জঙ্গিবাদ থেকে উন্নয়নের রোল মডেল বাংলাদেশ

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ১৭ আগস্ট ২০১৮, ১৪:৩০ | আপডেট : ১৭ আগস্ট ২০১৮, ১৫:০৪

ঢাকা, ১৭ আগস্ট, এবিনিউজ :

আজ ১৭ আগস্ট

আজ থেকে প্রায় ১ যুগ আগে ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে সারাদেশে ৬৩ জেলায় একযোগে বোমা হামলা করেছিল জঙ্গি সংগঠন জামায়াতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ (জেএমবি)।

সিরিজ বোমা হামলা করতে এক হাজার ২০০ কোটি টাকার ফান্ড গঠন করা হয়েছিল। ফান্ডের বেশির ভাগ টাকা এসেছিল মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ থেকে। বাকি অর্থ যুদ্ধাপরাধীদের গঠিত একটি রাজনৈতিক দল ছাড়াও বিভিন্ন এনজিওর মাধ্যমে জোগান দেওয়া হয়েছিল। অবশ্য ২০০১ সালের আগেই বিএনপি-জামায়াতের প্রত্যক্ষ মদদে ধর্মীয় উগ্রবাদিতার বিস্ময়কর উত্থান হয়। ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের পরিকল্পিত গ্রেনেড হামলা ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে শেখ হাসিনাকে হত্যার ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রের ভয়ংকর নজির।

২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট বেলা ১১টার দিকে একযোগে রাজধানীসহ দেশের ৩০০টি স্থানে ৫০০ বোমার বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। মাত্র আধ ঘণ্টার ব্যবধানে চালানো এ সিরিজ বোমা হামলায় দু’জন নিহত হন, আহত হন দুই শতাধিক মানুষ। একমাত্র মুন্সিগঞ্জ জেলায় বোমার বিস্ফোরণ ঘটেনি।

হাইকোর্ট, সুপ্রিমকোর্ট, জেলা আদালত, বিমানবন্দর, বাংলাদেশে থাকা মার্কিন দূতাবাস, জেলা প্রশাসক কার্যালয়, জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়, প্রেসক্লাব ও সরকারি-আধা-সরকারি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা বেছে বেছে সিরিজ বোমা হামলা চালায় জঙ্গিরা।

হামলার জায়গাগুলোতে জেএমবির লিফলেট ছড়িয়ে দেয় জঙ্গিরা। আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয় লিফলেটগুলোতে। ‘দ্রুত এদেশে ইসলামী হুকুম কায়েম করতে হবে। নতুবা কঠিন পথ বেছে নিতে বাধ্য হবে জেএমবি।’ বিচারকদের বিশেষ বার্তা লিফলেটে লেখা ছিল এ ধরনের কথা। ইসলামী আইন বাস্তবায়ন না হলে আবারও হামলার হুমকি দেয় জেএমবি।

সিরিজ বোমা হামলায় সারাদেশের বিভিন্ন থানায় শতাধিক মামলা দায়ের করেছিল পুলিশ। এর কিছুদিন পর আবারও ধারাবাহিক হামলা করে জেএমবি। ওই বছরই ৩ অক্টোবর চাঁদপুর, লক্ষ্মীপুর ও চট্টগ্রামের জেলা আদালতে বিচার কাজ চলাকালে দুপুর ১২টায় আবার একযোগে বোমা হামলা চালানো হয়। এজলাসে ঢুকে বিচারককে লক্ষ্য করে বোমা ছুড়ে মারা হয়। তিন জেলা আদালতে প্রতি জেলায় ৩টি করে মোট ৯টি বোমা ছোড়া হয়। এ ঘটনায় চাঁদপুর ও চট্টগ্রামে দায়েরকৃত মামলায় ১০ জনকে গ্রেফতার করা হয়।

এসব মামলায় শায়খ আব্দুর রহমান, বাংলাভাই, আতাউর রহমান সানি, জাভেদ ইকবাল, আবু জহর, জাহেদুল ইসলাম সুমন, শাহাদাত হোসেন ও লাল্টুকে আসামি করা হয়। এর ১৫ দিন পর ১৯ অক্টোবর সিলেটের দ্রুত বিচার আদালতের বিচারক বিপ্লব গোস্বামীকে হত্যা করতে বোমা হামলা চালায় জঙ্গিরা। তিনি অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে গেলেও বোমার আঘাতে মারাত্মক আহত হন।

মাসখানেক পরেই ১৫ নভেম্বর বহুল আলোচিত ঝালকাঠি শহরের অফিসার পাড়ায় জাজেস কোয়ার্টারের সামনে বিচারকদের বহনকারী মাইক্রোবাসে শক্তিশালী বোমা হামলা চালানো হয়। বোমা বিস্ফোরণে ঝালকাঠি জজ আদালতের সিনিয়র সহকারী জজ সোহেল আহমেদ চৌধুরী ও জগন্নাথ পাড়ে নিহত হন। অল্পের জন্য রক্ষা পান আরেক বিচারক আব্দুল আউয়াল। এ ঘটনায় ২টি পৃথক মামলা করা হয়।

এরপর ৩০ নভেম্বর গাজীপুর ও চট্টগ্রাম আদালতে পৌনে এক ঘণ্টার ব্যবধানে আত্মঘাতী জঙ্গিরা গায়ে বোমা বেঁধে হামলা চালায়। এতে ২ জঙ্গিসহ ৯ জন নিহত ও শতাধিক ব্যক্তি আহত হয়। সর্বশেষ ২ ডিসেম্বর গাজীপুর জেলা আদালতে আবারও চায়ের ফ্ল্যাক্সে করে বোমা হামলা চালানো হয়। এতে ৭ জন নিহত ও অর্ধশত আহত হয়।

এদিকে, বিভিন্ন হামলার সঙ্গে জড়িত জেএমবির হুজি প্রধান মুফতি হান্নানকে ২০০৫ সালের ১ অক্টোবর রাজধানীর মধ্য বাড্ডা থেকে, সদস্য আব্দুল আউয়াল ওরফে আদিলকে ২০০৫ সালের ১৮ নভেম্বর ঠাকুরগাঁও থেকে, জেএমবির শূরা সদস্য আতাউর রহমান ওরফে সানিকে ২০০৫ সালের ১৩ ডিসেম্বর রাজধানীর তেজগাঁও ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট থেকে, জেএমবির শূরা সদস্য হাফেজ রাকিব হাসান ওরফে মাহমুদকে ২০০৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররম এলাকা থেকে, আমির শায়খ আব্দুর রহমানকে ২০০৬ সালের ২ মার্চ সিলেটের পূর্ব শাপলাবাগ এলাকার সূর্য দীঘল বাড়ি থেকে, জেএমবির সেকেন্ড ইন কমান্ড সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলাভাইকে ২০০৬ সালের ৬ মার্চ ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা থানার চেচুয়া বাজারের রামপুরা গ্রাম থেকে, জেএমবির সূরা সদস্য মো. সালেহীন ওরফে সালাউদ্দিন ওরফে তৌহিদকে ২০০৬ সালের ২৫ এপ্রিল চট্টগ্রামের সিডিএ এলাকার একটি বাড়ি থেকেএবং ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার অপারেশনাল কমান্ডার মুফতি মঈন উদ্দিন ওরফে আবু জান্দালকে ২০০৮ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি গাজীপুরের বানিয়াচালা মসজিদ থেকে গ্রেফতার করা হয়।

এদের মধ্যে ঝালকাঠির দুই বিচারক হত্যা মামলাটি পরে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করা হয়। ২০০৬ সালের ৩০ মে মামলার রায়ে শায়খ আব্দুর রহমান, সিদ্দিকুল ইসলাম বাংলা ভাই, আতাউর রহমান সানি, আব্দুল আউয়াল, মাসুম, খালিদ, সাইফুল্লাহসহ মোট ৭ জনকে ফাঁসির আদেশ দেয়া হয়। ২০০৭ সালের ৩০ মার্চ এদের ফাঁসি কার্যকর করা হয়।

অদ্যাবধী বিভিন্ন সময় জেএমবির জঙ্গি কার্যক্রমের ঘটনায় পুরনো মামলার সঙ্গে নতুন নতুন ঘটনায় মামলা হয়েছে। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মামলার বিচার কাজ শেষ হয়েছে। মৃত্যুদণ্ড, যাবজ্জীবন সাজাসহ বিভিন্ন মেয়াদে সাজা পায় অপরাধীরা। কিছু মামলা এখনও চলমান।

২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট সিরিজ বোমা হামলার ঘটনায় সারাদেশে ১৫৯টি মামলা দায়ের করা হয়। এর মধ্যে ৯৪টি মামলার বিচার সম্পন্ন হয়েছে। এই মামলাগুলোতে ৩৩৪ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা প্রদান করা হয়েছে। এখন ৫৫টি মামলা বিচারের অপেক্ষায় রয়েছে। যার আসামি সংখ্যা হচ্ছে ৩৮৬ জন।

এই সিরিজ বোমা হামলার রায় প্রদান করা মামলাগুলোর ৩৪৯ জনকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। আসামিদের মধ্যে ২৭ জনের বিরুদ্ধে ফাঁসির রায় হয়েছে। এর মধ্যে ৮জনের ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে।

সিরিজ বোমা হামলার ঘটনায় রাজধানীর বিভিন্ন থানায় মোট ১৮টি মামলা দায়ের করা হয়। এর মধ্যে দুটি মামলার রায় হয়েছে। ১১টি মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল এবং বাকী ৫টি মামলা বিচারের অপেক্ষায় আছে। রাজধানীর তেজগাঁও একটি মামলায় ঢাকার একটি আদালত একজনকে ১০ বছরের কারাদণ্ড ও আরেকজনকে ৭ বছরের কারাদণ্ড প্রদান করেন। এছাড়া নগরীর বিমানবন্দর থানার অন্য আরেকটি মামলার রায়ে ৫ জনকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করেন।

জানা যায়, ঢাকার বিচারাধীন ৫টি মামলা সাক্ষ্য গ্রহণের পর্যায়ে রয়েছে। বিচারাধীন এই মামলাগুলো আগামী জানুয়ারির মধ্যে শেষ করা যাবে বলে আশা করছেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা। বিচার শেষ করতে সাক্ষী হাজির করাই বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করেন তারা।

সিরিজ বোমা হামলায় ঝালকাঠিতে দুই বিচারক হত্যা মামলায় ২০০৭ সালে জেএমবির শীর্ষ নেতা শায়খ আব্দুর রহমান, সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলা ভাই ও আতাউর রহমান সানির ফাঁসি কার্যকর করা হয়।

তৎকালীন চারদলীয় জোট সরকারের তৎকালীন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী-এমপি ও স্থানীয় বিএনপি-জামায়াতের নেতাদের বিরুদ্ধে জেএমবিকে মদদ দেয়ার অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফর জামান বাবার, এনএসআই প্রধান অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী, রাজশাহীর এসপি মাসুদ মিয়াসহ অনেকরই ভূমিকা ছিলো জেএমবির উত্থানে। জেএমবির শক্ত ভিত গড়ে তোলায় ভূমিকা রাখে জামাত-শিবিরের শত শত কর্মী।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, জঙ্গিবাদ পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব নয়। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি কাঠোর নজরদারির কারণে জঙ্গিরা প্রায় নির্মূল হয়ে গেছে। বৈশ্বিক, আঞ্চলিক, এবং দেশীয় ষড়যন্ত্রকারীদের চক্রান্তের কারণে জঙ্গিবাদ পুরোপুরি নির্মূল সম্ভব নয় বলেও মনে করেন তারা। জঙ্গি নির্মূলে সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ঐক্যসহ আইন শৃংখলা বাহিনীকে আরো তৎপর হওয়ার আহবান নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের।

বর্তমান সরকারের সন্ত্রাসের প্রতি জিরো টলারেন্স আর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃঢ় নেতৃত্বে বাংলাদেশ আজ সফল হয়েছে এই জঙ্গি গোষ্ঠীকে দমন করতে। বাংলাদেশ আজ বিশ্ব দরবারে উন্নয়নের রোল মডেল। এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ।

দেশ থেকে ১৭ আগস্টের মতো অপরাজনৈতিক তত্পরতা চিরতরে দূর করতে হবে। এ দেশের জঙ্গিবাদের শীর্ষ নেতা ও ধর্মীয় উগ্রবাদিতার পৃষ্ঠপোষকরা পাকিস্তান বা মধ্যপ্রাচ্যে পালিয়ে আছে। এদের সবাইকে অবিলম্বে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচার সম্পন্ন ও রায় কার্যকর করা হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম জঙ্গিবাদের করালগ্রাস থেকে মুক্ত থাকতে সক্ষম হবে।

সিদ্ধান্ত আপনার, আপনি কি আবার ফিরে যেতে চান জঙ্গিবাদের সেই কালো যুগে, ফিরে যেতে চান আবার কোনো বাংলা ভাইয়ের সশস্ত্র মহড়ার দিনে- অবশ্যই না! জঙ্গিমুক্ত ও সুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে আপনার ভূমিকা রাখুন।

এবিএন/মাইকেল/জসিম/এমসি

এই বিভাগের আরো সংবাদ