বাংলাদেশে একুশের বইমেলায় এখন ভিন্নমতের বই প্রকাশের সুযোগ কতটা আছে?

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ০২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১৮:২০

বাংলাদেশে অমর একুশে বইমেলায় এবারো অংশ নিচ্ছে চার শতাধিক প্রকাশনা সংস্থা। আর একাডেমি প্রাঙ্গণ ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান মিলিয়ে স্টল ও প্যাভিলিয়নের সংখ্যা সাতশ'র বেশি। ঢাকার চাকুরীজীবী রোদেলা নিরুপমা ইসলাম বলছিলেন বইমেলা নিয়ে তার আগ্রহ উচ্ছ্বাস ও অপেক্ষার কথা।

"সেই ছোটোবেলা থেকে বই মেলায় আসি। ঢাকার বাইরে ছিলাম, তাও আসতাম। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম। প্রতি বছর মেলায় যেতাম প্রায় প্রতিদিন। এখন কর্মজীবনে এসে প্রতিদিন পারিনা কিন্তু যতটুকু সম্ভব যাই। নতুন বই আর মেলার জন্য বছর জুড়েই অপেক্ষা করি"।

তার মতো বহু মানুষের কাছেই একুশের বইমেলা অন্য রকম এক ভালোবাসা। কিন্তু বছর জুড়ে অপেক্ষার পর প্রতি বছর যে ব্যাপক আয়োজন নিয়ে মেলা শুরু হয় তা কি পাঠক কিংবা বইপ্রেমীদের আকাঙ্ক্ষা মেটাতে পারছে? সব ধরনের পাঠক কি রাজনীতি, ধর্ম, দর্শন, গল্প, উপন্যাস, কবিতায় সব মত পথের বই পাচ্ছে?

পাঠকদের চাহিদা মেটাতে পারছে বইমেলা

রাশেদুল হাফিজ, যিনি গত প্রায় দু'দশক ধরে নিয়মিত বইমেলায় যান, তার মতে বইমেলায় এমন অনেক বই এখন স্বচ্ছন্দে প্রকাশ ও বিক্রয় হয়না যেগুলো আগে সহজে মিলতো।

তিনি বলেন, "বইয়ের পরিমাণ দিন দিন বাড়ছে। কিন্তু প্রকাশের ক্ষেত্রে বইয়ের ভিন্নতা কমে যাচ্ছে। বিশেষ করে রাজনীতি, ধর্মীয় ও বিজ্ঞানভিত্তিক বইয়ের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। গত কয়েক বছরের নানা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার প্রভাব পড়ার কারণেই সব পথ মতের বই এখন আর আসছেনা।"

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে বাংলা একাডেমি চত্বরে ও একাডেমি ভবনের উল্টো দিকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মাসব্যাপী এ মেলার আয়োজন করে বাংলা একাডেমি। তবে মেলা চলার সময় মেলার আমেজ ছড়িয়ে পড়ে পুরো বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনেই।

সেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী বলছেন আগে মেলায় ঢল বসতো নামী সাহিত্যিকদের ঘিরে আর এখন রাজনৈতিক নেতারা থাকেন সদলবলে। এটি মেলায় যারা ভিন্নমতের কিছু আনতে চায় তাদের জন্য পরোক্ষভাবেই একটি বড় হুমকি।

"যারা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব তারা তাদের অনুসারীদের জন্য বই লেখে। তাদের অনুসারীরা আসে ও তাদের বই বেস্ট সেলার হয়ে যাচ্ছে। অথচ এগুলো তেমন মানসম্মত হচ্ছেনা আবার তথ্যবহুল না। শুধু রাজনৈতিক কারণেই এগুলোকে প্রকাশ করতে হচ্ছে অনেককে।"

রুবাইয়াত সুলতানা নিকিতা বলছেন বইয়ের মাধ্যমে বহু চিন্তা কিংবা বহুমতের যে প্রদর্শনীর সুযোগ ছিলো সেটি এখন আর নেই বলেই মনে করেন তিনি।

"একটা বই প্রকাশ করতে হলে চিন্তা করতে হয় প্রকাশক কিংবা পাঠককে বা অন্য কাউকে তা আঘাত করছে কি-না। কিন্তু বইয়ের ক্ষেত্রে তো তা হওয়ার কথা নয়। এ ধরনের প্রতিবন্ধকতা এখন অনেক বেশি। সমাজ, দেশ বা রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এ বিষয়ে আমাদের পিছিয়ে দিয়েছে।" ভিন্নমতের সুযোগ আছে ? লেখকরা কী বলছেন?

একুশের বইমেলায় ভিন্নমতের সুযোগ নেই বা কমে যাচ্ছে বলে যে অভিযোগ আসছে পাঠকদের মধ্য থেকে সে বিষয়ে প্রকাশকদের কয়েকজন কোনো মন্তব্য করতে চাননি।

কয়েকজন প্রকাশক ও লেখক বলেছেন মেলা এলাকায় লেখক হুমায়ূন আজাদের ওপর হামলা, অভিজিৎ রায় হত্যাকাণ্ড, নিজ অফিসে প্রকাশক খুন, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগ তুলে একটি প্রকাশনীর স্টল বন্ধ ,এমনকি প্রকাশক ও লেখক আটকের যেসব ঘটনা এবং তার পাশাপাশি কর্তৃপক্ষের দিক থেকে নানা শর্ত আরোপ কিংবা বাধা নিষেধ দেয়ার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বইমেলায়। আর সে কারণেই ভিন্নমতের কোনো লেখাকেই নিরাপদ মনে করছেন না।

অনেক প্রকাশক আবার এসব নিয়ে কথা বলেও একাডেমি কর্তৃপক্ষের বিরাগভাজন হতে চাননা। কারণ এবারেও মেলার পরিবেশ যেনো বিঘ্নিত না হয় তার জন্য অঙ্গীকার করতে হয়েছে দুটি প্রকাশনা সংস্থাকে।

লেখক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ফাহমিদুল হক বলছেন এটিই এখন বই মেলার বাস্তবতা। লিখছে সেটা দেখার অনুমতি পাচ্ছে। লেখকরা অনেক সময় সরাসরি লেখেন আবার রূপক অর্থেও লেখেন অনেকে। এটা শিল্প বা নন্দনের বিষয়। সেখানে এমন হস্তক্ষেপ গ্রহণযোগ্য নয়।"

আর লেখালেখিতে প্রকাশ্যে কিংবা অপ্রকাশ্যে বিভিন্ন কায়দায় নজরদারির কারণেই ভিন্নমত প্রকাশ্যে একটা ভীতির পরিবেশ তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

তবে লেখক আনিসুল হক বলছেন লেখক হিসেবে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা যেমন তিনি চান তেমনি মেলাটা যেনো ঠিকমতো হয় সেদিকেও নজর থাকা দরকার।

"বিশৃঙ্খলা হতে পারে এমন কিছু যদি রিপোর্ট হয় তাহলে বাংলা একাডেমি তা প্রকাশে বাধা দেয়। এখন সৃজনশীলতা বা লেখালেখির জন্য দরকার শর্তহীন স্বাধীনতা, যার সীমা পরিসীমা নেই। কিন্তু প্রতিষ্ঠানগুলো সবসময় যে কোনা নিয়ম নিয়ে স্বাধীনতাকে বেধে ফেলতে চায়। একজন লেখক হিসেবে চাই যেনো মত প্রকাশের সম্পূর্ণ স্বাধীনতা যেনো পাই তবে যখন পারিবারিক বা সাংসারিক মানুষ হিসেবে ভাবি তখন মনে হয় কারোরই এমন কিছু করা উচিত নয় যাতে বিশৃঙ্খলা হয়।"

ভিন্নমতের সুযোগ: প্রকাশকদের দৃষ্টিতে

বইয়ের বিষয়বস্তু নিয়ে কয়েক বছর আগে হত্যার হুমকি পেয়েছিলেন প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান সময় প্রকাশনের কর্ণধার ফরিদ আহমেদ। মিস্টার আহমেদ এখন বলছেন মেলাকে ঘিরে নেতিবাচক কোন কিছু যেনো না হয় সেজন্য লেখক, প্রকাশক বা কর্তৃপক্ষসহ সবারই দায়িত্বশীল হবার বিকল্প নেই।

"আমাদের কিছু লেখক আছে যারা তিন দশক ধরে লেখালেখি করছেন। আজ পর্যন্ত তারা বলেননি তাদের কোনো বই নিয়ে সমস্যা হয়েছে। যে সব প্রকাশককে তিন দশক ধরে দেখছি তারা বলেননি যে সমস্যা হচ্ছে। তারপরেও যে দু একটি ঘটনা ঘটেছে সেগুলো যত বেশি এড়ানো যায়, যত না ঘটে ততই প্রকাশনার জন্য মঙ্গল।"

যদিও শ্রাবণ প্রকাশনীর রবিন আহসান বলছেন পরিস্থিতি কারণেই তারা আপস করতে বাধ্য হচ্ছেন।

"এই মেলার মাঠেই আমরা সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদের বিরুদ্ধে কথা বলেছি। এখন সে কিন্তু সে পরিস্থিতি নেই। বাংলা একাডেমি নিজেও বই প্রকাশের চেয়ে স্টল বন্ধ করতে বেশি উৎসাহী। আমি নিজেও আগে যে ধরণের বই প্রকাশ করতাম, সেটি এখন করছিনা। বলা যায় সরকার পক্ষের বই-ই ছাপছি।"

অভিযোগ মানতে রাজী নন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক

তবে এসব অভিযোগ মানতে কিংবা বিষয়গুলো এভাবে দেখতে রাজী নন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হাবিবুল্লাহ সিরাজী। "বিজ্ঞান ভিত্তিক, ধর্ম ভিত্তিক প্রকাশনা, সব কিছুরই স্বাধীনতা আছে। আমরা বৈপরীত্য চাইনা বা বিতর্ক হোক তা চাইনা। কিন্তু মুক্তমনের বই চাই। মুক্তমনেরও সীমা পরিসীমা আছে। বাংলাদেশের মূল নীতির একটি ধর্মনিরপেক্ষতা। তার অংশ হিসেবে মুক্ত মনের বিকাশ ঘটুক কিন্তু তা যেনো অন্যকে আঘাত না দেয়। মুক্তিযুদ্ধকে আঘাত দেয় এমন লেখালেখিকে প্রশ্রয় দিতে চাইনা।"

যদিও লেখক, পাঠক ও প্রকাশকরা অনেকেই বলছেন একাডেমির এই সীমা পরিসীমা খোঁজ করবার নীতির কারণেই একুশের বইমেলায় দিন দিন কমে আসছে বহুমতের চর্চার সুযোগ।

তবে প্রকাশকদের কেউ কেউ সন্তুষ্টি প্রকাশ করছেন এই ভেবে যে তাদের লাভবান যে সুযোগ বইমেলা করে দেয় তা যেনো ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।

যদিও মেলায় সরকার দলীয় নানা সংগঠন ও সংস্থার আধিক্য ও পরিবেশের নামে নিয়ন্ত্রণ আরোপ এবং বইয়ের বিষয়বস্তু পরীক্ষায় আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সম্পৃক্ততা রাখা নিয়ে অনেকে ক্ষোভ প্রকাশ করলেন, তারপরও আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু বলতে রাজী হননি কর্তৃপক্ষের বিরাগভাজন হবার ভয়ে। -বিবিসি

এবিএন/মমিন/জসিম

এই বিভাগের আরো সংবাদ
well-food