আমাদের একটি ‘চাঁদ-দেখা’ নীতি দরকার

  ড. যোবায়ের মোহাম্মদ এহসানুল হক

১৩ মে ২০২১, ১৬:৪৫ | অনলাইন সংস্করণ

সম্প্রতি একটি আলোচনায় অংশ নিয়েছিলাম। শিরোনামটি পছন্দ ছিল না। আমি সারা বিশ্বে একই দিনে ঈদ-রোজা পালনের কথা বলি না, সৌদিকে অনুসরণের কথাও বলি না। 

আমার বক্তব্য হল: বাংলাদেশে যথাযথভাবে চাঁদ দেখা হয় না। যথাযথভাবে চাঁদ দেখে রোজা-ঈদ পালন করলে অনেক বিতর্কই থাকে না।
 
বাংলাদেশে সবচেয়ে সেকেলে পন্থায় চাঁদ দেখার প্রচলন আছে। জেলাশহরগুলোতে চাঁদ দেখা কমিটি কোনো ভবনের ছাদে ওঠে চাঁদ দেখার চেষ্টা করে। তারপর তারা ঢাকায় খবর পাঠায়। এভাবেই সিদ্ধান্ত আসে। 

এই পন্থায় অনেক সময় ভুল হয়। যার একটি প্রমাণ হল: সম্ভবত ২০১৯ সালে  আমরা একটি রোজা মিস করেছিলাম। সে বছর ভারতে আমাদের একদিন আগে রোজা শুরু হয়েছিল। আকাশ মেঘাচ্ছন্ন ছিল, এই অজুহাতে শাবানের ত্রিশ দিন পূর্ণ করা হয়, অথচ আমাদের পূর্বের দেশগুলো ও আমাদের লাগোয়া পশ্চিমের দেশ ভারতে খালি চোখেই চাঁদ দেখা গিয়েছিল। 

যদি চট্টগ্রাম থেকে একটি বাস ছেড়ে ঢাকায় পৌঁছে যায়, তাহলে কুমিল্লার মানুষ না দেখলেও ধরে নিতে হবে, বাসটি কুমিল্লার ওপর দিয়ে এসেছে।  

বাংলাদেশ কোন চন্দ্রদর্শন পলিসি আছে কী না জানি না। একেক বছর একক নিয়মে সিদ্ধান্ত হয়। কোন কোন বছর সিদ্ধান্ত উল্টে যায়। আমাদের আলেমরা স্থানীয়ভাবে চাঁদ দেখার প্রথা হতে একচুলও নড়বেন না। 

আচ্ছা তাই হোক। স্থানীয়দর্শন পদ্ধতির ওপর ভিত্তি একটি চাঁদ দেখা নীতি করা হোক। সেখানে বহির্দেশীয় সহযোগিতার কিছু ধারা রাখা যেতে পারে। যেমন, পূর্বের কোন দেশে চাঁদ দেখা গেলে আমরা সেটিকে নিজেদের দেখা বলে ধরে নিতে পারি। কারণ পূর্বের দেশে চাঁদ দেখা গেলে পশ্চিমের দেশে চাঁদ না দেখার কোন কারণ থাকতে পারে না। 

চাঁদ দেখা যথাযথভাবে করার জন্য চাঁদ দেখা কমিটিতে অবশ্যই একজন জ্যোতির্বিজ্ঞানীকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। মনে রাখা দরকার, চাঁদ দেখা একটি কারিগরি বিষয়, কেবল শরীয়ার বিষয় নয়।

চাঁদ দেখা কমিটি যদি টেলিস্কোপ ব্যবহার করে, তাহলে অনেক বিতর্কের অবসান হয়। সৌদি আরবের প্রতিটি মারসাদে টেলিস্কোপ আছে।

রাসূল (সা.) টেলিস্কোপ ব্যবহার করেননি, তাই করা যাবে না—এই যুক্তি দেয়া যাবে না। তাঁর যুগে আকাশ এতটা দূষিত ও ধুলোয় ধূসরিত ছিল না। একশ বছর আগে মানুষ যে আকারের চাঁদ খালি চোখে দেখতে পেত, এখন তা খালি চোখে দেখতে পায় না। টেলিস্কোপ ব্যবহার চাঁদ দেখার পক্ষে অনেক আলেম মত প্রকাশ করেছেন।  

তাহলে তিনটি বিষয় যোগ করে চন্দ্রদর্শন পলিসি ঠিক করা যেতে পারে: ক. বহির্দেশীয় সহযোগিতা গ্রহণ; খ. চাঁদ দেখা কমিটিতে জ্যোতির্বিজ্ঞানী অন্তর্ভুক্ত করা; গ. টেলিস্কোপ ব্যবহার করা।    

যোগাযোগের উন্নতির কারণে পূর্ব ও পশ্চিমের দেশগুলোতে একদিন আগে ঈদ রোজা পালিত হচ্ছে দেখে কিছু অনুসন্ধিৎসু তরুণ প্রশ্ন উত্থাপন করতে থাকেন। তাদের প্রশ্নটি যৌক্তিকভাবে বিবেচনা না-করে সর্বদা তাদেরকে গালি দেয়া হয়। 

এটি সঠিক মনোভাব হতে পারে না। আপনি যখন পুরো দুনিয়া থেকে ব্যতিক্রমী হয়ে চলবেন, মানুষ তখন প্রশ্ন করবেই। গালাগাল এটির সমাধান নয়। প্রশ্নগুলো যৌক্তিভাবে সুরাহা করুন। 

তার একটি উপায় হতে পারে, চন্দদর্শন পলিসি নির্ধারণ। এটা দিয়ে শুরু হোক। এতটা জমাটবদ্ধ পরিবেশে আমি এখনই বলতে চাই না, আমরা বৈশ্বিক চন্দ্রদর্শন মেনে নিই, বা নিরেট ক্যালেন্ডার ফলো করি। 

আশাকরি ধীরে ধীরে পৃথিবীর অনেক দেশের মতো আমাদের দেশেও চন্দ্রপঞ্জিকা অনুসৃত হবে। তার আগে আর কিছু না পারি, অন্ততপক্ষে যথাযথভাবে চাঁদ দেখে তো রোজা-ঈদ পালন করতে পারি।

লেখক: অধ্যাপক, আরবি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

এই বিভাগের আরো সংবাদ