বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন

ছয় দফা ঘোষণা করে যেভাবে নেতা হয়ে ওঠেন শেখ মুজিব

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১২:২১

ছয় দফা ঘোষণার পর ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি বা ন্যাপ-এর পূর্ব পাকিস্তান প্রধান অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ শেখ মুজিবুর রহমানকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “আপনি এই যে ৬ দফা দিলেন তার মূল কথাটি কী?” আঞ্চলিক ভাষায় এই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিলেন শেখ মুজিব: “আরে মিয়া বুঝলা না, দফা তো একটাই। একটু ঘুরাইয়া কইলাম।”

ঘুরিয়ে বলা এই এক দফা হলো পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন অর্থাৎ স্বাধীনতা।

এর আগে বিভিন্ন সময়ে এই অঞ্চলের স্বাধিকার আন্দোলনের দাবি উঠেছে কিন্তু ছয় দফার দাবির মধ্য দিয়ে এটি একক এজেন্ডায় পরিণত হয়।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৬৬ সালে লাহোরে বিরোধী দলগুলোর এক সম্মেলনে এই দফা পেশ করেন। অনেকে এসব দাবিকে ‘রাজনৈতিক বোমা’ বলে উল্লেখ করেছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও যুক্তরাষ্ট্রে কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রওনক জাহান বলেন, এর আগে বাঙালির রাষ্ট্রভাষা থেকে শুরু করে আরো অনেক এজেণ্ডা ছিল। কিন্তু ছয় দফা দেওয়ার পর থেকে জাতীয়তাবাদের বিষয়টি একমাত্র এজেন্ডায় পরিণত হল।

“তখন লোকজনকে সংগঠিত করা অনেক বেশি সহজ হল। হয় আপনি আমাদের পক্ষে অথবা বিপক্ষে,” তিনি বলেন।

“এ কারণে শেখ মুজিব খুব দ্রুত সকল মানুষকে জাতীয়তাবাদী এজেন্ডার পক্ষে নিতে পারলেন এবং ৭০-এর নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়লাভ করে দেশকে স্বাধীনতার চূড়ান্ত পথে নিয়ে গেলেন,” রওনক জাহান বলেন।

ছয় দফার পটভূমি
ছয় দফা কোন রাতারাতি কর্মসূচি ছিল না। এর প্রস্তুতি ছিল দীর্ঘদিনের। উনিশশ চল্লিশ সালের লাহোর প্রস্তাব, ‘৪৭ সালের ভারত ভাগ, ১৯৪৯ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগের জন্ম, রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন, ’৫৪ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের বিজয়, ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খানের সামরিক শাসন- এসবই ছয় দফার ভিত তৈরি করেছে।

রাজনৈতিক ইতিহাসবিদ মহিউদ্দিন আহমদ তার ‘আওয়ামী লীগ : উত্থানপর্ব ১৯৪৮-১৯৭০’ গ্রন্থে লিখেছেন, “ছয় দফা হঠাৎ করে আসমান থেকে পড়েনি। দীর্ঘদিন ধরে আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি ও ধারাবাহিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে এর তাত্ত্বিক ভিত্তি তৈরি হচ্ছিল। একই সঙ্গে তৈরি হয়েছিল রাজনীতিবিদদের সঙ্গে অর্থনীতিবিদদের যুগলবন্দী, স্বাধিকারের দাবিতে যাঁরা এক মোহনায় মিলেছিলেন।”

ছয় দফার জন্মের পেছনে মূল কারণ ছিল মূলত পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক বৈষম্য।

জন্মের পর থেকে পাকিস্তান যেসব বৈদেশিক সাহায্য পেয়েছে বাঙালি সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও তার বেশিরভাগ ব্যয় হয় পশ্চিম পাকিস্তানে। পূর্ব পাকিস্তানের ‘সোনালী ফসল পাট’ বিদেশে রপ্তানি করে যে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হতো সেটাও চলে যেত পশ্চিম পাকিস্তানে। বৈদেশিক বাণিজ্যের ৬০ শতাংশ ছিল পূর্ব পাকিস্তানের কিন্তু প্রায় সমস্ত অর্থ ব্যয় হতো পশ্চিম পাকিস্তানে।

পাকিস্তান সরকারের পরিকল্পনা কমিশনের ১৯৭০ সালের রিপোর্টে দেখা যায় উন্নয়ন ও রাজস্ব খাতে পূর্ব পাকিস্তানের তুলনায় পশ্চিম পাকিস্তানে ৬০ শতাংশ বেশি ব্যয় করা হয়েছে। ফলে পশ্চিমের মাথা পিছু আয়ও বহু গুণে বৃদ্ধি পেয়েছে।

“আইয়ুব খান সামরিক শাসন জারির পর ষাটের দশকের প্রথম থেকেই উন্নয়নের একটা প্রচারণা শুরু করে দিলেন। কিন্তু পূর্ব বাংলার অর্থনীতিবিদরা লেখালেখির মাধ্যমে দেখাতে লাগলেন যে এখান থেকে সম্পদ পশ্চিম পাকিস্তানে চলে যাচ্ছে”, রওনক জাহান বলেন।

“এক অর্থনীতির বদলে আমাদের দুটো অর্থনীতি দরকার। ফলে এতো দিন যে আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের কথা বলা হচ্ছিল সেটা একটা নতুন মাত্রা পেল,” তিনি বলেন।

তার সাথে ছিল রাজনৈতিক বৈষম্য। প্রশাসনে বাঙালিদের নিয়োগ দেওয়া হতো না। নেওয়া হতো না সেনাবাহিনীতেও। ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে সামরিক বৈষম্যও মানুষের কাছে স্পষ্ট হয়ে গেল।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাসের শিক্ষক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন বলেন, ১৭ দিনের পাক-ভারত যুদ্ধের সময় ৬ দফার আশু পটভূমি তৈরি হয়েছিল।

“এই যুদ্ধের সময় লক্ষ্য করা গিয়েছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সামরিক দিক থেকে সম্পূর্ণ অরক্ষিত ছিল। সেকারণে এই অঞ্চলের রাজনীতিবিদ ও সাধারণ লোকজনের মধ্যে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছিল,” তিনি বলেন।

“শেখ মুজিব বলেছিলেন যে এই যুদ্ধের পর পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের বিষয়টি নতুন গুরুত্ব পেয়েছে। আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে,” অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন বলেন।

যুদ্ধের সময় ভারত পূর্ব পাকিস্তানে আক্রমণ না করায় পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিবৃতিতে বলেছিলেন, “চীনের ভয়ে ভারত পূর্ব পাকিস্তানের যুদ্ধে জড়াতে সাহস করেনি।” জবাবে শেখ মুজিব বলেছিলেন, “পূর্ব পাকিস্তানকে যুদ্ধকালীন সময়ে এতিমের মতো ফেলে রাখা হয়েছে। ভারতীয় সৈন্যরা যদি দেশের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত পর্যন্ত লেফট রাইট করে হেঁটে যেত তবুও তাদেরকে বাধা দেওয়ার মতো অস্ত্র বা লোকবল কিছুই পূর্ব বাংলার ছিল না। আর চীনই যদি আমাদের রক্ষাকর্তা হয় তবে পশ্চিম পাকিস্তানের বদলে চীনের সঙ্গে গাঁটছাড়া বাঁধলেই হয়।”

কী ছিল ছয় দফায়
যুদ্ধের পর তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যস্থতায় তাসখন্দে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে একটি চুক্তি সই হয়। এই চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে পাকিস্তানের বিরোধীদলীয় রাজনীতিবিদরা উনিশ'শ ছেষট্টি সালের ৬ই ফেব্রুয়ারি একটি জাতীয় সম্মেলন ডাকা হয়।

আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমেদকে সাথে নিয়ে ওই সম্মেলনে যান শেখ মুজিবুর রহমান এবং আগের দিন সম্মেলনের বিষয় নির্ধারণী কমিটির সভায় ছয় দফা পেশ করেন। এই ছয় দফা কে তৈরি করেছিলেন সেটি ইতিহাসে স্পষ্ট নয়।

ছয় দফার ছিল তিনটি স্বতন্ত্র দিক- রাষ্ট্রের প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক কাঠামো।

রওনক জাহান বলেন, “ছয় দফাতে যে রাজনৈতিক দাবি তুলে ধরা হয়েছিল সেটা অনেক আগেই থেকেই ছিল। কিন্তু এখানে অর্থনীতির বিষয়গুলো অনেক বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো। তখন আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের অর্থনৈতিক বিষয়গুলো জোরেশোরে সামনে চলে এলো।”

ছয় দফার দাবিগুলো ছিল এ রকম :

>> পাকিস্তান একটি সংসদীয় সরকার ব্যবস্থায় ফেডারেশন হিসেবে গঠিত হবে

>> ফেডারেল সরকারের এখতিয়ারে থাকবে কেবল প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র। অন্যান্য বিষয় প্রদেশগুলোর হাতে থাকবে।

>> প্রতিটি প্রদেশের জন্য পৃথক তবে অবাধে রূপান্তরযোগ্য মুদ্রা থাকবে। যদি একক মুদ্রা হয় তাহলে মুদ্রা হস্তান্তর রোধ করার উপায় থাকতে হবে।

>> রাজস্ব থাকবে প্রদেশের হাতে। 

>> প্রতিটি প্রদেশের মুদ্রা আয়ের জন্য পৃথক অ্যাকাউন্ট থাকতে হবে। 

>> আঞ্চলিক নিরাপত্তা রক্ষায় প্রতিটি প্রদেশকে মিলিশিয়া রাখার অনুমতি দিতে হবে।

সৈয়দ আনোয়ার হোসেনে বলেন, “এখানে স্বাধীনতার কোন কথা লেখা ছিল না। সেখানে ছিল পাকিস্তান রাষ্ট্রের গণতন্ত্রায়নের সুপারিশ। এবং স্বায়ত্তশাসনের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার দিকে এগিয়ে যাওয়ার একটা পথ-নির্দেশ। এটা ছিল শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক কৌশল।”

ছয় দফা সম্পর্কে বলতে গিয়ে শেখ মুজিব সাহিত্যিক সৈয়দ শামসুল হককে বলেছিলেন : “আমার দফা আসলে তিনটা। কতো নেছো (নিয়েছ), কতো দেবা (দিবে), কবে যাবা?”

ছয় দফার প্রতিক্রিয়া
শেখ মুজিব বিরোধী দলগুলোর যে সম্মেলনে এসব দফা তুলে ধরেছিলেন সেখানেই তার বিরোধিতা করা হয়। সবার আপত্তির কারণে এই প্রস্তাব সম্মেলনের এজেন্ডায় স্থান পায়নি। ক্ষুব্ধ হয়ে শেখ মুজিব সম্মেলন থেকে ওয়াকআউট করেন।

রাজনীতিবিদরা বলেন, এসব দফা বাস্তবায়িত হলে পাকিস্তান থাকবে না, ভেঙে যাবে। পাকিস্তানের খবরের কাগজে তাকে চিহ্নিত করা হয় বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা হিসেবে।

নিজের দল আওয়ামী মুসলিম লীগেরও সব নেতার সমর্থন ছিল না ছয় দফার প্রতি। তবে ছাত্রলীগের তরুণ নেতারা শেখ মুজিবের পাশে ছিলেন। অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলিও ছয় দফার বিরোধিতা করে।

রওনক জাহান বলেন, “বামপন্থীরা তো সবাই ন্যাপে চলে গিয়েছিল। আইয়ুব তখন চীনের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তুলছে। ফলে তারা আর ছয় দফার সঙ্গে ছিল না। ফলে তারা জনবিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে লাগলো। ভাসানীর নেতৃত্বে যে ন্যাপকে শক্তিশালী দল বলে মনে হচ্ছিল ১৯৭০ এর মধ্যে তারা মানুষের সমর্থন হারিয়ে ফেললো। কোন বিষয়টি মানুষের কাছে বেশি জনপ্রিয় হবে সেটা বুঝতে তারা রাজনৈতিক ভুল করে ফেলেছিল।”

পাকিস্তানের সামরিক শাসক আইয়ুব খান বিচলিত হয়ে পড়েন। প্রয়োজনে তিনি অস্ত্রের ভাষায় ছয় দফার জবাব দেওয়ার হুমকি দেন। উনিশ'শ ছেষট্টি সালে কনভেনশন মুসলিম লীগের সমাপ্তি অধিবেশনে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান বলেন দেশের অখণ্ডতা-বিরোধী কোন প্রচেষ্টা সরকার সহ্য করবে না।

এর পর শেখ মুজিবকে বারবার গ্রেফতার করে কারাগারে আটক রাখা হয় এবং তার বিরুদ্ধে দায়ের করা হয় আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা। তখনই শোনা গেল ‘জেলের তালা ভাঙবো শেখ মুজিবকে আনবো’ এই স্লোগান।।

শেখ মুজিবের উত্থান
লাহোর থেকে ঢাকায় ফিরে পরের মাসেই এসে শেখ মুজিবুর রহমান আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। সাধারণ সম্পাদক হন তাজউদ্দীন আহমদ।

ছয় দফা কর্মসূচি জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য তারা সমগ্র পূর্ব পাকিস্তান সফর করতে শুরু করেন। এই কর্মসূচিকে তারা ‘বাঙালির বাঁচার দাবি’ হিসেবে অভিহিত করেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, দলকে চাঙ্গা করা এবং দলের প্রধান হয়ে ওঠার জন্যেও শেখ মুজিবের এরকম একটি কর্মসূচির প্রয়োজন ছিল।

রওনক জাহান বলেন, “১৯৬৩ সালে সোহরাওয়ার্দী মারা যাওয়ার পর শেখ মুজিবুর রহমান দলটির হাল ধরেন। সোহরাওয়ার্দীর পরে পূর্ব বাংলায় এবং আওয়ামী লীগে যারা রাজনীতি করতেন তারা কেউ কেন্দ্রীয় সরকারে বড় ধরনের ভূমিকা পালন করা, কিম্বা পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার বিষয়ে আগ্রহী ছিলেন না। শেখ মুজিবর রহমান তখন দলের নেতা হতে যাচ্ছেন এবং এজন্য তার একটা কর্মসূচির প্রয়োজন ছিল যা বাঙালির আকাঙ্ক্ষাকে ধরতে পারবে। এখানে নতুন আঙ্গিকে স্বাধিকারের কথা বলা হলো যা তাদেরকে স্বাধীনতার পথ দেখালো।”

এর পরই তিনি প্রেসিডেন্ট হলেন এবং এই কর্মসূচি নিয়ে সারা দেশে মহকুমায় মহকুমায় ঘুরে বেড়াতে শুরু করলেন। তখন তিনি যেখানে যাচ্ছেন সেখানেই তাকে গ্রেফতার করা হচ্ছে। এসময় শেখ মুজিবের সফরসঙ্গী ছিলে তাজউদ্দীন আহমদ।

তার কন্যা শারমিন আহমদ তার ‘তাজউদ্দীন আহমদ/নেতা ও পিতা’ গ্রন্থে লিখেছেন: “আইয়ুব খানের বৈদেশিক মন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো তখন ছয় দফাকে অযৌক্তিক প্রমাণ করার জন্য মুজিব কাকুকে ঢাকার পল্টনের জনসভায় তর্কযুদ্ধের আহবান জানালেন। মুজিব কাকু আব্বুর সঙ্গে পরামর্শ করে ভুট্টোর চ্যালেঞ্জটি গ্রহণ করলেন।”

“আব্বু ভুট্টোর সঙ্গে দেখা করে মুজিব কাকুর চ্যালেঞ্জ গ্রহণের সংবাদটি আনুষ্ঠানিকভাবে জ্ঞাপন করলেন। আব্বুর সঙ্গে কথা বলার পরপরই ভুট্টো বুঝতে পারলেন ছয় দফার যৌক্তিকতা আব্বু এমন নিপুণ ও তথ্যবহুল যুক্তিতে দাঁড় করিয়েছেন যে মুজিব কাকু ও তার দলকে তর্কে হারানো মুশকিল। আব্বুর সঙ্গে কথা শেষ করার পর ভুট্টো মুসলিম লীগ নেতাদের কাছে মন্তব্য করেছিলেন 'হি ইজ ভেরি থরো, শেখের যোগ্য লেফটেন্যান্ট আছে দেখছি।”

কিন্তু পরে সেই তর্কযুদ্ধ অনুষ্ঠিত হয়নি।

এই ছয় দফাকে কেন্দ্র করে সারা দেশে গণজাগরণের সৃষ্টি হলো। দৈনিক ইত্তেফাক এর পক্ষে জনমত গড়ে তুলতে বড় ধরনের ভূমিকা রাখে।

শেখ মুজিবসহ সব রাজবন্দীর মুক্তির দাবিতে ১৯৬৬ সালের ৭ই জুন সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে হরতাল ডাকা হয়। এদিন পুলিশের গুলিতে ১১ জন শ্রমিক ও সাধারণ মানুষ নিহত হয়।

শেখ মুজিবুর রহমানের সমসাময়িক রাজনীতিক অলি আহাদ তার ‘জাতীয় রাজনীতি ১৯৪৫-১৯৭৫’ গ্রন্থে লিখেছেন, “সকাল আটটার দিকে তেজগাঁওয়ে অবস্থিত কোহিনূর কেমিক্যাল কো. ও হক ব্রাদার্স কো. সম্মুখস্থ রাজপথের পূর্ব পার্শ্বে অবস্থিত একটি চায়ের দোকানে ধর্মঘটী শ্রমিক দল চা-নাস্তা গ্রহণকালে একজন শ্রমিক সাইকেল তথায় আসিলে দোকানে উপবিষ্ট শ্রমিকদের একজন সাইকেলের হাওয়া ছাড়িয়া দেয়। এমনি আপোষী দৃশ্যে হাসি-কৌতুকের হিল্লোড় বাহিয়া যায়। হঠাৎ হরিষে বিষাদ সৃষ্টি করে একটি পুলিশ জিপের আগমন। পুলিশ জিপে আগত পুলিশ শ্রমিকদিগকে লাঠিপেটা আরম্ভ করে, শুরু হয় পাল্টা শ্রমিক প্রতিরোধ। অসহিষ্ণু পুলিশের রিভলবারের গুলিতে তিনজন শ্রমিক গুলিবিদ্ধ হয়।”

এ সময় দৈনিক ইত্তেফাকের প্রকাশনাও বন্ধ হয়ে যায়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক রওনক জাহান বলেন, তখন নতুন একটা শ্রেণি এই আন্দোলনে অংশ নিতে দেখা যায়।

“নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন স্থানে কারখানার শ্রমিকরাও এর সাথে শরিক হলো। কিন্তু এর আগে বিভিন্ন আন্দোলনে মূলত শিক্ষার্থীরাই ভূমিকা পালন করেছিল। পরে ’৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে কৃষকরাও আন্দোলনে যোগ দিল,” তিনি বলেন।

এর পেছনে কারণ ছিল, শেখ মুজিব সারা দেশে ঘুরে ঘুরে লোকজনকে বোঝাতে পেরেছিলেন যে পূর্ব পাকিস্তানের সম্পদ পশ্চিম পাকিস্তান কেড়ে নিচ্ছে। তাদের সুদিন আসবে যদি তারা তাদের সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেন।

সৈয়দ আনোয়ার হোসেন বলেন, “আমার নিজের কানে শোনা। ছাত্রলীগের নেতা সিরাজুল আলম খান একটি সভায় মন্তব্য করেছিলেন যে শেখ মুজিবের নেতৃত্বেই এদেশকে স্বাধীন করতে হবে। কারণ লোকে তার কথা শোনে। অর্থাৎ ৬ দফার পর তিনি অবিসম্বাদিত নেতা হয়ে উঠতে শুরু করেন। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় মুক্তি পাওয়ার পর তাকে বঙ্গবন্ধু উপাধি দেওয়া হয় এবং এর পর থেকেই তিনি হয়ে উঠলেন বাঙালির মুখপাত্র।”

ছয় দফা ঘোষণা করে শেখ মুজিব চলে এলেন একেবারে সম্মুখভাগে।

রওনক জাহান বলেন, “শেখ মুজিব তখন সবকিছু তার কাঁধে তুলে নিলেন। ক্যারিশম্যাটিক নেতা ছিলেন তিনি। একজন অসাধারণ বাগ্মী ছিলেন। ১৯৬৬ থেকে ৭০ এই চার বছরে তিনি সবাইকে ছাড়িয়ে গেলেন। ছয় দফা আন্দোলন তাকে সাহায্য করলো বাঙালিদের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের একজন প্রতীক হয়ে উঠতে।”

ছয় দফা ঘোষণার পাঁচ বছর পর বাংলাদেশের জন্ম হয় এবং শেখ মুজিবুর রহমান হন তার প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি।

এবিএন/সাদিক/জসিম

এই বিভাগের আরো সংবাদ