ডেডলাইন ১০ ডিসেম্বর

  আলাউদ্দিন মল্লিক

২২ নভেম্বর ২০২২, ১৬:০৬ | অনলাইন সংস্করণ

আলাউদ্দিন মল্লিক
পলিটিক্যাল রেটোরিকস

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল পরিষ্কার করে বলেছেন, ‘এসব বাজে কথা নিয়ে আমাকে প্রশ্নে করবেন না। পলিসি মেকিংয়ে আমান সাহেব কেউ না। এটা পলিটিক্যাল রেটোরিকস (রাজনৈতিক কথার কথা)। ’

কিন্তু ১০ ডিসেম্বর নিয়ে আলোচনা থামছেই না। আগামী ১০ ডিসেম্বর থেকে দেশ খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের নেতৃত্বে চলবে বলে বিএনপির কয়েকজন নেতার পক্ষ থেকে বক্তব্য এলেও এই দিনটিকে ঘিরে দলটির কোনো বিশেষ পরিকল্পনা নেই। ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক আমানউল্লাহ আমান প্রথমে কথাটি তুলেছিলেন, দলের প্রচার সম্পাদক শহীদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানী পরে সেটি আবার বলেন, চট্টগ্রামে বিভাগীয় যে সমাবেশে এই বিষয়টি তোলেন দলের ভাইস চেয়ারম্যান মীর মোহাম্মদ নাছিরউদ্দিন।

বিএনপির শীর্ষ নেতারা নিশ্চিত করেছেন, এসব বক্তব্য কথার কথা মাত্র। কোনো নির্দিষ্ট দিনকে ঘিরে তাদের কোনো পরিকল্পনা নেই। নিকট অতীতে  দশম সংসদ নির্বাচন ঠেকাতে ২০১৩ থেকে ২০১৪ সালের ১২ জানুয়ারি পর্যন্ত সহিংস আন্দোলনের এবং ২০১৮ এর নির্বাচন আছি না আছির খেলতে তাদের খালি হাতে ঘরে ফিরতে হয়েছে। এমনকি গত চারটি বৎসর প্রতিবার ডিসেম্বরে কিছু একটা হবে বলে গুজব নানাভাবে ডানা মেলেছে। কিন্তু বাস্তবে কিছু হয়নি। এবার গুজব ব্যাপক; কারণ অর্থনৈতিক মন্দার সম্ভাবনা। দেশের একটা অংশ ব্যাপক আশাবাদী এই ইস্যুতে।  তাদের মাথায় এই চিন্তাটা একেবারেই নেই যে, যদি বাস্তবে মন্দা ঘটে নিম্ন আয়ের মানুষগুলোর কি হবে? তারা সরকার প্রধান আর ক্ষমতাসীন দলটির অপসারণে এতই মশগুল যে বৃহত্তর জনগণের অবস্থা নিয়ে মোটেই ভাবিত নয়। 

বিএনপির অভিলাষ
বিএনপি আগামী ১০ ডিসেম্বর টার্গেট করে সরকার পতনের আন্দোলন শুরু করেছে। ঢাকার মিরপুরে এক সমাবেশে বিএনপির নেতারা বলেছেন, ১০ ডিসেম্বর থেকে বাংলাদেশে সরকারের কো নির্দেশ মানা হবে না। দেশ চলবে বেগম খালেদা জিয়া এবং তারেক জিয়ার নির্দেশে। বিএনপি নেতাদের এই বক্তব্যের পর রাজনৈতিক অঙ্গনে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।  বিএনপির একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে যে, তারা একাধিক কর্মসূচির মাধ্যমে ১০ ডিসেম্বরের মধ্যে আন্দোলনকে একটি চূড়ান্ত পরিণতির দিকে নিয়ে যেতে চান। তাদের যে পরিকল্পনা তার মধ্যে রয়েছে-

১. ঢাকায় অবস্থান কর্মসূচি: ঢাকার প্রধান প্রধান সড়কগুলোতে কয়েক লাখ লোক জড়ো করে ঢাকা দখলই হলো বিএনপির প্রথম এবং প্রাথমিক লক্ষ্য। এই লক্ষ্যেই বিএনপি এখন সমস্ত আন্দোলন কর্মসূচি ঢাকাকে ঘিরেই পালন করছে। বিএনপির নেতারা মনে করছেন, যদি ঢাকা দখল করতে পারে তাহলে তারা সরকারের পতন ঘটাতে পারবে। এ লক্ষ্যেই ধাপে ধাপে কর্মসূচিগুলোকে ১০ ডিসেম্বর চূড়ান্ত পরিণতির দিকে নিয়ে যেতে চায় বিএনপি।  ১০ ডিসেম্বরের ঢাকা অবরোধ বা ঢাকা অবস্থান কর্মসূচির মাধ্যমে তারা সবকিছু অচল করে দিতে চায়।

২. সংসদ থেকে পদত্যাগ: সংসদে বিএনপির মাত্র ৬ জন সংসদ সদস্য রয়েছে। নীতিগতভাবে বিএনপি সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, তারা সংসদ থেকে পদত্যাগ করবে। তবে কখন, কিভাবে পদত্যাগ করবে সে ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত এখন পর্যন্ত নেয়নি।  এই ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে লন্ডনে পলাতক বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক জিয়া।  বিএনপি মনে করছে যে, সংসদ থেকে পদত্যাগ সরকারের ওপর একটি চাপ সৃষ্টির কৌশল হতে পারে।

৩. আন্তর্জাতিক চাপ: ১০ ডিসেম্বরের আগে সরকারের ওপর ব্যাপক আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করতে চায় বিএনপি। বিএনপি নেতারা মনে করছেন যে, আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করলে সরকার একটি দুর্বল অবস্থায় পড়বে এবং এই দুর্বলতার কারণেই হয়তো শেষ পর্যন্ত সরকার পদত্যাগে বাধ্য হবে। বিএনপি আশা করছে যে, ১০ ডিসেম্বরের মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান মানবাধিকার, গুম ইত্যাদি ইস্যুতে বড় ধরনের চাপ প্রয়োগ করবে এবং এই চাপ গুলো যদি শেষ পর্যন্ত অব্যাহত থাকে তাহলে সরকারের জন্য টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে।

৪. অর্থনৈতিক মন্দা অবস্থার সুযোগ: বর্তমানে দেশের অনেক ব্যাঙ্ক আমদানি এলসি খুলছে না।  এটি একটি অর্থনৈতিক মন্দার ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে বিএনপি নেতারা মনে করছেন।  এতে সরকার দুর্বল অবস্থানে আছে বলে তাদের ধারণা। যদি শ্রীলংকার মতো কিছু ঘটে যায় সেজন্য তারা আগেই আন্দোলনের ডাক দিয়েছেন। 

৫. বিশ্ব কৈশলগত অবস্থার পরিবর্তন: ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ব ভূ-রাজনৈতিক অবস্থার কৈশলগত পরিবর্তন ঘটিয়েছে।  তাই, বাংলাদেশ এখন আর দুই নৌকায় পা দিয়ে থাকতে পারবে না। অতীতে বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকার পাশ্চাত্যকে বিশেষতঃ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে এতটাই ক্ষেপিয়ে দিয়েছে যে তাদের সাথে আর গাঁটছড়া বাঁধা অসম্ভব বলে বিএনপি নেতারা মনে করছেন।  তাই তারা এখন পাশ্চাত্য হতে  বাড়তি সুবিধা পাবেন বলে মনে করেন। 

৬. ভারতের অবস্থান পরিবর্তন: সর্বশেষ ভারত সফর বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর জন্য কোনো ভালো খবর বয়ে আনেনি।  বরং চীন প্রশ্নে ভারত ব্যাপক উষ্মা প্রদর্শন করেছে।  তাই বিএনপি নেতারা মনে করছেন ক্ষমতাসীনরা আর পূর্বের মতো ভারতীয় সমর্থন পাবেন না।  এটি তাদের ক্ষমতা প্রাপ্তিতে সহায়ক হবে।   

৭. ব্যাপক গণসমর্থন: নিকট অতীতে তাদের কর্মসূচিগুলোতে ব্যাপক জন-সমাবেশ বিএনপি নেতাদের মনে নতুন আশার সৃষ্টি করছে। 

রাজনীতির ডেডলাইন সংস্কৃতি 
২০০৪ সালে বিএনপিবিরোধী দলে থাকার সময় আওয়ামী লীগের নেতাদের পক্ষ থেকে ৩০ এপ্রিলের যে ডেডলাইন এসেছিল, এটি দিয়েছিলেন তৎকালীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পদক এম.এ. জলিল। এটি রাজনীতিতে ট্রাম্প কার্ড হিসেবেও পরিচিত। বিশিষ্ট এনজিও ব্যক্তিত্ব ও প্রশিকার প্রতিষ্ঠাতা কাজী ফারুকের সহায়তা নিয়ে জলিল একটি ব্যাপক সমাবেশ করে রাজধানী অচল করে দিতে চেয়েছিলেন।  কিন্তু রাজনীতি আর সমাজসেবা এক জিনিস নয়।  তাই তার প্রচেষ্টা ফেল করে। 

বর্তমানে বিএনপি প্রায় একই পথে হাঁটছেন।  তারা মনে করছেন বিশ্ব পরিস্থিতি বর্তমান সরকারের প্রতিকূলে; এর সাথে যুক্ত হয়েছে রিজার্ভ সংকট যা একটি স্বল্প মেয়াদে হলে অর্থনৈতিক মন্দার সৃষ্টি করবে। এর মধ্যে ব্যাপক জনসমাবেশ করতে পারলে সরকার পতন সময়ের ব্যাপার।  কিন্তু তারা ভুলে গেছেন মার্কিন যুক্তরাষ্টের দরকার বাংলাদেশের সমর্থন - কোনো নির্দিষ্ট দলের নয়।  এই সমর্থন দরকার চীনের বিরুদ্ধে আর মায়ানমারে প্রক্সি যুদ্ধ পরিচালনার জন্য।  যদি বর্তমান ক্ষমতাসীনরা এতে রাজি হয় তাহলে তাদের কোনো সমস্যা নেই।  আর বিশ্ব রাজনীতিতে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।  তাই আইএমএফ একপ্রকার সম্মতি দিয়ে গেল।  মার্কিন বংশদবদ দক্ষিণ কোরিয়াও আর্থিক সহায়তার কথা দিয়েছে।  অবশ্য এ সবই হবে বাংলাদেশ যদি চীনা বিরোধী জোটে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে অংশ নেয়। 

কি ঘটে পারে 
বিভিন্ন আলামত বিচার করলে মনে হয়, ১০ ডিসেম্বর ২০২২ হবে একটি ব্যর্থ ডেডলাইন।  এখানে রাজনীতির মোড় পরিবর্তনকারী কোনো কিছু ঘটবে না। হয়ত কিছু মানুষের সমাগম হবে।  দিনশেষে অনেক মানুষ হতাশ হবে - যারা আশায় বুক বেঁধেছিল - এবার কিছু ঘটবে। দেশের অর্থনীতি এমন কোনো পর্যায়ে যায়নি যে শ্রীলংকার মতো কোনো ঘটনা ঘটে যাবে। যারা ষড়যন্ত্র তত্ত্বে ব্যাপক আস্থা রেখে বলেন দেশি-বিদেশী অংশগ্রহণে কিছু ঘটবে তারা বোকার স্বর্গে বাস করছেন।  

তবে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী বেশি বাড়াবাড়ি করে তবে হয়ত আরো কিছু মানুষ জেলে যাবে।  হয়ত অতিরিক্ত উৎসাহী ক্ষমতাসীনদের কারণে কিছু তাজা প্রাণ রাস্তায় লুটিয়ে যেতে পারে।  কিন্তু এতে কোনো গণ-অভ্যুত্থান হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

সিভিল বুরোক্রেসি আর মিলিটারি অংশগ্রহণে বিদেশী শক্তির সহযোগিতায় যে পরিবর্তন তার সম্ভাবনা নিয়ে যারা ভাবছেন - তাদের বলার এটুকুই যে ঘটনাটি প্রায় অসম্ভব আমাদের সংবিধান অনুযায়ী।  আর যদি ঘটেও তাহলে কোনো রাজনৈতিক দলের লাভ নেই।  তাঁরা আসবেন ভিন্ন এজেন্ডা বাস্তবায়নে যার সময়সীমা ন্যূনতম তিন হয়ে পাঁচ বৎসর।  ২০০৭-২০০৮ এর মঈনুদ্দিন গংদের শাসন যারা দেখেছেন তারা মানবেন যে এরা বিদ্যমান কোনো রাজনৈতিক দলের জন্য কিছু করেনি - বরং নিজেদের শাসন আর কর্তৃত্বকে দীর্ঘায়িত করার চেষ্টা করেছেন।  আর শেষে না পেরে বিদ্যমান রাজনৈতিক শক্তির হাতেই ক্ষমতা ছেড়েছেন।  এতে মানুষ প্রথমে আশাবাদী হলেও শেষ বিচারে বৃহত্তর জনগণের উপকার একেবারেই হয়নি। 
 
আলাউদ্দিন মল্লিক : প্রধান সমন্বয়কারী, আমরা ৯৯ শতাংশ (Uphold 99)

এই বিভাগের আরো সংবাদ