‘ব্যাংক ঋণের সুবিধাবঞ্চিত ৯১ শতাংশ এসএমই প্রতিষ্ঠান’

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২২, ১৮:৪৯

‘বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো তাদের বিতরণ করা মোট ঋণের ১৮ শতাংশ দেয় দেশের এসএমই খাতে। এ ঋণ পায় ৯ শতাংশ ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠান। বাকি ৯১ শতাংশ এসএমই প্রতিষ্ঠান ব্যাংক ঋণের সহায়তাবঞ্চিত। এছাড়া কয়েক বছরে ব্যাংকের মোট ঋণের অনুপাতে এসএমই খাতে ঋণের হার কমেছে, যা টেকসই উন্নয়নের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।’

আজ রোববার (১৪ আগস্ট) ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ড্রাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) প্যানেল উপদেষ্টা ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম এসব কথা বলেছেন।

‘বঙ্গবন্ধুর এসএমই উন্নয়ন ভাবনা ও বর্তমান প্রেক্ষাপট’ শীর্ষক সেমিনারে তিনি মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। এফবিসিসিআই কার্যালয়ে এ সেমিনারের আয়োজন করা হয়।

খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে এসএমইর উন্নয়ন করে বৈষম্য কমিয়ে আনতে চেয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ক্রমবর্ধমান বৈষম্যের পেছনে এসএমই খাতের বিকাশ না হওয়াই দায়ী।’

তিনি বলেন, ‘বিশ্বব্যাংকের হিসাবে দেশের এসএমই ঋণের সম্ভাব্য বাজার ২৬ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। কিন্তু ব্যাংকের ঋণ কাঠামোতে এসএমই খাত অবহেলিত। তাই বিশাল এ লাভজনক খাতে ব্যাংকগুলো নজর দিচ্ছে না।’

সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন। ব্যাংকগুলোর প্রতি ক্ষোভ জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘শুধু ডলার বিক্রি করে লাভ করার জন্য এতগুলো ব্যাংকের অনুমোদন দেওয়া হয়নি। এটা নৈতিকতার মধ্যে পড়ে না।’

তিনি বলেন, ‘শুধু মুনাফা করাই ব্যাংকের কাজ না। তাদেরকে অবশ্যই জাতীয় দায়িত্ব পালন করতে হবে। সেজন্যই তাদের লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। নগরাঞ্চলে বড় গ্রাহকদের ঋণ দিয়ে শহর-গ্রামের মধ্যে বৈষম্য বাড়ানো ব্যাংকের কাজ নয়। বরং উন্নয়ন সুষম করার দায়িত্ব।’

সরকারিপর্যায়ের সীমাবদ্ধতাগুলো দ্রুত কাটিয়ে ওঠার আশ্বাস দিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘এসএমই ফাউন্ডেশনকে আর্থিকভাবে সক্ষম করতে হবে। এসএমই নিয়ে সবাই কথা বলে। তবে কোনো কাজ করে না।’

এফবিসিসিআই সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন বলেন, ‘এসএমই অর্থনীতির মেরুদণ্ড। কিন্তু এ খাতে ব্যাংকগুলোর ঋণ দিতে অনীহা রয়েছে। তারা সহজে বড় গ্রাহকদের ঋণ দিতে পছন্দ করে। এতে ব্যাংকারদের কষ্ট কমে।’

এসএমই খাতের মূল সমস্যা অর্থায়ন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী এসএমই খাতে ২২ হাজার কোটি টাকা প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছিলেন। বৃহৎ খাতের ঋণ তিনমাসের মধ্যে বিতরণ হলেও এসএমই খাতের ঋণ দুই বছরেও বিতরণ হয়নি। কেননা ব্যাংকগুলো এসএমইদের টাকা দেওয়ার ক্ষেত্রে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে না।’

জসিম উদ্দিন বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশ ও ২০৪১ সালে উন্নত বাংলাদেশ গড়তে প্রতি বছরে ২০ লাখ নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করতে হবে। এজন্য প্রধান ভূমিকা পালন করবে ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাত। তাই তাদের পাশে ব্যাংকগুলোকে দাঁড়ানোর আহ্বান জানাচ্ছি। প্রয়োজনে খাতভিত্তিক সমিতি ও জেলা চেম্বারের সঙ্গে ত্রিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ঋণ দেওয়ার জন্য ব্যাংকগুলোকে আহ্বান জানাই।’

ব্যাংকগুলোর ডলার নিয়ে ব্যবসা করার বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে এফবিসিসিআই সভাপতি বলেন, ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডলার বিক্রিতে মুনাফার হার নির্ধারণ করে দেওয়া উচিত। কোনো কোনো ব্যাংক ডলার বিক্রিতে ৪২৫ শতাংশ পর্যন্ত মুনাফা করছে। এমন চললে দেশ গভীর সংকটে পড়বে।’

এফবিসিসিআইর সিনিয়র সহ-সভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বাবু এসএমই খাতের অর্থায়ন নিশ্চিত করতে বিশেষায়িত ব্যাংক প্রতিষ্ঠার সুপারিশ করেন। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশে উপজেলাপর্যায়ে বিসিক শিল্পনগরী স্থাপন ও অর্থনৈতিক অঞ্চলে এসএমইর জন্য প্লট বরাদ্দের আহ্বান জানান তিনি।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে এসএমই ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ড. মো. মাসুদুর রহমান বলেন, ‘বড় শিল্প যেভাবে সরকারি নীতির সহায়তা পায়, ছোট উদ্যোক্তারা সেভাবে পান না। কর ও শুল্ক কাঠামোর কারণে স্থানীয় বাজার থেকে কাঁচামাল ও মধ্যবর্তী পণ্য না কিনে বিদেশ থেকে আমদানিতে উৎসাহিত হচ্ছে।’

একই অভিযোগ করে এসএমই ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মো. মফিজুর রহমান বলেন, ‘এসএমই বিকাশে সরকারের আর্থিক আনুকূল্য ও প্রকল্প আনুকূল্য পাওয়া যায় না। ২০১৯ সালের এসএমই নীতিমালা বাস্তবায়নের জন্য ২১৪১ কোটি টাকার বাজেট হলেও তার বিপরীতে কোনো অর্থ পাওয়া যায়নি।

তৃনমূলের এসএমই উদ্যোক্তাদের ব্যাংকিং সেবার আওতায় আনতে ব্যাংকের শহরের প্রতি তিনটি শাখার বিপরীতে গ্রামাঞ্চলে সাতটি শাখা স্থাপনের নিয়ম করার আহ্বান জানান বেঙ্গল কমার্শিয়াল ব্যাংক লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তারিক মোর্শেদ। তিনি বলেন, ‘আমার ব্যাংকের ৯০ শতাংশ গ্রাহক এসএমই খাতের।’

মুক্ত আলোচনায় নারী ক্ষুদ্র ও কুটির উদ্যোক্তাদের ট্রেড লাইসেন্সসহ অন্যান্য সনদ প্রাপ্তি সহজ করা, বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীর ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পখাতে বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক সম্প্রসারণ বন্ধে প্রতিযোগিতা আইন কার্যকর করা, এসএমই খাতে গবেষণা ও পণ্য উন্নয়নে ইনস্টিটিউট স্থাপন করা, সরকারের নীতির কারণে কারখানা বন্ধ হলে যথাযথ ক্ষতিপূরণ দিয়ে এক্সিট পলিসি প্রণয়ন, শিল্পখাতে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ, প্রকৃত এসএমই উদ্যোক্তাদের ঋণপ্রাপ্তি নিশ্চিত করতে সংজ্ঞা পুননির্র্ধারণের দাবি জানান বক্তারা।

সেমিনারে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন এফবিসিসিআইর সহ-সভাপতি মো. আমিন হেলালী, মো. হাবীব উল্ল্যাহ ডনসহ পরিচালকরা। সেমিনারটি সঞ্চালনা করেন এফবিসিসিআইর মহাসচিব মোহাম্মদ মাহফুজুল হক।

এবিএন/আব্দুর রাজ্জাক/জসিম/এআর

এই বিভাগের আরো সংবাদ