সামাজিক মেলামেশার ক্ষেত্রে যেসব বিষয় বিবেচিত হয়

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ০৩ মার্চ ২০১৯, ১২:২৪

সামাজিক গবেষণায় দেখা গেছে, যখন আমরা আমাদের বন্ধুত্বের নেটওয়ার্ক গড়ে তুলি, তখন আমরা এমন মানুষ দিয়ে নিজেদের ঘিরে রাখি যারা অনেক ক্ষেত্রেই আমাদের মতো।

আবার এটাও মনে হতে পারে যে, মানুষের মাঝে এই বৈচিত্র্য যদি রাজনৈতিক মতাদর্শকে ঘিরে হয়, তাহলে সেই ব্যাপারে আমরা উদার থাকি এবং অনেক সময়ই আমরা ভিন্ন রাজনৈতিক পটভূমি এবং দৃষ্টিভঙ্গির মানুষের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তুলি।

বিবিসির আন্তর্জাতিক ইপসোস মোরির জরিপ অনুসারে, বিশ্বব্যাপী ১০ জনের মধ্যে মাত্র এক জনই বলে থাকেন যে তাদের প্রায় বেশিরভাগ বন্ধুবান্ধব তাদের মতো একই রাজনৈতিক মতাদর্শের।

অন্যদিকে অর্ধেকের বেশি মানুষ এটা মনে করে যে, তাদের থেকে আলাদা অন্য মতাদর্শের মানুষের কথা শোনাটাও গুরুত্বপূর্ণ, যদিওবা সেটা তাদের মতের সম্পূর্ণ বিপরীত হয়।

ইপসোস মরির গ্লেন গটফ্রাইড, যিনি পুরো জরিপ প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করেছেন। তিনি বলেন, গবেষণায় দেখা যায়, মানুষ আশাবাদী থাকতে পছন্দ করে; তারা এটা ভাবতে পছন্দ করে যে তারা বৈচিত্র্যপূর্ণ এবং সহনশীল।।’

নিজের চাইতে আলাদা অন্য ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলাটাকে বেশিরভাগ মানুষ খুব একটা জরুরি না ভাবলেও তারা নিয়মিতভাবে সেটা করে থাকে।

গটফ্রাইড বলেন, ‘সমাজের জন্য আমরা যা ভাল মনে করি আর যেটা আমরা আসলে অনুশীলন করি তার মধ্যে একটা ফাঁক রয়েছে।’

ইপসোস মোরি ২৭টি দেশের ইন্টারনেট সংযোগ সম্পন্ন প্রায় ২০ হাজার মানুষের বন্ধুদল বা ফ্রেন্ডশিপ গ্রুপের ওপর জরিপ করে। যেখানে অধিকাংশই নিজেদের চাইতে ভিন্ন ধরনের মানুষের সঙ্গে মেলামেশার প্রবণতা নিয়ে কথা বলেছে।

জরিপ করা দেশগুলোয় ৫ জন উত্তরদাতাদের মধ্যে দুজন বলেছেন যে, তাদের বেশিরভাগ বন্ধুবান্ধব কয়েকটি ইস্যুতে তাদের মতোই মতাদর্শ ও বিশ্বাস ধারণ করে থাকে।

সেই বিষয়গুলোর মধ্য রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন (৪২%), ধর্ম (৩৮%), অভিবাসন (৩৮%) এবং নারীবাদ (৩৭%)।

এখানে ব্র্যাকেটে শতাংশের হিসাবে একই মতের মানুষের হার বোঝানো হয়েছে।

তবে, রাজনৈতিক মতাদর্শের বিষয়ে তাদের জিজ্ঞাসা করা হলে এই শতাংশের হিসাব হ্রাস পায়।

মার্কিন গবেষণা দল দ্য ডি-পোলারাইজেশন প্রজেক্টের প্রতিষ্ঠাতা অ্যালিসন গোল্ডসওয়ার্দি বলেছেন, ‘মানুষ তাদের বন্ধুদলকে যতোটা রাজনৈতিকভাবে বৈচিত্র্যপূর্ণ মনে করে আসলে তা নয়। এটা বের করা গুরুত্বপূর্ণ।’

এর আংশিক কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, রাজনৈতিক বিভাজন প্রায়শই অন্যান্য সামাজিক বিভাজনের চাইতে বেশি সামনে আসে।
উদাহরণস্বরূপ, মিস গোল্ডসওয়ার্দি বলেছেন, ‘ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষের সঙ্গে একটি প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও দেখা করা যায়। যেটা কিনা জাতি, লিঙ্গ বা ধর্মের ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য হয় না।’

ইপসোসের জরিপ করা ৮০% শতাংশের বেশি মানুষ তাদের সামাজিক চক্রে এই রাজনৈতিক বিভাজনের বিষয়টিকে ভালভাবে উপলব্ধি করে। এবং এই বিষয়টি ইতিবাচক বা ক্ষতিকারক কিনা সেটার প্রেক্ষিতে তারা আলাদা হয়ে যায়।

যে দেশগুলোয় জরিপ করা হয়েছে, ৪০% শতাংশেরও বেশি মানুষ মনে করেন, রাজনৈতিক বিভাজনের কারণে এখনকার সমাজ গত দুই দশকের চাইতে অনেক বেশি বিপদের মধ্যে আছে। অথচ মাত্র ১৪% এর বিপরীত ভেবে থাকেন।

গটফ্রাইড বলেন, ‘রাজনীতি মানুষের সামাজিক চক্রে এক ধরনের সমস্যা।’

সাধারণ মানুষের মতে, রাজনীতি আরও বিভেদ সৃষ্টি করছে এবং একজন মানুষের জীবনে বৈচিত্র্য সৃষ্টিতে অবদান রাখছে।

আন্তর্জাতিক ইপসোস মোরির জরিপে বেশিরভাগ মানুষ বলেছে তারা এমন ব্যবধানগুলোকে মেনে নিতে চায় যেটা কিনা তাদের সামাজিক বলয়ের বাধাগুলো ভেঙে ফেলতে সহায়তা করবে।

উদাহরণস্বরূপ, অর্ধেক উত্তরদাতারা এ বিষয়ে একমত হয়েছেন যে, কেউ অন্য কোন ব্যক্তির মতাদর্শের সাথে একমত পোষণ না করলেও সেই ভিন্ন মতাদর্শের মানুষের কথা শোনা গুরুত্বপূর্ণ। যদি কেউই নিয়মিতভাবে এমনটা করেন না।

উত্তরদাতাদের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি জানিয়েছেন যে তারা সপ্তাহে অন্তত একদিন তাদের মতামতের বিরোধিতা করে এমন মানুষের সাথে কথা বলে থাকেন।

ভিন্ন মতের মানুষের সাথে মাসে একবারেরও কম সময় কথা বলে থাকেন জরিপে অংশ নেয়া প্রায় ২০% মানুষ। - এবং দশজনের মধ্যে একজন এমনটা কখনোই করেন না।

পোস্ট-ট্রুথ অ্যান্ড ইন্টারনেটের ওপর আরও একটি সাম্প্রতিক জরিপের প্রতিলিপি প্রকাশ করা হয়। যেখান থেকে জানা যায় যে, ৬৫% মানুষ মনে করেন যে সারা বিশ্বের অন্যান্য মানুষেরা তাদের নিজস্ব অনলাইন বলয়ে বাস করে, তবে কেবলমাত্র ৩৪% মানুষ তাদের এই বলয়ে বসবাস করার বিষয়টি স্বীকার করেছে।

যাই হোক, যখন কেউ বোঝাতে চায় যে তাদের বন্ধুত্ব করার বিষয়টি অনেকাংশেই অন্যের রাজনৈতিক মতামতের ওপর ভিত্তি করে। সেক্ষেত্রে তাদের সামাজিক বলয়ে তেমন একটা বৈচিত্র্য দেখা যায় না।

জরিপে অংশগ্রহণকারীদের প্রায় অর্ধেক বলেছে যে তাদের বেশিরভাগ বন্ধু জাতিগত-ভাবে (৫৬%) এবং বয়সের (৪৬%) ক্ষেত্রে তাদের মতো একই।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই গবেষণাটি আরেকটি বিষদ গবেষণার সঙ্গে অনেকটাই মিলে যায়, যেখানে বলা হয়েছে, আমরা তাদের সাথেই বন্ধুত্ব করতে চাই যারা আমাদেরই মতো।

শিক্ষা সম্পর্কে একই কথা বলা যেতে পারে: বিশ্বব্যাপী, একাধিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, একই ধরণের শিক্ষা অর্জনের সাথে সাথে মানুষের এই একই মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি গড়ে ওঠে। তবে, আয়ের মাত্রায় এই মিল নাটকীয়ভাবে কমে যায়।

শুধু ৩০% উত্তরদাতারা বলেছেন যে তাদের বন্ধু মহলের বেশিরভাগই কাছাকাছি আয় করে থাকেন।

জরিপে বলা হয়েছে, আয়ের বৈষম্য, যেটা কিনা অনেকসময়ই শিক্ষার সাথে সম্পর্কিত থাকে না, সেই বৈষম্য কখনও বন্ধুত্বের পথে কোনো বাধা তৈরি করে না বলে উঠে এসেছে জরিপটিতে।

কিন্তু অ্যালিসন গোল্ডসওয়ার্দি একটি সতর্কতার কথাও বলেছেন, ‘মানুষ তাদের সামাজিক মিথস্ক্রিয়াতে তাদের আয়ের বিষয়টি সাধারণত আলোচনা করে না। পাশাপাশি, মানুষ কত আয় করে সে সম্পর্কে সব সময় মিথ্যা বলে থাকে।’
তথ্যসূত্র : বিবিসি

এবিএন/সাদিক/জসিম

এই বিভাগের আরো সংবাদ
well-food