চট্টগ্রামে পাহাড় ধ্বসে প্রাণহানির আশংকা: তৎপর জেলা প্রশাসন

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ১১ জুন ২০১৮, ২১:৫৮ | আপডেট : ১২ জুন ২০১৮, ১১:৪১

চট্টগ্রাম, ১১ জুন, এবিনিউজ : চট্টগ্রামে গত কয়েকদিনের টানা বর্ষণে নগরী ও জেলার বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকা ধ্বস ও পাদদেশে বাসবাসকারী নিম্ন আয়ের মানুষের মৃত্যুর আশঙ্কা করছে জেলা প্রশাসন। ফলে প্রাণহানি থেকে বাঁচাতে অতি ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে বসবাসরত লোকজনকে পাহাড়ের পাদদেশ থেকে সরিয়ে নিতে ব্যস্থ জেলা প্রশাসনের একাধিক টিম। রাতদিন সমানে চলছে মাইকিং।

রবিবার রাতভর বৃষ্টির পর সোমবার সকাল থেকে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের নেতৃত্বে বন্দর নগরীর নয়টি পাহাড়ের দেড় শতাধিক ঘর ভেঙে গুড়িয়ে দিয়েছে। সরিয়ে নেওয়া হয় এসব ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে বসবাসরত প্রায় ৫ শ পরিবার।

এর আগে রবিবার সন্ধ্যা থেকে ভারি বর্ষণ শুরু হওয়ায় এবং পাহাড় ধসের আশঙ্কা থাকায় ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসকারীদের পাহাড়ের পাদদেশ থেকে সরে যাওয়ার জন্য বার বার প্রশাসনের পক্ষ থেকে নির্দেশনা দেওয়া হলেও বসবাসকারীরা সরে না আসায় সোমবার বাধ্য হয়ে ঘরগুলো ভেঙ্গে দিয়েছে বলে জানিয়েছে প্রশাসন।

অভিযানে অতি ঝুঁকিপূর্ণ ১৭০টি ঘরবাড়ি উচ্ছেদ করে সেখানে লাল পতাকা টাঙিয়ে দেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। ভূমিধসে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে এসব পাহাড় থেকে প্রায় ৫শ পরিবারকে অন্যত্র সরিয়ে নেয়ার তথ্য দিয়েছে জেলা প্রশাসন।

সোমবার সকাল থেকে নগরীর নয়টি ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড় উচ্ছেদে যারা নেতৃত্ব দিয়েছেন তাদের মধ্যে লালখান বাজার মতিঝর্ণা পাহাড়ে অভিযান পরিচালিত হয় অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. দেলোয়ার হোসেনের নের্তৃত্বে। সহকারী কমিশনার (ভূমি, বাকিলয়া) সাবরিনা আফরিন মোস্তফার নের্তৃত্বে অভিযান পরিচালিত হয় নগরীর একে খান ও পোড়া কলোনীর পাহাড়ে। আমিন পাহাড় ও মিয়ার পাহাড়ে সহকারী কমিশনার (ভূমি, চান্দগাঁও) সাব্বির রহমান সানি ও জালালাবাদ, খুলশী ও আকবর শাহ পাহাড়ে সহকারী কমিশনার (ভূমি, সদর) আব্দুল্লাহ আল মনসুর উচ্ছেদ অভিযানের নের্তৃত্ব দিয়েছেন।

জেলা প্রশাসন কার্যালয় সুত্রে জানাগেছে ভারীবর্ষণের কারণে পাহাড়ধসে দুর্ঘটনা ঠেকাতে জেলা প্রশাসনের নির্দেশনায় সোমবার সকাল থেকে উচ্ছেদ অভিযানে নামে জেলা প্রশাসনের একাধিক সহকারী কমিশনার। এর আগে রবিবার সন্ধ্যা থেকে লালখান বাজারের মতিঝর্ণা, বাটালি হিল, একে খান, পোড়া কলোনি, আমিন পাহাড়, মিয়ার পাহাড়, জালালাবাদ, খুলশী পাহাড় ও আকবর শাহ পাহাড়ের আশে পাশে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসকারীদের সরে যেতে মাইকিং করা হয়।

জেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সাব্বির রহমান সানি জানান, জেলা প্রশাসনের নির্দেশনায় মাইকিং করে নগরীর ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড় ও পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসরতদের সরে যেতে বলা হয়েছে। যেহেতু ভারী বর্ষণ হচ্ছে, সেহেতু পাহাড়ধসের আশঙ্কা রয়েছে। যেকোন দুর্ঘটনা ঠেকাতে আগাম প্রস্তুতি হিসেবে তাদের নিরাপদে সরে যাওয়ার জন্য বলা হয়েছে।

কিন্তু মাইকিং করেও বসবাসকারীরা কোন কর্ণপাত না করায় সোমবার সকাল থেকে জেলা প্রশাসনের একাধিক সহকারি কমিশনার (ভুমি) উচ্ছেদ অভিযানে নামে। অভিযানে সাতটি ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড় হতে কয়েকশ পরিবারকে সরিয়ে স্থানীয় বিদ্যালয়ে অস্থায়ীভাবে রাখা হয়েছে।

অনেকে তাদের পরিচিত শহরে বসবাসরত আত্মীয় স্বজনের কাছে চলে গেছে। পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণভাবে গড়ে তোলা প্রায় দেড় শতাধিক ঘর ভেঙ্গে দেওয়ার কথা জানিয়েছে অভিযানে নের্তৃত্ব দেওয়া জেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটগণ।

সুত্রমতে নগরীর লালখান বাজার, মতিঝর্না, হামজারবাগ নবীনগর পাহাড়, বার্মা কলোনি পাহাড়, এনায়েত বাজার জামতলা বস্তি, পলোগ্রাউন্ড পাহাড়, বাটালী হিল, জিলাপী পাহাড়, নাসিরাবাদ পাহাড়, এ কে খান পাহাড়, চন্দ্রনগর পাহাড়, রউফাবাদ পাহাড়, কুসুমবাগ, জালালাবাদ, সেনানিবাস, বায়েজিদ বোস্তামী, বন গবেষনাগারের পেছনে, খুলশী, ষোলশহর, ফৌজদারহাট, কুমিরাসহ বিভিন্ন এলাকায় চট্টগ্রামের অধিকাংশ পাহাড়ে বৈধ কিংবা অবৈধভাবে শতাধিক বস্তি গড়ে উঠেছে। এসব এলাকায় প্রায় ৫ লাখ লোক বাস করে বলে বিভিন্ন সংস্থার জরিপে জানা গেছে।

চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক ইলিয়াস হোসেন জানান, চট্টগ্রাম নগরীর ছোট-বড় ১৩টি পাহাড় চরম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। ইতোমধ্যে পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীদের উচ্ছেদ করে পানি ও বৈদ্যুতিক লাইন বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে।

বার বার মাইকিং করে তাদেরকে সরে যাবার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। পাহাড় ধসসহ যেকোনো দুর্যোগ মোকাবিলায় জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের পাশাপাশি ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সসহ স্বেচ্ছাসেবী ও উদ্ধারকর্মীদের প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

প্রশাসনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী নগরীর ১৩টি ঝুঁকিপুর্ণ পাহাড় ও টিলার মধ্যে ১১টিতে সবচেয়ে বেশি ৬৬৬ পরিবার ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় বসবাস করছে।

বিগত ১০ বছরে মহানগরীর বিভিন্ন এলাকার ছোট-বড় ১০টি পাহাড় ধস ও ভূমি ধসের ফলে অন্তত দুই শতাধিক নারী-পুরুষ ও শিশুর প্রাণহানি ঘটেছে। কিন্তু প্রশাসনের সতর্কতা সত্বেও পাহাড় দখল করে ওঠা ঘরবাড়ি থেকে দখলদারদের উচ্ছেদ করা যাচ্ছে না। শুধু ২০০৭ সালের ২১ জুন নগরীর সেনানিবাস সংলগ্ন কাইচ্ছাগোনাসহ সাতটি এলাকায় প্রবল বর্ষণে পাহাড় ধস ও জলাবদ্ধতায় ১২৭ জনের মর্মান্তিক প্রাণহানি ঘটে। সর্বশেষ ২০১৭ সালের ১২ ও ১৩ জুন রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও চট্টগ্রামে পাহাড় ধস, গাছ চাপায় ব্যাপক প্রাণহাণির ঘটনা ঘটেছে।

পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ আবদুল হান্নান জানান, গত কয়েকদিনে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ১৫০ মিলিমিটার ছাড়িয়ে গেছে। বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় পাহাড় ধসের ঝুঁকি বাড়ছে। পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়া উচিত। তিনি বলেন, সোমবার বেলা ১২টা পর্যন্ত শেষ ২৪ ঘণ্টায় নগরীতে ২৩১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।

এবিএন/রাজীব সেন প্রিন্স/জসিম/রাজ্জাক

এই বিভাগের আরো সংবাদ