ভারতে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছিলেন যে ইংরেজ নারী

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ০৯ মার্চ ২০১৯, ২১:৩২

ফ্রেডা বেদীর জীবনটা বেশ বৈচিত্র্যময়। জন্ম ইংল্যান্ডের ছোট্ট এক শহরে। প্রেমে পড়ে তিনি চলে যান ভারতে। সেখানে গিয়ে জড়িয়ে পড়েন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের সাথে। তার জীবনীকার অ্যান্ড্রু হোয়াইটহেড বলছেন সেই চমৎকার কাহিনী।

"কিছু কিছু বিষয় রয়েছে যা বর্ণ বা সংস্কারের চেয়ে গভীর। ভালবাসা হচ্ছে তেমনি একটি বিষয়।"- এই কথাগুলো ফ্রেডা বেদীর, একজন ইংরেজ নারী। ইংল্যান্ডের তৎকালীন সমাজব্যবস্থার সমস্ত কুসংস্কারকে পায়ে দলে যিনি বিয়ে করেছিলেন একজন ভারতীয় শিখকে, এবং একজন মা ও স্ত্রীর ভূমিকা সম্পর্কে ভারতীয় সমাজে যেসব প্রচলিত ধ্যানধারণা ছিল তাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিলেন।

ফ্রেডার সঙ্গে বাবা পেয়ারে লাল বেদী, বন্ধুরা যাকে সংক্ষেপে বিপিএল বলেন ডাকেন, তাদের দেখা হয়েছিল অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে। দুজনেই সেখানে পড়াশুনা করতেন।

সময়টা ছিল ১৯৩০-এর দশক। বর্ণপ্রথার বেড়াজালকে ডিঙিয়ে দু'জন মানুষের মধ্যে প্রেম হওয়ার ঘটনা ছিল চিন্তার বাইরে। সে সময় অক্সফোর্ডের মত বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রীর সংখ্যাও ছিল খুব কম। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মেয়েদের জায়গা দিতে মানসিকভাবে তৈরি ছিল না।

ফ্রেডার পরিবার অবশ্য খুব ধনী ছিল না। তার জন্ম ডার্বি শহরের এক দোকান ঘরের ওপর তলায় এক ফ্ল্যাটে। বাবা একটি গহনার দোকান চালাতেন এবং ঘড়ি সারাই করতেন। তবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ফ্রেডার শৈশবেই তিনি মারা যান।

কিন্তু পরবর্তী জীবনে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ফ্রেডার জীবনকে একেবারে বদলে দিয়েছিল। "আমার চোখের সামনে খুলে দিয়েছিল বিশ্বের জানালা," বলছিলেন তিনি।

বিশ্বব্যাপী আর্থিক মন্দা, তীব্র বেকারত্ব আর ফ্যাসিজমের প্রসারের সময় ফ্রেডার মত যারা পড়াশুনা করতেন তাদের ডাকা হতো 'ডিপ্রেশন জেনারেশন' বা 'মন্দার প্রজন্ম' হিসেবে।

অক্সফোর্ডে ফ্রেডার সাথে ভাব হয়েছিল যেসব মেয়েদের তারা প্রায় সবাই ছিল মন-মানসিকতায় বিদ্রোহী। তাদের সাথে নিয়ে ফ্রেডা লেবার ক্লাব এবং কমিউনিস্টপন্থী অক্টোবর ক্লাবের মিটিং-এ যোগদান করতেন।

পাশাপাশি ব্রিটিশ সম্রাজ্যের বিরুদ্ধে যারা লড়াই করছিলেন তাদের প্রতিও ফ্রেডার ছিল কৌতূহল এবং সহমর্মিতা। সেকারণেই তিনি যেতেন 'অক্সফোর্ড মজলিস'-এর সাপ্তাহিক বৈঠকে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে যে স্বল্পসংখ্যক ভারতীয় ছাত্র ছিলেন, তারা এই মজলিসে এসে ভারতের স্বাধীনতা নিয়ে কথাবার্তা বলতেন। সুদর্শন পাঞ্জাবী ছাত্র বিপিএল বেদী এই মজলিসে নিয়মিত যেতেন।

প্রথম দিকে ফ্রেডা আর বিপিএল-এর মধ্যে চেনা-জানার সম্পর্কের ভিত্তি ছিল ইন্টেলেকচুয়াল। পরে সেটা বন্ধুত্ব এবং প্রেমে রূপ নেয়।

উনিশশো তিরিশ-এ অক্সফোর্ডের মেয়েদের কলেজগুলো খুবই কট্টরপন্থী। বিশেষভাবে নর-নারীর সম্পর্ককে তারা সেক্স-এর বাইরে ভাবতেই পারতো না। কোন ছাত্র যদি কোন ছাত্রীর হোস্টেল কক্ষে গিয়ে দেখা করতে চাইতো, তখন ঘরের দরোজা খোলা রাখতে হতো এবং ঘরের মধ্যে একজন আয়াকে পাহারা রাখা হতো। আর হস্টেল রুমের বিছানাটিকে সরিয়ে করিডরের রাখা হতো।

এই সম্পর্কটি যাতে না বাড়ে তার জন্য ফ্রেডার কলেজ নানা পদক্ষেপ নিয়েছিল। তিনি একবার বিপিএল-এর সাথে কোন পাহারাদার ছাড়াই দেখা করেছিলেন বলে কলেজ তাকে খুব বকাঝকা করেছিল। পুরো বিষয়টা বর্ণবাদী ছিল ফ্রেডা মনে করেন।

কিন্তু অক্সফোর্ডে ফ্রেডা কিছু ভাল বান্ধবী পেয়েছিলেন। তাদের মধ্যে একজন হলেন বারবারা কাস্ল, যিনি পরে খুবই প্রভাবশালী এক রাজনীতিকে পরিণত হন।

ফ্রেডা যখন তাকে জানালেন যে তিনি বিপিএলকে বিয়ে করতে চান, তখন তার বান্ধবী খুবই খুশি হয়ে তাকে বলেছিলেন, "যাক্ বাঁচা গেল। তুমি অন্তত কোন সাধারণ গৃহবধূ হবে না।"

তবে ফ্রেডার মা বিষয়টাকে মোটেই সেভাবে দেখেননি। তারা বিয়েটাকে কোনমতেই মেনে নিতে চাননি। শেষ পর্যন্ত বিপিএল নিজে ডার্বি গিয়ে ফ্রেডার পরিবারের সাথে দেখা করার পর তারা মত বদল করেন।

ফ্রেডা বলছিলেন, তার বিয়ের ঘটনাটি অক্সফোর্ডে বেশ হৈচৈ ফেলেছিল। তার মতে তিনিই অক্সফোর্ডের প্রথম কোন স্নাতক শ্বেতাঙ্গ ছাত্রী যিনি কোন ভারতীয় সহপাঠীকে বিয়ে করেছিলেন। তবে এই বিয়ের ব্যাপারে অনেকেই তাদের বিরাগ ঢেকে রাখতে পারেননি।

এমনকি বিয়ের পর রেজিষ্ট্রার নব দম্পতির সাথে হাত মেলাতেও অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। বিয়ের পর থেকে ফ্রেডা নিজেকে ভারতীয় জীবনধারার সাথে খাপ খাওয়াতে সচেষ্ট হয়ে ওঠেন।

ছাত্র আন্দোলনের সাথে যুক্ত থাকার সুবাদে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যেই দুজনকেই বিপ্লবী এবং গোলযোগ সৃষ্টিকারী হিসেবে চিহ্নিত করে রেখেছিল।

এক বছর পর তারা যখন তারা যখন তাদের শিশু সন্তান রাঙাকে নিয়ে জাহাজে করে তৎকালীন বম্বেতে (এখনকার মুম্বাইতে) এসে নামেন, তখন কর্তৃপক্ষ সাত ঘণ্টা ধরে তাদের মালপত্রে তল্লাশি চালায়।

পুলিশ তাদের কাছে বামপন্থী প্রচারপত্র খুঁজছিল। "এমনকি রাঙার ছোট রুমালগুলিও সরিয়ে নেয়া হয়েছিল," বলছেন তিনি, "তারা সন্দেহ করছিল রুমালের মধ্যে ওসব প্রচারপত্র লুকানো থাকতে পারে।"

ফ্রেডার বিবাহিত জীবনে এক বড় ধরনের পরীক্ষা আসে হয় যখন তার সাথে তার বিধবা শাশুড়ির প্রথমবার দেখা হয়। তার শাশুড়ি ছিল বেশ ডাকসাইটে। সবাই তাকে 'ভাবুজি' বলে ডাকতো।

বম্বে থেকে বেদী দম্পতি কয়েক দিন ধরে পথ চলার পর এসে পৌঁছান পাঞ্জাবের ছোট এক গ্রাম কাপুরথালায়। তখন মধ্যরাত। বিপিএল মায়ের পা ছুঁয়ে প্রণাম করলেন। সাধারণ তাঁতের শাড়ী পরা ফ্রেডাও দেখাদেখি শাশুড়িকে প্রণাম করলেন।

"প্রথম দিকে আমার একটু অস্বস্তি লাগছিল। কিন্তু আমার সব জড়তা কেটে গেল যখন আমি দেখলাম আমার শাশুড়ি সজল চোখে আমাদের জড়িয়ে ধরলেন। তিনি যেন আমাদের ছাড়তেই চাইছিলেন না।"

স্বামীর ভারতীয় পরিবারের সাথে ফ্রেডা খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা করলেও তার জীবনযাপন ছিল একেবারেই ভিন্ন ধরনের।

বিপিএল-এর বাম রাজনৈতিক বিশ্বাসের জন্য তিনি পরিবারের কাছ থেকে কোন সম্পদ গ্রহণ করেন নি। তারা লাহোরে গিয়ে যে বাড়িতে ওঠেন তা ছিল কুঁড়ে ঘর। সেখানে ছিল না কোন বিদ্যুৎ কিংবা কোন জলের সংযোগ।

বাড়িতে তারা মুরগী পুষতেন আর মোষ পালন করতেন। এই জীবন প্রণালী ফ্রেডা মোটেও আশা করেননি। তেমনি শাশুড়িকে নিয়ে থাকাও তার কাছের ছিল একেবারেই নতুন ধারণা।

"একজন শ্বেতাঙ্গ নারী ভারতীয় পুত্রবধূ হয়ে ওঠার চেষ্টা করছে, এমন ব্যাপার আমি কোথাও দেখিনি," বলছিলেন সোম আনন্দ, যিনি একসময় বেদী পরিবারের নিয়মিত অতিথি ছিলেন।

"মিসেস বেদী প্রতিদিন সকালে ভাবুজির ঘরে ঢুকে তাকে প্রণাম করতেন। শাশুড়ির পছন্দ-অপছন্দের দিকেও নজর রাখতেন। শাশুড়িও ছিলেন উদারমনা। সব কিছু জেনে শুনেই তিনি খ্রিস্টান পুত্রবধূকে আপন করে নিয়েছিলেন।"

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বাঁধলে বিপিএল এবং ফ্রেডা প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। কারণ ব্রিটেন তার নিজের স্বার্থের জন্য ভারতকে এই লড়াইতে সামিল করেছিল।

পাঞ্জাবে সেনাবাহিনীতে নিয়োগ যাতে ভণ্ডুল করতে না পারেন, সেজন্য বিপিএল-কে মরুভূমির মধ্যে এক জেলখানায় কয়েদ করে রাখা হয়েছিল। ফ্রেডাও নিজের মাতৃভূমি বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে তৈরি হচ্ছিলেন।

ভারতের স্বাধীনতার দাবিতে মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী যে সত্যাগ্রহ আন্দোলন শুরু করলেন ফ্রেডা তাতে একজন স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে যোগ দেন।

তিনি তার স্বামীর গ্রামের বাড়ি ডেরা বাবা নানকে গিয়ে ঘোষণা করেন যে "ভারত যতদিন একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত না হবে ততদিন তিনি সব ভারতীয়কে বলবেন বিশ্বযুদ্ধে সামিল না হতে।"

এটা একটা উস্কানিমূলক বক্তব্য যার জন্য শাস্তির বিধান ছিল। কিন্তু একজন শ্বেতাঙ্গ নারীর পক্ষ থেকে এই ঘোষণা আসার পর তাকে নিয়ে কী করা হবে কর্তৃপক্ষ তা বুঝতে পারছিল না। তাই তারা সেখানে একজন ইংরেজ পুলিশ অফিসারকে পাঠায়।

ফ্রেডা বেদীকে আটক করে একজন ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করা হয়। তারপরের কথোপকথন ছিল এরকম:

"কাজটা আপনার জন্য যেমন সুখকর না, আমার জন্যও না," ম্যাজিস্ট্রেট বিড়বিড় করে বললেন।

"এটা নিয়ে ভাববেন না। আমার মোটেই খারাপ লাগছে না।"

"ইংরেজ নারী হিসেবে যেসব সুযোগ-সুবিধে আপনি পেতে পারেন, সেটা কি আপনি চান?"

"আপনি আমাকে একজন ভারতীয় নারী হিসেবেই দেখবেন। আমি তাতেই খুশি হবো।"

এরপর ম্যাজিস্ট্রেট ফ্রেডাকে ছয় মাসের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়ে জেলে পাঠিয়ে দেন।

কিন্তু জেলের জীবন খুব একটা কঠিন ছিল না। জেলে যেসব নারী কয়েদি ছিল, যারা ফৌজদারি অপরাধের জন্য দণ্ড ভোগ করছিলে, তারাই ফ্রেডার বেশির ভাগ কাজ করে দিত।

"ভারত ছিল আমার ভবিতব্য," বলছেন ফ্রেডা। একজন ইংরেজ নারী হয়ে ভারতের স্বাধীনতা দাবি করে কারাগারে গিয়ে বিখ্যাত হওয়াও তার ভবিতব্যই ছিল।

বেদী দম্পতির রাজনৈতিক খ্যাতি ভারতের স্বাধীনতার পরও বজায় ছিল। স্বাধীনতার পর তারা কাশ্মীরে চলে যান এবং কাশ্মীরী জাতীয়তাবাদীদের সাথে মিলে গড়ে তোলেন বামপন্থী নারী মিলিশিয়া গ্রুপ।

উনিশশো পঞ্চাশ সালে ফ্রেডা বেদীর জীবনে একটা বড় পরিবর্তন আসে। বার্মায় জাতিসংঘের দায়িত্ব পালনের সময় তিনি বৌদ্ধ ধর্মের সাথে পরিচিত হন এবং বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করেন।

উনিশশো উনষাট সালে চীনা নিষ্পেষণের শিকার হয়ে যখন হাজার হাজার তিব্বতি তাদের দেশ ছেড়ে পালাতে শুরু করেন, তখন ফ্রেডা ঐ শরণার্থীদের সাহায্যে এগিয়ে আসেন।

এক সময় তিনি বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে তিনি তার সন্তানদের প্রতি দায়িত্ব শেষ করেছেন। (তার তিন সন্তানের একজন হলেন চিত্র তারকা কবির বেদী।)

তিব্বতি বৌদ্ধ ধর্মের সাথে তিনি এতটাই মিশে যান যে তিনি বৌদ্ধ সন্ন্যাসিনীর শপথ নেন। তার বয়স যখন ষাটের কোঠায় তখন তিনি বৌদ্ধ ধর্মের বাণী প্রচারের জন্য সারা বিশ্ব ঘুরে বেড়ান। কিন্তু তিনি কখনই আর কোন পশ্চিমা দেশে গিয়ে থাকেন নি।

"একজন নারী এবং একজন স্ত্রী হিসেবে আমি বিকশিত হয়েছি ভারতের মাটিতে," তিনি বলেছিলেন। রুপার্ট ব্রুকের কবিতা উদ্ধৃত করে তিনি আরও বলেছিলেন, "তবে আমি সেই একমুঠো ধুলো যাকে জন্ম দিয়েছে, আকার দিয়েছে এবং জ্ঞান দিয়েছে ইংল্যান্ড। যদিও আমি ভারতীয় জীবনধারা গ্রহণ করেছি, আমার স্বামী-সন্তানরাও ভারতীয়, তবুও আমি মনে করি না আমি এবং আমার নতুন দেশের মধ্যে কোন ধরনের বাধা রয়েছে কিংবা কোন পার্থক্য রয়েছে।"

সারা জীবন ধরে ফ্রেডা জাতি, ধর্ম, বর্ণ, কিংবা লিঙ্গের বাধা অতিক্রম করে এসেছেন। প্রচলিত নিয়মের ওপর তিনি কুঠারাঘাত করেছেন। প্রচলিত চিন্তাভাবনাকে চ্যালেঞ্জ করে তিনি সবাইকে চমকে দিয়েছেন।
তার সে জন্যই তার জীবনের গল্প এতটাই আকর্ষণীয়।

এবিএন/মমিন/জসিম

এই বিভাগের আরো সংবাদ
well-food