শেখ হাসিনার ভারত ও চীন সফর ও ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি

  ড. প্রণব কুমার পান্ডে

০৭ জুলাই ২০২৪, ১১:১১ | অনলাইন সংস্করণ

ড. প্রণব কুমার পান্ডে
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জটিল পরিবেশে প্রতিদ্বন্দ্বী পরাশক্তিদের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলা বেশ কঠিন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ চীন ও ভারতের সঙ্গে দৃঢ় ও ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে। এই দেশদুটিতে তাঁর সাম্প্রতিকতম সফরের মাধ্যমে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদারের পাশাপাশি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় কৌশলগত অবস্থান ফুটে উঠেছে। 

এশিয়ার দুটি শক্তিশালী দেশ, ভারত ও চীনের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে যাকে সীমান্ত সংঘাত, অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতামূলকতা এবং বিভিন্ন ভূ-রাজনৈতিক লক্ষ্যের মাধ্যমে চিহ্নিত করা যায়। উভয় দেশের সম্পর্কের টানাপড়েনের মধ্যে কৌশলগতভাবে জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষিত ও নিশ্চিত করার জন্য বাংলাদেশকে অবশ্যই তার কূটনৈতিক কার্যক্রম সতর্কতার সাথে চালিয়ে যেতে হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকার প্রায়শই এই গতিশীলতা সম্পর্কে একটি পরিশীলিত সচেতনতা দেখিয়েছে এবং বাংলাদেশের সুবিধার জন্য উভয় দেশের সাথে ভারসম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করছে। 

"সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়" ধারণার দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে, ভারত ও চীন উভয়ের সঙ্গেই ন্যায্য সম্পর্ক বজায় রাখতে বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। গত জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হয়ে যাওয়া দ্বাদশ সংসদীয় নির্বাচনের সময় এই ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি বিশেষভাবে স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল ছিল যখন চীন ও ভারত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চাপের বিরুদ্ধে বাংলাদেশকে সমর্থন করেছিল। বাইরের হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে তাদের ঐক্যবদ্ধ বিরোধিতা বাংলাদেশের কূটনৈতিক কৌশলের পরিপক্কতা ও ক্ষমতাকে তুলে ধরেছে। 

ভারতের জাতীয় নির্বাচনের পর শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক ভারত সফরের মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের প্রমাণ পাওয়া যায়। এই সফরটির মাধ্যমে বিভিন্ন ক্ষেত্রে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা শক্তিশালি করতে উভয় দেশ কতটা নিবেদিত তা ফুটে উঠেছে। দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য বিস্তর আলোচনা হয়েছে দুই দেশের মধ্যে। উভয় দেশই একে অপরের পণ্যের বাজারে প্রবেশাধিকার উন্নত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। 

গঙ্গা নদীর পানি বণ্টনের চুক্তি নবায়ন এবং বাংলাদেশে তিস্তা নদীর পানি ব্যবস্থাপনা ও পানি সংরক্ষণ প্রকল্পে ভারতের সহায়তার প্রসঙ্গসহ সার্বিক ভাবে পানি বণ্টনের সমস্যা নিয়ে আলোচনা হয়েছে উভয় পক্ষের মধ্যে। উভয় পক্ষই পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে। রেল ও সড়ক পরিবহণের ক্ষেত্রে সহযোগিতার বৃদ্ধি এবং বাংলাদেশীদের জন্য ভারতে মেডিক্যাল ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করার বিষয়ে উভয় দেশের সরকার একমত হয়েছে। 

সফরকালে সামুদ্রিক সহযোগিতা ও ব্লু অর্থনীতি সংক্রান্ত সমঝোতাপত্র স্বাক্ষরিত হয়েছে যা আমাদের সমুদ্র-ভিত্তিক ব্লু অর্থনীতির উন্নয়ন এবং সামুদ্রিক ক্ষেত্রে সহযোগিতার প্রসার ঘটাতে সহায়তা করবে। সমুদ্রবিজ্ঞান সংক্রান্ত এই সমঝোতাপত্রটি এই ক্ষেত্রে গবেষণা করার জন্য একটি কাঠামোগত ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে। তাছাড়া, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার বিষয়ে সমঝোতাপত্রের পুনর্নবীকরণ এই সকল ক্ষেত্রে দক্ষতা বিকাশের সক্ষমতা বৃদ্ধি করবে এবং শক্তিশালী করবে।

উভয় দেশের সরকার প্রধানের উপস্থিতিতে ট্রানজিট সম্পর্কিত সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়েছে।  বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ভিত্তিহীন সমালোচনা সত্ত্বেও দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের অন্যান্য দেশসহ ভারত ও বাংলাদেশের জন্য এই সমঝোতা স্মারক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারত এই অঞ্চলের অন্যান্য দেশে পণ্য পরিবহনের মাধ্যম হিসাবে বাংলাদেশের মাটি ব্যবহার করবে, অন্যদিকে বাংলাদেশ নেপাল থেকে বিদ্যুৎ কেনার জন্য ভারতীয় ভূখণ্ড এবং সঞ্চালন পরিকাঠামো ব্যবহার করবে। তাছাড়া, নেপাল ও ভুটান বাংলাদেশী বন্দর ব্যবহার করার জন্য ভারতীয় ভূখণ্ড ব্যবহার করবে। ফলে, বাংলাদেশ  বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন করতে পারবে। শেখ হাসিনার ভারত সফরে মোট ১০টি সমঝোতাপত্র স্বাক্ষরিত হয়েছে এবং ১৩টি সুনির্দিষ্ট ঘোষণা প্রদান করা হয়েছে। 

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জুলাই মাসে চীন সফর করবেন বলে মিডিয়ার মধ্যমে জানা গেছে। ফলে, বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্য নিশ্চিতের জন্য এই সফর খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই সফরের মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও গভীর হবে এবং সহযোগিতার নতুন দিক উন্মোচন হবে। বাংলাদেশের পরিকাঠামো উন্নয়নে চীন একটি প্রধান সহযোগী দেশ। প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে  সড়ক, রেল এবং বন্দর নির্মাণসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলির জন্য আরও তহবিলের নিশ্চয়তা  পাওয়া যাবে বলে মনে করা হচ্ছে। 

তাছাড়া, বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতি কমানোর জন্য বিশেষ ঘোষণা আসতে পারে মর্মে বাংলাদেশে চীনের রাষ্ট্রদূত মিডিয়ার সামনে বক্তব্য দিয়েছে।  বাণিজ্য সম্পর্ক উন্নত করা এবং দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর বিষয়ে দুই সরকার প্রধানের সঙ্গে কথা আলোচনা হতে পারে এই সফরে। বাংলাদেশ চীনের বাজারে আরও বেশি প্রবেশাধিকার চাইবে যাতে তারা চীনের  বাজারে অধিক পণ্য বিক্রি করতে পারে। বিভিন্ন  ক্ষেত্রে প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং সক্ষমতা বৃদ্ধিকে সহায়তা করার সম্ভাব্য চুক্তিগুলির সাথে, প্রযুক্তি এবং উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে সহযোগিতাকে এজেন্ডায় শীর্ষ অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। 

ভারত ও চীন উভয়ের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার জন্য স্মার্ট কূটনীতির প্রয়োজন, বিশেষ করে তাদের ইতিহাস এবং ক্রমাগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে। উভয় দেশকে গঠনমূলকভাবে সম্পৃক্ত করাই ছিল শেখ হাসিনা-র কৌশল, যাতে বাংলাদেশ যেন শুধু এক পক্ষের দিকে ঝুঁকে না পড়ে। বাংলাদেশের ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং জাতীয় স্বার্থ বজায় রাখার জন্য চেষ্টা করে চলেছে। ভারত ও চীন উভয়ের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার মাধ্যমে বাংলাদেশ বড় দেশগুলির ভূ-রাজনৈতিক খেলায় ক্রিয়ানক হওয়া এড়াতে পারে, যাতে তার উন্নয়নের লক্ষ্যগুলি এগিয়ে যায়। 

দ্বাদশ সংসদীয় নির্বাচনের সময় বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে চীন ও ভারতের কূটনৈতিক সমর্থন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। একটি দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বাইরের হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে এবং দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় চীন ও ভারতকে এক সাথে নিয়ে কাজ করার মাধ্যেম বাংলাদেশ সরকার তাদের সক্ষমতার পরিচয় দিয়েছে।  

বাংলাদেশের চমৎকার ভারসাম্যমূলক বৈদেশিক নীতি বিশ্বজুড়ে এর প্রোফাইলের উন্নতি করেছে। বাংলাদেশ সরকার দেশকে এমন এক জায়গায় নিয়ে গেছে যা কঠিন বিদেশী সম্পর্ক পরিচালনা করার মাধ্যমে দেশের উন্নয়নমূলক লক্ষ্যগুলি এগিয়ে নিতে সক্ষম। এই কূটনৈতিক পরিপক্কতা দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থাসহ (সার্ক) বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক স্থানে বাংলাদেশের সুনাম বৃদ্ধি করেছে। 

তবে, তবে কূটনৈতিক ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের সাফল্য অর্জনের ক্ষেত্রে অসুবিধাও রয়েছে। কখনও কখনও ভারত ও চীনের মধ্যে ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব বাংলাদেশকে একটি চ্যালেঞ্জিং অবস্থানে ফেলে দেয়। এই উত্তেজনাগুলি পরিচালনা করার জন্য চলমান কূটনৈতিক মিথস্ক্রিয়ার পাশাপাশি পরিবর্তিত ভূ-রাজনীতি সম্পর্কে পরিশীলিত সচেতনতার প্রয়োজন। 

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার জন্য বাংলাদেশের সক্ষমতা তার আগামী দিনের এগয়ে যাওয়ার  ভাগ্য নির্ধারণ করবে। এটি নির্ভর করবে  ভারত ও চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতির উপর যাতে বাংলাদেশ বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে পারে, অর্থনৈতিক সম্পর্ক উন্নত করতে পারে এবং পরিকাঠামো ও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন থেকে লাভবান হতে পারে।  

বাংলাদেশের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে অবশ্যই অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিতে কাজ করতে হবে।  কূটনৈতিক মিথস্ক্রিয়া টেকসই উন্নয়নের সাধারণ উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে, যাতে অর্থনৈতিক অগ্রগতির ফলে সকল মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত ও চীন সফর প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলির সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সতর্ক ভারসাম্যকে সর্বোত্তমভাবে চিত্রিত করেছে। এই সংযোগগুলির জটিলতা নিয়ে দক্ষতার সাথে আলোচনা করে বাংলাদেশ বড় রাজনৈতিক ও আর্থিক সুবিধা অর্জন করেছে, দেশের সার্বভৌমত্বকে শক্তিশালী করেছে এবং তার উন্নয়ন কর্মসূচি এগিয়ে নিয়েছে। ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি সর্বদা বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতির একটি স্তম্ভ হয়ে থাকবে কারণ এই নীতি দেশকে অগ্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে গেছে এই বিষয়টি নিশ্চিত করে যে এই নীতির আলোকে  ভবিষ্যতের বাধাগুলি নিয়ে আলোচনা হতে পারে এবং ভারত ও চীন উভয়ের সাথে কৌশলগত মিথস্ক্রিয়া দ্বারা প্রদত্ত সম্ভাবনাগুলি কাজে লাগাতে পারে। 

ড. প্রণব কুমার পান্ডে : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের প্রফেসর। 

এই বিভাগের আরো সংবাদ