ভীতিকর অনুভূতি হার্টের প্যালপিটিশন

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ০৮ জুন ২০১৮, ১২:৪০

ডা. প্রধীর রঞ্জন নাথ, ০৮ জুন, এবিনিউজ : বুকের মাঝখানে বা বাম পাশে হাতুড়িপেটার মতো অনুভূতি বা কাঁপুনিকে প্যালপিটিশন বা বুক ধড়ফড় করা বলা হয়ে থাকে। প্যালপিটিশনের সঙ্গে শরীরে অস্বাভাবিক অনুভূতি, শরীর ঘেমে যাওয়া, হাত, পা, মুখ কাঁপতে থাকা, কথা জড়িয়ে আসা, পানির পিপাসা লাগা, মাথা হালকা বোধ করা এবং মাথা ঘুরতে থাকা, বুকে ব্যথা অনুভব করা এবং ক্ষেত্র বিশেষে অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থাও ঘটতে পারে।

প্যালপিটিশন এর কারণ
এড্রিনালিন নামক এক ধরনে রাসায়নিক পদার্থকে (হরমোন) দায়ী করা হয়। স্নায়ুবিক উত্তেজনার ফলে হঠাৎ অতিমাত্রায় এ হরমোন রক্তে নিঃসরণের জন্য এ ধরনের পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। তখন স্বাভাবিকভাবেই হার্ট দ্রুত চলতে থাকে এবং নাড়ির গতি বেড়ে যায়। অতিরিক্ত মানসিক পরিশ্রম, হস্তমৈথুন, অতিরিক্ত ইন্দ্রিয় চালনা, হজম শক্তির অভাব, শোক দুঃখ, অত্যন্ত মানসিক উত্তেজনা বা অবসন্নতা, স্নায়ু মন্ডলীর পীড়া, চা, কফি, তামাক, মদ বা যে কোন উত্তেজক নেশা ইত্যাদি কারণে এই রোগ হতে পারে। এছাড়া এনিমিয়া, ক্লোরোসিস, হিষ্টিরিয়া, ঋতুর অনিয়মতা, অতিরিক্ত রজস্রাব, জরায়ুর পীড়া, ঋতুর অবরুদ্ধ, মস্তিষ্কের যে কোন পীড়ায় এ রোগ হতে পারে। হার্টের অসুস্থতার মধ্যে ইসকেমিক হার্ট ডিজিজ, হার্ট ফেইলুর, হার্টের ভাল্বের সমস্যা, কার্ডিওমাইয়োপ্যাথি, মাইওকার্ডাইটিস, প্যারিকার্ডাইটিসকে অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে।

প্যালপিটিশান কত ধরনের
প্যালপিটিশান দুই ধরনের হতে পারে। যেমন– সাময়িক বা ক্ষণিকের জন্য প্যালপিটিশন হওয়া যা হঠাৎ শুরু হয়ে কিছুক্ষণ বিদ্যমান থাকার পর তা আপনা আপনিই দূরীভূত হয়ে যায় এবং অন্য এক ধরনের প্যালপিটিশনকে স্থায়ী প্যালপিটিশন বলা হয়। এক্ষেত্রে রোগী সারাক্ষণ বুক ধড়ফড় অনুভব করে থাকে। দুই ধরনের প্যালপিটিশনকেই মারাত্মক বলে ধরে নেওয়া হয়। তবে স্থায়ী প্যালপিটিশন সবচেয়ে বেশি জটিল রোগের বহিঃপ্রকাশ। ইসকেমিক হার্ট ডিজিজ বা হৃদপিণ্ডের রক্ত প্রবাহের স্বল্পতাজনিত (হার্ট ব্লক) হৃদরোগ বর্তমান সময়ে প্রধান প্রাণসংহারী হৃদরোগ হিসেবে বিবেচিত। প্রাথমিক পর্যায়ে পরিশ্রমকালীন রোগী বুকের ব্যথা, প্যালপিটিশন, শ্বাসকষ্ট অনুভব করে থাকে। রোগী কী মাত্রায় পরিশ্রম করলে এসব উপসর্গ দেখা দেয় তা দ্বারা রোগের তীব্রতা পরিমাপ করা হয়। এ পর্যায়ে রোগী পরিশ্রম বন্ধ করলে বা বিশ্রাম গ্রহণ করলে খুব দ্রুত এসব উপসর্গের নিরাময় ঘটে। তবে আবার পরিশ্রম শুরু করলে তা আবারও দেখা দিয়ে থাকে। রোগের তীব্রতা দিনে দিনে বৃদ্ধি ঘটতে থাকলে এক সময় বিশ্রামকালীনও বুক ব্যথা, শ্বাসকষ্ট ও প্যালপিটিশন দেখা দিয়ে থাকে। হার্ট ফেইলুর এমন এক ধরনের অসুস্থতা যা সব ধরনের হৃদরোগের শেষ পরিণতি হিসেবে বিবেচিত। থাইরয়েড হরমোনজনিত হৃদরোগে অন্যান্য উপসর্গের সঙ্গে সাময়িক অথবা স্থায়ী দুই ধরনের প্যালপিটিশন পরিলক্ষিত হয়ে থাকে। বাতজ্বরের জটিলতা হিসেবে হার্টের ভাল্বের সমস্যা দেখা দিয়ে থাকে। এ ক্ষেত্রে বাতজ্বরের প্রাথমিক পর্যায়ে এবং ভাল্বের অকার্যকারিতা দুই পর্যায়েই প্যালপিটিশন পরিলক্ষিত হয়।

প্যালপিটিশন এর লক্ষণ
হৃৎযন্ত্রের যেকোন পীড়া হলেই উহার উপসর্গ হিসেবে এ বুক ধড়ফড়ানি প্রকাশ পায়। ইহা ছাড়া সাধারণ দুর্বল ব্যক্তিদের ইহা হতে পারে। প্যালপিটিশন জনিত অস্বচ্চি ও স্নায়ুবিক উত্তেজনা, হৃদপিণ্ডের প্যালপিটিশনের মাত্রা অনুযায়ী কম বা বেশি হতে পারে। প্রবল আক্রমণে হৃদপিণ্ড অতিদ্রুত ও সজোরে স্পন্দিত হতে থাকে ও বুকের মধ্যে পক্ষ সঞ্চালনের ন্যায় আলোড়ন বা ধাক্কা দেওয়ার ন্যায় অনুভূতি হয় এবং নাড়ীর গতি অত্যধিক বৃদ্ধি পায়। হৃদপিণ্ডের কোন প্রকার যান্ত্রিক ব্যাধি না থাকলে হৃদপিণ্ড পরীক্ষায় কোন পরিবর্তন দেখা যায় না। আক্রমণ কিছুক্ষণ পরই নিবৃত্ত হয়। হৃদপিণ্ডের বিকারবশতঃ হলে দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।

ওষুধের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া
কিছু কিছু এলোপ্যাথিক ওষুধ সেবনের পরও রোগীর হার্টের প্যালপিটিশন দেখা দিতে পারে। যেমন– হাঁপানির রোগী যদি দীর্ঘদিন ধরে সালাবিউটামোল, এমাইনোফাএলিন ইত্যাদি ওষুধ সেবন করে থাকে তাহলে প্রায়ই হার্টের প্যালপিটিশন দেখা দেয়। এটাকে ওইথড্রয়াল সিনড্রোম বলা হয়। অতিমাত্রায় এলকোহল পানে হার্টের মাংসপেশীও অনুভূতি প্রবণ হয়ে ওঠে। এছাড়াও চা, কফি ইত্যাদি অতি মাত্রায় সেবন করলে হার্টের প্যালপিটিশন দেখা দিতে পারে।

দ্বিতীয়ত
যদি কোন কারণে রক্তে শর্করা বা গ্লুকোজ কমে যায় বিশেষ করে ডায়াবেটিস রোগী এলোপ্যাথিক ওষুধ অথবা ইনসুলিন বেশি মাত্রায় নেয়ার পর কম খাবার খায় তবে প্রায়ই হার্টের প্যালপিটিশনের কথা বলে থাকে। অতিমাত্রায় জ্বর থাকলেও হার্টের নাড়ির অধিকগতির জন্য প্যালপিটিশন হতে পারে। তাছাড়া থাইরয়েড গ্রন্থির টক্সিক প্রদাহ থাকলে হৃদকম্পন দেখা যায়। এ ধরনের রোগী খুব অস্থির থাকে এবং প্রায়ই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত থাকে। হার্টের রোগী অর্থাৎ হার্টের রোগ ভাল্ব বা হার্টের ইনফেকশন হলে প্রায়ই হার্টের প্যালপিটিশনের কথা বলা হয়ে থাকে।

পরীক্ষা নিরীক্ষা
হৃদ কম্পনের রোগীকে পরীক্ষা করে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অধিক নাড়ীর গতিছাড়া কিছু পাওয়া যায় না। ইলোকট্রোকার্ডিওগ্রাম (ইসিজি) করে অধিক নাড়ীর গতি ছাড়াও হার্টের অন্যান্য রোগ সম্বন্ধেও ধারণা পাওয়া যায়। জ্বরের রোগীর অধিক তাপমাত্রা পাওয়া যায়। যদি থাইরয়েড গ্রন্থির টক্সিক প্রদাহ থাকে তখন রোগীর বড় বড় চক্ষু, অধিক ঘাম, হাতের কম্পন এবং শরীর দেখে এ রোগ চেনা খুব সহজ নয়।

আনুষঙ্গিক চিকিৎসা ব্যবস্থা ও পথ্য
রোগের প্রবলাকারের সময় নির্বাচিত ওষুধ এক ঘন্টা পর পর সেবন করা উচিত। কিন্তু পুরাতন হলে প্রতিদিন ২/৩ মাত্রা। সকল প্রকার মানসিক উত্তেজনা, দৌড়ান, ভারী দ্রব্য উত্তোলন বা কোন পরিশ্রমের কাজ করা উচিত নয়। প্রত্যহ শীতল জলে স্নান, অল্প অল্প ব্যায়াম করা, নির্মল বাতাসে ভ্রমণ করা উচিত। কোন প্রকার উত্তেজক খাদ্যাদি আহার নিষেধ। চা, কফি, তামাক, মদ প্রভৃতি একেবারে নিষেধ। কোলেস্টেরল যাতে না বাড়ে সেজন্যে ডিম, বাটার, পনির, খাসির ও গরুর মাংস কম খাওয়া বা বাদ দেওয়া উচিত। অতি সামান্য পরিশ্রম করা রোগীকেও দীর্ঘক্ষণ ঘুমাতে দেওয়া উচিত। গরম জলে রোগীর পা ধোয়ালে বিশেষ উপকার হয়। নিরামিষ অভ্যাস করুন। শরীরের মেদ বাড়ার সাথে সাথে রক্তচাপও বৃদ্ধি পেতে থাকে। তাই ওজন কমানো অত্যন্ত দরকারি।

হোমিওপ্যাথিক প্রতিবিধান
হার্টের প্যালপিটিশন নিরাময়ে হোমিওপ্যাথিতে অত্যন্ত ফলদায়ক ওষুধ আছে। যা অন্য প্যাথিতে নেই। লক্ষণ সাদৃশ্যে নিম্নলিখিত ওষুধ সেবন করে এ রোগ থেকে সম্পূর্ণ আরোগ্য লাভ করে। যথা– ১. একোনাইট ন্যাপ, ২. ক্র্যাটেগাস, ৩. ক্যাক্‌টাস, ৪. ডিজিটেলিস, ৫. ল্যাকেসিস, ৬. ক্যানাবিস ইণ্ডিকা, ৭. আইরিস, ৮. স্পাইজেলিয়া, ৯. অরামমেট, ১০. কফিয়া, ১১. ন্যাজা, ১২. ব্রায়োনিয়া, ১৩. ক্যালকেরিয়া, ১৪. লিলিয়াম টিগ্রিনাম, ১৫. নাক্সভমিকা, ১৬. সালফারসহ আরো ফলদায়ক ওষুধ আছে। তারপরেও চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ সেবন করা উচিত। (সংগৃহীত)

এবিএন/ফরিদুজ্জামান/জসিম/এফডি

এই বিভাগের আরো সংবাদ