বেসরকারি হাসপাতালগুলোয় শনাক্তকরণ পরীক্ষা করা হচ্ছে না কেন?

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ০৫ এপ্রিল ২০২০, ১৯:৫৩

বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে সরকার দেশব্যাপী রোগ শনাক্তকরণ পরীক্ষা বাড়ালেও এই সেবা শুধুমাত্র নির্দিষ্ট কিছু সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোয় পাওয়া যাচ্ছে। কোন বেসরকারি হাসপাতাল কিংবা ডায়াগনস্টিক সেন্টারকে এখনো করোনাভাইরাস পরীক্ষার অনুমতি দেয়া হয়নি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে ১৪টি পরীক্ষাগারে কোভিড-১৯ রোগ শনাক্তকরণ পরীক্ষা চলছে।

এর মধ্যে নয়টি ল্যাব ঢাকায় এবং বাকি পাঁচটি ঢাকার বাইরে চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, রাজশাহী, রংপুর ও কক্সবাজারে রয়েছে।

খুলনা, বরিশাল ও সিলেট এই তিনটি বিভাগীয় শহরে আরও তিনটি ল্যাব স্থাপনের প্রস্তুতি চলছে বলেও জানা গেছে।

প্রতিটি বিভাগে ল্যাব স্থাপনের পর সেটি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রয়োজনে সম্প্রসারণ করা হবে বলেও প্রেস ব্রিফিংয়ে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক।

সরকারি পর্যায়ে শতভাগ সক্ষমতা অর্জনের আগ পর্যন্ত বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে এই পরীক্ষার আওতাভুক্ত করার কথা ভাবছে না সরকার, এমনটিই জানিয়েছেন হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টারের সহকারী পরিচালক ডা. আয়েশা আক্তার।

তবে প্রয়োজন হলে বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগ শনাক্তকরণ পরীক্ষা চালু করা হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

মিসেস আক্তার বলেন, "সরকার এখনও এই পরীক্ষা সম্প্রসারণের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। এখনও অনেক কিট আসছে। সব কাজ সম্পন্ন হলে একসাথে আরও কয়েকগুণ বেশি নমুনা পরীক্ষা করা যাবে। তারপরও যদি প্রয়োজন পড়ে, তাহলে বেসরকারি হাসপাতালের সহায়তা নেয়া হবে।"

এখন পর্যন্ত সরকার যতোটুকু সক্ষমতা অর্জন করেছে, সেটা দিয়েই কাজ করছে বলে তিনি জানান।

সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে সরকারি হাসপাতাল রয়েছে ৬৫৪টি এবং এসব হাসপাতালে মোট শয্যার সংখ্যা ৫১,৩১৬টি। আর বেসরকারি হাসপাতাল রয়েছে ৫,০৫৫টি, যেখানে মোট শয্যার সংখ্যা ৯০,৫৮৭টি।

এছাড়া বছরব্যাপী দেশের ৬০% বেশী মানুষ বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে চিকিৎসা নিয়ে থাকেন বলে সরকারি হিসাবে জানা গেছে।

করোনাভাইরাসের প্রকোপ নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার আগেই বেসরকারি হাসপাতালগুলোর রোগ শনাক্তকরণ পরীক্ষা ও চিকিৎসা দেয়ার মতো প্রয়োজন প্রস্তুতি নিতে হবে বলে মনে করছেন সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) এর উপদেষ্টা ডা. মোস্তাক হোসেন।

"করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। এটি যদি সামনে আরও বাড়তে থাকে এবং সরকারি হাসপাতালগুলো যদি সামাল দিতে না পারে, তখন এই বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। সে ব্যাপারে এখন থেকেই প্রস্তুতি নেয়া প্রয়োজন।" বলেন তিনি।

তবে সংক্রামক রোগের পরীক্ষা ও চিকিৎসা দেয়ার ক্ষেত্রে একটি হাসপাতালে যে বিশেষ সুবিধাগুলো থাকার প্রয়োজন সেগুলো বেশিরভাগ বেসরকারি হাসপাতালে নেই বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক ওনার্স এসোসিয়েশনের মহাপরিচালক ডা. মঈনুল আহসান।

এমন অবস্থায় বেসরকারি হাসপাতালকে অন্তর্ভুক্ত করা হলে এই হাসপাতালের চিকিৎসক ও রোগীরা উল্টো ঝুঁকি পড়বে বলে তিনি আশঙ্কা করছেন।

"করোনাভাইরাস শনাক্তকরণ পরীক্ষার জন্য বিশেষ ধরণের পরীক্ষাগার, মেডিকেল সরঞ্জাম, ভেন্টিলেটর এবং আধুনিক সুবিধা সম্পন্ন আইসোলেশন ইউনিট, চিকিৎসকদের সুরক্ষা সরঞ্জাম প্রয়োজন, সেটা বেশিরভাগ বেসরকারি হাসপাতালে নেই।"

এমন অবস্থায় করোনাভাইরাসের নমুনা পরীক্ষার আগে বেসরকারি হাসপাতালগুলোয় এ ধরণের সংক্রামক ব্যাধির উপযুক্ত চিকিৎসা সেবা দেয়ার ব্যবস্থা আছে কিনা সেটা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন মি. মঈনুল।

তিনি বলেন, "এখন বেসরকারি হাসপাতালে যদি পরীক্ষা করা শুরু হয়। দেখা গেল কারও করোনাভাইরাস পজিটিভ। এখন আমরা তো তাকে ফিরিয়ে দিতে পারবো না। এই সংক্রামক ব্যাধি চিকিৎসা দেয়ার মতো ফ্যাসিলিটিজ তো বেসরকারি হাসপাতালগুলোয় নেই।"

"দেখা গেল আইসিইউ ইউনিটে করোনাভাইরাস পজিটিভ কাউকে জায়গা দিলাম। এরপর অন্য সব রোগী আর চিকিৎসকরা আক্রান্ত হয়ে গেলেন।" বলেন, মি. মঈনুল।

এক্ষেত্রে যেসব বেসরকারি হাসপাতালের প্রয়োজনীয় অবকাঠামো এবং মেডিকেল সরঞ্জাম রয়েছে, তাদেরকে অগ্রাধিকারভিত্তিতে সরকার করোনাভাইরাস শনাক্তকরণ পরীক্ষার অনুমোদন দিতে পারে বলে জানিয়েছেন মোস্তাক হোসেন।

তিনি বলেছেন, এই রোগীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার পর তাদেরকে কোথায় এবং কীভাবে চিকিৎসা দেয়া হবে সে বিষয়ে নীতিমালা প্রণয়ন প্রয়োজন যেন যথাযথভাবে দুর্যোগ সামাল দেয়া যায়।

তবে বিশেষ পরিস্থিতিতে যদি বেসরকারি হাসপাতালগুলোয় করোনভাইরাসের পরীক্ষা ও চিকিৎসা দিতেই হয়, তাহলে সেটার জন্য রোগীর থেকে কোন পয়সা নেয়া যাবেনা বলে জানিয়েছেন মি. হোসেন।

করোনাভাইরাসের পরীক্ষা থেকে শুরু করে সার্বিক চিকিৎসা সরকারি অর্থায়নে সম্পন্ন হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

এদিকে করোনাভাইরাস ঝুঁকিতে হাসপাতালে গিয়ে চরম দুর্ভোগে পড়ছেন সাধারণ জ্বর ও সর্দি-কাশির রোগীরা।

এগুলো করোনাভাইরাসের লক্ষণ হওয়ায়, অনেক চিকিৎসক তাদের সেবা দিতে চাইছেন না।

ফলে চিকিৎসা নিতে গিয়ে অনেক রোগীকে এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ঘুরতে হচ্ছে। চিকিৎসা না পেয়েই ফিরে আসতে হচ্ছে অনেককে।

এরই মধ্যে একাধিক হাসপাতালে গিয়েও চিকিৎসা না পেয়ে বেশ কয়েকজন রোগী মারা গেছেন বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে উঠে এসেছে।

রোববার কোভিড-১৯ সংক্রান্ত সংবাদ সম্মেলনে বেসরকারী হাসপাতাল, চিকিৎসকদের চেম্বার খোলা রাখার অনুরোধ জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক।

"আপনারা আপনাদের ডিউটি থেকে দুরে থাকবেন না। নাহলে সেটা দেশবাসীর প্রতি অন্যায় করা হবে"- চিকিৎসকদের উদ্দেশ্যে বলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।

এর আগে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের মধ্যে বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও প্রাইভেট চেম্বারগুলোতে রোগীরা সেবা দেয়া না হলে সরকার তাদের বিরুদ্ধে লাইসেন্স বাতিলসহ কঠোর পদক্ষেপ নেবে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক।

এবিএন/মমিন/জসিম

এই বিভাগের আরো সংবাদ