ঘূর্ণিঝড় আম্পান : উপকূলের বাইরে নতুন নতুন এলাকায় হানা দিয়েছিল

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ২২ মে ২০২০, ১১:৩৯

বাংলাদেশে ঘূর্ণিঝড় আম্পানের তাণ্ডবে প্রায় সাড়ে ১১শ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতির কথা প্রাথমিকভাবে জানানো হয়েছে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান এ আর্থিক ক্ষতির কথা জানিয়েছেন।

দেশের বিভিন্ন এলাকায় বাঁধ, রাস্তা, ব্রিজ-কালভার্টসহ অবকাঠামোর পাশাপাশি ঘরবাড়ি, কৃষি এবং চিংড়ি ঘেরসহ মাছের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। প্রাণহানি হয়েছে কমপক্ষে ১৬ জনের।

দেশের ২৫টি জেলায় প্রায় দেড় কোটি মানুষ ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানার আগের দিন থেকে বিদ্যুৎহীন রয়েছেন। এই ঘূর্ণিঝড় আম্পানের তান্ডবের চিত্রটা ছিল ভিন্ন ধরনের।

উপকূলীয় অঞ্চলের বাইরে যে জেলাগুলোতে সাধারণত ঘূর্ণিঝড় হয় না, এসব জেলাতেও ঘূর্ণিঝড় আম্পানের তাণ্ডবে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। দক্ষিণ পশ্চিমের জেলার পানের বরজ থেকে শুরু করে রাজশাহীতে মৌসুমি ফল আম এবং উত্তরের অন্য জেলাগুলোয় ধান এবং সবজির অনেক ক্ষতি হয়েছে।

এসব এলাকা থেকে অনেকে বলেছেন, বড় ধরনের ঘূর্ণিঝড়ের অভিজ্ঞতা এবং প্রস্তুতি না থাকায় এর তাণ্ডব দেখে তারা হতবিহবল হয়ে পড়েন।

সরকার বলেছে, ঘূর্ণিঝড় আম্পানের আঘাতে দেশের ৪৬টি জেলায় ফসলের অনেক ক্ষতি হয়েছে।

কুষ্টিয়া থেকে শুরু করে ঝিনাইদহ-যশোর পর্যন্ত দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোর মানুষের ঘূর্ণিঝড় নিয়ে ধারণা খুবই কম। সেখানে ঘূর্ণিঝড় আশ্রয় কেন্দ্রও নাই। এবারও ঘূর্নিঝড় নিয়ে কোনো আশঙ্কা বা প্রস্তুতি ছিল। কিন্তু ঘূর্ণিঝড় আম্পানের সারারাতের তাণ্ডব এই অঞ্চলের মানুষকে আতঙ্কিত করে।

যশোরের চৌগাছা উপজেলার সীমান্বর্তী উজিরপুর গ্রাম থেকে ৬৫-বছর বয়স্ক একজন সমাজকর্মী এমদাদুল হক বলেছেন, এমন ঝড়ের সঙ্গে তারা পরিচিত ছিলেন না।

‘এ রকম ঝড় কোনদিন দেখিনি। কালবৈশাখী ঝড় হয়েছে বা বিভিন্ন সময় নিম্নচাপের সাথে ঝড় হয়েছে। কিন্তু এ রকম ব্যাপক ঝড় কখনও হয়নি। ফলে সে জন্য কোনো প্রস্তুতিও আমাদের ছিল না। ক্ষয়ক্ষতি মনে করেন, জমিতে ধান পানির নিচে গেছে। পাটের আগা ভেঙে গেছে।ঘরবাড়ি এবং গাছ অনেক ভেঙে গেছে। ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।’

যশোরসহ ওই অঞ্চলের জেলাগুলোতে একরের পর একর জমিতে পানের বরজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

পান গাছের লতা বাঁশের খুঁটি দিয়ে উঠিয়ে রাখা হয়, সেটাকে বরজ বলা হয়। পানচাষিরা সাধারণত বিভিন্ন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার কাছ থেকে ঋণ নিয়ে পান চাষ করে থাকেন।

যশোরের প্রত্যন্ত একটি গ্রামের হারুনর রশিদ শাওন বলেছেন,তার চাষ করা দুই বিঘা জমির পানের বরজ পুরোটাই নষ্ট হয়ে গেছে।

‘ঝড়ে আমার জমিতে পানের বরজ পুরোটা মাটিতে শুয়ে গেছে। এটা পুরোটাই নষ্ট হয়ে গেল।’

ঘূর্ণিঝড়টি এবার রাজশাহী অঞ্চলেও দাপট দেখিয়েছে। সেখানে মৌসুমি ফল আমের ব্যাপক ক্ষতি করেছে।

আমচাষিরা বলছেন, প্রায় ২৫ শতাংশ আম নষ্ট হয়েছে।

রাজশাহী বাঘা এলাকায় আমের ক্ষতি বেশি হয়েছে। সেখান থেকে একজন আমচাষি বলেছেন, ‘আমরা অনেক পরিচর্যা এবং অনেক টাকা খরচ করে ভালই আম হয়েছিল। কিন্তু সেটি এতই ঝড় হয়েছে যে বলা ভাষা নাই। মানে গাছের নীচে একেবারে আম পড়ে, শুধু আম আর আম, মাটি দেখা যাচ্ছে না। মানে মাটি সবুজ হয়ে গেছে আমের কারণে।’

তিনি আরও বলেছেন, ‘ঝড়ের কারণে মাটিতে পড়ে নষ্ট হওয়া এই আম ৩০টাকা কেজি দরে এখন বিক্রি হচ্ছে। মানে ৭৫ কেজির এক বস্তা আম মাত্র ৩০টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তা হলে বলেন, আমরা কীভাবে বাঁচব।’

চাঁপাইনবাবগঞ্জ এলাকার আম বাগানগুলোতে অবশ্য সেভাবে ক্ষতি হয়নি। এ ছাড়া বগুড়াসহ উত্তরের জেলাগুলোতে ধান এবং স্বজির অনেক ক্ষতি হয়েছে।

বগুড়া থেকে একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার হোসনে আরা বলেছেন, উপকূলের বাইরের জেলাগুলোতে ঘূর্ণিঝড় নিয়ে অভিজ্ঞতা না থাকায় এসব জায়গায় ক্ষতি বেশি হয়েছে।

‘এই নন কোস্টাল বেল্টে মানুষের প্রস্তুতি থাকে না। সেজন্য এই ঘূর্ণিঝড়ের তান্ডবে মানুষ হতবিহবল হয়ে যায়। এবং ক্ষতিও হয়েছে অনেক বেশি।’

কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেছেন, সারাদেশে ধানের বেশিরভাগই আগে কেটে ফেলা সম্ভব হয়েছে। সেজন্য জমিতে থাকা ধানের ১০ শতাংশের মতো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।

তিনি জানিয়েছেন, ডাল ও আমের বেশি ক্ষতি হয়েছে। সাতক্ষীরা থেকে আম আগে বাজারে আসে। সেখানে ৬০ শতাংশ আমই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে সরকারি হিসাবেই বলা হচ্ছে।

ড. রাজ্জাক বলেছেন, রাজশাহী এবং সাতক্ষীরায় ঝড়ের কারণে গাছ থেকে পড়ে যাওয়া আম সরকারিভাবে কিনে আমচাষীদের ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হবে।

এদিকে সরকারের নীতিনির্ধারকদের অনেকে বলেছেন, এই ঝড়ে যতটা ক্ষতি আশংকা করা হয়েছিল, ততটা হয়নি। সেটা তাদের কিছুটা স্বস্তি দিয়েছে। কিন্তু করোনাভাইরাসের দুর্যোগের মাঝে ক্ষতি যা হয়েছে, সেটাও কম নয় বলে তারা মনে করেন।
খবর বিবিসি বাংলা

এবিএন/সাদিক/জসিম

এই বিভাগের আরো সংবাদ