ঈদ উৎসব

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ২২ আগস্ট ২০১৮, ১৩:২৫

ঢাকা, ২২ আগস্ট, এবিনিউজ : ঈদ মানে উৎসব। ঈদ মানে আনন্দ। পৃথিবীর সব দেশেই ঈদুল ফিতর বা রোজার ঈদ জাঁকজমক করে উদযাপন করা হলেও ঈদুল আজহার আনন্দে কিন্তু খুব একটা ভাটা পড়ে না। ধনী-গরিব, ছেলে-বুড়ো, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সব মুসলমানের জীবনে ঈদ হাজির করে আনন্দের বন্যা। এমনকি আমাদের দেশে অন্যান্য ধর্মের মানুষকেও ঈদের আনন্দ স্পর্শ করে। ত্যাগ, শান্তি আর আনন্দের অনাবিল সওগাত নিয়ে ফের সমুপস্থিত হওয়ার ঈদুল আজহা নিয়ে এবিনিউজ টুয়েন্টিফোর ডট কম-এর প্রতিবেদন।

মানব জাতিকে ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত করতে বছর ঘুরে আমাদের মাঝে হাজির হয় ঈদুল আজহা। ত্যাগের মহিমায় সমুজ্জ্বল এই দিনটি তাই ত্যাগের আদর্শ অনুসরণের তাগিদ দেয়। বলা বাহুল্য, এই উৎসব-আনন্দে তাদের নিজ নিজ ইতিহাস-ঐতিহ্য, বিশ্বাস, মানসিকতা প্রভৃতি মূর্ত হয়ে ওঠে। তবে পৃথিবীর অপরাপর জাতি-সম্প্রদায়ের উৎসব আনন্দ দিবসের লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের চেয়ে মুসলমানদের ঈদ উৎসবের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য আরও সুদূরপ্রসারী ও ব্যাপক। কেননা অন্যান্য জাতির আনন্দ-উৎসব পার্থিব সুখ-সম্ভোগ পূরণের জন্য হয়ে থাকে।

মুসলমানদের জন্য অফুরন্ত খুশির বার্তা নিয়ে হাজির হয় দুটি দিন- ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা। ধনী-গরিব, ছেলে-বুড়ো, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সব মুসলমানের জীবনে ঈদ হাজির করে আনন্দের বন্যা। এমনকি আমাদের দেশে অন্যান্য ধর্মের মানুষকেও ঈদের আনন্দ স্পর্শ করে। মানবিক সাম্য, ত্যাগ ও সহমর্মিতার বিস্ময়কর ও অপরূপ আলোকপ্রভা ঈদের উৎসবে প্রকাশিত হয়, যা ইসলামের মহত্ত্ব ও সর্বজনীনতার প্রতীক। ঈদ প্রতিবছর আনন্দের পয়গাম নিয়ে হাজির হয়। অন্যদিকে আরবি ‘আজহা’ শব্দের অর্থ : ত্যাগ স্বীকার, কোরবানি প্রভৃতি। ঈদুল আজহায় আল্লাহর রাহে ত্যাগ ও কোরবানির চেতনা ভাস্বর হয়ে ওঠে। পশু জবেহ করার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভের প্রচেষ্টা মানব ইতিহাসের জন্মলগ্ন থেকেই চলে আসছে।

মহান আল্লাহতায়ালার আদেশ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে প্রায় চার হাজার বছর আগে মুসলিম জাতির পিতা হজরত ইব্রাহিম (আ.) নিজ শিশুপুত্র ইসমাইলকে (আ.) কোরবানি করার উদ্যোগ নেন। এর মধ্য দিয়ে ইসলামের ইতিহাসে ত্যাগের এই অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন তিনি। সেই থেকে বিশ্ব মুসলিম প্রতিবছর জিলহজ মাসের ১০ তারিখ প্রিয় পশু কোরবানি করে থাকেন আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য। বিশ্ব মুসলিমের মতো বাংলাদেশের মুসলমানরাও সেই ত্যাগ ও আনুগত্যের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে ঈদের দিনের শুরুতেই ঈদগাহে বা মসজিদে সমবেত হয়ে দুই রাকাত ওয়াজিব নামাজ আদায় করেন। নামাজের খুতবায় ইমাম বর্ণনা করবেন কোরবানির তাৎপর্য। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ধনী-গরিব নির্বিশেষে এককাতারে নামাজ আদায়, কোলাকুলি ও শুভেচ্ছা বিনিময় শেষে নিজ নিজ পশু কোরবানি করবেন। আনন্দের দিনে অশ্রুসিক্ত হয়ে অনেকেই যাবেন কবরস্থানে, তাদের বাবা-মাসহ প্রিয়জনদের রুহের মাগফিরাত কামনার জন্য। সর্বোচ্চ ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, যথাযোগ্য মর্যাদা, বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা ও ত্যাগের মহিমায় মুসলমানরা আনন্দ উৎসব পালন করবে। ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর এই ঈদুল আজহা হচ্ছে মুসলমানদের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব।

প্রতিবছর হিজরি, ক্যালেন্ডার অনুযায়ী জিলহজ মাসের ১০ তারিখ পবিত্র ঈদুল আজহা হাজির হয় পশুত্ব প্রবৃত্তির কোরবানি করে মনুষ্যত্বকে জাগ্রত করার সুমহান পসরা নিয়ে। ত্যাগের আনন্দে উদ্ভাসিত পবিত্র ঈদুল আজহা মানুষকে মানবিক চেতনায় পুষ্ট হয়ে জগতের সকল সৃষ্টির কল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করার শিক্ষা দেয়। উৎসাহ জোগায় একটি সাম্যপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে শামিল হতে। সংগত কারণে সমগ্র মুসলিমজাহান তো বটেই, সমগ্র বিশ^মানবের কাছে পবিত্র ঈদুল আজহার সীমাহীন গুরুত্ব ও তাৎপর্য রয়েছে।

এই কোরবানি বা ঈদের প্রধান শিক্ষা ‘ত্যাগ’ ছাড়া আরও একটি বড় শিক্ষা হলো আনন্দ ভাগাভাগি করে নেওয়া। যে কারণে জবেহকৃত পশুর গোশতের একটি অংশ গরিব-দুঃখীর মাঝে বিতরণের নির্দেশনা রয়েছে। এর বাইরে কোরবানিদাতার নিকটাত্মীয়ের মাঝেও গোশত বিতরণের নির্দেশনা আছে।

১০ জিলহজ পবিত্র ঈদুল আজহা শুরু হয়। মোট তিন দিন পশু কোরবানি করা যায়। সেই হিসেবে ১১ ও ১২ জিলহজও পশু কোরবানি করার বিধান রয়েছে। অর্থাৎ ১০ জিলহজ ঈদের নামাজের পর থেকে ১২ জিলহজ পর্যন্ত কোরবানি করা যায়। এই ঈদের প্রস্তুতির মধ্যে প্রধান বিষয় হলো পশু ক্রয়। অবশ্য যারা ঈদের উৎসবে রাজধানী ঢাকা বা অন্য কোনো শহরে কর্মস্থল থেকে গ্রামের বাড়িতে ফেরেন, তাদের প্রস্তুতি শুরু হয় যানবাহনের টিকিট সংগ্রহ করা থেকে ব্যাগ-ব্যাগেজ গোছানো দিয়ে। ঈদের যাত্রায় ভোগান্তি কম নয়, এবারও তার হেরফের হচ্ছে না। তবু প্রিয়জনের সান্নিধ্য লাভের আনন্দ, আপন ঠিকানায় ফেরার অনুভূতির তুলনায় যাত্রার দুর্ভোগ তুচ্ছজ্ঞান করেই সপরিবারে গ্রামে ফিরে যাবেন অসংখ্য মানুষ।

ঈদের শিক্ষা হলো সাম্য, ভ্রাতৃত্ব ও একাত্মবোধের মাধ্যমে আনন্দ উপভোগ এবং পারস্পরিক সাহায্য-সহযোগিতার সম্প্রসারণ। সমাজের গরিব অভাবী মানুষও যাতে এই মহানন্দে শামিল হতে পারে, সেজন্য ইসলাম নির্দেশনা দিয়েছে। ধনী-গরিবের একাকার হয়ে যাওয়ার এই ব্যবস্থা সত্যিই বিরল। ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, জাতীয়, আন্তর্জাতিক, পরলৌকিক সবক্ষেত্রেই ঈদের দাবি পরিব্যাপ্ত। অন্যান্য জাতি-গোষ্ঠীর উৎসবের মতো এটি সাময়িক সস্তা আনন্দ, তামাশা বা অর্থহীন উল্লাস নয়। আদর্শবাদিতা, মার্জিত রুচিবোধ আর শালীনতার প্রকাশ ঘটে এই উৎসবে। ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য থেকে বিচ্যুত না হয়ে সামাজিকতা এবং মানবতাবোধকে সমুন্নত করাই ঈদের মূল তাৎপর্য।

শহরে যারা ঈদ পালন করবেন, তারা ইতোমধ্যে কোরবানির পশুর হাটে ঘোরাঘুরি শুরু করে দিয়েছেন। এরই মধ্যে অনেকেই কিনেছেন পছন্দসই গরু বা ছাগল। দারুণ উৎসাহে কোরবানির পশুর যত্ন করতে ব্যস্ত অনেকে। ঈদের দুদিন আগে শহরের পাড়ায় পাড়ায় শোনা যাবে কোরবানির জন্য কেনা গবাদিপশুর হাঁকডাক। তখন সর্বত্রই যেন গ্রামীণ আবহ তৈরি হয়। আনন্দ উৎসবের এ ঈদকে সামনে রেখে গবাদিপশু মোটাতাজাকরণেরও হিড়িক পড়ে যায়। এজন্য ব্যবহৃত হচ্ছে ভিটামিন ট্যাবলেট, পামবড়ি ও বিশেষ ধরনের ইনজেকশন। এমনকি রাতারাতি ফল পেতে মাসব্যাপী যে ইনজেকশন দেওয়ার নিয়ম সেটি পাঁচ মিনিটের মধ্যেই পুশ করে গরু মোটাতাজা করছেন একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী। অভিযোগ উঠেছে, সরকারের প্রাণিসম্পদ বিভাগের লোকজনও এতে জড়িত। কোরবানির গরুর হাটে ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে অধিক মুনাফার লোভে জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর স্টেরয়েড ব্যবহার করে গরু মোটাতাজা করে দেদারসে বাজারজাত করছেন একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী। আর একশ্রেণির শৌখিন ক্রেতা ওইসব মোটাতাজা গরু কেনার জন্যই বেশি আকৃষ্ট হচ্ছেন। কোরবানির হাটে দেদারসে বিক্রি হচ্ছে মোটাতাজা, বিশালদেহী গরু। মোটাতাজা গরু মানুষের বেশি নজর কাড়ে। কিন্তু এই গরুগুলোকে হাটে বসে কেবল ঝিমুতে দেখা যায়। চুপচাপ থাকে। নড়াচড়াও কম করে। ষাঁড়সুলভ হম্বিতম্বি একেবারেই নেই। বিক্রেতারা এসব গরুকে ‘শান্ত ও ভদ্র’ বলে গছিয়ে দিতে চান ক্রেতাদের কাছে।

তবে এ বছর গরুকে ‘তাগড়া’ দেখাতে আরেক ধরনের ওষুধ খাইয়ে থাকে। বিত্তবানদের অনেকেই কোরবানির হাটে গিয়ে মোটাতাজা গরুর দিকেই ঝোঁকেন বেশি। দাম যতই হোক, কিনে নিয়ে বুক ফুলিয়ে বাড়ি আসেন। তবে বিশেষজ্ঞরা বলেন, তারা যে বেশি দাম দিয়ে অস্বাভাবিক মোটাতাজা গরুর সঙ্গে কিনে আনলেন স্বাস্থ্যের জন্য ভয়ানক বিষ, তা আর বুঝতে পারেন না। এসব গরুর মাংস খেয়ে নিজেদের জীবনকেই ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেন অনেকে। প্রতিবছর কোরবানির মৌসুমে অসাধু ব্যবসায়ী নিষিদ্ধ ‘স্টেরয়েড’ প্রয়োগ করে কৃত্রিম উপায়ে গরু মোটাতাজা করার হিড়িক ফেলে দেন। অতি মুনাফার আশায় তারা ডেক্সামেথাসন বা ডেকাসন, বেটামেথাসন ও পেরিঅ্যাকটিন জাতীয় স্টেরয়েড ব্যবহার করে গরু মোটাতাজা করে থাকেন। বেশ কয়েকজন গরুর খামারি জানিয়েছেন, এটি একটি গর্হিত অন্যায় কাজ। মোটাতাজাকরণের ওষুধ সেবনে গরু দেখতে মোটা হয় ঠিকই। গরুর শরীরের চামড়ার নিচে পানি জমে ফুলে যায় কিংবা চর্বি বেড়ে যায়। ওই ওষুধে গরুর মুখম-ল ফুলে গেলেও আসলে মাংস বাড়ে না।

সারাবিশ্বের মুসলমানরা ঈদুল আজহায় মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি ও করুণা লাভের জন্য কোরবানি দিয়ে থাকেন। ৪ হাজার বছর আগে হজরত ইব্রাহিম (আ.) আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের পর পৃথিবীতে সবচেয়ে প্রিয়বস্তু নিজ পুত্র হজরত ইসমাইল (আ.)-কে কোরবানি করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু পরম করুণাময়ের অপার কুদরতে হজরত ইসমাইল (আ.)-এর পরিবর্তে একটি দুম্বা কোরবানি হয়ে যায়। আল্লাহর নির্দেশ পালনে হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর সেই অনন্য ত্যাগের মহিমা স্মরণ করে মুসলিম সম্প্রদায় জিলহজ মাসের ১০ তারিখে আল্লাহপাকের অনুগ্রহ কামনায় পশু কোরবানি করে থাকে। আর্থিকভাবে সামর্থ্যবান মুসলমানের জন্য আল্লাহ কোরবানি ফরজ করে দিয়েছেন। তাই কোরবানি করাই এই দিনের উত্তম ইবাদত বলে ধর্মীয়ভাবে বলা হয়েছে। মনের পশুকে দমন করতেই প্রতীকী এই পশু কোরবানির বিধান। ১০ জিলহজ থেকে তিন দিন কোরবানি করা যায়। সচ্ছলদের জন্য কোরবানি ফরজ হলেও ঈদের আনন্দ থেকে বঞ্চিত হবে না দরিদ্ররাও। কোরবানি দেওয়া পশুর মাংসের তিন ভাগের এক ভাগ তাদের মধ্যে বণ্টন করে দেওয়া ইসলামের বিধান। আর ঈদ মানেই তো প্রীতির বন্ধন। তাই আপনজনের মধ্যেও বিলিবণ্টন করবেন আরও এক ভাগ। আর নিজের জন্য এক ভাগ। আজ মুসলিম উম্মাহর মধ্যে পশু কোরবানির যে প্রথা প্রচলিত রয়েছে এবং প্রবর্তন হয়েছে তা হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর কোরবানির ঐতিহ্য থেকেই। মহান আল্লাহ হজরত ইব্রাহিম (আ.)-কে একের পর এক পরীক্ষা করে সর্বশেষ নিজের বন্ধু হিসেবে ঘোষণা দেন।

ইসলামি বিধান অনুসারে, কোরবানির পশুর মাংস সবার সঙ্গে ভাগ করে নেওয়াই নিয়ম। গরিব-দুঃখীদের মধ্যে কোরবানির মাংসের নির্দিষ্ট অংশ বিলি করতে হয়। ফলে এর মাধ্যমে সেবা ও সহমর্মিতার আদর্শও সমাজে প্রতিষ্ঠা পায়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, ঈদুল আজহায় অনেক সময়ই ত্যাগের চেয়ে ভোগ প্রবল হয়ে ওঠে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে গরিব-দুঃখীরাও বঞ্চিত হয়। কোরবানির মাংস ঘরে ঘরে নির্বিচার ভোজন উৎসবের উত্থানও ঘটায়। অনেক সময় দায়িত্বশীলতার ঘাটতিও দেখা যায়। শহর ও গ্রামে যত্রতত্র কোরবানি দেওয়ার কারণে পরিবেশ নষ্ট হয়। রাস্তাঘাট বর্জ্য ও রক্তে মাখামাখি হয়ে থাকে। পচা দুর্গন্ধে স্বাভাবিক চলাফেরা বিঘিœত হয়। এমন পরিস্থিতি মুমিনদের জন্য সম্মানজনক নয়। তাই পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করার উদ্যোগও নেওয়া উচিত। সিটি কর্পোরেশনসহ দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানগুলোকেও নাগরিকদের সহায়তায় এগিয়ে আসতে হবে। ঝকঝকে, দুর্গন্ধমুক্ত ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশের উৎসবই প্রত্যাশিত।

ঈদুল আজহা মানে ত্যাগের ঈদ। এই ঈদ মহান কোরবানির শিক্ষা দেয়। কোরবানি হচ্ছে মূলত ত্যাগ। ত্যাগের মধ্যেই এর সার্থকতা ও তাৎপর্য নিহিত। পবিত্র ঈদুল আজহা আমাদের এ শিক্ষাই দেয়। তবে ঈদ কেবল ত্যাগের নয়, উৎসব-আনন্দেরও। এ আনন্দের ধারা আমরা লক্ষ্য করি সর্বত্র। বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের মধ্যে বাঁধভাঙা জোয়ার দেখা দেয়, যা নির্মল আনন্দেরই প্রকাশ। কোরবানিকে আরবি ভাষায় ‘উযহিয়্যা’ বলা হয়। উযহিয়্যা শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো ওই পশু, যা কোরবানির দিন জবেহ করা হয়। ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায় মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্য নির্দিষ্ট সময়ে পশু জবেহ করাকে কোরবানি বলা হয়। এটি একটি আর্থিক ইবাদাত। যার কারণে সবার ওপরই কোরবানি করার বাধ্যবাধকতা নেই। তাই যাদের ওপর কোরবানি আদায় করা আবশ্যক তাদের উচিত নির্দিষ্ট নিয়মে ও নির্দিষ্ট সময়ে পশু কোরবানি দেওয়া। তবে কোরবানির মূল উদ্দেশ্য যেহেতু নিজেদের পশুত্বপ্রবৃত্তির কোরবানি করে মনুষ্যত্বকে জাগ্রত করা, সেহেতু এই উদ্দেশ্যকে পাশ কাটিয়ে নিজেদের গৌরব-মর্যাদার প্রতীক হিসেবে কোরবানিকে বিবেচনা করা উচিত নয়। বর্তমান সময়ে অনেকেই কোরবানির মাধ্যমে নিজের আর্থিক সামর্থ্য জাহির করার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়। প্রকৃতপক্ষে এই প্রতিযোগিতাপ্রবণ কোরবানির কোনো মূল্য নেই আল্লাহর কাছে। মহান আল্লাহ কেবল ওই কোরবানিকেই কবুল করে থাকেন, যেটা কেবলই তারই প্রেম-ভালোবাসায় হয়ে থাকে।

বস্তুত মানুষের স্বচ্ছ-নির্মল হৃদয়ে পশুর স্বভাব বিদ্যমান থাকে। তাতে মানুষের স্বভাবে প্রকাশ পায় হিংসা-বিদ্বেষ, গর্ব-অহঙ্কার, কপটতা, পরশ্রীকাতরতা, পরনিন্দা ইত্যাদি। মানব-হৃদয়ের এই পশুত্ব মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের পথে প্রধান বাধা। তাই পশু কোরবানির পাশাপাশি নিজেদের পশুত্বকে কোরবানি দিতে হয় তাকওয়ার শাণিত ইচ্ছার মাধ্যমে। আর তখনই প্রতীকী পশুর কোরবানি সার্থক হবে। আল্লাহতা’লার উদ্দেশ্যে পশু কোরবানি উপলক্ষ হলেও এর অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহর নৈকট্য ও সন্তুষ্টি অর্জন করা। সেদিক থেকে ঈদুল আজহা একটি অত্যন্ত মহিমান্বিত দিন। আরবি শব্দ ঈদ-এর অর্থ আনন্দ উৎসব এবং আজহা’র অর্থ পশু জবাই করা। অর্থাৎ ঈদুল আজহা একই সঙ্গে পশু কোরবানি দেওয়ার এবং উৎসব করার দিন।

প্রসঙ্গত, একশ্রেণির মুসলমান ঈদুল আজহাকে কেবলই পশু কোরবানি দেওয়ার এবং উৎসব করার দিনে পরিণত করলেও দিনটির প্রধান উদ্দেশ্য মুসলমানদের মধ্যে আল্লাহতা’লার প্রতি পরিপূর্ণ ভালোবাসা ও আনুগত্য তৈরি করা এবং স্বার্থচিন্তার উচ্ছেদ করে আত্মত্যাগের শিক্ষা দেওয়া। আল্লাহতা’লার কাছে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে সমর্পণ করাই ঈদুল আজহার প্রকৃত শিক্ষা। সুতরাং কেবলই লোক দেখানোর জন্য বেশি টাকায় পশু কিনে কোরবানি দেওয়ার পরিবর্তে মুসলমানদের উচিত নিজেদের আল্লাহতা’লার কাছে সম্পূর্ণরূপে সমর্পণ করার এবং তার নৈকট্য ও সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করা। একই কারণে পশু কেনা উচিত সৎপথে উপার্জিত অর্থ দিয়ে। পশুর গোশত যত বেশি সম্ভব আত্মীয়-স্বজন ও গরিবদের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়ার মধ্যেও কল্যাণ রয়েছে। এভাবে সব মিলিয়েই কোরবানি তথা আত্মত্যাগ করার শিক্ষা দেয় পবিত্র ঈদুল আজহা। আমরা আশা করতে চাই, বাংলাদেশের মুসলমানরাও দিনটির মূল শিক্ষা অনুধাবন করবেন এবং চেষ্টা করবেন যাতে প্রতিবেশী ও স্বজনসহ অন্যরাও উৎসবে শরিক হতে পারেন।

কোরবানির ঈদ আনন্দ-বিনোদনের সাথে আমাদের মানুষ হিসেবে মানুষের প্রতি সামাজিক ও মানবিক দায়িত্ব পালনেও উদ্বুদ্ধ করে থাকে। আনন্দ উৎসবের এমন ব্যতিক্রমী উদাহরণ পৃথিবীতে আর দ্বিতীয়টি লক্ষ্য করা যাবে না। তবে, কোরবানির ঈদ আমাদের যে আহ্বান জানিয়ে যায়, যে চেতনা জাগ্রত করতে চায়, তা আমরা বাস্তব জীবনে কতটা চর্চা করছি, সে বিষয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন আছে? কোরবানির ত্যাগ-তিতিক্ষা ও তাকওয়ার চেতনা আমাদের ব্যক্তি-জীবন, পারিবারিক-জীবন, সমাজ-জীবন ও রাষ্ট্রীয়-জীবনে লক্ষ্য করা যায় না। এটি দুঃখজনক। ঈদুল আজহার বার্তা গ্রহণ করে তা আমাদের বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করতে পারলেই কেবল ঈদের ফল্গুধারায় পুরো জাতি আনন্দমুখর হতে পারবে। নানা সীমাবদ্ধতা ও সংকট সত্ত্বেও ত্যাগের মহিমায় উজ্জ্বল ও মহিমান্বিত হোক ঈদুল আজহা। ঈদ মোবারক।

এবিএন/মাইকেল/জসিম/এমসি

এই বিভাগের আরো সংবাদ