নারীর অগ্রগতি আজ দৃশ্যমান

  সেলিনা হোসেন

১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ০৯:২৯ | অনলাইন সংস্করণ

সেদিন অনেক নারী যেমনি ঢাকায় নেতৃস্থানীয় ভূমিকায় ছিলেন তেমনি দেশের অন্যান্য জেলাতেও তারা পিছিয়ে ছিলেন না। রওশন আরা বাচ্চু, সুফিয়া আহমেদ, হালিমা খাতুনসহ আরও অনেকের নামই ভাষা আন্দোলনের সংগঠক হিসেবে পাওয়া যায়।

বাঙালি চেতনার উন্মেষে এ দেশের কয়েকটি সাহিত্য-সংস্কৃতি সম্মেলনের ভূমিকা অনস্বীকার্য। ১৯৫০ সালে চট্টগ্রামে সরকারি বাধার মুখে যে ঐতিহাসিক সাংস্কৃতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় তার উদ্বোধন করেছিলেন কবি সুফিয়া কামাল। ১৯৫৩ সালে কুমিল্লায় অনুষ্ঠিত সাহিত্য সম্মেলনেও নারীরা অংশ নিয়েছিলেন। ১৯৫৪ সালে কার্জন হলে অনুষ্ঠিত সাহিত্য সম্মেলন এবং ১৯৫৭ সালের কাগমারি সম্মেলনে নারীরা বিপুল সংখ্যায় অংশ নিয়েছিলেন। আর আয়ুবশাহীর বিরোধিতার মুখেও যে স্মরণীয় অনুষ্ঠানমালার মাধ্যমে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী উদযাপিত হয় তারও কেন্দ্রীয় সংগঠক ছিলেন বেগম সুফিয়া কামাল, সনজীদা খাতুন প্রমুখ।

ষাটের দশকে এ দেশে ছাত্রসমাজ স্বৈরাচার ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী গৌরবময় সংগ্রামের সূচনা করে। এখানেও অনেক নারীর নাম উল্লেখ করা যায়।

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি পর্বে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের নেতৃত্বে বহু নারী সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছিল। আর মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পরে অনেকেই সরাসরি যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছেন। কেউ কেউ ফিল্ড হাসপাতালে নার্সের ভূমিকা পালন করেছেন। কেউবা দেশের অভ্যন্তরে গেরিলা যোদ্ধাদের গোপন আস্তানা দিয়ে সহায়তা করেছেন। অনেক নারী ঝুঁকি নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র ও তথ্য পৌঁছানোর কাজ করেছেন। তা ছাড়া আমরা তো জানি প্রায় দুলক্ষ নারী পাকবাহিনী ও তাদের দোসরদের হাতে নির্যাতিত হয়েছিলেন এই নয় মাসে। এই নির্যাতিত নারীরাও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি ও সম্মানের দাবিদার। গ্রামবাংলার সাধারণ নারী তারামন বিবি ও কাঁকন বিবি সাহসী যোদ্ধা হিসেবে বীর-প্রতীক খেতাবে ভূষিত হয়েছিলেন।

স্বাধীনতার পর পর বঙ্গবন্ধু নারীদের নিপীড়ন ও অবদান সম্পর্কে অবহিত ছিলেন। তিনি নির্যাতিতা নারীদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়ার কথা ভেবেছেন। তাঁদের জন্য পুনর্বাসন কেন্দ্র স্থাপন করে তাদের সবরকম সহযোগিতার ব্যবস্থা করেছিলেন। তাঁর মন্ত্রিপরিষদে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক নারী নেত্রী বদরুন্নেসা আহমেদ ও নূরজাহান বেগমকে অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর আকস্মিক নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর দেশ দীর্ঘ দুদশক ধরে বিপর্যস্ত অবস্থায় ছিল। তখনকার স্বৈরশাসকরা আমাদের ইতিহাসকে যেমন বিকৃত করেছে তেমনি নারীর অগ্রযাত্রাকেও কঠিন করে তুলেছিল।

বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এসে তাঁর পিতার পথ অনুসরণ করে দেশকে সঠিক পথে উন্নয়নের ধারায় ফিরিয়ে এনেছেন। তাঁর আমলের সংসদে নারীর সংরক্ষিত আসন শতকরা ১০ থেকে ১৫ ভাগ করা হয়েছে, স্থানীয় সরকারে নারীর নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ বেড়েছে। আর শিক্ষায় নারীর অংশগ্রহণ ব্যাপকভাবে দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। আজকের বাংলাদেশে সবচেয়ে মনরোম দৃশ্য হচ্ছে গ্রামবাংলার আলপথ ধরে স্কুল পোশাকে নতুন বই হাতে হাস্যোজ্জ্বল বালিকাদের সারি বেঁধে স্কুলে যাওয়ার ছবিটি।

বর্তমানে প্রাথমিকে ভর্তির হার প্রায় ১০০ ভাগ আর এতে ছেলেদের তুলনায় মেয়েরা এগিয়ে আছে। সর্বস্তরে পরীক্ষার ফলাফলেও মেয়েরা ছেলেদের চেয়ে এগিয়ে। তবে এখনো মাধ্যমিকে মেয়েদের ঝরে পড়ার হার উদ্বেগজনক এবং উচ্চ মাধ্যমিক ও স্নাতক পর্যায়ে ভর্তির হার কিছুটা কম। প্রধানত বাল্যবিয়ে ও অল্প বয়সে বিয়ের কারণে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়ে থাকে। তবে নারী সব বাধা অতিক্রম করে এগিয়ে চলেছে। আমরা দেখতে পাই কিশোরী মেয়েরাও উদ্যোগী হয়ে বাল্যবিয়ে বন্ধের চেষ্টা চালাচ্ছে। সচেতনতার এটি একটি বড় দিক।

আজকের বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেত্রী, সংসদের স্পিকার এবং গুরুত্বপূর্ণ অনেক মন্ত্রী নারী। নারীরা এখন সচিবসহ আমলাতন্ত্রের উচ্চপর্যায়ে অধিষ্ঠিত রয়েছেন। জেলা প্রশাসক, ইউএনও, পুলিশের ডিআইজি, পুলিশ সুপারসহ বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করছেন। বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, উচ্চ আদালতের বিচারপতির পদও অলঙ্কৃত করছেন উচ্চশিক্ষিত নারী। সামরিক বাহিনী, নেভি ও বিমানবাহিনীতে মেয়েরা যোগ দিচ্ছে। অনেকে নারী জাতিসংঘের শান্তি রক্ষীবাহিনীতে বিভিন্ন দেশে দায়িত্ব পালন করছেন।

খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে শেখ হাসিনার আগ্রহ সম্পর্কে সবাই জানেন। তার সময়ে ফুটবল ক্রিকেটসহ ক্রীড়াঙ্গনে মেয়েরা দেশে ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চমৎকার সাফল্য অর্জন করছে।

দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির মূল যে ৩টি স্তম্ভ-কৃষি, তৈরি পোশাক ও অভিবাসী শ্রমজীবীর রেমিট্যান্স তার মধ্যে কৃষি ক্ষেত্রে নারীর ভূমিকা ব্যাপক, তৈরি পোশাক খাতে শতকরা ৮০ জন কর্মীই নারী। বর্তমানে বিদেশের শ্রমবাজারেও পিছিয়ে থাকছে না নারী। তবে এ ক্ষেত্রে তারা যেন কোনো হয়রানির শিকার না হয় সেদিকে সরকারকে আরও নজর দিতে হবে।

দীর্ঘকালের পুরুষশাসিত এ সমাজে এখনো নানাভাবে মেয়েশিশু ও নারীরা সামাজিক নিগ্রহের শিকার হচ্ছে। নারীর প্রতি সহিংসতা, নারী পাচার এবং নারীর অধিকার লঙ্ঘন এখনো এ সমাজের অভিশাপ হিসেবে টিকে আছে। মূল্যবোধের অভাবে নষ্ট মানুষ নির্যাতনের জায়গাটি ধরে রেখেছে। নানাভাবে শিশু-কিশোরী-তরুণীদের প্রতি তাদের নির্যাতনের মাত্রায় সুস্থ সামাজিক ব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রত্যাশা করে দেশবাসী।

ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের বিদ্রোহী প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার ১৯৩২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণের আগে যে বিকৃতিটি তৈরি করেছিলেন তার শেষ লাইন কয়টি এমন: ‘নারীরা আজ কঠোর সংকল্প নিয়াছে যে, আমার দেশের ভগিনীরা আজ নিজেকে দুর্বল মনে করিবেন না। সশস্ত্র ভারতীয় নারী সহস্র বিপদ ও বাধাকে চূর্ণ করিয়া এই বিদ্রোহ ও সশস্ত্র মুক্তি আন্দোলনে যোগদান করিবেন এবং তাহার জন্য নিজেকে তৈয়ার করিবেন। এই আশা লইয়াই আমি আজ আত্মদানে অগ্রসর হইলাম।’

১৯৪৬ সাল থেকে কৃষকদের ধানে ন্যায্য অধিকার আদায়ের জন্য কৃষক আন্দোলনে সম্পৃক্ত হয়েছিলেন ইলা মিত্র। ১৯৫০ সালের ৭ জানুয়ারি তিনি পাকিস্তান পুলিশের হাতে ধরা পড়েন। পুলিশের হাতে ধর্ষণের শিকার হন। একটা বিবৃতি দিয়ে তিনি তাঁর উপরের নির্যাতনের কথা ছড়িয়ে দেন দেশবাসীর সামনে। বিবৃতির শুরুর লাইন এমন : ‘বিগত ৭-১-৫০ তারিখে আমি রোহনপুরে গ্রেপ্তার হই এবং পরদিন আমাকে নাচোল নিয়ে যাওয়া হয়। যাওয়ার পথে পুলিশ আমাকে মারধর করে এবং তারপর আমাকে একটা সেলের মধ্য নিয়ে যাওয়া হয়। তারা আমার সব কাপড়-চোপড় খুলে নেয় এবং সম্পূর্ণ উলঙ্গভাবে সেলের মধ্যে আমাকে বন্দি করে রাখে।’ জানুয়ারি সবসময় যুক্ত ছিলেন। নারীকে বাদ দিয়ে কোনো বড় অর্জন এ দেশে সম্ভব হয়নি। এভাবে বাংলাদেশের নারীসমাজ দেশের স্বাধীনতার স্বপ্নে, সমাজ পরিবর্তনের সংগ্রামে সবসময় যুক্ত ছিলেন। নারীকে বাদ দিয়ে কোনো বড় অর্জন এ দেশে সম্ভব হয়নি।

আমরা বলি ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ। পুরোটা সময় নারী তার মর্যাদার অবদান রেখেছে ইতিহাসের ক্রান্তিলগ্নের প্রতিটি সময়ে। নারীর পিছুহটার কোনো ইতিহাস এ দেশে নেই।

বায়ান্নোর ভাষা আন্দোলনেও তাঁরা ব্যাপক ভূমিকা রেখেছেন সেদিন, তবে আমরা আশাবাদী বর্তমান প্রধানমন্ত্রী যেভাবে শক্ত হাতে নারীর অগ্রযাত্রা কণ্টকমুক্ত করার ব্রত নিয়েছেন তাতে নিশ্চিতভাবে দেশ সুফল পাবে। উন্নয়নের এই পর্যায়ে আমরা বিশ্বাস করি, সচেতন নারী-পুরুষের সম্মিলিত প্রয়াসে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে আমাদের অগ্রগতি সময়ের ব্যাপার মাত্র।

লেখক: কথাশিল্পী ও সভাপতি, বাংলা একাডেমি।

এই বিভাগের আরো সংবাদ