বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন

যে কারণে বন্ধ মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের শ্রমবাজার

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০১৮, ১২:০১

ঢাকা, ২৭ আগস্ট, এবিনিউজ : বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারগুলোর একটি, মালয়েশিয়ার দরজা আর ৫ দিনের মধ্যেই আপাতত বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

‘জিটুজি প্লাস’ নামে যে এসপিপিএ সিস্টেমের আওতায় মালয়েশিয়া তাদের দেশে বাংলাদেশি শ্রমিকদের নিয়োগ করত, সেই পদ্ধতি আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকেই স্থগিত হয়ে যাবে বলে সে দেশের সরকার বাংলাদেশকে ইতোমধ্যে জানিয়েও দিয়েছে।

কুয়ালালামপুরের সাংবাদিক শেখ কবীর আহমেদ বিবিসিকে জানিয়েছেন, বর্তমান পদ্ধতিতে যে ১০টি রিক্রুটিং এজেন্সির মারফত বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নিয়োগ করা হত তা বাতিল ঘোষণা করা হলেও মালয়েশিয়ার সরকার নতুন কী পদ্ধতি চালু করতে চাইছে তা আদৌ স্পষ্ট নয়।

কবীর আহমেদ বলেন, ‘মাহাথির মোহাম্মদের নতুন সরকার হয়তো নতুন কোনও পদ্ধতি চালু করবেন। কিন্তু তাতে যে বেশ সময় লাগবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই, আর ততদিন পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে এদেশে শ্রমিক আসা বন্ধ থাকবে ধরেই নেওয়া যায়।’

বাংলাদেশ জনশক্তি রফতানিকারকদের সমিতি বায়রা বিবিসিকে জানিয়েছে, গত বছরের মার্চ থেকে এ বছরের জুলাই পর্যন্ত প্রায় ১ লাখ ৯০ হাজার অভিবাসী শ্রমিক বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়াতে পাড়ি দিয়েছেন।

এই সংখ্যা সৌদি আরবে যাওয়া বাংলাদেশী শ্রমিকের সমান- কাজেই বাংলাদেশের জনশক্তি রফতানিতে মালয়েশিয়ার গুরুত্ব কতটা, তা বোঝা কঠিন নয়।

বায়রার সচিবালয়ে উপদেষ্টা মো. দলিলউদ্দিন ম-ল অবশ্য বলছেন, ‘হ্যাঁ, সাময়িকভাবে হয়তো বিরূপ প্রভাব কিছুটা পড়বে। তবে মালয়েশিয়া এর আগেও বহুবার বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নেওয়া বন্ধ করেছে ও আবার চালু করেছে - আর সেই গত প্রায় ২৫ বছর ধরে এ জিনিস চলছে। কাজেই আমরা অতটা ভয় পাচ্ছি না, আশা করছি আবার নতুন কোনো সিস্টেম চালু হবে।’

তবে ঢাকা বিশ্বিবদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ এম এম আকাশ মনে করছেন, মালয়েশিয়ার এই সিদ্ধান্তে রেমিট্যান্স প্রবাহে যেমন বড় ভাটা পড়ার আশঙ্কা আছে সেটা একটা দিক; কিন্তু তার চেয়েও বড় বিপদ হল বাংলাদেশের ‘ভাবমূর্তির সংকট’।

অধ্যাপক আকাশের কথায়, ‘যে কারণেই মালয়েশিয়া এটা বন্ধ করুক, আমাদের যে কিছুটা বদনাম হয়ে গেল তা তো অস্বীকার করতে পারি না। আমি যেটুকু সমস্যাটা বুঝতে পারছি, আমাদের দিক থেকেও যে মালয়েশিয়াতে শ্রমিক পাঠানোর প্রক্রিয়াটা স্বচ্ছ ও দুর্নীতিমুক্ত ছিল না, সেটা তো পরিষ্কার। বাংলাদেশকে এখন তারই মাশুল গুনতে হবে।’

কিন্তু মালয়েশিয়া কেন ১ সেপ্টেম্বর থেকে বাংলাদেশের শ্রমিক নেওয়া বন্ধ করছে, তার কি কোনো নির্দিষ্ট কারণ দেখিয়েছে?

মালয়েশিয়ার সাংবাদিক শেখ কবীর আহমেদ জানান, গত ২১ আগস্ট এ দেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ডেপুটি সেক্রেটারি, জেনারেল দাতো ইন্দেরা খাইরুল দাজমি বিন দাউদের স্বাক্ষরিত একটি চিঠিতে জানানো হয়েছে যে সে দেশের বিগত সরকার বাংলাদেশের যে ১০টি রিক্রুটিং এজেন্সির মারফত শ্রমিক নিত, তাদের এসপিএ সিস্টেম সেপ্টেম্বরের গোড়া থেকেই বাতিল হয়ে যাবে।

তিনি বলেন, ‘এখন যদিও ওই চিঠিতে নির্দিষ্ট কোনো কারণ উল্লেখ করা হয়নি, আমরা বিভিন্ন সূত্রে জানতে পারছি ওই ১০টি এজেন্সির বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ ছিল। বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ায় নিয়োগ পেতে একজন শ্রমিকের যেখানে মাত্র ৪০ হাজার টাকা লাগার কথা, সেই জায়গায় এই এজেন্সিগুলো ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত চার্জ করত বলে জানা যাচ্ছে।’

এই দুর্নীতির সঙ্গে মালয়েশিয়ার পূর্বতন সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত একজন মালয়েশিয়ার নাগরিকও জড়িত বলে অভিযোগ উঠেছে।

তবে এই কথিত দুর্নীতির ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করতে চাননি বায়রা কর্তৃপক্ষ।

তবে সংস্থার উপদেষ্টা দলিলউদ্দিন মণ্ডল জানাচ্ছেন, তারা চেয়েছিলেন এই রিক্রুটমেন্ট পদ্ধতি সব সংস্থার জন্যই উন্মুক্ত করে দেওয়া হোক।

তার কথায়, ‘এর আগে ২০১৬ সালে দুই দেশের সরকার যখন আলোচনায় বসেছিল, তখন বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৯০০ এজেন্সির নাম জমা দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু মালয়েশিয়া মাত্র ১০টি এজেন্সিকে বেছে নেয় এবং বলে যে সংখ্যাটা পারে বাড়ানো হবে। আমরা অনেকবার লিখেছি যে প্রসেসটা ওপেন করে দেওয়া হোক, কিন্তু সেটা শেষ পর্যন্ত আর হয়নি।’

তিনি বলেন, ‘এখন মালয়েশিয়াতে সরকার পরিবর্তন হয়েছে। নতুন সরকার হয়তো আগের পদ্ধতিটা পছন্দ করছে না, এই জিনিস তো প্রায়ই হয়। ঠিক বলতে পারব না কী হয়েছে, তবে আমাদের বিশ্বাস মালয়েশিয়াতে জনশক্তি রফতানি পাকাপাকিভাবে কিছুতেই বন্ধ হবে না। তা হলে তো দুপক্ষেরই ক্ষতি, তাই না? ওরা যদি সা-রে-গা-মা সুর ধরে থাকে, তাহলে আমাদের শ্রমিকরা গিয়েই তো পা-ধা-নি গেয়ে সপ্তসুর শেষ করছে - এটা তো বুঝতে হবে। দুজনেরই আসলে পরস্পরকে দরকার।’

মালয়েশিয়ার অভ্যন্তরীণ রাজনীতির কারণেই আপাতত বাংলাদেশের শ্রমিক নিয়োগ বন্ধ করা হচ্ছে, বায়রা এমন একটা ইঙ্গিত করতে চাইলেও সেই যুক্তি মানতে নারাজ অর্থনীতিবিদ এম এম আকাশ।

তিনি বিবিসিকে বলছিলেন, ‘যদি ধরেওনি মালয়েশিয়ার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে পুরনো জমানার মন্ত্রী-নেতাদের দুর্নীতি খুঁড়ে বের করার চেষ্টা হচ্ছে, বাংলাদেশকে তো তার বলির পাঁঠা বানানোর কোনো কারণ নেই। এখানে আমাদেরও কিছু গাফিলতি ছিল, সেটা স্বীকার করে নেওয়াই ভালো।’

জনশক্তি রফতানির পুরো পদ্ধতিটা যতক্ষণ না পুরোপরি ‘ডিজিটাল’ করা হচ্ছে, ততদিন এই জাতীয় সমস্যা থেকেই যাবে বলে ধারণা অধ্যাপক আকাশের।

‘সরকারের একটা ওয়েবসাইট থাকবে - যেখানে বিদেশ যেতে ইচ্ছুক শ্রমিকরা নিজেদের যোগ্যতা, তথ্য-পরিচয় উত্যাদি আপলোড করবেন। সেখান থেকে বেছে নিয়ে বিদেশে চাহিদা অনুযায়ী ম্যাচ করে তাদের নিয়োগপত্র দেওয়া হবে, এটা করলেই তো সমস্যা মিটে যায়!’

‘তার বদলে এখন যে 'মিডলম্যান' বা মধ্যস্বত্ত্বভোগীদের স্বার্থান্বেষী চক্র কাজ করছে সরকার তাদের কাছে বারবার নতি স্বীকার করার ফলেই গুরুত্বপূর্ণ এই শ্রমবাজারগুলো বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে’, বলছিলেন অধ্যাপক আকাশ।

এবিএন/সাদিক/জসিম

এই বিভাগের আরো সংবাদ