জন্মের পর বাচ্চা তিনটিকে দুধ খেতে দেয়নি বাঘিনী, যায়নি কাছেও

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ২৬ নভেম্বর ২০২০, ২৩:২৫

১৪ই নভেম্বর রাতে চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানায় জয়া নামে বাঘিনী তিনটি শাবক জন্ম দেয়। প্রাণীকুলের মধ্যে প্রাকৃতিকভাবেই দেখা যায় সন্তান জন্মদানের পর মা শিশুকে দুধ খাওয়ায় এবং যত্ন নেয়।

কিন্তু এই বাঘিনী সন্তান জন্মদানের পর বাচ্চা তিনটিকে দুধ খেতে দেয়নি, কাছেও যাচ্ছে না।

ফলে দুধের অভাবে প্রথম শাবকটি মারা যায় ১৫ নভেম্বর, দ্বিতীয়টি মারা যায় ১৮ নভেম্বর।

এখন তৃতীয় শাবকটি, যার এখনো নাম রাখা হয়নি, তাকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানার কর্তৃপক্ষ।

চিড়িয়াখানার ডেপুটি কিউরেটর ও চিকিৎসক শাহাদাৎ হোসেন শুভ বলেছেন, এখন তৃতীয় শাবকটিকে বাঘের দুধ, ছাগলের দুধ এবং ভিটামিন মিলিয়ে প্রতি চার ঘণ্টা পর পর ফিডারে করে খাওয়ানো হচ্ছে।

কিন্তু জন্মের পর গত ১২ দিনে শাবকটির ওজন মাত্র ৩০০ গ্রাম বেড়েছে। ফলে সে পুরোপুরি সংকটমুক্ত এ কথা বলা যাবে না। তবে আমরা পুরোপুরি চেষ্টা করছি বাঁচিয়ে রাখতে।

জন্মের পরপর এই শাবকটির ওজন ছিল এক কেজি।

সন্তানকে কেন দুধ দেয়নি মা বাঘটি?
চিড়িয়াখানার ডেপুটি কিউরেটর শাহাদাৎ হোসেন শুভ বলেছেন, সন্তানকে দুধ না দেবার ঘটনা বাঘিনীদের জন্য অস্বাভাবিক নয়।

বিশেষ করে যেসব বাঘ বন্দী অবস্থায় থাকে, তাদের ক্ষেত্রে এমন হতে পারে।

এছাড়া এই বাঘিনীর এটিই প্রথম সন্তান জন্মদান, দুধ না দেওয়ার সেটাও একটা কারণ হতে পারে বলে ধারণা করছে চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ।

প্রথম সন্তান জন্ম দেওয়ার পরপর ক্যাপটিভ বা বন্দি অবস্থায় থাকা বাঘিনী অনেক সময়ই খুব উদাসীন আচরণ করতে পারে।

সন্তান জন্মের পর পর বাঘিনী সাধারণত যা করে, চিড়িয়াখানায় বন্দি বাঘিনী অনেক সময়ই তা নাও করতে পারে।

কিন্তু সাধারণত সে সংখ্যা কম হয় জানিয়ে হোসেন বলেছেন, জয়া নামের বাঘিনীর ক্ষেত্রে হয়ত সেটাই ঘটেছে। জয়া এখনো তার সন্তানের কাছ থেকে দূরে দূরে থাকছে।

এটা হয়ত পরে ঠিক হয়ে যেতে পারে।

তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষক এবং বাঘ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মো. ফিরোজ জামান বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করেন এভাবে, বছরের পর বছর বন্দী থাকায় যে কোনো প্রাণীর মধ্যে আচরণগত পরিবর্তন হয়ে যায়।

যে কারণে স্বাভাবিক ক্ষেত্রে যা করার কথা তার ব্যতিক্রম হতে পারে। এক্ষেত্রে হয়তো তাই হয়েছে।

তিনি মনে করেন, এই বাঘিনী হয় কোনো কারণে আপসেট হয়ে রয়েছে, তার মধ্যে প্রথম মাতৃত্বও তার জন্য সুখকর অনুভূতি না হতে পারে।

যে কারণে সে এখনই সন্তানের প্রতি স্বাভাবিক দায়িত্ব পালনে প্রস্তুত নয়, যে কারণে উদাসীন আচরণ করছে।

সন্তান জন্ম দেবার পর কী করে বাঘ
সন্তান জন্মদানের পরপরই সাধারণত বাঘিনী বাচ্চাকে চাটতে শুরু করে, এতে শাবকটির শরীরে রক্ত সঞ্চালন শুরু হয়। এরপর মা তাকে দুধ দেয়, এবং যত্ন নিতে থাকে।

জন্মের দুই ঘণ্টার মধ্যে বাচ্চার সাথে থাকা প্লাসেন্টা খেয়ে ফেলে বাঘিনী। এটা তাকে ওই সময় শক্তি যোগায়।

যেহেতু একসঙ্গে একাধিক সন্তান জন্ম দেয় একটি বাঘিনী, ফলে সন্তান জন্মদান প্রক্রিয়ায় সাধারণত ছয় থেকে আট ঘণ্টা সময় লাগে একটি বাঘের।

ওই সময়ে চিড়িয়াখানায় থাকা বাঘিনী সাধারণত কর্তৃপক্ষের বা তার পালনকারীর দেওয়া খাদ্যগ্রহণ করে না। এমনকি কেউ কাছে ভিড়তে পারে না ওই সময়।

এর একটি কারণ হিসেবে ডেপুটি কিউরেটর হোসেন বলছিলেন, বাঘের একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে সন্তান জন্মদানের পর তার শাবক যদি তার আগে অন্য কেউ ছোয়, তাহলে কখনো সে আর ওই শাবককে ছুঁয়ে দেখবে না।

যে কারণে চিড়িয়াখানায় সন্তান জন্মদানের সময় কাছাকাছি কারো যাবার অনুমতি থাকে না। যে ঘরে সন্তান জন্ম দেয় বাঘিনী সেই ঘরটি কয়েকদিন পর্যন্ত ঢেকে রাখা হয়, পুরোপুরি অন্ধকার করে রাখা হয়।

বাঘ শাবকের মৃত্যু হার বেশি
চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানার ডেপুটি কিউরেটর হোসেন বলেছেন, বাঘ শাবকের মৃত্যু হার সারা দুনিয়াতেই বেশি। জন্মের কয়েকদিনের মধ্যে অন্তত ৫০ শতাংশ শাবক মারা যায়। তবে মৃত্যু হার জঙ্গলে থাকা মুক্ত বাঘেদের মধ্যে বেশি বলে জানাচ্ছেন হোসেন।

বাঘ শাবকের পরিবারের ইতিহাস
হোসেন জানিয়েছেন, এই মূহুর্তে চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানায় মোট ছয়টি বাঘ রয়েছে, এদের মধ্যে দুইটি বাঘ এবং চারটি বাঘিনী রয়েছে।

নাম না রাখা বাঘ শাবকটির মায়ের নাম জয়া। তার জন্মও হয়েছে এই চিড়িয়াখানায়।

২০১৬ সালের ডিসেম্বরে দক্ষিণ আফ্রিকা একটি পুরুষ রয়েল বেঙ্গল টাইগার এবং একটি মেয়ে পুরুষ রয়েল বেঙ্গল টাইগার আনা হয়। ওই সময় বাঘটির নামকরণ করা হয় রাজ এবং বাঘিনীর নাম রাখা হয় পরী।

বাঘটির বয়স সে সময় ছিল ১১ মাস আর বাঘিনীর বয়স ছিল ৯ মাস।

২০১৮ সালের ১৯শে জুলাই পরী নামের বাঘিনী তিনটি সন্তান জন্ম দেয়। ওই তিনটি সন্তানের মধ্যে দুইটি ছিল 'হোয়াইট টাইগার', অন্যটি হলুদ-কালো ডোরাকাটা বাঘ, যার নাম রাখা হয় জয়া।

সেটি ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম কোনো হোয়াইট টাইগারের জন্ম, যদি পরে তাদের একটি মারা যায়। বেঁচে থাকা সাদা বাঘিনীর নাম শুভ্রা।

চিড়িয়াখানার পরিবেশে সংস্কার প্রয়োজন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষক এবং বাঘ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মো. ফিরোজ জামান বলছিলেন, বাংলাদেশের চিড়িয়াখানাগুলোতে প্রাণি পালনের যে পদ্ধতি তাতে সংস্কার আনা দরকার।

তিনি মনে করেন, জঙ্গলের পরিবেশ পুরোপুরি দেওয়া না গেলেও, অন্তত খাঁচার পরিবর্তে মুক্ত পরিবেশে রাখা দরকার বাঘের মত প্রাণীগুলোকে। এছাড়া তাদের যে পদ্ধতিতে খাবার দেওয়া হয়, তাতে পরিবর্তন প্রয়োজন। এতে তাদের বিকাশ স্বাভাবিকের মতো হবে এবং আচরণগত পরিবর্তন হবে না।

এবিএন/শংকর রায়/জসিম/পিংকি

এই বিভাগের আরো সংবাদ