আজকের শিরোনাম :

রেহানা মরিয়ম নূর : চিত্রনাট্য ও বিষয় ভাবনা

  আবু রায়হান

২৩ নভেম্বর ২০২১, ১০:৩৭ | অনলাইন সংস্করণ

চলচ্চিত্র নির্মাণে চিত্রনাট্য প্রথম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। আর চিত্রনাট্য ভাবনায় বিষয় নির্বাচন আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। চিত্রনাট্যের গুণে একটা ভালো ছবি নির্মাণের সম্ভাবনা যেমন থাকে, তেমনি বিষয়ের কারণেও তা নিজ সীমানা পেরিয়ে দূর সীমানাতেও আবেদন তৈরি করার সম্ভাবনা রাখে। গল্পের বিষয় এভাবে নির্দিষ্ট একটা সীমানার পরিমণ্ডল ছাড়িয়ে বৈশ্বিক একটা আবেদন তৈরি করতে পারে। রেহানা মরিয়ম নূরের চিত্রনাট্য বিষয় নির্বাচনের অর্থে সেই আবেদন তৈরি করতে পেরেছে বলে মনে হয়। ছবি বানানোর নিয়ত করার সময় থেকে যে জিনিসটা সবার আগে দরকার সেটা চিত্রনাট্য। যারা অল্পবিস্তর সিনেমার খবর রাখেন তারা জানেন এখানে স্ক্রিপ্ট বা চিত্রনাট্যের ক্ষেত্রে অবহেলাটা চোখে পড়ার মতো। এই অবহেলা জানা-বোঝার ক্ষেত্রে। এই অবহেলা মেহনত করার অর্থে এবং অর্থনৈতিক অর্থেও। রেহানা মরিয়ম নূরে এই অবহেলাগুলো কাটিয়ে ওঠার একটা স্পষ্ট ইঙ্গিত লক্ষ করা যায়। সিঙ্গেল মাদার, কর্মস্থল এবং প্রতিষ্ঠানে এবিউস, বুলিং, ভায়োলেন্স, হ্যারেসমেন্ট, কর্মস্থল বা প্রতিষ্ঠানের বিষয়টা কেন্দ্রে রেখে স্কুলে বুলিং এবং সিঙ্গেল মাদারের বিষয়টা পার্শ্ব বিষয় হিসেবে ধরে এই সিনেমার গল্প আবর্তিত হতে থাকে। স্নো বলের মতো। স্নো বল যেমন গড়াতে গড়াতে গায়ে আরও তুষার জমিয়ে বড় হতে থাকে, ছবিতে দেখি সিঙ্গেল মাদার, কর্মস্থল এবং প্রতিষ্ঠানে এবিউস, বুলিং, ভায়োলেন্স, হ্যারেসমেন্ট তিনটি বিষয়ের সঙ্গে আরও অসংখ্য বিষয় যুক্ত হয়ে রেহানা মরিয়ম নূরের চিত্রনাট্য তৈরি হয়েছে।

ঘটে যাওয়া ঘটনার ভিজ্যুয়ালাইজেশন নির্মাণ করাই কি সিনেমার কাজ? নাকি উপন্যাস, গল্প, পত্র-পত্রিকা, টেলিভিশন, ফেইসবুক ইত্যাদি মারফত জানা-শোনা ঘটনার শুধু ভিজ্যুয়ালাইজেশন করাই সিনেমার কাজ হতে পারে? নাকি ঘটনার ভেতরে-বাইরে তালাশ করা, কার্যকারণের একটু হদিস নেওয়া, আর পাতলা, চিকন, মসৃণ, সূক্ষ্ম যা আমাদের সাদা চোখে স্বাভাবিক মনে হয়, যা আমাদের মনে কোনো প্রশ্নের উদ্রেক করে না, যা আমাদের জীবনযাপনে এবং দৈনন্দিন আট-দশটা ঘটনার মতোই স্বাভাবিক মনে হয়, সেই স্বাভাবিক, পাতলা, চিকন, মসৃণ, সূক্ষ্ম বিষয়গুলো যে জীবনে কত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, সে বিষয়গুলোকে আতশকাচের নিচে রেখে প্রশ্নবোধক চিহ্ন সহযোগে দর্শকদের সামনে হাজির করা একজন শিল্পী বা একজন চলচ্চিত্রকারের কাজ? জানা ঘটনাকে নতুন এবং বহু মাত্রায়, নতুন চেহারায়, নতুন অবয়বে হাজির করাও তো শিল্পীরই কাজ। শিল্পী কাজটা সহজ করে দিলে আমরা তখন নতুন করে ঘটনাগুলোর পুনঃতদন্ত শুরু করি এবং ভিন্নভাবে দেখতে মনোযোগী হই।

পরীক্ষার হল থেকে ফিরে যাওয়ার সময় ডাক্তার আরেফিনের রেহানার কাঁধে হাত রেখে কথা বলা, সৌজন্যমূলক দূরত্ব বজায় না রেখে অস্বস্তিকরভাবে খুব কাছাকাছি দাঁড়িয়ে কথা বলা, তুমি সম্বোধন, এক্সপেল করার পর নকল করার ঘটনাকে স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে যুক্তি হাজির করা, ছাত্রীকে ফেভার করা, ছাত্রীর সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনার পর শিক্ষক এবং ছাত্রী উভয়ই বিষয়টাকে হাল্কাভাবে নেওয়া, রেহানা অভিযোগ করলে প্রিন্সিপালের ঘটনাটা এড়িয়ে যেতে বলা, অথবা বেতন বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া, অথবা মনে হতে পারে যে, যার ঘটনা তার মাথাব্যথা নেই আরেকজনের কেন এত মাথাব্যথা? আবার অ্যানি নামের ছাত্রীটি যখন রেহানার কাছে সেফটিপিন চায় তখন মনে মনে হয়তো ভাবি ‘যাক শুধু গায়েই হাত দিয়েছে, আর বেশি কিছু তো হয় নাই’। এই ভেবে যেন একটু স্বস্তি পাওয়া। আবার ইমুর স্কুলে পেনসিলের খোঁচা বা হাতে কামড় দেওয়া বা স্যরি না বলা। কিংবা প্যারেন্টস মিটিংয়ে এক নারী যখন ‘মেয়েদের ইগো থাকা ভালো না’ বলে রেহানাকে পরামর্শ দেয়, এসব সমাজের প্রতিধ্বনিই মনে হয়। এই সিনেমায় ইত্যাদি ‘ছোটখাটো’, ‘খেয়াল না করা’, ‘মামুলি’ প্রসঙ্গগুলো শুধু ম্যাগ্নিফাই করেই আমাদের দেখানো হয় না বরং এই বিষয়গুলো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কীভাবে প্রাতিষ্ঠানিকতার রূপ নেয় এবং সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ায় আমাদের কাছে স্বাভাবিক মনে হয়, আর এই স্বাভাবিকতাই কীভাবে মহিরুহ আকার ধারণ করে জীবনকে বিপন্ন করে তোলে, সেই ‘ছোটখাটো’, ‘খেয়াল না করা’ অগোচর বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিয়ে আমাদের দৃষ্টিগোচর করানো হয়।

কর্মস্থল তো যেকোনো কর্মস্থলই হতে পারত। মেডিকেল কলেজের আলাদা গুরুত্ব কোথায়? গুরুত্বটা দুই রকম হতে পারে। ঘটনাটা মেডিকেল কলেজে ঘটেছে, যা কি না একটা প্রতিষ্ঠান এবং একই সঙ্গে উচ্চশিক্ষারও জায়গা। আবার একটা প্রতিষ্ঠান কীভাবে ঘটনার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয় তারও একটা প্রক্রিয়া আমরা দেখি। এই দুই অর্থেই প্রতিষ্ঠানকে হাজির করা হয়েছে। ইমুর স্কুলের ঘটনাগুলোর কথা মনে করা যাক : সেখানেও একই প্রক্রিয়া দেখতে পাই। স্কুলে/প্রতিষ্ঠানে ঘটনাগুলো ঘটছে আবার সেগুলো প্রাতিষ্ঠানিক রূপও পাচ্ছে। তাহলে মেডিকেল কলেজের ঘটনার সঙ্গে প্রাইমারি স্কুলের ঘটনার যোগাযোগ বা সম্পর্কটা কোথায়? সম্পর্কটা হলো প্রাইমারি থেকে উচ্চশিক্ষার পরিধি পর্যন্ত ঘটনাগুলোকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার একটা প্রক্রিয়া সমাজে ক্রিয়াশীল, যা সামাজিকীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

প্রতিনিয়ত আমরা সমাজ, প্রতিষ্ঠান, নৈতিকতা, প্রত্যাশা, মূল্যবোধ, বিধিনিষেধের বেড়াজাল আর হাজারো নিয়মকানুনের চাপ বা বোঝা বহন করতে করতে জীবনটা যাপন করি। কমবেশি সবাই আমরা এই চাপের ভিক্টিম। রেহানা মরিয়ম নূরের রেহানা কি এই চাপের বাইরে? বরং নারী হিসেবে সে একটা বাড়তি চাপ বহন করে। এই চাপে পড়া বা চাপে থাকা মানুষ কেমন আচরণ করতে পারে? কেন করে? কীভাবে করে? কী করতে চায়? ইত্যাদি বুঝতে চাইলে বরং এভাবে ভাবতে পারি যে এত কিছুর চাপে একজন ব্যক্তি মানুষ আসলে কী করতে পারে? তার আচরণই বা কেমন হতে পারে? অর্থাৎ রেহানাকে যা করতে দেখি তা যদি ক্রিয়া হিসেবে না দেখে সমাজ, প্রতিষ্ঠান, নৈতিকতা, প্রত্যাশা, মূল্যবোধ, বিধিনিষেধের বেড়াজাল আর হাজারো নিয়মকানুনের চাপের প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখি বা একজন ভিক্টিমের প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখি তাহলে হয়তো ব্যক্তি হিসেবে রেহানাকে বোঝা একটু সহজ হবে। আবার রেহানার এই প্রতিক্রিয়া যদি শুধু ব্যক্তি রেহানার বিষয় হিসেবে ধরে নিই তাহলেও চরিত্রটা বুঝতে একটু ঘাটতি থেকে যেতে পারে। ব্যক্তি রেহানাকে সমাজের অনেক চাপে পড়া বা ভিক্টিমের প্রতিনিধি হিসেবে দেখলে চরিত্রটা বুঝতে সহজ হতে পারে। ধরা যাক, কোনো পরিবার জানল যে তাদের মেয়ে বা ছেলে সেই স্কুল বা মেডিকেল কলেজ অথবা বিশ্ববিদ্যালয় অথবা কর্মস্থলের কারও দ্বারা এবিউস, বুলিং, হ্যারেসমেন্ট, ভায়োলেন্সের শিকার হয়েছে। তখন সেই পরিবারের মায়ের প্রতিক্রিয়া কেমন হবে? বাবার প্রতিক্রিয়া? ভাই যদি থাকে তার প্রতিক্রিয়া? বোন যদি থাকে তার প্রতিক্রিয়া? আত্মীয়স্বজনরা জানলে তাদের প্রতিক্রিয়া? আবার সবাই জানার পর সেই পরিবারের প্রতিক্রিয়া? এই সবার প্রতিক্রিয়ার প্রকাশ ঘটেছে রেহানা চরিত্রের মধ্য দিয়ে।

যৌন হয়রানির ঘটনায় ডাক্তার আরেফিনকে রেহানা শুধু ঘটনাটাকে স্বীকার করতে বলে। প্রথমেই স্বীকার করলে রেহানা কোনো অভিযোগ করত কি না জানি না। ধারণা করি করত না। তখন পর্যন্ত রেহানা ছাড়া কেউ জানে না। স্বীকার করলে রেহানার কী লাভ হতো? ডাক্তার আরেফিন প্রথমে স্বীকার করে নাই। পরে কি করেছে? ধারণা করি করেছে। এবং ততক্ষণে চাকরিটা ঠিক থাকলেও তার স্ত্রী তাকে ছেড়ে চলে গেছে। এখানেও গুরুত্বপূর্ণ দুটো বিষয় খেয়াল করা যায় : প্রথমে বিষয়টা স্বীকার না করাটা সমাজের অনড় সাংস্কৃতিক অবস্থারই প্রকাশ, আর দেরিতে বললেও অনেক ক্ষতি। ফলে ডাক্তার আরেফিনের কথার সূত্র ধরেই যদি বলি, ‘জীবনে সবাই ভুল করে’ আর ভুল যেহেতু ভুলই সেটাকে প্রথমে স্বীকার করলে ব্যক্তিগত (চিন্তা এবং বৈষয়িক) ক্ষতির ঝুঁকি যেমন কমে, তেমনি একটা সাংস্কৃতিক অনুশীলনের পথ তৈরিতে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। ইমুকে রুমে আটকে রেখে ছবি শেষ হয়। রুমে বন্দি এই ইমু কে? এই ইমুই কি রেহানা বা রেহানাদের জীবন-বৃত্তান্তের শুরু না? যাকে ‘আমরা’ এভাবে বন্দি করে রেখেছি সে বড় হয়ে কী হবে? অথবা যাকে আমরা নৈতিকতা, নিয়ম, মূল্যবোধের নামে আটকে রাখি তাদের ভবিষ্যৎটা কেমন হতে পারে? ভালো করে খেয়াল করলে দেখা যাবে এই ইমুর মধ্যে আমাদের সবার ছোটবেলাকে পাওয়া যাবে। আবার রেহানা চরিত্রটাকে যদি দুই ভাগ করে দেখি তাহলে বুঝতে পারব এই ইমুর বড় ভার্সন কি আজকের রেহানা না? সমাজে নানা বিধিনিষেধের বেড়াজালে আবদ্ধ থাকতে থাকতেই কি এক দিন এরা ইমু থেকে রেহানায় পৌঁছায়?

আগের কথা পরে বলি। ছবির শুরুতেই দেখি কোনো একটা কারণে রেহানা পেছন ফিরে দেখে। তারপর হন হন করে নিজের রুমে চলে যায়। পেছন ফিরে সে কী দেখে? কিছু কি তাকে তাড়া করছে? সেটা কী? সেটা হতে পারে রেহানার ব্যক্তিগত অতীত। ব্যক্তির অতীত এবং বর্তমানের সঙ্গে থাকে সমাজ, সমাজের সঙ্গে থাকে মূল্যবোধ। আছে রাষ্ট্র নামক প্রতিষ্ঠান। রাষ্ট্রের সঙ্গে থাকে ব্যবস্থা। আর থাকে নিয়মকানুন, দায়িত্ব-কর্তব্য, নৈতিকতা, বিধিনিষেধ, থাকে ভালো-মন্দ, সঠিক-বেঠিক, থাকে আইনকানুন। কখনো এসব কিছুর মিলিত রূপের ডাকনাম যা হতে পারে আসল নামও তাই হতে পারে : সেটা হলো ‘ভয়’। এই ভয় যখন একজন ব্যক্তিকে সারাক্ষণ তাড়া করে তার কী দশা হতে পারে? সেকি স্বাভাবিক মানুষ থাকতে পারে? নাকি তার আচরণ স্বাভাবিক হতে পারে? এতসব প্রশ্ন দিয়েই ছবি শুরু হয়। সারাক্ষণ ভয়ে ভীত থাকলে মানুষ কি চিন্তা অথবা আচরণে মুক্ত মানুষ হতে পারে? প্রশ্ন দিয়ে ছবি শেষ হয় অথবা বলা যায় ছবির শুরুটা আসলে শেষের দরজা বন্ধের প্রশ্নটা দিয়েই।

সবচেয়ে ‘সেরা’ ছবিরও কিছু ত্রুটিবিচ্যুতি থাকে। থাকে অল্পবিস্তর দুর্বলতাও। আর এসবই শিল্প প্রক্রিয়ার স্বাভাবিক লক্ষণ। শিল্পমাধ্যমে পারফেক্ট বা চূড়ান্ত বলে কিছু নেই। আছে নিরন্তর যাত্রা। রেহানা মরিয়ম নূরেও ত্রুটিবিচ্যুতি, দুর্বলতা যা আছে সেটাকে স্বাভাবিক লক্ষণ হিসেবেই বিবেচনা করা যেতে পারে।

লেখক : নাট্যকর্মী ও গবেষক

এই বিভাগের আরো সংবাদ
ksrm