আওয়ামী লীগের ইতিহাসের সাক্ষী পল্টন-সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও বঙ্গবন্ধু এভিনিউ

  হীরেন পণ্ডিত

০৫ জুলাই ২০২৪, ১১:১৩ | অনলাইন সংস্করণ

আওয়ামী লীগ এর জন্ম ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন রোজ গার্ডেনে তখন দলটির নাম ছিলো ‘আওয়ামী মুসলিম লীগ’। শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকসহ তৎকালীন রাজনৈতিক নেতারা সেদিন  রোজ গার্ডেনে উপস্থিত ছিলেন। সে সময়ের প্রক্ষাপটে তা প্রাসঙ্গিক ছিল বলেই মনে করেন রাজনীতি বিশ্লেষকরা।
১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির পর তৎকালীন মুসলিম লীগ জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। সেসময় জনগণের বিভিন্ন দাবি বাস্তবায়নেই আওয়ামী লীগের জন্ম হয়। আওয়ামী লীগ নামটি দিয়েছিলেন দলের প্রথম সভাপতি মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী। সেসময় রাজনৈতিক বাস্তবতায় ও কর্মীদের দাবির প্রেক্ষিতে মুসলিম শব্দটি থেকে গেলেও দল আত্মপ্রকাশের ছয় বছরের মাথায় ১৯৫৫ সালে দলের নাম থেকে মুসলিম শব্দটি বাদ দেয়া হয়। এর উদ্দেশ্য- দলে ধর্মনিরপেক্ষতার চর্চা এবং অসাম্প্রদায়িকতা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ। ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে আওয়ামী লীগ। স্বাধীনতার পর ‘বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ’ নাম নেয় দলটি।
এই দীর্ঘ সময় ৭৫ বছর পাড়ি দিতে আওয়ামী লীগকে কখনও সহ্য করতে হয়েছে শাসকের রক্তচক্ষু, কখনও দলটির নেতাকর্মীদের উপর এসেছে অসহ্য নির্য়াতন। কিন্তু বাংলাদেশের জন্ম দেয়া দলটি কখনও দমে যায়নি। বাংলাদেশের মানুষের মানসচিন্তাকে ধারণ করেই আওয়ামী লীগ যুগ-যুগান্তরে হয়ে ওঠে জনগণের দল। রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগ সবসময় সম্পৃক্ত থেকেছে। দীর্ঘ ৭৫ বছরে ৫০ বছরই আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রক্ষমতার বাইরে ছিল। কিন্তু তাতে দলের রাজনৈতিক আদর্শের কোনো ক্ষতি-বৃদ্ধি হয়নি। নেতারাও আদর্শচ্যুত হননি। বরং আরো কঠিনভাবে দলের ঐক্য ধরে রেখেছেন।
বাঙালী জাতির সবচেয়ে বড় দু’টি অর্জন হচ্ছে দেশের স্বাধীনতা এবং দেশের সর্বোচ্চ উন্নয়ন। এই দু’টিই এসেছে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে। সাম্প্রদায়িকতা এখনো বিজয়ের প্রধান অন্তরায়। ৭৫ বছরের আওয়ামী লীগের চ্যালেঞ্জ সাম্প্রদায়িক শক্তি। আওয়ামী লীগের ৭৫ বছরের দীর্ঘ পথ-পরিক্রমায় পল্টন ময়দান, সোহরাওয়ার্দি উদ্যান ও বঙ্গবন্ধু এভিনিউ আওয়ামী লীগের ৭৫ বছরের ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে আছে।
পল্টন ময়দান: ঢাকার গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্যের স্মারক এ ময়দান। ব্রিটিশ সেনাদের পদভারে জেগে উঠা বিশাল উন্মুক্ত প্রাঙ্গণ। স্বাধীন বাংলাদেশ এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অসংখ্য গৌরবগাথার জন্ম দিয়েছে পল্টন ময়দান। 
ব্রিটিশ আমলে একটি নতুন সেনানিবাস তৈরি করার উদ্দেশ্যে ঢাকার তখনকার ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট চার্লস ড'স নবাবপুর ও ঠাটারীবাজার ছাড়িয়ে শহরের উত্তর-পূর্বে অবস্থিত বেশকিছু অংশ সংস্কার করেন। সেখানে সিপাহীদের ছাউনি, অফিসারদের বাসস্থান এবং প্যারেড গ্রাউন্ড করা হয়। এ এলাকাটিই বর্তমান পল্টন বা পুরানা পল্টন এলাকা। 
এই মাঠে জনসভায় বঙ্গবন্ধু পূর্ব বাংলায় সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করেন। সেটা ছিল ১৯৭১ সালের ৩ মার্চের ঘটনা। জাতির মুক্তিসনদ ছয় দফা দেয়ার কারণে বঙ্গবন্ধু মুজিবসহ সর্বমোট ৩৫ জনকে ফাঁসি দেয়ার লক্ষ্যে আগরতলা মামলার আসামি করা হয়। ১৯৬৯ সালের ৪ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকসু কার্যালয়ে ডাকসু ভিপি হিসেবে তোফায়েল আহমেদের সভাপতিত্বে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। ৯ ফেব্রুয়ারি শপথ দিবসে পল্টন ময়দানে সভাপতির ভাষণ শেষে স্লোগান দেয়া হয়- শপথ নিলাম শপথ নিলাম মুজিব তোমায় মুক্ত করব; শপথ নিলাম শপথ নিলাম, মাগো তোমায় মুক্ত করব।’
২১ ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবসে পল্টনের মহাসমুদ্রে ১০ ছাত্রনেতা প্রিয় নেতা শেখ মুজিবসহ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় আটক সবার নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে স্বৈরশাসকের উদ্দেশে ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম প্রদান করা হয়। জনরোষের ভয়ে ২২ ফেব্রুয়ারি আইয়ুব খান আগরতলা মামলা সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করে বঙ্গবন্ধুসহ সব রাজবন্দিকে নিঃশর্ত মুক্তি দেয়।
স্বাধীনতার পরেও বাংলাদেশের রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রামের প্রাণকেন্দ্র ছিল পল্টন ময়দান। নিয়মিত বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সভা-সমাবেশ হতো এখানে। তবে জিয়াউর রহমানের সময়ে পল্টনে সভা-সমাবেশের ওপর কিছুটা নিয়ন্ত্রণ আরোপ করায় সেই ধারাবাহিকতায় ছেদ পড়তে শুরু করে।
নব্বইয়ের দশকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময় আবার প্রাণ ফিরে পায় পল্টন ময়দান। তবে এরশাদের পতনের পরের প্রায় দেড় যুগে এই ময়দান ধীরে ধীরে ঔজ্জ্বল্য হারাতে থাকে। তবে ঐতিহাসিক এ ময়দান এখন হারিয়ে গেছে। পল্টন ময়দান এখন খেলার মাঠ হয়ে গেছে। ৯০ দশকের বিশাল ময়দান দিন দিন ছোট হতে হতে মধ্যম সারির মাঠ হয়ে গেছে
নানা ফেডারেশনের ভবন নির্মাণের কাজ এখনো চলমান। বর্তমানে এখানে আর মিছিল মিটিং করার পরিবেশও নেই। প্রতিদিনই এ মাঠে ফুটবল, ক্রিকেট, রাগবি কত কী খেলা হয়। বলতে গেলে দিনভরই কোনো না কোনো খেলা চলে পল্টন ময়দানে। গত এক দশকে খেলাধুলার অবকাঠামোতে ফাঁকা ময়দানটি এখন চতুর্দিকে ঘেরা এক আবদ্ধ জায়গা। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর পল্টন ময়দানে বড় কোনো জনসভা হয়নি। 
মানুষের ভোট ও ভাতের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আবারও ঐতিহাসিক পল্টন ময়দানে সভা সমাবেশ শুরু হয়। এই মাঠে দাড়িয়ে শেখ হাসিনা শাসকগোষ্ঠীদের উদ্দেশ্যে কঠোর হুশিয়ারি দিয়ে বাংলাদেশের জনগণের অধিকার আদায়ে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে তোলার ডাক দিয়েছিলেন। তাই শাসকগোষ্ঠী স্বাধীনতার ইতিহাস বিজড়িত পল্টন ময়দান আশির দশকের প্রথম থেকেই শুরু করে ইতিহাস থেকে মুছে দেয়ার প্রক্রিয়া। 
সোহরাওয়ার্দী উদ্যান: বাংলাদেশের যে কোন আন্দোলনে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের গৌরবময় একটি ইতিহাস রয়েছে। স্বাধীনতার পূর্বে এর নাম ছিল রেসকোর্স ময়দান। এখানে হর্স-রেস-জুয়া হতো। স্বাধীনতার পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মদ, জুয়া, হাউজি নিষিদ্ধ করার সঙ্গে সঙ্গে রেস খেলা ও জুয়া বন্ধ করে দেন। রেসকোর্স নামটি পাল্টে গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নাম অনুসারে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান নাম দেন। আজ এই নামে পরিচিত। আওয়ামী লীগের সঙ্গে এই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের একটা নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। স্বাধীন বাংলাদেশের সঙ্গে যেমন ছিল পল্টন ময়দানের। আজ সেখানে ভাসানী স্টেডিয়ামসহ অনেক কমপ্লেক্স বানানোর ফলে সভা-সমাবেশ করার পরিবেশ, সুযোগ নষ্ট হয়ে যায়। অথচ জাতির পিতা ১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি লাহোরে রাজনৈতিক দলসমূহের শীর্ষ নেতাদের বৈঠকে বাঙালীর মুক্তি সনদ ঐতিহাসিক ৬ দফা পেশ করার পর ঢাকায় ফিরে এই পল্টনের জনসভায় বক্তৃতা করেন। 
পাকিস্তান আমলে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান তথা সেদিনের রেসকোর্স ময়দান ছিল আকারে অনেক বড়, বিস্তৃত। এখানে জনসভা করার মতো, জনসমাবেশ ঘটানোর মতো জোর আওয়ামী লীগ ছাড়া আর কারও ছিল না। স্বাধীনতা আন্দোলন এবং জনসভা অনুষ্ঠানের অনেক স্মৃতি এই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানজুড়ে আওয়ামী লীগের। আওয়ামী লীগ ও রেসকোর্স ময়দান বা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বঙ্গবন্ধুর মার্চ মাসব্যাপী দুনিয়া কাঁপানো অসহযোগ আন্দোলনের মাঝে এই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ১০ লাখ মানুষের উত্তাল জনসমুদ্রে তার ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ দিয়েছিলেন। ১০৯৫ শব্দের এই ভাষণ আজ বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ রাজনৈতিক ভাষণ। 
এর আগে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার উদ্দেশ্যে দায়ের করা তথাকথিত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে মুক্ত হয়ে তিনি রেসকোর্স ময়দানে আসেন এবং তাকে সংবর্ধনা প্রদান করা হয়। ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ তিনি মুক্ত হন এবং ২২ ফেব্রুয়ারি তার সম্মানে আয়োজিত এই সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তৎকালীন ডাকসুর ভিপি তোফায়েল আহমেদ জাতির পক্ষে তাকে বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত করলে উপস্থিত ২০ লাখ জনতার হাত উঁচিয়ে সমর্থন জানায়। ১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের পর এই রেসকোর্স ময়দানে পরাজিত পাকিস্তানের ৯৩ হাজার আর্মি অফিসার ও জোয়ান আমাদের বিজয়ী মিত্রবাহিনীর কাছে অস্ত্রসহ সারেন্ডার করে এবং সারেন্ডার দলিলে স্বাক্ষর দান করে। 
১৯৭২-এর ৮ জানুয়ারি পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে লন্ডন ও দিল্লী হয়ে ১০ জানুয়ারি তাঁর স্বপ্নের স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে আসেন এবং এই রেসকোর্স ময়দানে প্রথম বক্তৃতা করেন। বঙ্গবন্ধু কবিগুরুর ভক্ত ছিলেন। কবির কবিতা আবৃত্তি করে বলেছিলেন, ‘কবিগুরু তুমি এসে দেখে যাও, তোমার বাঙালী আজ মানুষ হয়েছে।’ স্বাধীনতা-উত্তর ১৯৭২ সালের ২০ মার্চ এই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানেই ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বিজয় এবং পাকিস্তানের কারাগার থেকে বঙ্গবন্ধুকে মুক্ত করতে যে মহীয়সী নারী সর্বাত্মক শক্তি ও সহযোগিতা নিয়ে আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন সেই মিসেস ইন্দিরা গান্ধীকে বিরোচিত সংবর্ধনা জানানো হয়েছিল। সেদিন এখানে ১০ লাখ মানুষ জড়ো হয়েছিল এবং নৌকার আদলে ইন্দিরা মঞ্চ বানানো হয়। ইন্দিরা গান্ধীর বাংলাদেশ সফরের আগে ভারতীয় মিত্রবাহিনী তাদের দেশে ফিরে যায়। 
আমাদের আজকের গর্বিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হবার পর দীর্ঘ ছয় বছরের প্রবাস জীবন থেকে ১৯৮১ সালের ১৭ মে দেশে ফিরলে তাকে সংবর্ধনা জানানোর জন্য তৎকালীন তেজগাঁও আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে মানিক মিয়া এভিনিউ এবং নিজ বাসভবন ধানমন্ডির ঐতিহাসিক ৩২নং এর বঙ্গবন্ধু ভবন পর্যন্ত অর্ধকোটির অধিক মানুষ রাস্তার দুই পাশে জড়ো হয়েছিলেন। শেখ হাসিনা একটি ট্রাকে মাচানের ওপর দাঁড়িয়ে বিমানবন্দর থেকে প্রথমে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সমাবেশে ও পরে ৩২ নম্বরে যাবার পথে রাজপথের দু’পাশ থেকে মানুষ তাকে হাত নেড়ে স্বাগত জানায়। 
১৯৯৩ সালের ২৬ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আয়োজন করা হয় গোলাম আযমসহ কতিপয় যুদ্ধাপরাধীর প্রতীকী বিচার। সেদিন উদ্যানে একটি গণআদালত বসানো হয় এবং আদালতে গোলাম আযমকে তার পাকিস্তানী আর্মির সহযোগী হিসেবে গণহত্যা, নারী নির্যাতন এবং সর্বোপরি বাংলাদেশের বিপক্ষে সশস্ত্র রাজাকার, আলবদর, আলশামস বাহিনী গঠন করে সরাসরি বিরোধিতাকারীদের মৃত্যুদণ্ড (প্রতীকী) ঘোষণা করে রায় দেয়া হয়। গণআদালতে প্রায় ৫ লাখ লোক জড়ো হয়েছিল এবং শেখ হাসিনা তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা, নেপথ্যে থেকে সকল আয়োজন সম্পন্ন করে দেন। ১৯৯৬-এ গণআন্দোলনের মাধ্যমে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি-জামায়াত সরকারের পতন এবং সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে ২১ বছর পর সরকার গঠন করেন শেখ হাসিনা। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্থাপন করেন শিখা চিরন্তন এবং নির্মাণ করেন স্বাধীনতা স্তম্ভ এবং স্বাধীনতা জাদুঘর। ‘শিখা চিরন্তন’ স্থাপন অনুষ্ঠানে দেশের মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের নেতৃবৃন্দ ছাড়াও শেখ হাসিনার আমন্ত্রণে রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবে অংশ নেন তিন বিশ্বনেতা-বিরল ব্যক্তিত্ব দক্ষিণ আফ্রিকার নেলসন ম্যান্ডেলা, ফিলিস্তিনের ইয়াসির আরাফাত এবং তুরস্কের সোলেমান ডেমিরেল। 
শেখ হাসিনা তাদের নিয়ে শিখা চিরন্তন স্থাপন করেন। যতদিন স্বাধীনতা থাকবে, যতদিন স্বাধীন বাংলাদেশ থাকবে ততদিন এই শিখা চিরন্তন জাতির গৌরবের স্মারক হিসেবে প্রজ্বলিত থাকবে। স্বাধীনতা স্তম্ভ আমাদের আত্মাভিমানের উঁচু শির হয়ে আছে, থাকবে অনন্তকাল। 
বঙ্গবন্ধু এভিনিউ: বঙ্গবন্ধু এভিনিউ হল ঢাকার গুলিস্তানে অবস্থিত একটি শহুরে রাস্তা। এর আগের নাম ছিল জিন্নাহ এভিনিউ। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর এর নাম পরিবর্তন করে বঙ্গবন্ধু এভিনিউ রাখা হয়। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের  কেন্দ্রীয় কার্যালয় বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে অবস্থিত। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ২৩ বঙ্গবন্ধু এভিনিউস্থ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সম্মুখে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ আয়োজিত ‘সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ ও দুর্নীতিবিরোধী’ সমাবেশে বিএনপি-জামাত জোট সরকারের প্রত্যক্ষ মদদপুষ্ট মানবতার শত্রু ঘৃণ্য ঘাতকের দল বর্বরোচিত গ্রেনেড হামলা চালায় ও নির্বিচারে গুলি বর্ষণ করে। এই নারকীয় গ্রেনেড হামলায় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদক বিশিষ্ট নারী নেত্রী বেগম আইভী রহমান গুরুতরভাবে আহত হন। অবশেষে ২৪ আগস্ট সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ে সভা সবাবেশ অনুষ্ঠিত হয় বঙ্গবন্ধু এভিনিউ এর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে।
ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে স্মার্ট বাংলাদেশ: আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত ধরে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশেই প্রবেশ করেছে, অর্থনৈতিক উন্নয়নে পৃথিবীতে রোল মডেল হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাঙালি জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠা, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির লালন, শোষণ মুক্ত সমাজ বিনির্মাণ এবং একটি উন্নত সমৃদ্ধ আধুনিক, প্রগতিশীল রাষ্ট্রব্যবস্থা বিনির্মাণের লক্ষ্যে কাজ করে চলেছেন। বাংলাদেশ নানা দিক থেকেই এগিয়ে যাচ্ছে। আর এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না, অগ্রগতির মধ্যদিয়েই একটি দেশ সমৃদ্ধ হয়। যদি বিশ্বের অন্যান্য দেশ বাংলাদেশের অগ্রগতির স্বীকৃতি দেয় এবং প্রশংসা করে, তবে তা অত্যন্ত ইতিবাচক এবং অনুপ্রেরণার। 
আওয়ামী লীগ সরকার অবকাঠামোগত উন্নয়নে ও নাগরিক সেবাকে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়েছে, সহজ করে দিয়েছে। শেখ হাসিনার স্বপ্ন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া, দেশের মানুষকে উন্নয়নের স্বাদ পাইয়ে দেয়ার লক্ষ্যে কাজ করছেন। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস রচনা, বঙ্গবন্ধুর অস্তিত্বকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে স্থান দিয়ে যথাযথ মর্যাদার আসনে বসানোই ছিল মূল লক্ষ্য।
ক্ষুধা ও দারিদ্রমুক্ত একটি প্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নের পর এখন ২০৪১ সালের মধ্যে স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ে তোলার জন্য চারটি ভিত্তি সফলভাবে বাস্তবায়নে কাজ করে যাচ্ছে আওয়ামী লীগ সরকার। এগুলো হলো-স্মার্ট সিটিজেন, স্মার্ট ইকোনমি, স্মার্ট গভর্নমেন্ট ও স্মার্ট সোসাইটি। এর পাশাপাশি হাতে নেওয়া হয়েছে ২১০০ সালের বদ্বীপ কেমন হবে- সেই পরিকল্পনা। স্মার্ট বাংলাদেশে সব কাজ, সম্পাদন করা হবে প্রযুক্তির মাধ্যমে। যেখানে প্রত্যেক নাগরিক প্রযুক্তি ব্যবহারে হবে দক্ষ। 
২০৪১ সালের স্মার্ট বাংলাদেশ হবে সাশ্রয়ী, টেকসই, বুদ্ধিভিত্তিক, জ্ঞানভিত্তিক এবং উদ্ভাবনী বাংলাদেশ। স্মার্ট সিটি ও স্মার্ট ভিলেজ বাস্তবায়নের জন্য স্মার্ট স্বাস্থ্যসেবা, স্মার্ট ট্রান্সপোর্টেশন, স্মার্ট ইউটিলিটিজ, নগর প্রশাসন, জননিরাপত্তা, কৃষি, ইন্টারনেট কানেকটিভিটি ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা হবে। শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে গত ১৬ বছরেরও বেশি সময় ধরে দেশকে যেভাবে নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন ও বাংলাদেশ বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটেও অন্য দেশগুলোর মতো বড় ধরনের কোনো অর্থনৈতিক সংকটে না পড়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে তিনি এই সময়ে দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তিকে শক্ত অবস্থানে নিতে পেরেছেন। তা না হলে ১৭ কোটি মানুষের দেশটাকে এই সংকটকালেও বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করা বেশ কঠিন হতো।  

লেখক : প্রাবন্ধিক, গবেষক ও কলামিস্ট।

এই বিভাগের আরো সংবাদ