ট্রাম্প অভিশংসন : ২০২০ নির্বাচনের ওপর ইমপিচমেন্ট বিচার কী প্রভাব ফেলবে?

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১২:০৮

ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিশংসনের বিচার প্রায় শেষের পথে। অভাবনীয় ও অপ্রত্যাশিত কিছু বড় ঘটনা বাদ দিলে, তার বিরুদ্ধে প্রতিনিধি পরিষদের আনা বড় দুটি অভিযোগ থেকে দলীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে তাকে খালাস বা মুক্তি দেয়া হবে। এর আগে অভিশংসনের ওইসব অভিযোগ প্রতিনিধি পরিষদে দলীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটেই পাস করা হয়েছিল।

দেশটির জাতীয় নির্বাচনের মাত্র ৯ মাস আগে দুই পক্ষকেই রাজনৈতিক ক্ষত কাটিয়ে ওঠার কিছুটা সুযোগ দেয়া হবে। এই নির্বাচনে পুরো প্রতিনিধি পরিষদ, সেনেটের এক-তৃতীয়াংশের বেশি এবং প্রেসিডেন্ট পদেও ভোট অনুষ্ঠিত হবে।

জরিপ অনুসারে, অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার সময়ের তুলনায় দেশটির রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্য এখন পরিবর্তিত হয়েছে। রাজনৈতিক মতাদর্শের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র কঠিনভাবে বিভক্ত। প্রেসিডেন্টের পুনর্র্নিবাচিত হওয়ার সম্ভাবনা অনিশ্চিত হলেও তা একেবারে কম নয়।

সাক্ষী হাজির না করার সিদ্ধান্তকে আমেরিকানরা ভালোভাবেই গ্রহণ করেছিল। আর এটা তারা ভুলে যাবে। যাই হোক, সাক্ষী বলতে আসলে কী বোঝায় তা নিয়ে ডেমোক্র্যাট এবং রিপাবলিকানদের মধ্যে আলাদা অভিমত রয়েছে।

ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্পের প্রশাসনের কর্মকর্তা যেমন জন বল্টন এবং মিক মালভেনিকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে চেয়েছিলেন, তাদের বিশ্বাস এদের দেয়া তথ্য হয়তো ট্রাম্পের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগকে জোরালো করতে পারবে। আর রিপাবলিকানরা জো বাইডেনের ছেলে হান্টার, অভিশংসন বিষয়ে প্রধান ব্যবস্থাপক অ্যাডাম শিফ এবং একজন হুইসেলব্লোয়ারকে ডাকতে চেয়েছিল- এবং এভাবে তারা পুরো প্রক্রিয়াটির সমাপ্তি টানতে চেয়েছিল।

অভিশংসন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতির বিরাজমান বৈশিষ্ট্যগুলোতে কোনো পরিবর্তন আনেনি; বরং এটাও এক ধরনের বৈশিষ্ট্যতে পরিণত হয়েছিল।

জরিপে সব সময় পুরো চিত্র ফুটে ওঠে না। তবে অভিশংসন প্রক্রিয়া যে রাজনীতির ওপর প্রভাব ফেলেছে তার কিছু চিহ্ন প্রকাশিত হয়েছে।

রিপাবলিকান ঘাঁটিকে উজ্জীবিত করেছে
আইওয়ার ডি মইনে-তে বৃহস্পতিবার রাতে এক র‍্যালিতে সমর্থকদের সামনে ট্রাম্প অভিশংসন প্রক্রিয়া যাকে তিনি ‘ধাপ্পাবাজি’ বলে উল্লেখ করেন তার বিরুদ্ধে আবারো কথা বলেন।

তিনি বলেন, ১৮৬৮ সালে অ্যান্ড্রু জনসন, ১৯৭৩ সালে রিচার্ড নিক্সন এবং ১৯৯৯ সালে বিল ক্লিনটনের বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রক্রিয়া ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের ‘কালো সময়’। কিন্তু তার প্রেসিডেন্সি ‘সুখময়’ ছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি।

আর সমর্থকরা এতে সম্মতিও দিয়েছে।

‘আমার মনে হয় ডেমোক্র্যাটরা যা করছে তার কারণেই তিনি পুনর্র্নিবাচিত হবেন,’ বলেন ট্রেসি রুট যিনি তার ছেলে টনির সাথে র‌্যালিতে এসেছেন। ‘ভোটে তাকে হারাতে পারবে না তারা, তাই তাকে তাদের অভিশংসিতই করতে হবে।’

মিনেসোটা থেকে ৪ ঘণ্টা গাড়ি চালিয়ে র‌্যালিতে যোগ দিতে এসেছেন সারা জনসন। তিনি বলেন, অভিশংসনের বিচারের প্রতিটি মুহূর্ত তিনি দেখেছেন এবং প্রেসিডেন্টকে অভিযুক্ত প্রমাণিত করতে ডেমোক্র্যাটদের প্রচেষ্টা তার কাছে ‘হাস্যকর’ মনে হয়েছে। ছিল।

তিনি বলেন, সব আমেরিকানরা দেখছিল যে ‘পুরো ব্যবস্থাটাই কতটা দুর্নীতিগ্রস্ত।’

এই মুহূর্তে হোয়াইট হাউসের জন্য রাজনৈতিক কৌশল বেশ পরিষ্কার আর তা হচ্ছে, অভিশংসনকে ওয়াশিংটন এমনভাবে চিত্রায়িত করার চেষ্টা করছে যেন শুরু থেকেই কেউ একজন প্রেসিডেন্ট এবং তার সমর্থকদের নাজেহাল করার চেষ্টা করছে। 

‘তারা আমার নয় বরং আপনাদের পেছনে লেগেছে,’ গত ডিসেম্বরে এক টুইটে এমনটা লিখেছিলেন ট্রাম্প। ‘আমি ঠিক পথে আছি।’

ট্রাম্পের প্রচারণার মূল উদ্দেশ্য যদি নভেম্বরে তার প্রতি সমর্থন আদায় হয় তাহলে হাউজ ডেমোক্র্যাটদের অভিযোগ এবং পরে তা সেনেটে রিপাবলিকানদের খারিজ করার বিষয়টিকে তারা ইতিবাচকভাবেই দেখবে। এই প্রচারণাকে ‘যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় তৃণমূল পর্যায়ে প্রচারণা’ বলে অভিহিত করেছেন প্রচারণা ব্যবস্থাপক ব্র্যাড পার্সকেল।

ডেমোক্র্যাট ঘাঁটির প্রতিফলন
হাউস অভিশংসন তদন্ত শুরুর আগের কয়েক মাস ধরে ডেমোক্র্যাটদের জন্য বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছিল যে চেম্বারের নেতাদের গৃহীত পদক্ষেপের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ অব্যাহত রাখা হবে কিনা?

স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি এবং গোয়েন্দা কমিটির চেয়ারম্যান অ্যাডাম শিফ তাদের একনিষ্ঠ ভোটারদের নিরাশ করার মতো ঝুঁকি নিয়েছিলেন যারা প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে লড়াইকে সমর্থন দিয়েছিলেন।

ডেমোক্র্যাটিক প্রেসিডেন্ট প্রার্থীদের মধ্যে ম্যাসাচুসেটসের সিনেটর এলিজাবেথ ওয়ারেন ছিলেন প্রথম দিককার একজন যিনি ট্রাম্পের অভিশংসন চেয়েছিলেন। ডি মইনে-তে সমর্থকদের জন্য এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন তিনি যাদের অনেকেই এরইমধ্যে নভেম্বরের নির্বাচনের বিষয়ে উদ্যমী হয়েছেন।

‘এই নির্বাচন আমাদের দেশকে আবারো বিভক্ত করতে যাচ্ছে, কিন্তু আশা করছি যে, সত্যান্বেষীরা ডেমোক্র্যাটদেরকেই এগিয়ে নিয়ে যাবে,’ বলেন রেচেল স্মিথ যিনি আইওয়াতে আরবানডেলের একজন শিক্ষক।

‘অন্য যারা অনেক বেশি মধ্যপন্থী এবং এখনো কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি, এটা নিশ্চয়ই তাদেরকে ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন দিতে উদ্বুদ্ধ করবে।’

২০২০ এ ট্রাম্পের বিরুদ্ধে কারা লড়বেন?

তার স্বামী জাস্টিন বলেন, ফলাফল যাই আসুক না কেন তিনি খুশি কারণ হাউস তাকে অভিশংসিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আর প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে যেসব খারাপ কাজ করার অভিযোগ উঠেছে তা সম্প্রচার করার উদ্যোগ যথাযথ ছিল বলেও জানান তিনি।

‘সীমা যে অতিক্রম করা হয়েছে তার একটা বার্তা দেয়া জরুরি ছিল,’ তিনি বলেন। তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ইউক্রেনের বিষয়টি জন-সমক্ষে আসার আগ পর্যন্ত তিনি অভিশংসনের পক্ষে ছিলেন না বলেও জানান তিনি।

এখন অন্তত তারা সম্মত হয়েছে যে, যে ফলাফল এসেছে তাতে তারা এবং অন্য ডেমোক্র্যাটদের পরিতৃপ্ত হওয়া উচিত।

বাইডেন ক্ষতিগ্রস্ত?
এমন কোনো প্রমাণ নেই যা ইঙ্গিত করে যে ইউক্রেনে বাইডেন কোনো ধরনের অপরাধের সাথে যুক্ত ছিলেন, কিন্তু রাজনীতিতে এমন কৌশলগত বিষয় খুব একটা কাজে লাগে না। সত্য হোক আর না হোক, এটা ক্ষতিকর।

আর প্রেসিডেন্টের প্রতিরক্ষা দলের উদ্বোধনী বিতর্কে, ফ্লোরিডার সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল পাম বন্ডি এটি যাতে ক্ষতিকর হয় তার সব ধরণের ব্যবস্থা করেছেন।

নিজের বক্তব্যে তিনি অনেকটা প্রসিকিউটরের মতোই আচরণ করেছেন- তিনি উপস্থাপন করেছেন যে, হান্টার বাইডেন এবং সেই সূত্রে তার বাবা সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের বিরুদ্ধে মামলা হলে তিনি সেখানে কোন কোন বিষয়কে গুরুত্ব দিতেন।

তিনি বলেন, ইউক্রেনীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠান বুরিশমা বাইডেনের ছেলেকে বোর্ডে সদস্যপদ দিয়েছে যা মার্কিন নীতিতে প্রভাব সৃষ্টির প্রচেষ্টা।

তিনি প্রশ্ন তোলেন যে, ওবামা প্রশাসনের ইউক্রেন নীতিতে জো বাইডেন কি কোন ধরণের প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করেছেন যা তার ছেলের বিরুদ্ধে তদন্ত পরিচালনা থেকে বিরত রেখেছে?

এই একটি সন্দেহই, বাইডেনের বিরুদ্ধে ইউক্রেনীয় সরকারকে তদন্ত করতে প্রেসিডেন্ট আহ্বান জানানোর যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তাকে বৈধতা দেয়।

‘আমরা শুধু এটাই বলতে চাই যে তার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলার, এই ইস্যুটিকে তুলে ধরার সুযোগ ছিল, আর এটাই যথেষ্ট,’ তিনি বলেন।

খোদ অভিশংসন তদন্ত এবং এর সাথে বাইডেনের সংশ্লিষ্টতা বাইডেনের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনী প্রচারণায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলার জন্য যথেষ্ট, যদিও ইউক্রেনকে আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করাতে ট্রাম্পের প্রচেষ্টা সফল হয়নি।

বন্ডির উপস্থাপনার পর, আইওয়ার রিপাবলিকান সেনেটর জডি আর্নেস্ট বাস্তবিকপক্ষেই অস্থির হয়ে পড়েছিলেন। কারণ তিনি সাংবাদিকদের বলেছিলেন যে, বাইডেনের প্রেসিডেন্ট হওয়ার চেষ্টা হয়তো কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

‘আমি দেখতে চাই যে, আজকের এই আলোচনা কিভাবে আইওয়ার ককাস ভোটার বিশেষ করে ডেমোক্র্যাট ককাস ভোটারদের প্রভাবিত করে,’ তিনি বলেন। এখনো কি তারা ভাইস প্রেসিডেন্ট বাইডেনকে সমর্থন দেবে? এ বিষয়ে নিশ্চিত নই।

বাইডেন তার রাজনৈতিক সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে চাওয়ার ইচ্ছাকে শক্তি হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা করেছেন, গত সপ্তাহে এক টুইটে তিনি বলেন, আর্নেস্ট এবং ট্রাম্প ‘প্রচণ্ড ভয় পান বলে আমি হব মনোনীত ব্যক্তি।’

অক্টোবরে পরিচালিত এক জরিপ বলছে, ৪০ শতাংশ ডেমোক্র্যাট এবং বেশিরভাগ রিপাবলিকান এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা মনে করে যে, হান্টার বাইডেন এবং ইউক্রেন ইস্যুটি যৌক্তিকভাবেই নির্বাচনী প্রচারণার বিষয়।

ডেমোক্র্যাটদের মনোনয়ন প্রতিযোগিতা এবং শরতে সাধারণ নির্বাচনের ক্ষেত্রে সন্দেহের বিন্দুমাত্র ছায়াও হিসাব পাল্টে দিতে পারে।

কঠিন সময়ে দৃঢ় থাকা
এই বিষয়টি কিভাবে ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনী প্রচারণায় প্রভাব ফেলতে পারে তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ হচ্ছে, নভেম্বরে রিপাবলিকান কয়েক জন সেনেটর পুনর্র্নিবাচিত হওয়ার ক্ষেত্রে বেশ কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে পড়তে যাচ্ছে।

অনেকে ধারণা করছেন যে, কলোরাডোর করি গার্ডনার, অ্যারিজোনার মার্থা ম্যাকসেলি বা মেইনির সুসান কলিন্সের মতো রিপাবলিকানরা নিজেদের পদ হারাতে পারেন। এই তিনজনের মধ্যে দুই জন সাক্ষীর বিষয়ে অনুষ্ঠিত ভোটে ভোট দেননি।

অন্যদিকে আলাবামার ডেমোক্র্যাট সেনেটর ডো জোনস চলতি বছরের শেষের দিকে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া নির্বাচনে সবচেয়ে ঝুঁকির মুখে রয়েছেন।

এর কোনো শেষ নেই
ট্রাম্পের বিরুদ্ধে সেনেটে অভিশংসন বিচার হয়তো শেষ হতে চলেছে, কিন্তু এক অধ্যায় শেষ হয়ে যাওয়া মানে প্রেসিডেন্টের ইউক্রেন সংশ্লিষ্টতার পুরো বই শেষ হয়ে যাওয়া নয়।

যদিও সেনেটে সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বল্টনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে না, কিন্তু বাইডেনের বিষয়ে ইউক্রেনকে তদন্ত করতে প্রেসিডেন্ট কীভাবে চাপ দিয়েছিলেন সে সম্পর্কিত তথ্য মাত্র সামনে আসা শুরু হয়েছে।

এটা পুরোটা সামনে আসবে যদি তার আত্মজীবনী প্রকাশিত হয় কিংবা যদি তিনি জনসমক্ষে কথা বলতে রাজি হন।

হাউস ডেমোক্র্যাটরা অন্যদেরও সাক্ষী হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করতে পারে, যেমন ট্রাম্পের সাবেক চিফ-অব-স্টাফ জন কেলি যিনি সম্প্রতি বল্টনের দাবিকে সমর্থন দিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন।

এমনকি কলামিস্ট জোনাথন অল্টারের মতে, সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হওয়ার পরেও সাক্ষীরা ডেমোক্র্যাটদের কাছে আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
খবর বিবিসি

এবিএন/সাদিক/জসিম

এই বিভাগের আরো সংবাদ