলোয় সাংবাদিকরা সেনাবাহিনীর কোনো বিবৃতিকে বিশ্বাস করতে পারবে কিনা, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। 

কিন্তু কনরিকাস বলেন, 'কাউকে বোকা বানানো  আমার উদ্দেশ্য ছিলনা। অনেকেই বিষয়টিকে ভিন্নভাবে দেখছে যা 'অত্যন্ত লজ্জাজনক'।'

আগামী জুনেই অবসরে যাওয়ার কথা কর্নেল কনরিকাসের। তবে তিনি স্বীকার করেছেন যে গাজার যোদ্ধাদের ধোঁকা দেয়ার ইচ্ছা তাদের আছে। তাদের উদ্দেশ্য হামাসের অ্যান্টি ট্যাংক মিসাইল ক্রুদের তাদের গুপ্তস্থান থেকে বেরিয়ে আসতে এবং ইসরায়েলিদের দিকে গুলি ছুঁড়তে বাধ্য করা। এর ফলে তাদের অবস্থান ইসরায়েলি যোদ্ধাদের কাছে স্পষ্ট হবে এবং তারা সেগুলো ধ্বংস করতে পারবেন। 

তবে প্রতারণামূলক কৌশলের ইতিহাস কনরিকাসের কার্যালয়ের রয়েছে। ২০১৯ সালেও তারা আহত-নিহত সেনাদের সরিয়ে নেয়ার নাটক করে, যেখানে মিথ্যা ব্যান্ডেজ বাঁধা সেনাদের দেখানো হয়। এর দ্বারা তারা লেবানিজ গণমাধ্যমকে দেখাতে চেয়েছিল যে হিজবুল্লাহ মিসাইল হামলা করেছে।  

এবারও সংবাদের ভুল জানাতে মুখপাত্রের কার্যালয় দুই ঘন্টা লাগিয়েছে যা হিজবুল্লাহর নিজেদের বিজয় ঘোষণা করার জন্য যথেষ্ট সময়।   

তবে ইসরায়েলি সংবাদপত্র 'হারেটজ' এর সেনাবাহিনী বিশ্লেষক, আমোস হারেল-এর মতে, সাংবাদিকদের ধোঁকা দেয়া এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সন্দেহের তালিকায় চলে আসাটা আই.ডি.এফ এর জন্য বিপদজনক। ইসরায়েলের দ্বারা ব্যভৃত হচ্ছে এমন টের পেলে তা সাংবাদিকদের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ তারা সীমান্তের দুই পারেই কাজ করে।' 

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইসরায়েল-ফিলিস্তিনের মধ্যে চলমান সংকটের মুহুর্তে এমন বিভ্রান্তিকর তথ্য দু পক্ষের জন্যই পরিস্থিতি আরো ঘোলা করতে পারে।   

-দ্য নিউইয়র্ক টাইমস ভায়া দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড 

এবিএন/জনি/জসিম/জেডি

এই বিভাগের আরো সংবাদ