সড়ক দুর্ঘটনার ক্ষতিপূরণ আদায়ে জটিলতা কেন?

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ১৩ অক্টোবর ২০১৯, ১৮:৪৩

ঢাকায় দুই বাসের মাঝখানে পড়ে হাত হারানো এবং পরবর্তীতে মারা যাওয়া তিতুমীর কলেজের ছাত্র রাজিবের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেয়ার জন্য দু'টি পরিবহণ সংস্থাকে আদালত নির্দেশ দিলে তাদের মধ্যে একটি সংস্থার আপিল আবেদনের পর আপিল বিভাগ ঐ সংস্থাকে এক মাসের মধ্যে রাজিবের পরিবারকে ক্ষতিপূরণের আংশিক টাকা দিতে নির্দেশ দিয়েছে।

২০১৮ সালের এপ্রিলে ঢাকার কারওয়ান বাজারে দুই বাসের চাপে হাত বিচ্ছিন্ন হয় রাজিবের।

রাজিবের পরিবারের পক্ষের রিটকারী আইনজীবী রুহুল কুদ্দুস কাজল বিবিসি বাংলাকে জানান, "এ বছরের ২০শে জুন হাইকোর্ট রাজিবের পরিবারকে ৫০ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দেয়ার নির্দেশ দেয়, যার মধ্যে ২৫ লক্ষ দেয়ার কথা বিআরটিসি'র এবং ২৫ লক্ষ স্বজন পরিবহনের দেয়ার কথা।"

"স্বজন পরিবহন হাইকোর্টের ঐ সিদ্ধান্তের স্থগিতাদেশ চেয়ে আপিল করে। তারই পরিপ্রেক্ষিতে আপিল বিভাগ আজ স্বজন পরিবহনকে এক মাসের মধ্যে রাজিবের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেয়ার নির্দেশনা দেয়।"

হাইকোর্টের সিদ্ধান্ত স্থগিত হবে কিনা, আগামী ১৭ই নভেম্বর সে সিদ্ধান্ত জানানো হবে বলে নিশ্চিত করেন আইনজীবী মি. কাজল।

বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতের ঘটনায় আদালতের পক্ষ থেকে ক্ষতিপূরণ দেয়ার আদেশ দেয়ার নজির খুব বেশি নেই, কিন্তু যে কয়েকটি আছে সেগুলোর মধ্যে আলোচিত কয়েকটি ঘটনার ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা সময়মতো ক্ষতিপূরণের টাকা আদায় করতে পারে নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

কেন ক্ষতিপূরণ আদায় করা কঠিন হয়?

সড়ক দুর্ঘটনার ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণ দেয়ার ক্ষেত্রে আদালতের আদেশ থাকা স্বত্বেও ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের ক্ষতিপূরণ না পাওয়ার কারণ হিসেবে সড়ক পরিবহন আইনে অস্পষ্টতা এবং বাংলাদেশের বিচারিক প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রিতার বিষয়টিকে উল্লেখ করেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী মন্তব্য করেন বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ এধরণের ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ আদায়ের বিধান সম্পর্কে যথেষ্ট ওয়াকিবহাল না থাকার কারণে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিপূরণের অর্থ আদায় করা সম্ভব হয় না।

"বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রেই এরকম দেখা গেছে যে, আদালত ক্ষতিপূরণ দেয়ার আদেশ দিলেও শেষপর্যন্ত ভুক্তভোগী পর্যন্ত ক্ষতিপূরণের অর্থ পৌঁছায় না।"

মি. মোজাম্মেল হকের মতে পরিবহণ মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলো ক্ষমতা এবং প্রভাব খাটিয়ে অনেকটা গায়ের জোরেই ক্ষতিপূরণ না দিয়ে আদালতের আদেশ অমান্য করে পার পেয়ে যায়।

আদালতের আদেশ অমান্য করা সম্ভব হয় কীভাবে?

আইনজীবী আইনুন্নাহার সিদ্দিকা বলেন ক্ষতিপূরণের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে আদালতের নির্দেশ না মানার বিষয়টি অনেক সময়ই আদালতের নজরে না আনার কারণে পার পেয়ে যায় আসামীরা।

"কোনো সংস্থা নির্দেশমতো ক্ষতিপূরণ দিচ্ছে না, এই বিষয়টি অনেক সময় আদালতের নোটিশে আনা হয় না। আদালতের নোটিশে আনলে তখন দেখা যায় যে আদালত কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করে।"

অধিকাংশ সময়ই বিচার প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রিতার কারণে ভুক্তভোগী বা তার পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা টেনে নেয়া হয় না বলেই এই পরিস্থিতির তৈরি হয় বলে মনে করেন মিজ. সিদ্দিকা।

"আমাদের দেশে সাধারণত মানুষ মামলা করতেই অনাগ্রহ প্রকাশ করে বিচারের দীর্ঘসূত্রিতার কারণে। তার ওপর দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো একজনের পরিবারের সদস্যরা বা শরীরের কোনো একটি অঙ্গ হারানো কোনো ব্যক্তি দিনের পর দিন আদালতে দৌড়াদৌড়ি করার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে।"

এছাড়াও ক্ষতিপূরণ সংক্রান্ত আইনে অস্পষ্টতা থাকার বিষয়টিকেও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে মনে করেন মিজ. সিদ্দিকা।

"কোন ধরণের দুর্ঘটনায় কাকে, কী পরিমাণ ক্ষতিপূরণ দেয়া হবে, এটি সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট কোনো আইন নেই।"

মিজ. সিদ্দিকা জানান সড়ক দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে সাধারণত রিট করা হয়, যেখানে কোর্টের কাছে একজন ব্যক্তির আনুমানিক ক্ষতির হিসেবে কোর্টের কাছে ক্ষতিপূরণ চাওয়া হয়। এরপর আদালত তাদের বিবেচনায় একটা অঙ্ক ঠিক করে ক্ষতিপূরণ দেয়ার নির্দেশ দেয়, যেটি অনেক সময়ই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে।

বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার পর ভুক্তভোগীরা চিকিৎসা এবং পরিবারের ভরণপোষণের ব্যয় পরিচালনা করতে গিয়ে তাদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বিক্রি করে এবং এভাবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে জিডিপি'র প্রায় ২ শতাংশ ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী।

এবিএন/মমিন/জসিম

এই বিভাগের আরো সংবাদ