ঈদ আসুক সবার ঘরে

  প্রভাষ আমিন

২০ জুলাই ২০২১, ১৯:০৪ | অনলাইন সংস্করণ

প্রভাষ আমিন
মুসলমানদের মূল উৎসব দুটি—ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা। বাংলাদেশে দুটি উৎসব পরিচিত রোজার ঈদ আর কোরবানির ঈদ নামে। দুই ঈদের ধরন দুই রকম। এক মাসের সংযম সাধনা শেষে রোজার ঈদ আসে ছেড়ে দেওয়া স্পিংএর মতো আনন্দ নিয়ে। কোরবানির ঈদের আনন্দের ধরনটা আবার অন্যরকম।

বিশেষ করে কোরবানির ঈদে শিশুদের আনন্দটা লাগামছাড়া। মুরুব্বীদের সাথে পশুর হাটে গিয়ে পশু কেনা, সেটা বাড়িতে এনে কয়েকদিনের জন্য লালনপালন, দুদিনেই প্রিয় হয়ে ওঠা পশুটি ঈদের দিন কোরবানি দেওয়া, মাংস তৈরি, মাংস বণ্টন- সব মিলে কোরবানির ঈদের উৎসবের অন্যরকম রং। তবে করোনার কারণে গত দুই বছর আমরা যথাযথ আনন্দের সাথে ঈদ উদযাপন করতে পারছি না।

ঈদের প্রধান আনন্দ হলো, আনন্দটা সবার সাথে ভাগাভাগি করে নেওয়া। সেখানেই করোনার বাধা। ধনী-গরিব সবাই মিলে এক কাতারে ঈদের নামাজ আদায় করা, নামাজ শেষে কোলাকুলি করা মানে হৃদয়ে হৃদয় মেলানো। নিউ নরমাল লাইফ সেই চিরচেনা ছবি এখন বদলে দিচ্ছে। মানুষের সাথে মানুষের শারীরিক নৈকট্যই করোনায় সবচেয়ে বড় বাধা। করোনা থেকে বাঁচতে হলে মানুষের কাছ থেকে দূরে থাকতে হবে।

ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদে আনন্দ যেমন বেশি, ঝুঁকিও বেশি। পশু কেনা থেকে শুরু করে মাংস বণ্টন- প্রতিটি ধাপেই অনেক বেশি মানুষের অংশগ্রহণ। তারচেয়ে বড় কথা হলো, দুই ঈদের মধ্যে অন্তত কোরবানির ঈদটি মানুষ গ্রামে কাটাতে চায়। তাই বাড়ি ফিরতে তারা বেপরোয়া হয়ে যায়। বাড়ি ফেরা থেকে শুরু করে কোরবানি—পুরো প্রক্রিয়াটাই জনবহুল। তাই এই ঈদে সতর্ক থাকাটা জরুরি।

ইসলামে ঈদের ধারণাটাই হলো, আনন্দটা সবার মাঝে ভাগাভাগি করে নেওয়া। ধনী-গরিবের বৈষম্য কমিয়ে আনা। এমনিতে আমাদের সমাজে, দেশে প্রবল অর্থনৈতিক বৈষম্য রয়েছে। করোনা এসে সেই বৈষম্য আরও বাড়িয়েছে। এই করোনার মধ্যেও অনেকের সম্পদ আরও বেড়েছে। আবার অনেকে নিঃস্ব হয়ে গেছেন। করোনার কারণে অনেকে চাকরি হারিয়েছেন।

দফায় দফায় লকডাউনের কারণে ছোট ব্যবসায়ীদের অনেকে পুঁজি হারিয়েছেন। অনেকের ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেছে। করোনা মধ্যবিত্তদের নিম্ন মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্তদের নিম্নবিত্ত বানিয়ে ফেলেছে। আর প্রান্তিক নিম্নবিত্তদের জীবন তো সবসময় একইরকম। খেয়ে না খেয়ে চলছে তাদের জীবন। ছোটখাটো চাকরি করে যিনি সংসার চালাতেন। হঠাৎ বেকার হয়ে তিনি অকূল পাথারে পড়েছেন।

করোনাকালে হুট করে আরেকটা চাকরিটা জুটিয়ে ফেলা তার জন্য অসম্ভব। গত ঈদেও হয়তো তার কোরবানি দেওয়ার সামর্থ্য ছিল। এবার নিত্যদিনের খাবার জোগাড় করাই কঠিন। কোরবানি দেওয়া তো অনেক দূরের কথা। অনেকে ঢাকা ছেড়ে একেবারে ফিরে গেছেন।

ঈদের আনন্দে যেন আমরা সেই মানুষগুলোকে ভুলে না যাই। যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী আমরা ঈদের আনন্দটাই ভাগাভাগি করে নিই। আপনার ঘরে অঢেল আনন্দ, অঢেল মাংস; প্রতিবেশীর ঘরে হাহাকার। তাহলে কিন্তু আপনার আনন্দটা পূর্ণ হবে না। ধর্মীয় রীতি অনুযায়ীও কিন্তু আপনার ঈদ পূর্ণ হবে না।

আগেই বলেছি, বাড়ি ফেরা থেকে মাংস বণ্টন- কোরবানির ঈদের প্রতিটি ধাপই জনবহুল। এই ধাপগুলোতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা সত্যিই কঠিন। কিন্তু সরকার যাই বলুক, লকডাউন কঠোর থাকুক আর শিথিল; নিজেদের স্বার্থেই আমাদের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। কারণ আমার জীবনটা আমার, সরকারের নয়।

দুইটা মৌলিক বিষয় মেনে চলতেই হবে—সার্বক্ষণিকভাবে মাস্ক ব্যবহার করা এবং যতটা সম্ভব জনসমাগম এড়িয়ে চলা। আরেকটা জরুরি বিষয় হলো, কোরবানি শেষ হওয়ার সাথে সাথে বর্জ্য পরিষ্কার করে ফেলতে হবে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে না চললে কী হতে পারে, হাসপাতালগুলোর দিকে তাকালে যে কেউ টের পাবেন। এই যে বললাম, আনন্দটা যেন সবার সাথে ভাগাভাগি করে নিই।

গত দেড় বছরে প্রায় ১৮ হাজার পরিবার থেকে আনন্দ কেড়ে নিয়েছে করোনা। স্বজন হারানোর বেদনা নিয়ে ঈদের আনন্দ সত্যি কঠিন। দুদিনের ব্যবধানে মা-বাবাকে হারিয়েছেন মাছরাঙা টেলিভিশনের প্রধান বার্তা সম্পাদক রেজোয়ানুল হক রাজা এবং নিউজটোয়েন্টিফোর এর বার্তা সম্পাদক বোরহানুল হক সম্রাট। আমরা যত চেষ্টাই করি, এই ঈদে তাদের ঘরে আনন্দ আনা সত্যি কঠিন। এমন বেদনার গল্প অনেক পরিবারে।

এই ঈদে স্বাস্থ্যবিধি না মানলে, বেপরোয়া চলাফেরা করলে এমন বেদনা হানা দিতে পারে যে কারো পরিবারে। কার ঘরে হানা দেবে সেটা নির্ভর করছে আমার-আপনার ওপর। যারা স্বাস্থ্যবিধি মানবে, তারা তুলনামূলক কম ঝুঁকিতে থাকবে; যারা মানবে না, তাদের ঝুঁকি বেশি। এখন সিদ্ধান্ত আপনার, আপনি কোন দলে থাকবেন।

আমরা অবশ্যই সবাই মিলে ঈদ উদযাপন করবো, সবাই মিলে আনন্দ করবো। তবে এমনভাবে করবো, যাতে আরও অনেকগুলো ঈদ আমরা স্বজনের সাথে কাটাতে পারি। এই ঈদ যেন কারো জীবনের শেষ ঈদ না হয়।

লেখক: বার্তা প্রধান, এটিএন নিউজ।

এই বিভাগের আরো সংবাদ