বিবিসি বাংলা প্রতিবেদন

যে দুশ্চিন্তা আচ্ছন্ন করে রাখে ঢাকার পথচারী নারীদের

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ১৪ জানুয়ারি ২০২০, ১৫:৫২

‘সেদিন একটা কাজে যেতে বাসে উঠেছিলাম। হঠাৎ খেয়াল হলো আমার পাশের সিটের পুরুষ যাত্রী আমার শরীর ঘেঁষে বসার চেষ্টা করছেন। আমি জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিলাম। গায়ে মৃদু ধাক্কা লাগার পর চোখ ফেরাতেই একেবারে হতভম্ব হয়ে যাই। লোকটার কোলে একটা ব্যাগ রাখা ছিল। ব্যাগের ফাঁক দিয়ে লোকটা পুরুষাঙ্গ দেখাচ্ছিল। লোকটি আমার গা ঘিনঘিন করছিল। কিন্তু প্রতিবাদ করতে পারিনি। আমি শুধু সিট থেকে উঠে বাসের পেছনের দিকে অন্য সিটে গিয়ে বসে পড়ি।’

বলছিলেন সাবিহা আফরোজ, তিনি স্বামীর সঙ্গে মিলে একটি ট্যুর কোম্পানি পরিচালনা করেন। ব্যবসা কিংবা ব্যক্তিগত কাজে প্রায় প্রতিদিনই তাকে বাড়ির বাইরে বের হতে হয়।

আফরোজ বলছেন, যে হারে ধর্ষণ, যৌন নির্যাতনের মতো ঘটনা বাড়ছে তাতে করে প্রতিদিনই নিজের নিরাপত্তা নিয়ে এক রকম টেনশন কাজ করে তার মধ্যে। আগে চিন্তা হতো যে, সড়ক দুর্ঘটনা, ছিনতাই বা এ রকম কোনো সমস্যায় পড়ব কি-না। বেঁচে ফিরব কি-না। এখন সে রকম কোনো চিন্তা মাথায় কাজ করে না। এখন সবার আগে মাথায় এ চিন্তা আসে যে, আমি নিজের সতীত্ব নিয়ে বাসায় ফিরতে পারব তো?’

‘ব্যাগে কাঁচি নিয়ে বের হই’
সম্ভাব্য যৌন হয়রানি কিংবা এ ধরনের বিপদ এড়াতে অনেক নারী এখন নিজেরাই বিভিন্ন উপায় অবলম্বন করে থাকেন। এ রকমই একজন তামজিন নাইমা। তিনি একজন স্কুলশিক্ষক। নিজেকে নিরাপদ রাখতে তিনি কারাতে শিখেছেন।

নাইমা বলেন, ‘কারাতে আমাকে কনফিডেন্স দিয়েছে। কিন্তু সত্যি কথা বলতে আমি শারীরিকভাবে বেশ দুর্বল। ফলে ব্যাগে করে আমি কাঁচি বা এ ধরনের জিনিস নিয়ে বের হই।’

সাবিহা আফরোজও বলছেন একই ধরনের সতর্কতার কথা। ‘আমি কোথাও গেলে অনেক কিছু চিন্তা করে বের হই। যেখানে মানুষজন কম, সেখানে থাকি না। অনেক সময় বাসে কম যাত্রী থাকলে উঠি না। এ জন্য অনেকক্ষণ অপেক্ষায় থাকতে হয়। এ ছাড়া সঙ্গে সেফটি পিন রাখি, এন্টি কাটার রাখি কোনো বিপদে পড়লে যেন কিছুটা কাজে আসে সে জন্য।’

অভিভাবকদেরও দুশ্চিন্তা বেড়েছে
দেশে শুধু যে নারীরা ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন, তা নয়। শিশুরাও ধর্ষণ কিংবা যৌন হয়রানির মুখে পড়ছেন। বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের তথ্যে দেখা যায়, গত বছরে শিশু ধর্ষণের সংখ্যা হাজার ছাড়িয়েছে। ফলে অভিভাবকদেরও দুশ্চিন্তা বেড়েছে।

এ রকমই একজন ঢাকার নাজমা রশীদ। তার এক ছেলে, এক মেয়ে। ছেলের বয়স ১৬। আর মেয়ের বয়স ১৬। ছেলেকে নিয়ে তার ততটা ভাবতে হয় না। যতটা ভাবতে হয় মেয়েকে নিয়ে।

তিনি বলেন, ‘আমার ছেলে বাইরে খেলতে যায়। মেয়েকে কোথাও একা যেতে দিই না। সারাক্ষন চোখে চোখে রাখি। কাউকে বিশ্বাস করা যায় না তো। ওর বয়স যখন এক বছর হয়, তখন থেকেই ওকে কোন পুরুষ আত্মীয়ের কোলেও দিতাম না। মেয়েকে যেনো নিরাপদে রাখতে পারি, এ জন্যই ৭ বছর আগে চাকরিটাও ছেড়ে দিয়েছি। এর পরও ভরসা পাই না। সবসময় তো আর নজরে রাখা সম্ভব হয় না।’

পরিস্থিতি কতটা স্বাভাবিক
নারীরা বলছেন, তাদের মধ্যে যৌন নির্যাতনের শিকার হবার ভয় ঢুকে গেছে। এমনকি শিশুদের ক্ষেত্রেও এ ভয় তাড়া করে ফিরছে অভিভাবকদের। কিন্তু এ ধরনের পরিস্থিতি একটা সমাজের জন্য কতটা স্বাভাবিক?

সমাজবিজ্ঞানী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন, সাদেকা হালিম বলছেন, এ ধরনের পরিস্থিতি মোটেই স্বাভাবিক নয়। প্রত্যেকটা নারীর নিজস্ব বলয় আছে। বাংলাদেশে জনসংখ্যার পঞ্চাশ শতাংশেরও বেশি নারী। তাদের মধ্যেই আবার প্রায় ৬২ শতাংশ নারী কর্মজীবী। এখন তাদের যদি নিরাপত্তা নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হয়, রাতে বের হবো কি-না সেটা ভাবতে হয়, তা হলে এটাতো তো তাদের পদে পদে বাধা সৃষ্টি করবে।

তিনি বলছেন, এ ধরনের মানসিক চাপ বা ভীতি নিয়ে ব্যক্তির ওপর যেমন প্রভাব ফেলে, তেমনি সেটা সামাজিক অগ্রগতিকেও ব্যাহত করে।

এবিএন/সাদিক/জসিম

এই বিভাগের আরো সংবাদ