সড়কে নৈরাজ্য বন্ধে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা আসলে কতটা

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ২১ মার্চ ২০১৯, ২১:৪০ | আপডেট : ২১ মার্চ ২০১৯, ২১:৪২

বাংলাদেশে নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীরা আবারও রাস্তায় নেমে ব্যাপক আন্দোলন শুরু করার পর কর্তৃপক্ষ আবার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে যে তারা এজন্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে। সড়ক দুর্ঘটনায় এক বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রের মৃত্যুর পর এই দ্বিতীয় দফা আন্দোলন শুরু হয়েছিল।

এর আগেও নিরাপদ সড়কের দাবিতে ব্যাপক আন্দোলনের মুখে সরকারের তরফ থেকে অনেক প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল।

কিন্তু সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে যেরকম ব্যাপক এবং কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের দরকার হবে, সেই রাজনৈতিক সদিচ্ছা সরকারের কতটা আছে,সেই প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা।

যাত্রীদের অধিকার নিয়ে আন্দোলনকারী একটি সংগঠন যাত্রী কল্যাণ সমিতি বলেছে,সরকার বিভিন্ন সময় যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, সেগুলোর বাস্তবায়ন দৃশ্যমান হয়নি।সেকারণে সরকারের আন্তরিকতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।

এই সমিতির একজন একজন নেত্রী রিজু আকতার বলছিলেন, সরকার যদি আন্তরিকভাবে সমাধান চায়, তাহলেই কেবল সড়কে বিশৃঙ্খলা বন্ধ করা সম্ভব।

"সড়ক দুর্ঘটনা ঘটলেই সরকার শুধু প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। কিন্তু কোনো প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন নেই।"

সড়ক পরিবহণ ব্যবস্থাপনায় সরকারের কয়েকটি সংস্থা কাজ করে। বিশেষ করে ঢাকায় সড়ক পরিবহণ মন্ত্রণালয় এবং বিআরটিএ যেমন রয়েছে।সেখানে সিটি কর্পোরেশন এবং পুলিশও কাজ করে।

ঢাকার পুলিশ কমিশনার ইতিমধ্যে রাস্তায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে তাদের ব্যর্থতার কথা স্বীকার করেছেন।

সড়ক পরিবহণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির একজন সদস্য এবং আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য এনামুল হক বলছেন, সড়ক পরিবহণ ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত কোনো পরিকল্পনা না থাকায় বিশৃঙ্খলা থাকছে।

"যখনই একটা ঘটনা ঘটবে, সেখানেই একটা ফুটওভার করে দেবে। এটা কোনো সমাধান নয়।এখানে সমন্বয়ের অবশ্যই ঘাটতি আছে।আপনি দেখবেন, আমরা যখন রাস্তা বানাই, রাস্তার অর্ধেকটা দখল করে রাখে একটা শ্রেণি।রাস্তার শৃঙ্খলা দেখে পুলিশ। আবার রাস্তা বানাচ্ছে সিটি কর্পোরেশন, সড়ক পরিবহণ কর্তৃপক্ষ কিছু রাস্তা বানাচ্ছে। এই বিভিন্ন বিভাগ কাজ করছে।"

"এছাড়া বিভিন্ন গতির যানবাহন চলছে। ফলে রাস্তার গ্রহণ-ক্ষমতা এবং মানুষের গ্রহণ-ক্ষমতা, দুটাই কমে যাচ্ছে।কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না।"

কেন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত দরকার?

বুয়েটের বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামসুল হক বলেছেন,সমস্যা এবং সমাধানের উপায় চিহ্নিত করে পরিকল্পনা করা আছে। এখন আসলে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ছাড়া সমাধান সম্ভব নয় বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।

তিনি বড় সমস্যা হিসেবে দেখেন, বাস মালিক বা শ্রমিকদের রাজনৈতিক প্রভাব।আর সেজন্যই সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।

নিরাপদ সড়ক চাই নামের একটি সংগঠনের ফারিহা ফতেহ মনে করেন, সমাধানের প্রশ্নে সড়কের সাথে জড়িত সব পক্ষের আন্তরিকতা প্রয়োজন।

"এখানে কিছু বিষয় আছে রাজনৈতিক বলতে পারেন। আর ব্যবসায়িক একটা পয়েন্ট রয়েছে। আমাদের দেশে বাসের মালিক শত শত।এই বাস চালানোর ক্ষেত্রে একটা বিষয় হচ্ছে, চালকের জন্য জমা পদ্ধতি। এজন্য চালকরা বেশি অর্থ আয় করতে রাস্তায় বাস নিয়ে প্রতিযোগিতা করে এবং উল্টা-পাল্টা করে তারা ওভারটেক করে। এসব রাতারাতি ১০০ভাগ সমাধান করা সম্ভব নয়। তার মানে এই নয় যে, সমাধান অসম্ভব।"

সরকার কী রাজনৈতিকভাবে কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে পারবে?

আওয়ামী লীগের একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা বলেছেন, সরকার সড়কপথে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে বিভিন্ন সময় নানা উপায় নিয়ে আলোচনা করেছে। কিন্তু এই খাতে ব্যাপক এবং কঠোর পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। সেখানে রাজনৈতিক কিছু বিষয় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

সড়ক পরিবহণ শ্রমিকদের নেতা শাহজাহান খান আওয়ামী লীগ সরকারের আগের মেয়াদে মন্ত্রী ছিলেন। মালিকদের সংগঠনের নেতাদেরও বেশিরভাগই এখন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাথে সম্পৃক্ত।

এছাড়া এই সংগঠনগুলো ধর্মঘট ডেকে সড়ক পথ অচল করে দেয়ার ক্ষমতা রাখে। সব মিলিয়ে সরকার তাদের ক্ষ্যাপাতে চায় না বলে দলটির একাধিক সূত্র বলেছে।

আওয়ামী লীগের নেতাদের অনেকে বলছেন, মালিক শ্রমিকদের সংগঠনের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ থাকায় এই সরকারের গত দুই মেয়াদে তারা কখনও লাগাতার ধর্মঘটের কর্মসূচি সেভাবে নেয়নি। সেজন্য এই নিয়ন্ত্রণ সরকার হারাতে চায় না।

কিন্তু সড়কে বিশৃঙ্খলার কারণে সরকার যে বার বার সমালোচনা এবং আন্দোলনের মুখে পড়ছে, সেই বিষয়টিও এখন সরকারের ভিতরে আলোচনায় আসছে দলটির নেতাদের অনেকে বলছেন।

আওয়ামী লীগে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফ বলেছেন, সমস্যা সমাধানে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। কিন্তু এরজন্য রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রয়োজন নেই বলে তিনি মনে করেন।

"বাংলাদেশ একটি জনবহুল দেশ। এত বিশাল জনগোষ্ঠীকে পরিবহণের জন্য সরকারি বা রাষ্ট্রীয়ভাবে সড়কপথে সে ধরণের কোনো ব্যবস্থা নেই।স্বাভাবিকভাবে এই পরিবহণ ব্যবস্থাটা বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভর করে।যখনই বেসরকারি খাতের ওপর একটা সেক্টর পুরোপুরি নির্ভর করবে, তখন সেখানে পুরো শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা অনেক কঠিন ব্যাপার।"

তিনি আরও বলেছেন, "অবশ্যই এটা চলাটা কারও কাম্য নয়।আমরা চাই এর সঙ্গে যারা দায়িত্বশীল আছে, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, তারা পথ খুঁজে বের করবে যে, কিভাবে আমরা এর থেকে বেরিয়ে আসতে পারি।এটা আসলে কোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয় না।"

সড়ক পরিবহণ মন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের গুরুতর অসুস্থ হয়ে কিছুদিন ধরে সিঙ্গাপুরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

তবে সরকারের একাধিক সিনিয়র মন্ত্রী দাবি করেছেন, সরকার এবার সমন্বয়ের মাধ্যমে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার বিষয়ে জোর দিচ্ছে। বিবিসি

এবিএন/মমিন/জসিম

এই বিভাগের আরো সংবাদ
well-food