ঘুম নিয়ে যেসব প্রচলিত ধারণা স্বাস্থ্যের ক্ষতিকর

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ১৭ এপ্রিল ২০১৯, ১২:৩৮

ঘুম সম্পর্কে ব্যাপকভাবে প্রচলিত কিছু ধারণা আমাদের স্বাস্থ্য এবং মেজাজের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে। পাশাপাশি আমাদের আয়ু কমিয়ে ফেলছে বলে জানিয়েছেন গবেষকরা।

নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি দল, রাতে ভালো ঘুমের ব্যাপারে সর্বাধিক প্রচলিত ধারণা বা দাবিগুলো ইন্টারনেট থেকে খুঁজে বের করে। তার পর তারা সেই দাবিগুলোকে বৈজ্ঞানিক প্রমাণের সঙ্গে মেলান এবং স্লিপ হেলথ জার্নালে সেই গবেষণা প্রকাশিত হয়।

তারা আশা করেন যে, ঘুম নিয়ে মানুষের এমন পুরনো ধারণা বা বিশ্বাসগুলো দূর করার ফলে মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য ও সুস্থতার উন্নতি হবে।

এখন আপনাদের মধ্যে কতজন এ ধরনের ধারণায় বিশ্বাস করার জন্য আফসোস করবেন?

৫ ঘণ্টারও কম সময় ঘুমিয়ে আপনি নিজেকে সামলাতে পারবেন

এটা এমনই এক ধারণা যেটা কখনই যাবে না। জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মার্কেল দাবি করেছেন, প্রতিরাতে ৪ ঘণ্টারও কম ঘুমিয়ে তিনি একটি সপ্তাহ কাটিয়ে দিতে পারেন।

ব্যবসা বা উদ্যোক্তা পর্যায়ে সাফল্যের পেছনে অফিসের অতিরিক্ত সময়ে বিছানায় ঘণ্টাখানেক ঘুমিয়ে নেয়ার যে একটা প্রভাব রয়েছে সেটা কমবেশি সবারই জানা।

তবুও গবেষকরা বলেছেন, ৫চ ঘণ্টারও কম সময় ঘুমানোকে স্বাস্থ্যকর বলে যে ধারণা প্রচলিত আছে সেটা বরং স্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর।

গবেষক ড. রেবেকা রবিন্স বলেন, ‘দিনের পর দিন ৫ ঘণ্টা বা তারও কম সময় ঘুমানো যে স্বাস্থ্যের ভয়াবহ পরিণতির ঝুঁকি অনেকখানি বাড়িয়ে দেয়, তার ব্যাপক প্রমাণ আমাদের কাছে রয়েছে।’

এর মধ্যে রয়েছে হৃদযন্ত্রজনিত বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি, যেমন- হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক এবং আয়ুষ্কাল কমে যাওয়া।

তাই তিনি সুপারিশ করেন যে, সবার প্রতিরাতে একনাগাড়ে ৭-৮ ঘণ্টার ঘুমের লক্ষ্য রাখা উচিত।

বিছানা যাওয়ার আগে মদ পান করলে ঘুম ভালো হয়
শরীর মন শিথিল করার এই উপায়টি পুরোপুরি বানোয়াট। গবেষক দলটি বলছে, সেটা এক গ্লাস ওয়াইন হোক, ড্রামভর্তি হুইস্কি হোক বা এক বোতল বিয়ার।

‘এটি মূলত আপনার ঘুমের প্রাথমিক পর্যায়, অর্থাৎ যে সময়ে চোখের দ্রুত নড়াচড়া কমে আসতে থাকে সেই স্তরটিকে বাধা দেয়। ঘুমের এই পর্যায়টি স্মৃতিশক্তি ও শেখার জন্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ।’

তাই হ্যাঁ, মদ খাওয়ার পর আপনার হয়তো ঘুম ভালো হবে বা খুব সহজেই ঘুমিয়ে পড়বেন। তবে ঘুমের কারণে যে উপকারগুলো পাওয়ার কথা সেগুলো আর পাবেন না।

অ্যালকোহল হল মূত্রবর্ধক পানীয়, তাই আপনাকে হয়তো মধ্যরাতে ঘুম থেকে উঠে বারবার টয়লেটে যাওয়ার ঝামেলা পোহাতে হতে পারে।

বিছানায় শুয়ে টিভি দেখা আপনাকে শিথিল করতে সাহায্য করে
আপনি কি কখনো ভেবেছেন, বিছানায় যাওয়ার আগে আমার একটু শিথিল হওয়া দরকার, আমি কি তা হলে কিছুক্ষণ টিভি দেখব? বিষয় হলো, এই রাত করে টিভি দেখা আপনার ঘুমের জন্য খারাপ হতে পারে।

ডা. রবিনস যুক্তি দেন, আমরা যদি টেলিভিশন দেখে থাকি, তা হলে প্রায়ই রাতের খবরগুলো দেখা হয়। এতে করে আপনি মানসিক চাপ সেইসঙ্গে অনিদ্রা রোগ বা ইনসোমনিয়ায় ভুগতে পারেন।

যে সময় আপনার শরীর-মন শিথিল রাখার কথা সেই সময়ে অর্থাৎ বিছানায় শুতে যাওয়া থাকার আগে আপনাকে অনিদ্রা বা চাপের মুখে পড়তে হতে পারে।

গেম অব থ্রোনসের উদাহরণ দিতে গেলে কেউ যুক্তি দিতে পারবেনা যে, রেড ওয়েডিং পর্বটি শিথিল করার মতো ছিল।

টিভির পাশাপাশি স্মার্টফোন এবং ট্যাবলেটের অন্যান্য সমস্যার মধ্যে রয়েছে- এই ডিভাইসগুলো থেকে যে নীল আলো বের হয় সেটা শরীরে ঘুমের হরমোন মেলাটোনিনের উৎপাদনকে বিলম্বিত করতে পারে।

ঘুমানোর অনেক চেষ্টা সত্ত্বেও যদি ঘুম না আসে তাও বিছানায় পড়ে থাকুন
আপনি ঘুমানোর চেষ্টায় অনেক সময় নষ্ট করেছেন। এমনকি সারা নিউজিল্যান্ডের দুই কোটি ৮০ লাখ ভেড়ার সবকটি হয়তো আপনি গুনে শেষ করে ফেলেছেন।

তা হলে আপনার পরবর্তীতে কি করা উচিত? এই প্রশ্নের উত্তর হল, ঘুমের জন্য এত চেষ্টা বন্ধ রাখতে হবে।

ডা. রবিনস বলেন, ‘আমরা অনিদ্রার সঙ্গে আমাদের বিছানার যাওয়ার বিষয়টিকে সংযুক্ত করলাম। একজন সুস্থ মানুষের বিছানায় যাওয়ার ১৫ মিনিটের মধ্যে ঘুম চলে আসে।

 

তবে ঘুম আসতে এর চেয়ে বেশি সময় লাগলে, অবশ্যই বিছানা ছেড়ে দিতে হবে। এর পর পরিবেশ বদলে দিতে হবে।

এমন কাজ করতে হবে যেখানে মস্তিষ্কের তেমন কিছু ভাবতে হবে না। যেমন- মোজা ভাজ করা।

বারবার স্নুজ বোতামে চাপ দেয়া
অনেকেই তাদের ফোনে একাধিক সময়ে স্নুজ টাইমার সেট করাটাকেই স্বাভাবিক মনে করেন। এটা ভেবে যে বিছানায় অতিরিক্ত ছয় মিনিটেই বুঝি বিশাল কোনো পার্থক্য হবে।

কিন্তু গবেষক দল বলেছেন, যখন অ্যালার্ম বন্ধ হয়ে যায়, তখনই আমাদের উঠে যাওয়া উচিত।

ডাঃ রবিনস বলেছেন, এতে আপনার মতো সবাই কিছুটা আধো ঘুম আধো জাগা অবস্থায় থাকলেও তারা স্নুজ করার প্রলোভনকে প্রতিরোধ করতে পারবে। প্রথম অ্যালার্ম বাজার পর স্নুজ দিয়ে আপনার শরীর হয়তো আবার ঘুমিয়ে পড়বে। তবে সেই ঘুম হবে অনেক নিম্নমানের পাতলা ঘুম।

তাই এ ধরনের উপায় আর পরামর্শ উড়িয়ে দিয়ে অ্যালার্ম থামার সঙ্গে সঙ্গে ঘরের পর্দা খুলে দিন এবং যতটা সম্ভব নিজেকে উজ্জ্বল আলোর সামনে রাখুন।

নাক ডাকায় কোনো ক্ষতি নেই
নাক ডাকা হয়তো ক্ষতিকারক নাও হতে পারে, তবে এটি স্লিপ অ্যাপনিয়া রোগের একটি লক্ষণ হতে পারে।

এই রোগের কারণে আমাদের গলায় যে দেয়াল আছে সেটা ঘুমের সময় শিথিল এবং সংকীর্ণ হয়ে যায়। যার কারণে মানুষ অল্প সময়ের জন্য শ্বাস নিতে পারে না।

এ ধরনের মানুষেরা উচ্চ রক্তচাপ, অনিয়মিত হৃৎস্পন্দন এমনকি হৃদরোগ বা স্ট্রোকের ঝুঁকিতে থাকে। তবে এই নাক ডাকা যদি খুব জোরে হয় তাহলে সতর্ক হতে হবে।

ডা. রবিনস বলেছেন, আমাদের স্বাস্থ্য, আমাদের মেজাজ, আমাদের ভালো থাকা এবং আমাদের দীর্ঘায়ুর উন্নয়নে আজকের রাত থেকে আপনি যা করতে পারেন তার মধ্যে ঘুম হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলির মধ্যে একটি।
তথ্যসূত্র : বিবিসি

এবিএন/সাদিক/জসিম

এই বিভাগের আরো সংবাদ
well-food