বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন

ভারতের পার্লামেন্টে মুসলিম এমপিরা কোথায়?

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ২৭ এপ্রিল ২০১৯, ১১:৫৮

ভারতের মুসলিম গোষ্ঠীর যে জনসংখ্যা, সেই অনুপাতে পার্লামেন্টে মুসলিম এমপির সংখ্যা বরাবরই খুব কম ছিল, এখনো তাই। বিদায়ী ষোড়শ লোকসভা- যার মেয়াদ খুব শিগগিরি শেষ হচ্ছে- সেখানে মুসলিম এমপি ছিলেন মাত্র ষোলোজন, যা স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে সবচেয়ে কম। অর্থাৎ অন্যভাবে বললে, ভারতের জনসংখ্যার প্রায় ১৫ শতাংশ মুসলিম- অথচ তারা পার্লামেন্টে তিন শতাংশ এমপিও পাঠাতে পারেননি।

কিন্তু কেন এই পরিস্থিতি? তাদের ধর্মের এমপিরা সংখ্যায় কম হওয়ার ফলে ভারতের মুসলিম সমাজকেই বা কী ধরনের সমস্যায় পড়তে হচ্ছে?

ভারতের আর্থিক রাজধানী মুম্বাই দেশের অন্যতম প্রধান মুসলিম অধ্যুষিত, সেখানেই গিয়েছিলাম সরেজমিনে খোঁজখবর নিতে! মুম্বাইতে আরব সাগরের বুকে প্রায় এক কিলোমিটার ভেতরে ঢুকে হেঁটে যেতে হয় পীর হাজি আলির দরগা দর্শনে।

বৈশাখের চড়া রোদে, ঘেমে নেয়ে সেই পথ বেয়ে শত শত মুসলিম নারী-পুরুষ সাগরের বুক চিরে যাচ্ছিলেন সেখানে, দরগায় চড়ানোর জন্য অনেকে চাদরও কিনছিলেন। ভারতের এই আর্থিক রাজধানী মুম্বাইতে প্রায় ৫০ লাখ মুসলিমের বসবাস, যা শহরের মোট জনসংখ্যার ২০ শতাংশেরও বেশি। তা সত্ত্বেও বহু বহু বছরের মধ্যে মুম্বাই থেকে কোনো মুসলিম এমপি নির্বাচিতই হননি, যা বলে দেয় ভারতের পার্লামেন্টে এই সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব আসলেই কতটা কম।

হাজি আলিতে যে মুসলিম নারীরা এসেছেন তারা অনেকেই মনে করেন, তাদের ধর্মের এমপি বেশি হলে অবশ্যই তাদের বক্তব্য পার্লামেন্টে অনেক ভালোভাবে রাখার সুযোগ হবে। কেউ কেউ আবার বলছিলেন, মুসলিমদের সম্পর্কে সারা দুনিয়ায় অনেক ধরনের ভুল ধারণা আছে, এই ধর্মের লোকজন পার্লামেন্টে বেশি যাওয়ার সুযোগ পেলে সেই ভুলও হয়তো ভাঙবে। ‘তবে হ্যাঁ, তাদের কাজ করতে হবে- সংখ্যায় বেশি হলেও তারা যদি কাজের না-হন তাতে কোনো লাভই হবে না!’

বোরা মুসলিম সম্প্রদায়ের ফতিমা পুনাওয়ালা আবার বলছেন, ‘যা আছে একদম ঠিক আছে। এমপি বেশি হলে আমাদের আর কীসের লাভ? বরং যেটুকু আছে তাতেই আমি রীতিমতো স্বচ্ছন্দ। কিন্তু ভারতের পার্লামেন্টে মুসলিম এমপিদের সংখ্যা কেন এত কম?

মুম্বাইতে টাটা ইনস্টিটিউট ফর সোশ্যাল সায়েন্সের অধ্যাপক ও সমাজবিজ্ঞানী পি কে শাজাহান জবাব দেন, ‘প্রথম কথা হলো, রাজনৈতিক দলগুলো মুসলিম প্রার্থী দেওয়ার ব্যাপারে কতটা সিরিয়াস? তারা মুসলিম প্রার্থী দিলে তবেই না মানুষের তাদের নির্বাচন করার প্রশ্ন আসবে।’

‘কিন্তু ভারতের বেশির ভাগ দলেই আমরা দেখি, মুসলিম কর্মীদের একটা পর্যায়ের পর নেতৃত্বে উঠে আসাই মুশকিল- এমপি হওয়া তো অনেক দূরের কথা। আর এই আন্ডার-রিপ্রেজেন্টশনের একটা গুরুতর প্রভাবও পড়ছে সমগ্র মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর।’ মুসলিম জনগোষ্ঠী যে ভারতীয় সমাজে অনেকটাই প্রান্তিক, তার সঙ্গে পার্লামেন্টে তাদের প্রতিনিধিত্বের অভাবের একটা ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে।

তবে তার চেয়েও বড় কথা হল, সাচার কমিটি মুসলিম সমাজে যে দডেভেলপমেন্ট ডেফিসিটদ বা উন্নয়নের অভাবের প্রতি দিকনির্দেশ করেছিল, সেটার মোকাবিলায় কিন্তু কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের একটা বড় ভূমিকা আছে। মুসলিম সংখ্যালঘু জেলাগুলো চিহ্নিত করে তাদের শিক্ষা-স্বাস্থ্যে জোর দেওয়ার কথা বলেছিল ওই কমিটি, কিন্তু সে কাজ মোটেও এগোয়নি।

আরও বেশি মুসলিম এমপি থাকলে হয়তো অন্যরকম হয়তো, যদিও বেশি এমপি থাকাটা একটা সম্প্রদায়ের উন্নয়নের জন্য যথেষ্ঠ ও প্রয়োজনীয় শর্ত বলে আমি মনে করি না‘, বলছিলেন অধ্যাপক শাহজাহান। মুম্বাইতে সবচেয়ে প্রভাবশালী মুসলিম রাজনীতিবিদের নাম আবু আজমি- যিনি রাজ্যসভায় এমপিও ছিলেন।

তার ছেলে আবু ফারহান আজমি নবীন প্রজন্মের রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী - এবং তার আরেকটা পরিচয় তিনি বলিউড তারকা আয়েশা টাকিয়ার স্বামী।

কোলাবায় নিজের ক্যাফে-তে বসে ফারহান কিন্তু একটু অন্য ধরনের কথা শোনালেন। এটা আসলে একটা স্বার্থের চক্র! যে ষোলোজন মুসলিম এমপির কথা আপনি বলছেন তাদেরও একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে নিজের কেন্দ্র থেকে আবার জিতে আসা, আর পাঁচজন রাজনীতিবিদের মতোই।’

‘এখানে মুসলিমদের উন্নয়ন-ফুন্নয়ন সব বাজে কথা, আর সে কারণেই আমি মনে করি পার্লামেন্টে মুসলিমদের প্রতিনিধিত্ব না-থাকলেও আমাদের দিব্বি চলে যাবে। কেন না, আসলে এই মুহুর্তে কেউ আমাদের প্রতিনিধিত্ব করছেই না!’, সাফ কথা ফারহান আজমির।

কেন পার্লামেন্টে যথেষ্ঠ সংখ্যায় মুসলিম এমপি নেই, তার একটা প্রধান কারণ হিসেবে বলা হয় বড় জাতীয় রাজনৈতিক দলগুলো মুসলিম প্রার্থীদের মনোনয়ন দিতেই উৎসাহী নয়। কংগ্রেস এবারে হাতেগোনা মুসলিম প্রার্থীদের মনোনয়ন দিয়েছে, আর হিন্দুত্ববাদী দল হিসেবে পরিচিত বিজেপির প্রার্থীতালিকায় মুসলিমরা তো নেই বললেই চলে।

মুম্বাইয়ের আন্ধেরিতে শিবাজী মহারাজের মূর্তিতে মালা দিয়ে প্রচার শুরু করার আগে এই প্রসঙ্গটা তুলতেই অবশ্য তুমুল আপত্তি জানান ওই কেন্দ্রের দাপুটে বিজেপি এমপি পুনম মহাজন। ‘না না না, আসলে বিষয়টা হল আমি তো কখনও বলি না আমি একজন মারাঠিভাষী হিন্দু এমপি, আমি নিজের পরিচয় দিই একজন মুম্বাইকর এমপি বলে। ফলে ভোটব্যাঙ্কের রাজনীতির নামে আমাদের দেশে হিন্দু-মুসলিম বিভাজনের যে ধারা বহু বছর ধরে চলে এসেছে দয়া করে সেটা এবার বন্ধ করুন। আমরা এখন বিশ্বের চতুর্থ বা পঞ্চম বৃহত্তম অর্থনীতি, দেশের সবার প্রত্যাশা নিয়ে এখন এগিয়ে যাওয়ার সময়- এখন কি এই হিন্দু-মুসলিম ভাগাভাগিটা না-করলেই নয়?’, পাল্টা প্রশ্ন পুনম মহাজনের।

মুম্বাইভিত্তিক দভারতীয় মুসলিম মহিলা আন্দোলনদ বা বিএমএমএ দীর্ঘদিন ধরে ভারতের মুসলিম নারী অধিকার নিয়ে কাজ করে আসছে। সেই সংগঠনের নূরজাহান সাফিয়া নিয়াজ আবার মনে করিয়ে দিচ্ছেন পার্লামেন্টে মুসলিম মহিলাদের ইস্যু নিয়ে বিতর্কে তাদের হয়ে কথা বলার প্রায় কেউই নেই। যে মুষ্টিমেয় মুসলিম এমপিরা তারা সবাই প্রায় পুরুষ, তারা যেমন মুসলিম নারীদের হয়ে কথা বলছেন না - অন্য ধর্মের এমপিরাও বলছেন না। ফলে মুসলিম নারীরা কোথায় এসে দাঁড়াবেন?’, বলছেন মিস নিয়াজ।

মুম্বাইয়ের অধ্যাপক মহম্মদ তারিকও বিশ্বাস করেন, নির্বাচনী রাজনীতিতে শেষ বিচারে সংখ্যার একটা গুরুত্ব থাকেই। কারণ শেষ পর্যন্ত সংখ্যার ওপরই নির্ভর করে পার্লামেন্টে একটা ইস্যু আপনি তুলতে পারবেন কি না, বা কী ধরনের ইস্যু তুলতে পারবেন।

তার ছাত্র ফয়েজ আহমেদ আবার বলছিলেন, ‘কথাটা মুসলিম বা অ-মুসলিমদের নয়। একজন এমপি যদি মুসলিম না-ও হন, তার তো দায়িত্ব তার কেন্দ্রের সব নাগরিকের স্বার্থ দেখা।

কিন্তু যখন গত পাঁচ বছরে আমরা দেখলাম কোথাও বিফ রাখার অভিযোগে মানুষকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হচ্ছে বা স্রেফ ধর্মের কারণে কাউকে হামলার শিকার হতে হচ্ছে তখন কি পার্লামেন্টে আমরা যথেষ্ট তীব্র প্রতিবাদ দেখেছি? দেখিনি! কমার্সের ছাত্র সালমানের আবার বিশ্বাস, ‘মুসলিম সমাজের যে কোর ইস্যুগুলো সেটা কেবল একজন মুসলিম এমপিই ভালভাবে বুঝতে পারবেন, অন্য ধর্মের এমপিদের পক্ষে সেটা সম্ভবই নয়।

পার্লামেন্টে তিনি তিন তালাক বিলের তীব্র বিরোধিতা করেছেন, বলেছেন যে দেশে সমকামিতা কোনও অপরাধ নয়, সেখানে কীভাবে তিন তালাকের জন্য মুসলিম পুরুষের শাস্তি হতে পারে? মি ওয়াইসির এই অবস্থান নিয়ে বিতর্ক হয়েছে বিস্তর। মুসলিম এমপি-রা আদৌ সঠিকভাবে সেই সমাজের অবহেলিত বা নিপীড়িত অংশের হয়ে কথা বলছেন কি না, সে প্রশ্নও তুলেছেন অনেকেই।

কিন্তু সমাজবিজ্ঞানী পি কে শাজাহান বলছিলেন, তারপরেও পার্লামেন্টে মুসলিম এমপিদের হয়তো প্রয়োজন আছে- সংখ্যাগরিষ্ঠের একতরফা শাসনকে রুখবার জন্যই। মেজরিটারিয়ানিজমের স্বৈরতন্ত্র যে কী করতে পারে সে সম্পর্কে আমাদের সবারই ধারণা আছে। যখন সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন চেপে বসে, তখন সমাজের একটা নির্যাতিত অংশের পার্লামেন্টে যদি প্রতিনিধিত্ব না-থাকে অবস্থা আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।

অনেকেই বরছেন মুসলিম নারীদের হয়ে কথা বলার কেউ পার্লামেন্টে নেই ‘তাতে সব সঙ্কট হয়তো মিটে যাবে না, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলো সামনে আনার ক্ষেত্রে এই প্রতিনিধিত্ব অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ’, বলছেন তিনি। বিএমএমএর অ্যাক্টিভিস্ট নূরজাহান সাফিয়া নিয়াজও এ ব্যাপারে পুরোপুরি একমত।

‘মুসলিম এমপিরাই শুধু মুসলিমদের কথা বলবেন, দলিত এমপি-রাই কেবল দলিতদের ইস্যুগুলো তুলে ধরবেন এরকম ধারণার সঙ্গে আমি মোটেই সহমত পোষণ করি না। তাহলে তো আলাদা আলাদা ধর্মের বা জাতের জন্য আলাদা ইলেক্টোরেট তৈরি করতে হয়। কিন্তু তার পরেও ভারতের মতো দেশের যে বৈচিত্র্য, সেটা পার্লামেন্টেও প্রতিফলিত হলে সেটা গণতন্ত্রের স্বাস্থ্যেরই লক্ষণ’, মন্তব্য মিস নিয়াজের।

মুম্বাইয়ের প্রবীণ নাগরিক ও চিত্রপরিচালক শ্যাম বেনেগাল আবার বলছিলেন, ‘এ শহর কিন্তু কোনও দিন প্রার্থীর ধর্ম দেখে ভোট দেয়নি। তার কথায়, দেশভাগের ঠিক পর পর, সত্তর বছর আগে হয়তো দিত- কিন্তু এখন সেই ধারা একেবারেই পাল্টে গেছে। কিন্তু ইদানীংকার ভারতবর্ষে যেভাবে আবার ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার প্রশ্নগুলো মাথাচাড়া দিচ্ছে কিংবা সংখ্যালঘু মুসলিমরা নানাভাবে হামলার শিকার হচ্ছেন- তাতে পার্লামেন্টে তাদের আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বর প্রশ্নটা যে নতুন করে উঠছেই, তা কিন্তু অস্বীকার করার উপায় নেই।

এবিএন/সাদিক/জসিম

এই বিভাগের আরো সংবাদ