ক্যাম্প থেকে পালাচ্ছে রোহিঙ্গারা

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ২১ মে ২০১৯, ০০:৩৮

টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে অস্থীরতা তৈরি হয়েছে। ক্যাম্প ছেড়ে পালানোর চেষ্ট করছে তারা। ক্যাম্পগুলোর নিরাপত্তা-দুর্বলতায় রাতের অন্ধকারে সহজেই বেরিয়ে পড়ছে রোহিঙ্গারা। ক্যাম্প ছেড়ে রোহিঙ্গারা ছড়িয়ে পড়েছে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে। দেশের মূল জনস্রোতে মিশে যাওয়ার চেষ্টা করছে তারা। অনেকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে ফিরতে বাধ্য হচ্ছে ক্যাম্পে। অনেকে আবার পরিচয় গোপন করে পাসপোর্ট নিয়ে দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। বাংলাদেশ ছেড়ে অবৈধভাবে মালয়েশিয়ায়ও পাড়ি জমাচ্ছে।

গত এক মাসে সমুদ্র পথে মালয়েশিয়ায় পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা কালে পাঁচ শতাধিক রোহিঙ্গাকে আটক করেছে নিরাপত্তাবাহিনী। পাঁচ শতাধিক ধরা পড়লেও ছলে বলে নানা কৌশলে মালয়েশিয়ায় পালিয়ে যেতে পারে অসংখ্য রোহিঙ্গা। । প্রতিদিন ক্যাম্প থেকে রোহিঙ্গারা পালাচ্ছে। প্রতি বছর সাধারণত বর্ষা মৌসুমের আগে অর্থাৎ, শুকনো মৌসুমে রোহিঙ্গাদের অনেকেই বিদেশে যেতে আগ্রহী হয়ে ওঠে। কারণ বর্ষায় সাগর উত্তাল থাকে। তাই শুকনো মৌসুমে দালালদের হাত ধরে সাগর পাড়ি দিয়ে অবৈধভাবে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়াসহ আশপাশের দেশগুলোতে আশ্রয়ের পথ খোঁজে তারা। তবে এবার অন্যান্য বছরের তুলনায় রোহিঙ্গা অধিক মাত্রায় ক্যাম্প ছাড়ছে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।

রোহিঙ্গাদের নির্দিষ্ট সীমানায় ঘেরা দিয়ে রাখতে না পারায় তারা বনজঙ্গলসহ বিভিন্ন চোরাপথ দিয়ে সহজে বের হয়ে যাচ্ছে। পুলিশ ও কোস্ট গার্ড সমুদ্র পথে মালয়েশিয়া যাওয়ার প্রস্তুতি নেওয়ার সময় শুক্রবার রাতে ৮৪ জন রোহিঙ্গাকে আটক করেছে। এদের মধ্যে ৬৭ জনকে আটক করেছে পুলিশ এবং ১৭ জনকে আটক করেছে কোস্ট গার্ড। কক্সবাজারের টেকনাফ ও পেকুয়া থেকে তাদের আটক করা হয়। এক সপ্তাহ আগে ঢাকা থেকে ২৬ জন রোহিঙ্গাকে আটক করা হয়েছিল।

ক্যাম্প থেকে বিভিন্ন উপায়ে বের হয়ে মালয়েশিয়া যেতে উদগ্রীব রোহিঙ্গারা। তারা যাতে ক্যাম্প থেকে বেরিয়ে অন্য জায়গায় যেতে না পারে সেজন্য উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন জায়গায় নিরাপত্তা বাহিনীর চেকপোস্ট স্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু তার পরও নানা উপায়ে রোহিঙ্গারা ক্যাম্প থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে।

কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এ বি এম মাসুদ হোসেন বলেন, রোহিঙ্গারা নিরাপত্তা বাহিনীর চেকপোস্ট এড়িয়ে পাহাড়-জঙ্গলের ভেতর দিয়ে এলাকা থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। রোহিঙ্গারা এখন স্থানীয় ভাষা শিখে গেছে। পোশাক স্থানীয়দের মতো পরিধান করছে। এ ছাড়া অনেকে স্থানীয়দের সঙ্গে মিশে বা স্থানীয়দের ভিড়ে কৌশলে পালানোর চেষ্টা করছে।

তিনি বলেন, ২০১৭ সালের পর থেকে ক্যাম্পের বাইরে চলে গেছে এমন ৬৭ হাজার রোহিঙ্গাকে ফের ক্যাম্পে ফেরত আনা হয়েছে। বর্ষার আগে তাদের মধ্যে ক্যাম্প ছাড়ার প্রবণতা থাকে। বিশ্বের অন্যান্য দেশে এমন ঘটনায় নির্দিষ্ট একটি জায়গায় কাঁটাতারের মধ্যে তাদের আটকে রাখা হয়। ক্যাম্পের মধ্যে তাদের রাখতে হলে বেশকিছু ব্যাপারে এখনই পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। পুলিশের পক্ষ থেকে একটি প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।

একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, রোহিঙ্গাদের ক্যাম্পের মধ্যে রাখার জন্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে যেসব উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হচ্ছে তা হলো; ক্যাম্পের নির্দিষ্ট এলাকায় ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা বসানো। ক্যাম্পের ভেতরে লাইটের ব্যবস্থা রাখা। কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে নির্দিষ্ট এলাকা দিয়ে রোহিঙ্গাদের যাতায়াতের ব্যবস্থা করা। ক্যাম্পের ভেতরে যাতে গাড়ি নিয়ে টহল দেওয়া যায় সেই ধরনের অবকাঠামো তৈরি করা। ক্যাম্পে থাকা যেসব রোহিঙ্গা নিয়মিত রেশন পাচ্ছেন, তাদের তালিকা হালনাগাদ করা। যেসব রোহিঙ্গা অপরাধে জড়িয়ে পালিয়ে আছে তাদের রেশন বন্ধ করার ব্যবস্থা করা।

স্থানীয় সূত্র জানায়, এক সপ্তাহে কক্সবাজারের টেকনাফ, উখিয়া ও মহেশখালী উপকূলীয় এলাকায় অভিযান চালিয়ে দেড় শতাধিক রোহিঙ্গাকে আটক করেছে পুলিশ। যাদের মধ্যে বেশিরভাগই নারী ও শিশু। এ ছাড়া ১০ মে রাজধানীর একটি বাসা থেকে ২৪ রোহিঙ্গা নারীকে উদ্ধার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। তাদের কেউ চাকরি, কেউ উন্নত জীবনের আশা আবার কেউ কেউ বিয়ের প্রলোভনে পড়ে মালয়েশিয়া যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। মালয়েশিয়া যাওয়ার চেষ্টাকালে বিভিন্ন সময় যেসব রোহিঙ্গাকে আটক করা হয়েছে তাদের মধ্যে বেশিরভাগই নারী।

উখিয়ায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নারীদের নিয়ে কাজ করে বেসরকারি সংস্থা নারী জাগরণ সংস্থা। এই সংস্থার প্রধান নির্বাহী শিউলি শর্মা বলেন, রোহিঙ্গা নারীদের অনেকেই মালয়েশিয়া গিয়ে বিয়ে করার স্বপ্নে বিভোর। তারা মনে করে যে মালয়েশিয়া যেতে পারলে তাদের ভালো বিয়ে হবে। এ ধারণা তাদের ঢুকিয়ে দিয়েছে মানবপাচারকারী সিন্ডিকেট। ফলে তাদের অনেকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সমুদ্র পথে মালয়েশিয়া যেতে আগ্রহী।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পকে কেন্দ্র করে এখন মানব পাচারকারীদের তৎপরতাও বেড়েছে। তা ছাড়া কিছু রোহিঙ্গা আছে যাদের স্বজন মালয়েশিয়ায় অবস্থান করছে। তারা রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বসবাসরত স্বজনদের মালয়েশিয়া নেওয়ার জন্য যোগাযোগ করে। এ ক্ষেত্রেও মানবপাচারকারীরা সহায়তা করছে।

আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী সূত্র জানায়, চলতি বছরে গত চার মাসে সমুদ্রপথে অবৈধভাবে মালয়েশিয়া যাত্রাকালে প্রায় সাড়ে ৪০০ রোহিঙ্গাকে আটক করা হয়েছে, যাদের বেশিভাগই নারী ও শিশু। এর মধ্যে পুলিশ প্রায় ৪০০ এবং বিজিবি ৪০ জনকে আটক করে। তারা সবাই উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন রোহিঙ্গা শিবিরের বাসিন্দা। সর্বশেষ গত ১৪ মে রাতে টেকনাফের নোয়াখালীপাড়া এলাকা থেকে ৩১ রোহিঙ্গাকে আটক করা হয়। এর মধ্যে চার শিশু, ২০ নারী ও ৭ জন পুরুষ। একই দিন রাতে কক্সবাজারের কলাতলীর শুকনাছড়ি ও দরিয়ানগর সমুদ্রঘাটে জড়ো হয়ে মালয়েশিয়া পাড়ি দেওয়ার সময় ২৮ রোহিঙ্গাকে আটক করে। এদের মধ্যে ১৩ নারী, ৬ শিশু ও ৯ জন পুরুষ। এ সময় পাচারকাজে জড়িত একটি নৌকাও জব্দ করা হয়।

এবিএন/শংকর রায়/জসিম/পিংকি

এই বিভাগের আরো সংবাদ