আজকের শিরোনাম :

জাতিসংঘ সদস্যপদ : ফিলিস্তিনে শান্তির প্রথম পদক্ষেপ

  জেফরি স্যাক্স ও সাইবিল ফারেস

১৩ মে ২০২৪, ১৫:১৫ | অনলাইন সংস্করণ

চলতি মাসের ১০ তারিখ ছিল জাতিসংঘে ফিলিস্তিনের সদস্যপদ নিয়ে ভোটাভুটির দিন (ফিলিস্তিনকে জাতিসংঘের ১৯৪তম সদস্যপদ দেওয়ার জন্য নিরাপত্তা পরিষদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে সাধারণ পরিষদে একটি প্রস্তাব পাস হয়েছে। প্রস্তাবটির পক্ষে ভোট পড়েছে ১৪৩টি; বিপক্ষে ৯টি দেশ)। আরব বিশ্ব বারবার বলে আসছে– তারা দ্বিরাষ্ট্রীয় প্রশ্নের সমাধানে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনে প্রস্তুত। ২০০২ সালে আরব শান্তি উদ্যোগে যেমন এ বিষয়টি আলোচিত হয়, তেমনি ২০২৩ সালে আরব-ইসলামী শীর্ষ সম্মেলনেও এর ওপর জোর দেওয়া হয়। ১৬ মে অনুষ্ঠেয় ৩৩তম আরব লিগ সম্মেলনেও নিশ্চয় শান্তি ও স্থিতিশীলতার কথাই আলোচিত হবে।

যুদ্ধ বন্ধ করে মধ্যপ্রাচ্যে স্বাভাবিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পথ স্পষ্ট। ১৯৬৭ সালের সীমান্ত অনুসারে ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকার করে নিতে হবে। একই সঙ্গে পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী মেনে মুসলমানদের পবিত্র স্থানগুলো ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণমুক্ত করতে হবে। এর পর ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন এবং ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন উভয়েরই নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে। বিশ্বের অধিকাংশ দেশই দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধানে একমত। কারণ এটি আন্তর্জাতিক আইনে স্বীকৃত এবং জাতিসংঘের রেজুলেশনে অন্তর্ভুক্ত।

এখন বিশ্বের ১৯৩টি দেশের মধ্যে ১৪৩টি দেশ ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। অথচ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন পর্যন্ত জাতিসংঘে ফিলিস্তিনের সদস্যপদ আটকে রেখেছে। তিনটি দেশ বার্বাডোজ, জ্যামাইকা অ্যান্ড ত্রিনিদাদ ও টোবাগো সম্প্রতি ফিলিস্তিনের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেছে, আবার সাধারণ পরিষদে ফিলিস্তিনের সদস্যপদের পক্ষে ভোটও দিয়েছে। ফিলিস্তিনের যে রাজনৈতিক অধিকার রয়েছে, তার পক্ষে বিশ্ব সম্প্রদায়ের ঐকমত্যের আলামত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও অন্যান্য দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের প্রতিবাদেও স্পষ্ট। শিক্ষার্থীরা ফিলিস্তিনে বর্ণবৈষম্য ও গণহত্যা দেখছে এবং তার বেদনাও ভালোভাবে অনুভব করছে। সে জন্যই তারা এ সংকটের অবসানে সক্রিয়ভাবে আন্দোলন করছে।

১৮ এপ্রিল নিরাপত্তা পরিষদে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের পক্ষে যে ভোট হয়, সেখানে ১৫টির মধ্যে ১২টি দেশ ফিলিস্তিনের পক্ষে ভোট দিলেও ভেটো দেয় যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাজ্য ভোটদানে বিরত ছিল। বস্তুত যুক্তরাষ্ট্রের ভেটোর কারণেই সাধারণ পরিষদের ১০ মে’র জরুরি অধিবেশন বসে। এখন প্রস্তাবটি আবার চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য নিরাপত্তা পরিষদে উঠবে।

ইসরায়েলের নেতারা দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধানের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য ইসরায়েলের পক্ষে দাঁড়িয়েছে। কেবল এবারই নয়; দেশ দুটি বরাবরই দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধানের উদ্যোগ পণ্ড করেছে। তারা ইসরায়েলের বর্ণবাদী ব্যবস্থা সমর্থন করে তাদের সহযোগিতা করে যাচ্ছে, যা গণহত্যা সংঘটন এবং অবৈধ বসতি স্থাপনকে বৈধতা দিয়েছে।

ফিলিস্তিন জাতিসংঘের সদস্য হলে তা ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন উভয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। আন্তর্জাতিক আইনের মাধ্যমেই শান্তি প্রতিষ্ঠা হবে এবং জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ, আরব রাষ্ট্রসহ অবশ্যই বিশ্ব সম্প্রদায়ের সমর্থনের মাধ্যমে তা পূর্ণতা পাবে।
এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে এ অবস্থা চলে আসছে। ১৯১৭ সালে ব্রিটেন ওসমানীয় সাম্রাজ্যের একটি প্রদেশকে ইহুদিদের আবাসভূমি হিসেবে ঘোষণা করে। অথচ ওই জায়গায় ব্রিটেনের কোনো অধিকার ছিল না। এর পর ৩০ বছর ধরে চলা সহিংসতা নাকবা বা ফিলিস্তিনি উচ্ছেদে রূপ নেয় এবং পরে এ নিয়ে বারবার যুদ্ধ বাধে। ১৯৬৭ সালের যুদ্ধের পর ইসরায়েল অবশিষ্ট ফিলিস্তিন ভূমি দখল করে সেখানে বর্ণবাদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে। ইসরায়েল কঠোর নির্দয়মূলক শাসনব্যবস্থা কায়েম করে। গোঁড়া ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনি উভয়ের মধ্যে তিক্ততা বাড়ে এবং তাদের বিভাজন দিন দিন ব্যাপকতা লাভ করে।
দুই রাষ্ট্রের মধ্যে কয়েক দশক ধরে যে সহিংসতা চলছে, তার অবসান ঘটানোর জন্য আমরা সত্যিকারের এক ঐতিহাসিক মুহূর্তে আছি। রাজনৈতিক কারসাজির মাধ্যমে শান্তি প্রক্রিয়াকে আর ক্ষতিগ্রস্ত করা যাবে না। দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধানের মাধ্যমেই অবিলম্বে শান্তি আসতে পারে। জাতিসংঘে ফিলিস্তিনের রাষ্ট্র হওয়াটা এ ক্ষেত্রে যাত্রাবিন্দু হিসেবে কাজ করবে, কিন্তু এটাই শেষ নয়। কূটনৈতিক এই স্বীকৃতি পারস্পরিক নিরাপত্তার জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিতে সহায়তা করবে। ১০ মে জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলো ফিলিস্তিনের পক্ষে ভোট দিয়ে আন্তর্জাতিক আইন সমুন্নত রাখা, ন্যায়বিচার ও শান্তির পক্ষে যে রায় দিয়েছে, এর মাধ্যমেই শান্তি আলোচনা শুরু হোক।

জেফরি স্যাক্স ও সাইবিল ফারেস: লেখকদ্বয় যথাক্রমে কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক এবং জাতিসংঘ টেকসই উন্নয়ন সমাধান নেটওয়ার্কের মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকাবিষয়ক উপদেষ্টা। 

আলজাজিরা থেকে ঈষৎ সংক্ষেপিত ভাষান্তর মাহফুজুর রহমান মানিক। 
সৌজন্যে : দৈনিক সমকাল।

এই বিভাগের আরো সংবাদ