বিতর্কের পরও সৌদি আরবকে কেন অস্ত্র জুগিয়েই চলেছে ব্রিটেন

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ১৪ জুলাই ২০২০, ১৩:৩৬

ইয়েমেনে লড়াই চলছে পাঁচ বছর ধরে। এই যুদ্ধে বেসামরিক মানুষের মৃত্যু বেড়ে চলার পটভূমিতে সৌদি আরবে অস্ত্র রপ্তানিতে ব্রিটেনের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক ক্রমশ বাড়ছে।

কেন সৌদিদের অস্ত্র জোগাতে এত আগ্রহী ব্রিটেন? 
তেল সমৃদ্ধ সৌদি আরব বিশ্বে অস্ত্রের সবচেয়ে বড় ক্রেতা দেশ। আরব দুনিয়ার সবচেয়ে দরিদ্র দেশ প্রতিবেশী ইয়েমেনে বিদ্রোহীদের দমনে বিমান হামলায় নেতৃত্ব দিচ্ছে সৌদি আরব। গত বছর এক রিপোর্টে ব্রিটেন নিজেকে বিশ্বের দ্বিতীয় সর্ববৃহৎ অস্ত্র বিক্রেতা বলে বর্ণনা করেছে। ব্রিটেন যত অস্ত্র রপ্তানি করে, তার ৪০ শতাংশই বিক্রি করে শুধু একটি দেশের কাছে- সেটি হলো সৌদি আরব।

ইয়েমেন যুদ্ধে সৌদিদের পাশে রয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। ২০১৯ সালে প্রকাশিত ব্রিটিশ সরকারের প্রতিবেদন অনুযায়ী তারাও ব্রিটেনের কাছ থেকে অস্ত্র কেনার তালিকায় উপরের দিকেই রয়েছে। অস্ত্র ব্যবসার হিসাবে ব্রিটেনের তুলনায় এগিয়ে আছে একমাত্র আমেরিকা।

ইয়েমেনের অবস্থান কী?
ব্রিটেনের এই কোটি কোটি পাউন্ড মুনাফার অস্ত্র ব্যবসা ইয়েমেনে সাধারণ মানুষের জীবন কীভাবে বিপন্ন করে তুলেছে এবং কী ধরনের ভয়ানক প্রভাব ফেলছে, ব্রিটেনের বিরোধী রাজনীতিক ও অস্ত্র ব্যবসার বিরোধীরা তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।

জাতিসংঘ বলছে, ইয়েমেনে বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ একটা মানবিক সঙ্কট তৈরি হচ্ছে।

জাতিসংঘ তাদের রিপোর্টে যাচাই করা তথ্য তুলে ধরে বলছে, ২০২০-র মার্চ পর্যন্ত ইয়েমেনে মূলত সৌদি নেতৃত্বাধীন বিমান হামলায় বেসামরিক মানুষ মারা গেছে অন্তত ৭ হাজার ৭০০ জন।

অন্যান্য পর্যবেক্ষক গোষ্ঠী অবশ্য বলছে যে সেখানে মৃতের প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি সংস্থা এসিএলইডি-র (আমর্ড কনফ্লিক্ট লোকেশান অ্যান্ড ইভেন্ট ডেটা প্রজেক্ট) নথিভুক্ত করা পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৯ সালের অক্টোবর মাস পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা এক লাখ, যার মধ্যে সরাসরি হামলায় নিহত বেসামরিক মানুষের সংখ্যা ১২ হাজার।

ইয়েমেনের জনসংখ্যা দুই কোটি ৪০ লাখ। এর মধ্যে ৮০ শতাংশের মানবিক সহায়তা এবং সুরক্ষার প্রয়োজন। আনুমানিক হিসাব অনুযায়ী দেশটিতে বিশ লাখ শিশু গুরুতর অপুষ্টির শিকার, যাদের মধ্যে প্রায় ৩ লাখ ৬০ হাজার শিশুর বয়স পাঁচের নিচে।

ব্রিটিশ সরকারের বক্তব্য কী?
গত গ্রীষ্মে মানবাধিকার আন্দোলনকারীরা ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে বড় ধরনের একটা বিজয় পেয়েছিল। তারা বিষয়টি আদালতে নিয়ে যায়, এবং আদালতের নির্দেশে ব্রিটিশ সরকার সৌদি আরবে অস্ত্র রপ্তানি বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়।

আদালত সরকারের এই অস্ত্র বিক্রির নীতি ইয়েমেনে আন্তর্জাতিক আইনের ‘গুরুতর লঙ্ঘন’ কি-না, তা বিবেচনা করে দেখার নির্দেশ দেয়।

প্রায় এক বছর পর সরকার তার মূল্যায়ন শেষে ঘোষণা করে যে তারা অস্ত্র বিক্রি আবার শুরু করবে।

‘সৌদি আরবের অভিপ্রায় সঠিক এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন মেনে চলার ক্ষমতা দেশটি রাখে,’ জানান ব্রিটেনের বাণিজ্য বিষয়কমন্ত্রী লিজ ট্রাস। তিনি সরকারি বক্তব্য তুলে ধরে বলেন যে সেখানে আইন লঙ্ঘনের ‘বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা’ ঘটেছে মাত্র।

এমপিদের কাছে এক লিখিত বিবৃতিতে তিনি জানান, ‘যেসব ঘটনা আইনের সম্ভাব্য লঙ্ঘন বলে সরকারকে বিবেচনা করে দেখার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল, তা ঘটেছে বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন পরিস্থিতিতে এবং বিভিন্ন কারণে।’

সমালোচনা কেন?
ব্রিটেনের লেবার পার্টির এমিলি থর্নবেরি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিষয়ে বিরোধী দলের মুখপাত্র। তিনি মনে করেন যে সরকার তার এই সিদ্ধান্তের স্বপক্ষে ‘নৈতিক যুক্তি’ দিতে পারবে না, এবং তিনি বলেছেন এর মাধ্যমে ব্রিটেনের ‘মানবাধিকারের পক্ষের ভাবমূর্তি’ ক্ষুণ্ন হচ্ছে।

গত বছর ব্রিটিশ সরকারকে আদালতে নিয়ে গিয়েছিল যে অস্ত্র ব্যবসা-বিরোধী সংগঠন, সেই ‘দ্য ক্যাম্পেইন এগেনস্ট আমর্স ট্রেড বা ক্যাট’ বলছে এটি ‘নৈতিকভাবে দেউলিয়া’ একটা সিদ্ধান্ত।

মধ্যপ্রাচ্যে বিমান হামলায় হতাহাতের বিষয়টি নজরদারি করে এমন একটি ব্রিটিশভিত্তিক সংস্থা ‘এয়ারওয়ারস্’ বলছে, সৌদি আরবকে অস্ত্র সরবরাহ করার জন্য ব্রিটিশ সরকারের সবুজ সঙ্কেত দেওয়ার প্রক্রিয়া সন্দেহজনক এবং অনির্ভরযোগ্য।

এই সংগঠনটির দাবি, মিত্র দেশ সৌদিদের কথা যদি ছেড়েও দেয়া হয়, তার পরেও ব্রিটেন নিজেই যে সংখ্যায় বিমান ইয়েমেনে হামলা চালিয়েছে, তার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

‘ব্রিটেন তদন্তের ক্ষেত্রে যেসব মাপকাঠি নির্ধারণ করেছে, তাতে বেসামরিক মানুষের ক্ষতির বিষয়টা স্বীকার করে নেয়ার পথ অসম্ভব করে দেয়া হয়েছে,’ বলছে এয়ারওয়ারস্।

সংগঠনটি তাদের যুক্তির সমর্থনে ইসলামিক স্টেট-এর বিরুদ্ধে ব্রিটেনের পাঁচ বছর ব্যাপী লড়াইকে দৃষ্টান্ত হিসাবে তুলে ধরেছে।

ব্রিটিশ সরকারের হিসাব অনুযায়ী, মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের অংশ হিসাবে সিরিয়া ও ইরাকে ব্রিটেন ‘আইসিসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ৪,৪০০ অস্ত্র’ দিয়েছে।

কিন্তু ব্রিটেনের হিসাব বলে, এর মধ্যে ব্রিটিশ বিমান বাহিনী রয়াল এয়ার ফোর্সের হামলায় মারা গেছে মাত্র একজন বেসামরিক মানুষ।

এয়ারওয়ারস্-এর হিসাবে নিহত বেসামরিক মানুষের সংখ্যা ছিল ৮,০০০ থেকে ১৩,০০০ এবং বেসামরিক মৃত্যু নথিভুক্ত করার ব্রিটিশ পদ্ধতি তাদের মতে ‘অবাস্তব, অযৌক্তিক’।

কী পরিমাণ অর্থ জড়িত?
ক্যাট বলছে, ২০১৫ সালে ইয়েমেনে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ব্রিটেন লাইসেন্স-এর অধীনে সৌদি আরবে ৫৩০ কোটি পাউন্ড অর্থমূল্যের অস্ত্র বিক্রি করেছে।

সংগঠনটি বলছে, ইয়েমেনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সৌদি আরবের মিত্র অন্যান্য উপসাগরীয় দেশগুলোকে আরও একশো' কোটি পাউন্ডের অস্ত্র বিক্রির লাইসেন্স ব্রিটেন পেয়েছে।

তবে ক্যাটের হিসাবে এর বাইরে আরও রয়েছে লাইসেন্স মুক্ত অস্ত্রের বিক্রি এবং সামরিক সরঞ্জামের দেখভাল, কারিগরি ও সরবরাহ বাবদ অস্ত্র বিক্রি সংক্রান্ত আরও নানা চুক্তি থেকে অর্জিত মুনাফা।

তাদের হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের সদস্য দেশগুলোর কাছে ব্রিটেনের বিক্রি করা অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জামের মূল্য ‘অন্তত ১৬ বিলিয়ন পাউন্ড’ (দু'হাজার কোটি মার্কিন ডলারের বেশি)।

যেসব অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম ব্রিটেন বিক্রি করেছে, তার মধ্যে রয়েছে টাইফুন এবং টর্নেডো জঙ্গী বিমান, এবং সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যের বোমা।

সামরিক সরঞ্জাম ছাড়াও ব্রিটেন সৌদি জোট বাহিনীকে সামরিক পরামর্শ দিয়েছে, যার মধ্যে আছে লক্ষ্যবস্তুর ওপর বোমাবর্ষণ এবং কৌশল সংক্রান্ত পরামর্শ, এবং সৌদি সেনাদের ব্রিটেনে প্রশিক্ষণ দান।

বিষয়টা কি শুধুই ব্রিটেনের অস্ত্র বিক্রির?
সৌদি আরব ২০১৫ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত যে পরিমাণ অস্ত্র আমদানি করেছে তার মধ্যে ৭৩ শতাংশ অস্ত্র্র এসেছে আমেরিকা থেকে- জানাচ্ছে স্টকহোম ইন্টারন্যাশানাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট।

দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে ব্রিটেন - তারা বিক্রি করেছে সৌদিতে মোট আমদানি করা অস্ত্রের ১৩ শতাংশ এবং তৃতীয় স্থানে থাকা ফ্রান্স বিক্রি করেছে ৪.৩ শতাংশ।

সেই হিসাবে দেখলে, আমেরিকার তুলনায় ব্রিটিশ অস্ত্র চুক্তির পরিমাণ অনেকই কম।

সংস্থাটির ঊর্ধ্বতন একজন গবেষক পিয়েটার ডি ওয়েজম্যান বলছেন, আমেরিকা গত পাঁচ বছরে যত অস্ত্র বিক্রি করেছে, তার অর্ধেক বিক্রি করা হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে এবং মধ্যপ্রাচ্যে বিক্রি করা অস্ত্রের অর্ধেকই কিনেছে সৌদি আরব।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সৌদি আরব ও তার শরীক সংযুক্ত আরব আমিরাতকে বর্ণনা করেছেন ‘এলাকায় ইরান এবং তার দোসরদের দুষ্কর্মের বিরুদ্ধে একটা সুরক্ষা দেয়াল’ হিসাবে।

ইরান ইয়েমেনে হুতি বিদ্রোহীদের সমর্থন জোগাচ্ছে বলে ধারণা করা হয়, যাদের বিরুদ্ধে লড়ছে সৌদি নেতৃত্বাধীন বাহিনী। তবে হুতিদের সমর্থন জোগানোর অভিযোগ তেহরান অস্বীকার করে।

ভবিষ্যতে কী হতে পারে?
ব্রিটেনের সংবাদপত্র ফাইনানশিয়াল টাইমস-এ ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডমিনিক রাব এক নিবন্ধে লিখেছেন যে ব্রিটেন ইয়েমেনে শান্তি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে এবং মানবিক ত্রাণ ব্যবস্থায় অংশ নিচ্ছে।

ইয়েমেনে দেশ জুড়ে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়ে তিনি আরো বলেন, দেশটিতে জাতিসংঘের কর্মকাণ্ডে সাহায্য করার জন্য ব্রিটেন, জার্মানি এবং সুইডেন যৌথভাবে অতিরিক্ত ৩৬ কোটি ৫০ লাখ ডলার অর্থ সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

ইয়েমেনে এ যাবত কালের মধ্যে সবচেয়ে ব্যাপক কলেরার প্রাদুর্ভাব ছাড়াও, দেশটি কোভিড-১৯এর প্রকোপ মোকাবেলায় হিমশিম খাচ্ছে। দেশটির চিকিৎসা সেবা ব্যবস্থার মাত্র অর্ধেক এ পর্যন্ত কাজ করছে।

এপ্রিল মাসে, করোনাভাইরাস মহামারির কারণে সৌদি আরব একতরফা যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে। কিন্তু হুতিরা এই যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব প্রত্যাখান করে। তারা দাবি করে রাজধানী সানা এবং বন্দরনগরী হুদাইদা থেকে আকাশপথে ও সমুদ্রপথে দেয়া সব রকম অবরোধ তুলে নিতে হবে।

ফলে অচলাবস্থার নিরসন এখনও হয়নি। জাতিসংঘ হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে যুদ্ধে এ পর্যন্ত দেশটিতে যে ধ্বংসলীলা হয়েছে, তাকে হয়তো বহু গুণে ছাপিয়ে যাবে আগামীতে ধ্বংসের যে চিত্র আশংকা করা হচ্ছে, তা।

জাতিসংঘ বলেছে, করোনাভাইরাস মহামারির কারণে ইয়েমেনে মৃত্যুর সংখ্যা হয়ত ‘গত পাঁচ বছরে দেশটিতে যুদ্ধ, রোগব্যাধি ও অনাহারে মৃত্যুর মোট সংখ্যাকে অনেকাংশে ছাড়িয়ে যাবে’।
সূত্র : বিবিসি

এবিএন/সাদিক/জসিম

এই বিভাগের আরো সংবাদ