ফেসবুক কোনো রাষ্ট্র হলে আচরণ হতো উ. কোরিয়ার মতো

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২০, ০১:০৫

ফেসবুককে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে পারে এমন কোনও শক্তি কি পৃথিবীতে আছে? হয়তো নেই! সংবিধান পারেনি, আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা পারেনি, নীতিনির্ধারকরা পারেননি, কংগ্রেস ব্যর্থ হয়েয়ে, ব্যর্থ ইউরোপীয় ইউনিয়নও। ক্যামব্রিজ অ্যানালিটিকা কেলেঙ্কারিতে ফেডারেল বাণিজ্য কমিশন যখন ফেসবুককে ৫০০ কোটি ডলার জরিমানা করল, তখন এর শেয়ারের মূল্য বরং বেড়ে গেছিল।

এটাই বিষয়টিকে সবচেয়ে মজাদার, সম্ভবত যুগান্তকারী করে তুলেছে। ইউনিলিভার, কোকা-কোলা, স্টারবাকসের মতো বিশ্বের বৃহত্তম ব্র্যান্ডগুলোর ফেসবুক বয়কটের সিদ্ধান্ত যদি সফল হয়, তবে তা হবে একমাত্র যে কারণে, তা হলো- তারা সেটাই টার্গেট করেছে, যেটা ফেসবুক বোঝে। আর যদি ব্যর্থ হয়, তাহলেও সেটা হবে আরেক মাইলফলক।

কারণ, ফেসবুকই একমাত্র কোম্পানি যা কোনও বিদেশি শক্তির মাধ্যমে মার্কিন নির্বাচনে আক্রমণকে সহজ করে দিয়েছিল, যে একটি গণহত্যা সরাসরি সম্প্রচার করেছিল এবং বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের কাছে তা পৌঁছে দিয়েছিল (ক্রাইস্টচার্চে মসজিদে হামলা), তারাই একটি গণহত্যা উসকে দিতে সহায়তা করেছিল (রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমার সেনাদের নির্যাতন)।

সাবেক ব্রিটিশ উপ-প্রধানমন্ত্রী নিক ক্লেগ গত সপ্তাহে লিখেছেন, ‘ফেসবুকের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো সমাজের সামনে আয়না তুলে ধরে।’ কিন্তু, ফেসবুক কোনও আয়না নয়, এটা হচ্ছে বন্দুক, লাইসেন্সবিহীন বন্দুক- এটা আইন মানার জন্য বা নিয়ন্ত্রণের জন্য নয়- এটা মানুষের হাতে হাতে। ফেসবুক হচ্ছে ২৬০ কোটি মানুষের বাড়ি, যা যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে কাজ করা গুপ্তচর দিয়ে ভরা; এটি এমন গোষ্ঠীগুলোর জন্য পরীক্ষাগার যারা গণহত্যার প্রশংসা করে এবং বিশ্বাস করে যে, ৫জি ঘুমের মধ্যে আমাদের মস্তিষ্ক ভাজা ভাজা করে ফেলবে।

মানুষজন অনেক সময় বলে, ফেসবুক যদি কোনও রাষ্ট্র হতো, তবে তা হতো চীনের চেয়ে বড়। কিন্তু, এই বিশ্লেষণ ঠিক নয়। ফেসবুক যদি কোনও রাষ্ট্র হতো, তবে তা হতো কোনও দুর্বৃত্ত রাষ্ট্র। এটা হতো উত্তর কোরিয়া। আর ফেসবুক কোনও বন্দুক নয়, সে হচ্ছে পারমাণবিক অস্ত্র।

কারণ, এটি সাধারণ কোনও কোম্পানি নয়; এটি হচ্ছে স্বৈরতন্ত্র, একনায়কতন্ত্রের মতো একজন মানুষের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত একটা সাম্রাজ্য। যার বিরুদ্ধে ক্ষয়ক্ষতির প্রমাণ থাকলেও তিনি হয়ে উঠেছেন অনস্বীকার্য, অনির্বচনীয়, অপ্রতিরোধ্য। তিনি বিশ্বজুড়ে তার সমালোচকদের উপেক্ষা করার পথ বেছে নিয়েছেন।

এটি সংবাদের মূল মাধ্যমগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করলেও অবিশ্বাস্য, উদ্বেগমূলক প্রচারণা চালিয়েই যাচ্ছে। উত্তর কোরিয়ার মানুষেরা যেমন দেশের বাইরে কাজ করতে অক্ষম; তেমনি ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ এবং ইনস্টাগ্রাম স্পর্শ ছাড়া আজ বেঁচে থাকা প্রায় অসম্ভব বলেই মনে হয়।

#স্টপহেটফরপ্রফিট ক্যাম্পেইন মূলত বিদ্বেষমূলক বক্তব্য প্রতিরোধের লক্ষ্যে। এটি বিজ্ঞাপনদাতের জুলাই মাসে ফেসবুকের বিজ্ঞাপন বন্ধে উদ্বুদ্ধ করতে আমেরিকার ছয়টি নাগরিক অধিকার সংস্থাকে ঐক্যবদ্ধ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রে ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটারস’ আন্দোলনকারীদের হুমকি দিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘লুটপাট শুরু, তো গুলি শুরু’ পোস্ট সরিয়ে নিতে ফেসবুক অস্বীকৃতি জানানোর পর শুরু হয়েছিল এ ক্যাম্পেইন।

তবে, বিষয়টি বর্ণবিদ্বেষ নিয়ে ফেসবুকের সমস্যার চেয়ে আরও বড়। এটি যুক্তরাষ্ট্র ছাড়িয়ে বহুদূরে পৌঁছে গেছে। ফেসবুকের ক্ষতি এখন বৈশ্বিক। এটি গণতন্ত্রের অস্তিত্বের জন্য হুমকি।

এটি কি কাকতালীয়, যে তিনটি দেশ করোনাভাইরাসকে সবচেয়ে বাজেভাবে মোকাবিলা করেছে, তাদের নেতারা ফেসবুকে মিথ্যা ছড়িয়ে দেয়ার ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়েছেন? ট্রাম্প, বোলসোনারো ও জনসন। সম্ভবত হ্যাঁ, সম্ভবত না!

মার্ক জুকারবার্গ কিম জং উন নন। তিনি আরও অনেক বেশি ক্ষমতাবান। গত সপ্তাহে তিনি নিজের কর্মীদের বলেছেন ‘সব বিজ্ঞাপনদাতা শিগগিরই এই প্ল্যাটফর্মে ফিরে আসবে’। যদিও এ পর্যন্ত ৫০০ কোম্পানি ফেসবুক বয়কট করেছে, তবে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন অনুসারে, এটি ফেসবুকের লাভের পাঁচ শতাংশ মাত্র। সুতরাং, ফেসবুক শুধু চীনের চেয়েই নয়, এটি পুঁজিবাদের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে।

শেষ পর্যন্ত বিষয়টা আমাদের এবং আমাদের মানিব্যাগের ওপরই নেমে আসে, এ নিয়ে ওই ব্র্যান্ডগুলোকে আর কী বলা যায়? বিশ্ব এখন বুঝতে পেরেছে, তাদের উদ্ধারে কেউ এগিয়ে আসছে না। ট্রাম্প এবং জুকারবার্গ একটি অব্যক্ত ও অবধারিত কৌশলগত জোট গঠন করেছেন। কেবল যুক্তরাষ্ট্রেরই রয়েছে ফেসবুকের ডানা চেপে ধরার ক্ষমতা এবং ট্রাম্পের মিথ্যাচার প্রচার বন্ধের ক্ষমতা রয়েছে কেবল ফেসবুকের।

অনেক সময় ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলো মানুষ বুঝতে পারে না, যতক্ষণ না অনেক দেরি হয়ে যায়। হয়তো কখনও কখনও পারে। এবারে হয়তো এখনও খুব বেশি দেরি হয়নি।

এবিএন/শংকর রায়/জসিম/পিংকি

এই বিভাগের আরো সংবাদ