লক্ষ্মীপুরে তিন ধাপে নির্মাণ হবে তীর রক্ষা বাঁধ, উপকূলবাসী স্বপ্ন দেখছে বসবাসের

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২১, ১৪:০২

১৬ শতাংশ জমিসহ বাবার রেখে যাওয়া বাড়িতে বৃদ্ধা মা, স্বামী ও দুই সন্তান নিয়ে থাকতেন বিবি শাহিদা (২৮)। গ্রামের আর ১০টি পরিবারের মতই কৃষি উৎপাদিত আয়ের অংশ দিয়ে চলতো তার সংসার। সেই স্মৃতিময় দিনগুলো আজ শাহিদার চোখে যেন শুধুই স্বপ্ন! গত চার বছর পূর্বে মেঘনার করাল গ্রাসে নদীতে বিলিন হয়েছে তার শেষ আশ্রয়স্থল। একই সময় ভেঙে যায় স্বামীর সাথে গড়া সংসারটুকুও। সর্বস্ব হারিয়ে বৃদ্ধা মা ও সন্তানদের নিয়ে নদীর পাড়েই অন্যের বাড়িতে আশ্রয় নেন তিনি।

লক্ষ্মীপুরের কমলনগরের চর ফলকন ইউনিয়নের পশ্চিম লুধুয়া গ্রামের বাসিন্দা স্বামী পরিত্যক্তা বিবি শাহিদা। নদীর পাড়ে বসে ওমানী টুপি বুনতে বুনতে শাহিদা জানান, ‘নদীর পাড়ে জন্ম নেওয়াটাই এখন অপরাধ! বশতভিটে ও স্বামী (মইজ উদ্দিন)’- দু’টো এক সাথে হারিয়ে মানসিক ভাবে ভেঙে পড়েছিলাম। এখন টুপি বুনে মাসে ৭০০ টাকা পাই তা দিয়ে বৃদ্ধা মায়ের ঔষুধ খরচই চলে না। আশপাশের মানুষ সহযোগিতা করলে খেয়ে বাঁচি।’

৮ বছর ধরে লুধুয়া মাছঘাটে চায়ের দোকান করছেন চার সন্তানের জনক আবদুল মালেক। গত কয়েক বছরে মেঘনায় তার বাড়ি চার বার ভেঙেছে। প্রথমবার কৃষ্ণপুর গ্রামে পৈত্রিক ভিটে, দ্বিতীয়বার পাতার চর গ্রামে ২০ শতাংশ জমি কিনে বাড়ি করেন। সেটিও নদীতে বিলিনের পর কলোনী নামক এলাকায় ১২ শতাংশ জমিতে পুনরায় করা বাড়ি, এরপর চতুর্থবার লুধুয়া সরকারী দীঘির পাড়ে ২৪ শতাংশ জমিতে তৈরি করা বাড়িটিও তলিয়ে যায়। বাধ্য হয়ে নদীর পাড়েই অন্যের জমি ভাড়া নিয়ে ঘর তুলে পরিবারের মাথা গুজিয়েছেন তিনি।

মেঘনা নদীরপাড় ১২০টি দোকান নিয়ে গড়ে উঠা মোশারফ হোসেন 'বাঘার হাট' নামক বাজার। দীর্ঘদিনের পুরনো বাজারটি এখন মাঝ নদীর তলদেশে। ওই বাজারের খাবার হোটেল ব্যবসায়ী তাজুল ইসলাম জানান, শুধু বর্ষায় ভাঙন নয়, পাশাপাশি পাড়ে এক-একটি গোল চক্র সৃষ্টি হলে ২০/২৫শতাংশ জায়গা একত্রে তলিয়ে যায়। গত ১২ বছরে ৩০ বার তার হোটেল স্থানান্তর করতে হয়েছে। এর মধ্যে গত মাসেই চার বার সরিয়েছেন খাবারের হোটেলটি।

শুধু স্বামী পরিত্যক্তা বিবি শাহিদা, দোকানদার আবদুল মালেক ও হোটেল ব্যবসায়ী তাজুল ইসলামই নয়, মেঘনার ভয়াবহ ভাঙনের কবলে নিঃস্ব হয়েছে লক্ষ্মীপুরের কমলনগর ও রামগতি উপজেলার প্রায় লক্ষাধিক বাসিন্দা। তীব্র স্রোতে একের পর এক বিলিন হয়েছে শতাধিক বশতভিটা, বিস্তৃর্ণ ফসলী জমি, রাস্তা-ঘাট, হাট-বাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্য ক্লিনিক ও আশ্রয়ণ কেন্দ্র। ছোট ছোট প্রকল্পে বালুবর্তি জিও ব্যাগ পেলেও ভাঙন ঠেকানো সম্ভব হচ্ছে না। দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া না হলে তীব্র ভাঙনে বিলিন হবে দুই উপজেলার সরকারি-বেসরকারিসহ গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন স্থাপনা।

এদিকে গত পহেলা জুন’২১ জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় মেঘনার ভাঙন রোধে রামগতি-কমলনগর উপজেলার ৩১ কিলোমিটার তীর রক্ষাবাঁধ নির্মাণের জন্য ৩ হাজার ৮৯ কোটি ৯৭ লাখ টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদন দেয় প্রধামন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রক্রিয়া অনুযায়ী বরাদ্ধ পেলে ১০ কিলোমিটার হারে তিন ধাপে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর নাগাদ প্রকল্পের কাজ শুরু করা যাবে বলে জানান লক্ষ্মীপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী।

তবে তীর রক্ষবাঁধ বাস্তবায়নে অন্য কোন ঠিকাদার নয়, একক সেনা বাহিনীর মাধ্যমেই পুরো ৩১ কিলোমিটার টেকসই রক্ষাবাঁধ নির্মাণের দাবী উপকূলের বাস্ত্যুহারা বাসিন্দা ও জনপ্রতিনিধিদের।
জানা যায়, লক্ষ্মীপুর জেলার ৫ উপজেলার মধ্যে সদর আংশিক, রায়পুর, কমলনগর ও রামগতি উপজেলা মেঘনা উপকূলে। এরমধ্যে কমলনগর ও রামগতি উপজেলার ৩৭ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে মেঘনার ভাঙন। এর মধ্যে কমলনগরে অংশে দৈর্ঘ্য ১৭ এবং রামগতি অংশে ২০ কিলোমিটার।

বিগত ২০১৪ সালে মেঘনার তীর রক্ষাবাঁধ নির্মাণের জন্য ১,৩৫০ কোটি টাকার প্রকল্প দেয় একনেক সভা। প্রথম ধাপে ১৯৮ কোটি টাকা ব্যয়ে রামগতি সাড়ে ৪ কিলোমিটার ও কমলনগরে ১ কিলোমিটার তীর রক্ষাবাঁধ নির্মাণ করা হয় ২০১৭ সালে। এরপর দ্বিতীয় ধাপে ১৫ কিলোমিটার ও তৃতীয় ধাপে ১৪ কিলোমিটার রক্ষা বাঁধের কাজ ২০১৯ সালে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও প্রথম ধাপের কাজ শেষ হতেই প্রকল্পটি বাতিল করা হয়। কিন্তু মেঘনার অব্যহত ভাঙন থেকে রক্ষা মেলেনি উপকূলের বাসিন্দাদের। তীব্র ভাঙণ ও জোয়ারে পানিতে বাস্তুহারা হয়েছে দুই উপজেলার লক্ষাধিক মানুষ। রাস্তা-ঘাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও মসজিদসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা নদীতে তলীয় গেছে। অধিকাংশ স্থানেই বন্ধ হয়েছে শিক্ষা ও চিকিৎসা ব্যবস্থা।

স্থানীয়রা জানান, ১৯৮ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত রক্ষাবাঁধ দু’টির মধ্যে রামগতি অংশে সাড়ে ৪ কিলোমিটার নির্মাণ কাজ করেন সেনা বাহিনী। যা আজও অক্ষত। অথচ অপর অংশে কমলনগরের মাতাব্বরহাট এলাকায় ঠিকাদার দিয়ে অনিয়মের মাধ্যমে ১ কিলোমিটার তীর রক্ষাবাঁধ নির্মাণ করা হয়। কিন্তু নির্মাণ কাজ শেষ হতে না হতেই ৮ বার ধসে যায় বাঁধটি। এতে বার বারই ক্ষতির শিকার হচ্ছেন স্থানীয়রাই। তাই টেকসই রক্ষাবাঁধ নির্মাণের জন্য নতুন প্রকল্পের ৩১ কিলোমিটার তীর রক্ষাবাঁধ সেনাবাহিনীর মাধ্যমে বাস্তবায়নের দাবী তাদের। এতে তীব্র ভাঙণ থেকে রক্ষা পাবে দুই উপজেলার বাসিন্দারা। অন্যথায় বেস্তে যেতে পারে সরকারের প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের উন্নয়ন প্রকল্প।

গত বছর মেঘনার ভাঙন থেকে কমলনগরের নাছিরগঞ্জ বাজার এলাকায় স্থানীয়দের অর্থায়নে ৫০ লক্ষ টাকা ব্যয়ে এবং তরুনদের স্বেচ্ছাশ্রমে নির্মাণ করা হয় তিন কিলোমিটার জংলাবাঁধ।

সরেজমিনে দেখ যায়, তীব্রস্রোতে নাছিরগঞ্জ এলাকার সেই জংলাবাঁধটি আজ নদীতে বিলিন। অপরদিকে লুধুয়া বাজার এলাকায় ভাঙন তীব্র হয়ে উঠছে। জোয়ারের স্রোতে ভাঙনের পাশাপাশি নদীর পাড়ে এক একটি গোল চক্র সৃষ্টি হয়ে ২০/২৫ শতাংশ পরিমাণ ভূমি তথা এক এক জনের ভিটেমাটি ও ফসলের জমি তলিয়ে যাচ্ছে।

কমলনগর উপজেলার ছাত্রলীগের আহ্বায়ক রাকিব হোসেন আবীর আকাশ জার্নালকে বলেন বলেন, ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকে রক্ষাবাঁধ নির্মাণ করার দায়িত্ব দিলে এ অঞ্চলের মানুষের কথা চিন্তা করবে না। নিজের লাভের কথা চিন্তা করেই অমিয়ম করবে, যার প্রমান পূর্বের মাতাব্বরহাট এলাকার এক কিলোমিটার বেড়িবাঁধ। প্রকল্পের টাকা জলে না ঢেলে সেনা বাহিনীর মাধ্যমে টেকসই তীর রক্ষাবাঁধ নির্মাণের দাবী তাদের।

রামগতি উপজেলা যুবলীগের আহ্বায়ক মেজবাহ উদ্দিন হেলাল বলেন- তীব্র ভাঙনে মেঘনা ভিটেমাটি হারা করেছে এ অঞ্চলের নিম্নআয়ের অধিকাংশ মানুষ। একনেকে তীর রক্ষাবাঁধ প্রকল্পের অনুমোদন হওয়ায় প্রধানমন্ত্রীর প্রতি রামগতিবাসীর পক্ষ থেকে চির কৃতজ্ঞতা। তবে রামগতিবাসী চায় স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ। তাই টেকসই বাঁধ নির্মাণ কল্পে সেনাবাহিনীর মাধ্যমে নদী তীর বাঁধ প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবী জানান তিনি।

তথ্য অনুসন্ধানে ভাঙন কবলিত ইউনিয়ন পরিষদগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কমলনগর উপজেলার ৬ ইউনিয়নের ১৬টি ওয়ার্ডে বর্তমানে প্রতিনিয়তই ভাঙছে। ভাঙন কবলে চর ফলকন ইউনিয়নে ৫ হাজার বাসিন্দা, সাহেবেরহাট ইউনিয়নে ৩০ হাজার, চর কালকিনিতে ১৫ হাজার, পাটারিরহাট ইউনিয়নে ১৫ হাজার, চর মার্টিন ও চর লরেঞ্চ ইউনিয়নে ৫ হাজার বাসিন্দা বাস্তুহারা হয়ে হয়েছেন। অপরদিকে রামগতি উপজেলার ৬ ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার ৩৪টি ওয়ার্ড মেঘনার ভাঙন কবলে রয়েছে। তবে বড়খেরী ইউনিয়নে ১০ হাজার, চর আলেকজান্ডার ইউনিয়নে ১০ হাজার ও চর আবদুল্লাহ ইউনিয়নে ১০ হাজার বাসিন্দা মেঘনায় হারিয়েছেন তাদের সর্বস্ব।

কমলনগর উপজেলার চর ফলকন ইউনিয়ণ পরিষদের চেয়ারম্যান হাজী হারুন অর রশিদ সাংবাদিকদের বলেন, মেঘনার ভাঙনে তার ইউনিয়নের ৩,৭,৮ ও ৯নং সহ ৪টি ওয়ার্ড বিলিন হয়ে গেছে। কৃষ্ণপুর থেকে ৭ কিলোমিটার এলাকা এখন নদীর তীরে। ভাঙন কবলীত মানুষগুলো অন্যত্র চলে যাওয়ায় ওইসব ওয়ার্ডের কোন বাসিন্দার চাকুরী কিংবা অন্য কোন সরকারি ভেরিফিকেশনের তথ্য জানাতে গিয়ে চরম বেকায়দায় পড়তে হয়। একই সমস্যার কথা জানালেন রামগতির চর আবদুল্লাহ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান কামাল হোসেন। তার ইউনিয়নের ৯টি ওয়ার্ডই নদীতে বিলিন।

দীর্ঘদিন ধরে মেঘনা নদী তীরে রক্ষাবাঁধ নির্মাণের দাবীতে মানববন্ধন ও স্মারকলিপি প্রদানসহ বিভিন্ন আন্দোলন করে আসছে কমলনগর-রামগতি বাঁচাও মঞ্চ নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। সম্প্রতি ঢাকা জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে এক মানববন্ধনে সংগঠনটির আহ্বায়ক ও সুপ্রীম কোর্টে আইনজীবী আবদুস সাত্তার পলোয়ান গণমাধ্যমকে জানান, গত ২০ বছরে মেঘনা কি পরিমাণ মানুষের সর্বনাশ করেছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে একনেক সভায় রামগতি-কমলনগর রক্ষাবাঁধ প্রকল্পের অনুমোদন দেয়ায় প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। একই সাথে সেনা বাহিনীর মাধ্যমে টেকসই রক্ষাবাঁধ নির্মাণে দাবী জানান তিনি।

লক্ষ্মীপুর পানি উন্নয়ণ বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী ফারুক আহমেদ বলেন, প্রতিনিয়তই ভাঙন অব্যহত রয়েছে। অতি ভাঙন কবলিত এলাকায় সাময়িক সময়ের জন্য বালু ভর্তি জিও ব্যাগ ফেলা হবে। তবে মেঘনা নদীর তীর রক্ষাবাঁধ নির্মাণ সেনা বাহিনী না ঠিকাদারের মাধ্যমে বাস্তবায় হবে। বিষয়টি সরকারের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত। তাঁরা যেভাবে আদেশ করবে সেবাবে বাস্তবায়ন হবে।
কাজের অগ্রগতির বিষয়ে তিনি জানান, একনেক সভায় অনুমোদন হলেও এখনো ফাইল প্রসেসিং শেষ হয়নি। প্রক্রিয়া শেষে প্রকল্প অনুযায়ী অর্থ ছাড় পেলে, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসেই তীর রক্ষাবাঁধ নির্মাণ কাজ শুরু করা যাবে। তবে প্রথম ধাপে ১০ কিলোমিটার করে মোট তিন ধাপে রক্ষাবাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা হাতে রয়েছে বলে জানান তিনি।

এবিএন/অ আ আবীর আকাশ/গালিব/জসিম

এই বিভাগের আরো সংবাদ
ksrm