লুটপাট নয়, রাজনীতি হোক মানুষের কল্যানে

  আলাউদ্দিন মল্লিক

৩১ জুলাই ২০২২, ১১:০২ | অনলাইন সংস্করণ

আলাউদ্দিন মল্লিক
রাজনীতিবিদ
অনেকে রাজনীতিকে পেশা মনে করেন৷ কিন্তু রাজনীতি মোটেই পেশা নয়৷ রাজনীতি বৃহত্তর পরিসরে মহত্তর কাজ৷ রাজনীতি হলো, ব্যক্তিস্বার্থ ভুলে বৃহত্তর জনগোষ্ঠী, দেশ, তথা বিশ্বের কল্যাণের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করা৷ রাজনীতিবিদদের থাকার কথা মানুষ হিসেবে উৎকর্ষের শীর্ষে৷ কারণ, তারাই দেশের ভাগ্যনিয়ন্তা, তারাই নীতিনির্ধারণ করবেন, জনগণ ভোট দিয়ে রাজনীতিবিদদের তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করবেন৷ সাধারণ মানুষের নৈতিক স্খলনও অপরাধ৷ তবে রাজনীতিবিদদের স্খলন বড় অপরাধ৷ কারণ, তারা মানুষের নেতা, সাধারণ মানুষ তাদের অনুসরণ করবে৷ যেমন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য বা ইউরোপের বিভিন্ন দেশে সাধারণ মানুষের যৌন হয়রানি আর রাজনীতিবিদদের যৌন হয়রানিকে আলাদা দৃষ্টিতে দেখা হয়৷ রাজনীতিবিদদের হতে হবে নিষ্কলুষ চরিত্রের অধিকারী৷ অনেক ক্ষেত্রে ‘ছোট অভিযোগে’ অনেক বড় নেতার ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যায়৷ কিন্তু বাংলাদেশে আর সবকিছুর মতো রাজনীতিবিদদের নীতি-নৈতিকতারও অবনমন ঘটছে৷

ব্যবসার রাজনীতি 
রাজনীতিতে ভিড়লে নানা ধরনের অন্যায় সুযোগ-সুবিধা হাসিলের সত্যতা এখন ওপেন সিক্রেট। কোনো গোপন ব্যাপার নয়। লজ্জার নয়, বরং গৌরবের। তা সব দলেই। তা ক্ষমতার স্বাদ পাওয়া দলগুলোতে বেশি। কেবল রাজনীতিকে দুষলে কিছুটা একতরফা হয়ে যায়। দুর্বৃত্তায়ন চলছে জাতীয় জীবনের প্রতিটি অঙ্গনে। বর্তমান সময়  যে যত বড় মাপের দুর্বৃত্ত, সে তত বড় ক্ষমতাবান। সমাজে সে তত উঁচু আসনে অধিষ্ঠিত, তত বেশি সালামপ্রাপ্ত। তারা স্তাবক, পারিষদ, অস্ত্রধারী, বন্দুকধারী, লাঠিয়াল বাহিনী দ্বারা পরিবৃত্ত। দেশের নদী, নদীতে পড়া চর, নদীর বালুতট, তার তলদেশ, পাহাড়, বন, শ্মশানঘাট, কবরস্থান-সবদিকেই তাদের নজর। সর্বস্ব খেয়ে ফেলার চন্ডালতা। কোথায় তাদের ক্ষমতা ও অর্থের উৎস- কারো অজানা নয়। বৈদেশিক ব্যাংকে এই হতদরিদ্র বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া বিশাল বিশাল অঙ্কের টাকা দিনে দিনে গচ্ছিত হয়েছে।

রাজনীতির ব্যবসা 
রাজনীতি এখন দেশের বড় ব্যবসা। রাজনীতিবিদ ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ীরা একাকার হয়ে কলুষিত সম্পর্ক গড়ে তুলছে। এসব ব্যবসায়ী সামগ্রিকভাবে সরকারের সঙ্গে দরকষাকষি করে ব্যবসার পরিবেশ তৈরিতে ভূমিকা রাখছে না। তারা শুধু ব্যক্তিগত যেমন- ব্যাংকের মালিকানা, কর অবকাশ, বড় ঋণসহ নানা সুবিধা নিচ্ছেন। এ সুবিধা সুরক্ষায় রাষ্ট্রক্ষমতা ব্যবহারের জন্য রাজনীতিতে আসার প্রবণতা বাড়ছে। 

লোভনীয় রাজনীতি
রাজনীতির মানুষ ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট - যুবলীগের যুগ্ম সম্পাদক হিসেবে তার ব্যাপক কাজের প্রশংসা ক্ষমতাসীন দলে। যেকোন সমাবেশে লোকজন যোগানে তার জুড়ি ছিলনা - এভাবেই তিনি হয়ে উঠেছিলেন অপরিহার্য।  অন্যদিকে রাজধানীর ক্লাবগুলোতে যাতায়াতকারীদের কাছে তিনি ক্যাসিনো সম্রাট হিসেবে পরিচিত। যুবলীগের রাজনীতি করলেও তার নেশা ও পেশা জুয়া খেলা। জুয়ার ব্যবসা করে কামিয়েছেন কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা। তিনি মাসে অন্তত একবার সিঙ্গাপুরে যেতেন, জুয়া খেলতে, ১০ দিন থাকতেন। তার জুয়ার আসর থেকে কেউ-ই জিতে আসতে পারেন না। মতিঝিল, আরামবাগ, ফকিরাপুল, পল্টন এলাকাসহ অন্তত ১০টি ক্লাবে অবৈধ ক্যাসিনো ব্যবসায় তার সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। সম্রাটের রাজনৈতিক জীবন শুরু ১৯৯০ সালে। সেই সময়কার ছাত্রলীগের নেতা ছিলেন ইসমাইল হোসেন চৌধুরী ওরফে সম্রাট। তখন সারাদেশে এরশাদবিরোধী আন্দোলন চলছিল। সম্রাট রমনা অঞ্চলে আন্দোলনের সংগঠকের দায়িত্বে ছিলেন। এ কারণে তখন নির্যাতনসহ জেলও খাটতে হয় তাকে। এর পর থেকেই ‘সম্রাট’ খ্যাতি পান সাহসী সম্রাট হিসেবে। যুবলীগের বর্তমান কাউন্সিলের আগেরটাতে তিনি যুবলীগ ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি নির্বাচিত হন। যুবলীগের বহিষ্কৃত নেতা ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটের বিরুদ্ধে দুই কোটি ৯৪ লাখ ৮০ হাজার ৮৭ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়। এ ঘটনায় ২০১৯ সালের ১২ নভেম্বর দুদক  কর্তৃক দায়েরকৃত মামলা রয়েছে। সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় প্রায় ২২৩ কোটি টাকা পাচার এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে যুবলীগের বহিষ্কৃত নেতা ইসমাইল চৌধুরী সম্রাটের বিরুদ্ধে চার্জশিট অনুমোদন দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তার আসল সম্পদ হাজার কোটি ছাড়িয়ে যাবে বলে অনেকের ধারণা। 
খন্দকার মোহতেশাম হোসেনের বাবর - প্রাক্তন মন্ত্রী এবং ফরিদপুর-৩ (সদর) আসনের এমপি ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেনের ছোট ভাই ।  ২০০৭ সালে মুরগির ব্যবসা করতেন। এরপর ২০০৮ সালে তার বড় ভাই ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন ফরিদপুর-৩ (সদর) আসনে আওয়ামী লীগের এমপি নির্বাচিত হন। পরে হন মন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রীর বেয়াই হিসেবে খন্দকার মোশাররফ হোসেন স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী হতে শুরু করলে তার ভাই খন্দকার মোহতেশাম হোসেনের বিস্ময়কর উত্থান ঘটে। কয়েক বছরের মধ্যেই মুরগি ব্যবসায়ী থেকে বনে যান হাজার কোটি টাকার মালিকে। 

বাংলাদেশের ফোর্বসের বিলিয়নিয়ারের তালিকার প্রথম ১০ ধনী :
১. মুসা বিন শমসেরঃ তিনি প্রিন্স মুসা নামে পরিচিত। তাকে বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানি বাণিজ্যের অগ্রদূত বলা হয়। তিনি ড্যাটকো গ্রুপের এর মালিক। তিনি প্রায় ৯৫০ মিলিয়ন ডলারের মালিক ।
২. সালমান এফ রহমানঃ বেক্সিমকো গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা মালিক। তিনি প্রায় ৬০০ মিলিয়ন ডলারের মালিক ।
৩. আহমেদ আকবর সোবহানঃ তিনি হচ্ছেন বসুন্ধরা গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা মালিক। তিনি প্রায় ৬০০ মিলিয়ন ডলারের মালিক ।
৪. এম এ হাশেমঃ তিনি পারটেক্স গ্রুপ ও ইউসিবিএল ব্যাংকের চেয়ারম্যান । তিনি প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলারের মালিক ।
৫. আজম জে চৌধুরীঃ তিনি ইস্ট-কোস্ট গ্রুপের মালিক, প্রাইম ব্যাংকের চেয়ারম্যান এবং মবিল যমুনা লুব্রিক্যান্টের সোল এজেন্ট । তিনি প্রায় ৪১০ মিলিয়ন ডলারের মালিক ।
৬. গিয়াস উদ্দিন আল মামুনঃ তিনি তারেক জিয়ার বন্ধু। তিনি রিয়েল স্টেট, হোটেল ও মিডিয়া ব্যবসায়ী।
৭. রাগিব আলীঃ তিনি চা উৎপাদন ব্যাবসায় সফল একজন ব্যাবসায়ী।তিনি সাউথ ইস্ট ব্যাংকের চেয়ারম্যান। তিনি প্রায় ৩০০ মিলিয়ন ডলারের মালিক ।
৮. শামসুদ্দিন খানঃ তিনি একে খান এন্ড কোম্পানি লিঃ-এর চেয়ারম্যান এবং ডিরেক্টর । তিনিও প্রায় ৩০০ মিলিয়ন ডলারের মালিক ।
৯.  ইকবাল আহমেদঃ তিনি সিলেটের একজন ব্যাবসায়ী। সামুদ্রিক খাবার ব্যবসায় তিনি সফল। তিনি সীমার্ক গ্রুপ লিবকো ব্রাদার লিঃ-এর চেয়ারম্যান এবং ডিরেক্টর । তিনি প্রায় ২৫০-২৯০ মিলিয়ন ডলারের মালিক ।
১০. সাইফুল ইসলাম কামালঃ তিনি নাভানা লিঃ ও নাভানা সিএনজি লিঃ-এর চেয়ারম্যান এবং ডিরেক্টর । তিনিও প্রায় ২৯০ মিলিয়ন ডলারের মালিক ।
এই তালিকার ৬ নম্বর ব্যক্তি প্রায় শুন্য থেকে মাত্র ৫ বৎসরে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে ব্যবহার করে প্রায় ২৫ মিলিয়ন ডলারের মালিক।  প্রথম, সপ্তম, অষ্টম, নবম আর দশম ব্যক্তি ছাড়া বাকি চারজনই তাদের সম্পদ অর্জনে ব্যাপকভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করেছেন। 
আর নেটের দুনিয়ায় ঘুরে বেড়াচ্ছে আরেকটি তালিকা (সূত্র: https://www.bdexpressmedia.com/):
১. মুসা বিন শমসের: প্রিন্স মুসার মোট সম্পত্তির পরিমাণ ১২বিলিয়ন ইউ এস ডলার যা বাংলা টাকায় হয় প্রায় ০১লক্ষ কোটি টাকা।
২. সালমান এফ রহমান: র মোট সম্পত্তির পরিমাণ ২ বিলিয়ন ইউএয ডলার যা বাংলাদেশী টাকায় হয় প্রায় ১৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা প্রায়। 
৩. তারেক রহমান: তারেক রহমানের মোট সম্পত্তির পরিমাণ ১.৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা  ১৪৪৫০ কোটি টাকা । 
৪. সজীব ওয়াজেদ জয়:  তার মোট সম্পত্তির পরিমাণ ১.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। যা বাংলাদেশী টাকায় হয় প্রায়  ১২৭৫০ কোটি টাকার মতো।
৫.সৈয়দ আবুল হোসেন: বর্তমানে তার মোট সম্পদের পরিমাণ রয়েছে প্রায় ০১ বিলিয়ন ইউএস ডলার- যা বাংলাদেশী টাকায় হয় ৮৫০০ কোটি টাকা প্রায়। 
৬. আহমেদ আকবর সোবহান: তার মোট সম্পত্তির পরিমাণ ৫০০ মিলিয়ন ইউএস ডলার। যা বাংলাদেশী টাকায় হয় প্রায় ৪২৫২ কোটি টাকা।
৭. গিয়াসউদ্দিন আল মামুন: তার মোট সম্পত্তির পরিমাণ  ৪২০ মিলিয়ন ইউএস ডলারের মত যা বাংলাদেশী টাকায় হয় প্রায় ৩ হাজার ৫৭০ কোটি টাকা। 
৮. মহীউদ্দীন খান আলমগীর: বর্তমানে তার মোট সম্পত্তির পরিমান প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ইউএস ডলারের মতো । বাংলাদেশের টাকায় হয় প্রায় ৩হাজার ৪০০ কোটি টাকার মতো।
৯. ইকবাল আহমেদ: বর্তমানে ইকবাল আহমেদ এর সম্পত্তির পরিমাণ প্রায় ২৯০ মিলিয়ন ইউএস ডলার। যা বাংলাদেশি টাকায় হয় প্রায় ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকার কাছাকাছি। 
১০. রাগীব আলী : মোট সম্পত্তির পরিমাণ প্রায় ২৭০ মিলিয়ন ইউএস ডলার যা বাংলাদেশী টাকায় হয় ২ হাজার ৩০০। 

এই তালিকায় তৃতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম, সপ্তম আর অষ্টম এই পাঁচজনই রাজনীতি করে তাদের এই আর্থিক সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন। আর দ্বিতীয় এবং ষষ্ঠ জন ও ব্যবসায়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করেছেন।

ট্রেন্ড রাজনীতি 
মার্কিন রাষ্ট্রপতিদের সফলতা আর ব্যর্থতার নানা জরিপ বিবেচনায় নিয়ে মার্কিন সেনাবাহিনীর এক সাবেক কর্নেল উইলিয়াম জি ক্যাম্পবেল একটি লেখা লিখেছেন। তাঁর সিদ্ধান্ত হচ্ছে, ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় ব্যবসায়ী পেশা থেকে যাঁরা এসেছেন, প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাঁরা খুব খারাপ করেছেন। আমাদের মনে আছে, থাইল্যান্ডের সফল ব্যবসায়ী থাকসিন সিনাওয়াত্রা দেশটির প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। কিন্তু রাজনীতিতে সফল হতে পারলেন না। কিন্তু এর উল্টোটা বাংলাদেশের জন্য আজ সত্য - রাজনীতিবিদরা ব্যবসায়ী হিসেবে অন্তত আর্থিক শক্তিতে সামর্থবান হয়ে উঠেছেন। ক্ষমতাসীন দলের এমন কোন এম.পি. পাওয়া যাবেনা যার অনন্ত শত কোটির সম্পদ নেই।  কারো কারো হাজার কোটি।

রাজনীতির ট্রেন্ড 
আজকে এমনকি সবচেয়ে কম জানা মানুষটিকে যদি প্রশ্ন করা যায় আপনার এলাকার বর্তমান এম.পি. মারা গেলে কে এম.পি. হবে? সবারই একটাই উত্তর-বর্তমান এম.পি.র সন্তান না হয় স্ত্রী।  এটি জাতীয় পর্যায়েও তাই।  প্রায় প্রতিটি দল তার উত্তরাধিকার হিসেবে হয় বর্তমান নেতার সন্তান নয়ত স্ত্রীকে ঠিক করে রাখছে।  পরিবারতন্ত্রের ভিতরে এখন বাংলাদেশের রাজনিতি।  আর এটিই আমাদের দেশের রাজনীতির ট্রেন্ড।  আরেকটি ট্রেন্ড হল রাজনীতিকে অর্থ বানানোর মাধ্যমে পরিণত করা।   এখানে রাজনীতির মূল কাজটি অর্থাৎ মানুষকে সেবা করার মাধ্যমে তার জীবন-জীবিকার উন্নয়ন একেবারেই উপেক্ষিত। ফলে রাজনীতি হয়ে উঠেছে গণমানুষ বিরোধী।  আর তাই মানুষ এতে একেবারেই সম্পৃক্ত হচ্ছে না।

সমাধানের খোঁজে 
তাই রাজনীতির এই যে গণমানুষকে সর্বোচ্চ  উপেক্ষার স্তরে পৌঁছেছে তা হতে উত্তরণ আবশ্যক। মুষ্টিমেয় একটি ছোট গোষ্ঠীর হাত হতে রাজনীতিকে তার সত্যিকার বৃহত্তর পরিবেশে নিয়ে ফেলতে হবে। পরিবারতন্ত্র আর  মুষ্টিমেয় কিছু লোভী মানুষের হাত হতে একে মুক্ত করতে হবে।  তার জন্য কোনো সংক্ষিপ্ত সহজ পথ নেই।  এর জন্য দরকার পড়বে একটি দীর্ঘ ধারাবাহিক প্রক্রিয়া।  শুনতে দুঃখজনক হলেও এই কাজটি রাজনীতিবিদেরকেই করতে হবে।   

ঠক বাছতে গাঁ উজাড় 
জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া: ২০১৪ খ্রিস্টাব্দ হতে  আ.ব.ম. মোস্তফা আমিনের নেতৃত্বে  (মোস্তফা আমিনের ভাষায় অলংকারিক আহ্বায়ক ডক্টর কামাল হোসেন) শুরু চটকদার আর গালভরা "মুক্তিযুদ্ধর চেতনা ভিত্তিক অসাম্প্রদায়িক, কার্যকর গণতান্ত্রিক, শান্তির বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার" নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে নানা কর্মসূচির মাধ্যমে দেশের রাজনীতিতে একটি শুভ পরিবর্তনের জোয়ার তৈরীর প্রচেষ্টা চলে।  

জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নাটক:  জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া ব্যানারে ২০১৮ এর মধ্যে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নানা কর্মসূচি আর আলাপ আলোচনার মাধ্যমে ১৫ ই সেপ্টেম্বর প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি ডাক্তার বদরুদ্দোজা চৌধুরী নেতৃত্বাধীন  যুক্তফ্রন্ট [বিকল্পধারা বাংলাদেশ, বাংলাদেশ ন্যাপ (গণি), ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এনডিপি), বাংলাদেশ লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (বিএলডিপি), লেবার পার্টির একাংশ -এ পাঁচটি দল নিয়ে গঠিত একটি জোট] আর সাথে জাসদের আ স ম আব্দুর রব, নাগরিক ঐক্যের মাহামুদুর রহমান মান্না, গণস্বাস্থ্যের ডাক্তার জাফর উল্লাহ চৌধুরী আর ডাকসুর প্রাক্তন সহ-সভাপতি সুলতান মোহাম্মদ মনসুর কে সংযুক্ত করে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠিত হয়। চিরাচরিত বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী ডক্টর কামাল হোসেন এর আহবায়ক থাকেন। তখন পর্যন্ত ডক্টর কামাল হোসেনের মূল ভাবনাটা এর সাথের কেউ অনুধাবন করতে পারেনি। তার প্রমান প্রথম পাওয়া যায় ৩ ই অক্টোবর - এদিন  গণফোরাম নেতা ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে বিএনপি এবং কয়েকটি ছোট দল জাতীয় ঐক্য ফ্রন্ট নামে নতুন একটি জোট গঠনের কথা ঘোষণা করা হয়।  আর এর মাধ্যমে পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়াটি চলে যায়  বিএনপি তথা হাওয়া ভবন খ্যাত এবং বাংলাদেশের রাজনীতিতে যুবরাজ বলে কুখ্যাত তারেক রহমানের হাতে।  সুদূর লন্ডনে বসে সীমিত কয়েকজন চাটুকার পরিবেষ্টিত হয়ে একটি বড় সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দামি হোটেল কিংস্টন লজ-এর  লবিতে বসে বাংলাদেশের রাজনীতির একজন অন্যতম নিয়ামক হিসেবে ভূমিকা পালন করছেন।  তাই ২০১৮ সালের নির্বাচীনটি পুরোপুরি তার একার নিয়ন্ত্রনে আসামাত্র নিত্য-নতুন চমক আসতে থাকে। মানিকগঞ্জে দীর্ঘদিনের এম.পি. এবং দলের মহাসচিবের দায়িত্ব পালনকারী প্রয়াত খন্দকার দেলোয়ার পরিবার বাদ দিয়ে অখ্যাত ইঞ্জিনিয়ার জিন্নাহকে মনোনয়ন দেয়া হয়। দুর্নীতির বরপুত্রের বিরুদ্ধে মনোনয়ন বাণিজ্যের অভিযোগ উঠে। ডক্টর কামাল হোসেন সহ জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মূল কিছু নেতা  (এরা নির্বাচনে মনোনয়ন পেয়েছিলেন) বাদ দিয়ে বাকি সবাই মূল্যহীন হয়ে যায়। ক্ষমতায় গেলে নিজেদের মন্ত্রিত্ব পাওয়ার সম্ভাবনার কারণে  জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মূল নেতারা কোন ধরণের প্রতিবাদ বা কথা তুলেননি।  শুধুমাত্র  আ.ব.ম. মোস্তফা আমিন এই নির্বাচনী প্রক্রিয়া থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন। ফলে, পুরো নির্বাচনী বিষয়টি একমাত্র যুবরাজের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। চলে মনোনয়ন বাণিজ্য যা জোটের ভিতর চূড়ান্ত ব্যবধান তৈরী করে। ফলশ্রুতিতে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট একটি নিষ্ফল নাটকে পরিণত হয়। 

অবশেষে নির্বাচন: ২০১৮ খ্রিস্টাব্দের ৩০ ডিসেম্বর সংসদ নির্বাচনে ২০০৮ এর পর প্রথমবারের মতো এই নির্বাচনে সব রাজনৈতিক দল অংশ নিয়েছিল। তবে দলীয় সরকারের অধীনে নিয়ন্ত্রিত এবং একচেটিয়াভাবে নির্বাচন করার অভিযোগ ওঠে। এই নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন এবং অভিযোগের পাল্লা অনেক ভারী হয়। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকে রাতেই বিভিন্ন কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবং তাদের জোটের প্রার্থীর সমর্থকেরা ব্যালট পেপারে সিল মেরে রাখার অভিযোগ করা হয়। আর ক্ষমতাসীনরা বিরোধীদের মাত্র ৭ টি আসন দিয়ে নিজেদের নির্বাচিত করতে সক্ষম হয়।  এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ তো দূরের - কার্যকরী কোন প্রতিবাদ পর্যন্ত হয়নি।

এবার এই পুরো প্রক্রিয়াটির কুশীলবদের সম্পর্কে জনগণের সাধারণ মূল্যায়ন কেমন তার একটা ধারণা নেয়া যাক:
ডক্টর কামাল হোসেন: কামাল হোসেন (জন্ম: ২০ এপ্রিল ১৯৩৭, বরিশালের শায়েস্তাবাদে) বাংলাদেশের একজন বিশিষ্ট আইনজীবী এবং রাজনীতিবিদ।তিনি বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নে আইনমন্ত্রী হিসেবে নেতৃত্ব দেন।  বাংলাদেশের রাজনীতিতে তিনি গণতন্ত্র, নাগরিক, মুক্ত মত আর মানবাধিকার নিয়ে সর্বদাই সোচ্চার। তাকে ব্যক্তিগত সততা, ন্যায্যতা, মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের প্রবক্তা হিসাবে সাধারণভাবে সম্মান করা হয়। রাজনৈতিক জীবনে একবার মাত্র ১৯৭৩ সালের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে তৎকালীন ঢাকা-১৪ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এছাড়া আর কোন নির্বাচনে তার জয়ের ইতিহাস নেই।  তিনি মোটামুটি একজন জনবিচ্ছিন্ন প্রভাবশালী সুশীল ব্যক্তিত্ব হিসেবে দেশে বিবেচিত।  কিন্তু আন্তর্জাতিক মহলে অধিক গ্রহণযোগ্য হওয়ার কারণে জাতীয় রাজনীতির উচ্চ মহলে তাঁর সমাদর রয়েছে। 

ডাক্তার বদরুদ্দোজা চৌধুরী: অধ্যাপক একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী বা বি.চৌধুরী (জন্ম ১ নভেম্বর ১৯৩২) একজন বাংলাদেশী রাজনীতিবিদ। জিয়াউর রহমানের শাসনামলে তিনি উপ-প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। ২০০১ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ক্ষমতায় আসার পর তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হন। এর কিছুদিন পর ২০০১ সালের নভেম্বর মাসে তিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি একজন স্বনামধন্য চিকিৎসক। এছাড়া তিনি একজন লেখক, প্রাবন্ধিক, নাট্যকার, উপস্থাপক এবং সুবক্তা। ২০০২ সালে সৃষ্ট এক বিতর্কিত ঘটনার জের ধরে তিনি রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন ও পরবর্তীকালে আরেকটি রাজনৈতিক দল বিকল্প ধারা বাংলাদেশ গঠন করেন। পরবর্তীতে ২০০৮, ২০১৪ আর ২০১৮ এর জাতীয়  নির্বাচনে তাঁর ভানুমতির খেল (২০০৮ সালে মহাজোটে যোগ, ২০১৪ এবং ২০১৮ তে বিরোধীদের সাথে কথা চালিয়ে শেষ পর্যন্ত ক্ষমতাসীনদের সাথে নির্বাচন) তাঁর দল লাভবান তিনি চাণক্যের নীতি প্রয়োগ করে চলেছেন বলে বেশির ভাগ রাজনীতিবিদদের কাছে বিতর্কিত।
আ স ম আব্দুর রব: জন্ম-  ১জানুয়ারি, ১৯৪৫, নোয়াখালী জেলা।  আ.স.ম আব্দুর রব বাংলাদশের জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি) এর নেতা। তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম সংগঠক। তৎকালীন ডাকসুর ভিপি, আ স ম আবদুর রব এর নেতৃত্বে ১৯৭১ সালের ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হাজার হাজার ছাত্র জনতার মাঝে প্রথম স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন। ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ তিনি পল্টন ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে "জাতির জনক" উপাধি প্রদান করেন। ১৯৭২ সালে ৩১ অক্টোবর জাসদ গঠিত হলে তিনি ৭ সদস্যের কমিটির যুগ্ন সম্পাদক নির্বাচিত হন।  জাসদের রাজনীতির একজন অপরিহার্য নেতা হিসেবে ১৯৭৫ সালের ৭ ই নভেম্বরের অভ্যুত্থানে সক্রিয় অংশ নেন।  এর পরিণতিতে ১৯৭৬ সালের জুলাই মাসে জাসদের ১৭ জন নেতাকে দেশদ্রোহিতার অভিযোগে সামরিক আদালতে বিচার করা হয়।  এর একজন হিসেবে ১০ বৎসর সশ্রম কারাদন্ড দেয়া হয় তাকে।  নানা ঘটনার পরে ১৯৮০ সালে তার সাজা মওকুফ হয়।  তাঁর সবচেয়ে বিতর্কিত রাজনৈতিক ঘটনাটি ঘটে ১৯৮৮ এর বিরোধী দলবিহীন একতরফা নির্বাচনে অংশ নেওয়া যার মাধ্যমে তিনি সম্মিলিত বিরোধী দলের পক্ষে সংসদে বিরোধী দলীয় নেতা নির্বাচিত হন।
বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী: বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তম (জন্ম:১৪ জুন, ১৯৪৭) ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি বাঘা সিদ্দিকী নামে পরিচিত ছিলেন। তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সমরনায়ক, যিনি ভারতীয় বাহিনীর সাহায্য ব্যতিরেকেই ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসের প্রথমার্ধে ঢাকা আক্রমণের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম বাহিনী কাদেরিয়া বাহিনী তার নেতৃত্বে গঠিত ও পরিচালিত হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকার জন্য তাকে বীর উত্তম খেতাবে ভূষিত করা হয়। তার নামে সখিপুরে "কাদেরনগর" গ্রামের নামকরণ করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ-পূর্ব ও পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে যুক্ত থাকলেও ১৯৯৯ সালে তিনি আওয়ামী লীগ ত্যাগ করেন এবং কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ নামক রাজনৈতিক দল গঠন করেন। তিনি এই দলের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি।  দলটি হতে তিনি একবার এম.পি. নির্বাচিত হন। তবে সরকারি নানা টেন্ডার নিয়ে টাঙ্গাইল অঞ্চলে রাস্তায় সেতু নির্মাণ অসম্পূর্ণ রাখার কারণে তিনি "ব্রিজ উত্তম"  উপাধিতে ভূষিত হয়েছেন।
মাহামুদুর রহমান মান্না: মাহমুদুর রহমান মান্না একজন বাংলাদেশী রাজনীতিবিদ এবং গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব। তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এর সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সেন্ট্রাল স্টুডেন্টস ইউনিয়ন (ডাকসু)র সাবেক সহ-সভাপতি, এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (চাকসু) এর সাবেক সাধারণ সম্পাদক। পর পর দুইবার বাংলাদেশের দুইটি গুরুত্বপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব পালন করার অভিজ্ঞতা থাকা এবং জাতীয় রাজনীতি গুরুত্ব পাওয়া সত্ত্বেও একবার জাতীয় সংসদে নির্বাচিত হতে পারেন নি।  বর্তমানে নাগরিক ঐক্য-এর আহ্বায়ক হিসেবে রাজনীতিতে সক্রিয়।
ডাক্তার জাফর উল্লাহ চৌধুরী:  জাফরুল্লাহ চৌধুরী (জন্ম ২৭ ডিসেম্বর ১৯৪১) একজন বাংলাদেশি চিকিৎসক, জনস্বাস্থ্য সক্রিয়তাবাদী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং মুক্তিযোদ্ধা। তিনি গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র নামক স্বাস্থ্য বিষয়ক এনজিওর প্রতিষ্ঠাতা। ১৯৮২ সালে প্রবর্তিত বাংলাদেশের ‘জাতীয় ঔষধ নীতি’ ঘোষণার ক্ষেত্রে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। আর এটাই তাঁর রাজনীতিতে অংশ নেয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় নেতিবাচক পয়েন্ট।  সামরিক সরকারের সাথে তাঁর এই সখ্যতা গণমানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতাকে শুন্যে নামিয়ে দিয়েছে।   
সুলতান মোহাম্মদ মনসুর:  জন্ম ১ জানুয়ারী ১৯৫৬। সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ একজন বাংলাদেশী রাজনীতিবিদ।  তিনি বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দায়ীত্ব পালন করেছেন একসময়।এছাড়াও ডাকসু এর ভিপি ছিলেন তিনি। রাজনীতিতে তাঁর বর্তমান ক্ষমতাসীনদের সাথে সম্পর্ক নিয়ে অস্পষ্টতা আছে।  তাঁর লেবাস বর্তমান ক্ষমতাসীনদের মত।  দলটিতে ফেরত যাওয়ার বিষয়ে প্রচুর কানকথা তাঁকে শেষ বিচারে একজন বিতর্কিত ব্যক্তিতে পরিণত করেছে।
বর্তমান বিরোধীদের বড় বড় কয়েকজনের সম্পর্কে গণমানুষের এই ধারণা ২০১৮ এর নির্বাচনে সত্যি বলে প্রতীয়মান হয়েছে।  তাই এই সব জনবিচ্ছিন্ন ব্যক্তিরা যারা ব্যাপক প্রচার পাচ্ছে কার্যত পরিবর্তনের জন্য কোন ভূমিকাই রাখতে পারছে না।  

দীর্ঘমেয়াদি ধারাবাহিক প্রচেষ্টা আবশ্যক
পৃথিবীর কোনো জাতি সংক্ষিপ্ত উপায়ে নিজেদের ভাগ্য উন্নয়ন করতে পারেনি।  দীর্ঘমেয়াদী ধারাবাহিক প্রচেষ্টাই একটি জনগোষ্ঠীকে পারে সম্পদশালী আর উন্নত করতে। অতীতের বিজয় অভিযান পরিচালনা করে লুটপাটের মাধ্যমে সম্পদশালী হওয়ার দিন আর নেই।  এমনকি বিজয়ের মাধ্যমে সম্পদশালীরাও নিজেদের অবস্থান বজায় রাখতে পারছে না।  উঠে আসছে নতুন নতুন জাতি তাদের পরিকল্পনা আর ধারাবাহিক দীর্ঘমেয়াদি প্রচেষ্টার বাস্তবায়নের মাধ্যমে।  এজন্য একসময়ের দুনিয়া শোষণ করা ব্রিটিশ, ফরাসি, পর্তুগিজ, স্পেন এবং  সুলতান/রাজাদের শাসনের জাতি/দেশ গুলোকে পিছনে ফেলে  বিশ্বে উন্নতির অগ্রভাগে রয়েছে সুইডেন, বেলজিয়াম, জাপান,  সিঙ্গাপুর প্রভৃতি দেশ।  এমনকি বিশাল জনগোষ্ঠীর দেশ চীনও একই ভাবে  পরিকল্পনা করে অগ্রসর হয়েছে। বিগত এক দশকের বেশি  সময়  ধরে বাংলাদেশ উন্নতি করে চলেছে পরিকল্পনা মাফিক।  উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য দেশটি এখন রোলমডেল।

শিক্ষায় দরকার নৈতিকতা 
বাংলাদেশে একটি যুগোপযুগী আধুনিক শিক্ষার প্রবর্তন করার জন্য বার বার চেষ্টা হয়েছে।  কিন্তু শিক্ষকদের সঠিকভাবে প্রশিক্ষিত না করতে পারার কারণে  আধুনিক একটি  শিক্ষা ব্যবস্থার কিরূপ করুন দশায় পতিত হতে পারে তা নিজ চক্ষে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। তাই শিক্ষা সম্পূর্ণ রেজাল্ট কেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে। এর সাথে শিক্ষার্থীরা হয়ে পড়েছে প্রাইভেট টিউশনের হাতে জিম্মি। এই প্রজন্ম হয়ত ভারী ভারী সার্টিফিকেট পাচ্ছে - কিন্তু শিখছে খুবই কম।  সম্পূর্ণ শিক্ষায় নৈতিক শিক্ষা একেবারে অনুপস্থিত।  এর ভয়াবহ ফল হিসেবে নীতি-নৈতিকতা বর্জিত একেকটা প্রজন্ম তৈরী হচ্ছে।  আর দেশ তাদের কাছ থেকে তেমন কিছু পাচ্ছে না।  এরা শুধু নিজের স্বার্থ নিয়েই জীবন পার করে দিচ্ছে।  ফলে সমাজ আর রাষ্ট্রের উন্নয়ন ব্যাপক বাঁধাগ্রস্ত হচ্ছে।  নেতৃত্ব দিচ্ছে স্বার্থবাদীরা। তাদের স্বার্থে প্রকৃত আর টেকসই উন্নয়ন ঘটছে না।  

শুরু হোক পরিবার থেকে 
একটি জাতি যখন মেধা-মননে পিছিয়ে যেতে থাকে তখন দুই জায়গা থেকে তার উত্তরণ ঘটাতে হয় - প্রথমটি রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ পর্যায় হতে পরিকল্পনা আর আইন করে তার ব্যাপক প্রচার করে এবং শিক্ষা ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন এনে যুগোপযুগী করার মাধ্যমে।  দ্বিতীয়টি পরিবার হতে।  দুটিই দীর্ঘমেয়াদি ধারাবাহিক কাজ।  যেহেতু বর্তমানে এই রাষ্ট্রটি যে কোন কারণেই হোক না কেন তার শিক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকরণ বাস্তবায়ন করছে না, তাই পরিবারেরই এই দায়িত্ব নিতে হবে।

দরকার সম্মানবোধ আর সৌজন্যের চর্চা 
এই জাতির বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মধ্যে দুটি বৈশিষ্ট সর্বদা বিদ্যমান: এক. গুরুজন আর বিদ্যানকে সম্মান করা।  দুই. আতিথেয়তা।  তাই অল্প আয়াসেই অতি প্রয়োজনীয় দুইটি মৌলিক চর্চা পরস্পরের প্রতি সম্মানবোধ আর সৌজন্যের চর্চার  ব্যাপক প্রসার sকরা সম্ভব।  এই দুইটি অভ্যাসে পরিণত করতে পারলে জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠন করা সহজতর হবে।  

মানুষ সবার আগে 
সাধারন মানুষ রাজনৈতিক এই হানাহানি থেকে মুক্তি চায়, তারা বিশ্বাস করে, মানুষের জন্যই রাজনীতি, ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য রাজনৈতিক দলগুলো আন্দোলন করুন, তাদের যুক্তিসংগত আন্দোলন নিয়ে কারো মাথা ব্যাথা নেই, কিন্তু যখন আন্দোলনের নামে মানুষ হত্যা করা হয় এবং আবার তা দমন করতে গিয়ে মানুষ হত্যা করা হয় সেটা কোন ভাবেই মেনে নেয়া যায় না। তারা রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে দাবি জানিয়েছে অবিলম্বনে আন্দোলনের নামে এই মানুষহত্যা বন্ধ হোক পাশাপাশি বিরোধীমত দমনের নামে সকল প্রকার রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসও বন্ধ হোক। কারন যেই মরুক মরছে, মরছে আমাদের মানুষই।
রাজনীতি হলো একটি দেশের চালিকাশক্তি। একটি দেশকে নির্মাণ করা এবং সেই দেশের মানুষকে সার্বিক নিরাপত্তা দেওয়া রাজনীতির অন্যতম উদ্দেশ্য। বর্তমান বিশ্বে কল্যাণ রাষ্ট্রের ধারণা বা তত্ত্ব রাজনীতিকে আরও বেশি সংবেদনশীল ও দায়িত্ববান করে তুলেছে। কল্যাণ রাষ্ট্রে নাগরিকের অধিকার পূরণ করা রাষ্ট্রের অপরিহার্য কর্তব্য। এই কর্তব্যকে কিছুতেই রাষ্ট্র অস্বীকার করতে পারে না। তাই আধুনিক রাষ্ট্র ও রাজনীতি দুটোই এখন আমজনতার সেবা দিতে বাধ্য। কেননা জনতা যদি রাষ্ট্র ও রাজনীতি সম্পর্কে অনাস্থা প্রকাশ করে, তাহলে ক্ষমতা বা গদি দখলে রাখা যায় না। 


 
লেখক : প্রধান সমন্বয়ক, আমরা ৯৯ শতাংশ (আপহোল্ড ৯৯) ।
ইমেইল: [email protected] 

এই বিভাগের আরো সংবাদ