নবজাতকের পরিচর্যা

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ২১ মে ২০১৮, ১৮:১৭

ডা. শহীদুল্লাহ চৌধুরী, ২১ মে, এবিনিউজ : হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসক এবং একজন অভিজ্ঞ নার্স এর উপস্থিতিতে মায়েদের সন্তান প্রসব করা জরুরি। সাথে একজন অভিজ্ঞ শিশু চিকিৎসক থাকলে নবজাতককে পুনঃ উজ্জীবিত করা সহজ হয়। শিশুর সুস্বাস্থ্য ও সুন্দর জীবনের জন্য জন্ম পরবর্তী পরিচর্যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জন্মের পরপরই শিশুর অবস্থা জরুরিভিত্তিতে পর্যবেক্ষণ করা উচিত। শিশুর শারীরিক পরীক্ষার ক্ষেত্রে শ্বাসপ্রশ্বাস, নড়াচড়া, তাপমাত্রা, হৃদযন্ত্রের স্বাভাবিক স্পন্দন, দুধ চুষে খাওয়ার শক্তি ইত্যাদির কী অবস্থা তা ভালভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

নবজাতকের জন্মের পর যে কাজটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তা হল– শিশুকে ভালভাবে মুছে শুষ্ককরা, শিশু ঠিকমত কান্না করছে কী না এবং শ্বাসপ্রশ্বাস ঠিকমত নেওয়া শুরু করেছে কী না তা ভালোভাবে দেখা। সবকিছু ঠিক থাকলে ২–৩ মিনিটের মধ্যে শিশুর নাড়ি প্লাস্টিকের ক্ল্যাম্প দিয়ে আটকে জীবাণুমুক্ত কাঁচি বা ব্লেড দিয়ে কাটতে হবে। কাটা স্থানে ক্লোরহেক্সিড্রিন দ্রবণ লাগাতে হবে। শিশুর প্রাথমিক পরিচর্যার পর ৩০মিনিট থেকে ১ ঘন্টার মধ্যে শিশুকে মায়ের দুধ খাওয়াতে হবে। এ ব্যাপারে মাকে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করতে হবে। ১৫–২০ মিনিট পরপর শিশুকে ভালোভাবে পরীক্ষা করে শ্বাসপ্রশ্বাস স্বাভাবিক আছে কী না দেখতে হবে। প্রয়োজনে শিশু চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। শিশুর মা–বাবাকে শিশুর জন্মগত ত্রুটি সম্পর্কে ধারণা দিতে হবে। যেমন–ঠোঁট বা তালুকাটা, হাত–পায়ের আঙ্গুল কমবেশি হওয়া, মেরুদণ্ডের পেছনে কোন কোন ফুটার মাধ্যমে মেরুদণ্ডের আবরণসহ বের হয়েছে কী না, জন্মগত চোখের ছানি (Valvular) হার্টের ত্রুটি বা বাল্ববের সমস্যা (Cataract), ইত্যাদি স্বাভাবিক বিষয়ে খোলামেলা আলোচনা করতে হবে।

সুস্থ নবজাতকের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য:

১. গর্ভধারণের সময়কাল ৩৭ থেকে ৪২ সপ্তাহ।

২. জন্মের সময় নবজাতকের ওজন ২৫০০ গ্রাম থেকে ৩৯০০ গ্রাম।

৩. জন্মের পরপর শিশুর স্বাভাবিক কান্না করা।

৪. স্বত:স্ফুর্তভাবে শ্বাসপ্রশ্বাস নেওয়া, মিনিটে ৪০–৫৯ বার।

৫. শিশুর দৈর্ঘ্য ৪৭–৫১ সে.মি. এবং মাথার পরিধি ৩৩–৩৬ সে.মি.।

৬. শরীরের তাপমাত্রা ৯৭.৭ ডিগ্রি ফারেনহাইট–৯৯.৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট।

৭. শিশুর হাত–পায়ের স্বাভাবিক নড়াচড়া।

৮. শিশুর মায়ের দুধ চুষে খেতে স ম কী না?

৯. হাত–পা নীল বর্ণের হলেও শরীরের রং গোলাপি (Pink) বর্ণের হওয়া জরুরি।

নবজাতকের ত্বকের সমস্যা:

নবজাতকের ত্বকে প্রায়ই বিভিন্ন ধরণের দাগ (Rash) দেখা যায়। মা–বাবার এসব নানা ধরনের দাগ (Rash) এর জন্য সবসময় আতংকে থাকেন। প্রায়ই ক্ষেত্রে এ ধরনের দাগের জন্য কোর ধরনের চিকিৎসার প্রয়োজন হয় না। এমনিতেই ভালো হয়ে যায়। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ফোস্কা বা ফুসকুড়ি সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়লে সেক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ জরুরি হয়ে পড়ে। ক্ষতিকর Rash বা দাগগুলো হল–

১. Erythema Toxicum : যা শরীরে কীটপতঙ্গের দংশন বা কামড়ের মতই মনে হয়। এমনিতেই এগুলো ভালো হয়ে যায়।

২. Milia : সাদা রঙের ছোট ছোট দাগ, যা নবজাতকের নাক, মুখ, কপাল ও আশপাশে দেখা যায়। এগুলোর চিকিৎসার কোন প্রয়োজন হয় না।

৩. Milria : ঘামাচির মত কিছু কিছু দাগ মাঝে মাঝে নবজাতকের ত্বকে দেখা যায়। যা কয়েকদিনেই সেরে যায়।

এগুলো ছাড়াও বিভিন্ন ধরণের জন্মগত দাগ শিশুর শরীরে দেখা যায়। যেমন– Sutmor Patch বা নীল রঙের দাগ। এগুলোর চিকিৎসার কোন প্রয়োজন হয় না।

আবার কিছু কিছু দাগ নবজাতকের শরীরে দীর্ঘসময় থেকে যায়। যেমন– Post Wine Spot বা কালো বা বেগুনী বর্ণের দাগ। Cafe Spot বাকফির মত ছোট ছোট আকারের দাগ ইত্যাদি।

অনেকসময় বিভিন্ন ধরণের গরম কাপড়ের কারণে বা দীর্ঘসময় ডায়াপার পরানোর কারণে Rash ফোস্কা পড়তে পারে। সেক্ষেত্রে কিছু হালকা স্টেরয়েড জাতীয় ক্রিম ব্যবহার করে সহজেই নবজাতককে এসমস্যা থেকে সারিয়ে তোলা যায়।

নবজাতকের পায়খানা–প্রস্রাব বিষয়ে জ্ঞাতব্য:

নবজাতকের পায়খানা–প্রস্রাব ঠিকমতো হওয়া অত্যন্ত জরুরি। সাধারণত: জন্মের ১২–২৪ ঘন্টার মধ্যে প্রস্রাব না হয়, তাহলে শিশু চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। এতে দেরি করা উচিত হবে। কারণ অনেক সময় শিশুর কিডনি বা মূত্রনালীর সমস্যা থাকতে পারে। একটি সুস্থ বাচ্চা যদি নিয়মিত মায়ের দুধ খায় তাহলে দিনে ৮–১০ বার প্রস্রাব করবে। কিন্তু প্রথম ২/১ দিন দুধ কম হওয়ার কারণে ২/৩ বারও প্রস্রাব হয়ে থাকে। বেশিরভাগ শিশু জন্মের পর কালো কালো পায়খানা করে থাকে, এটি স্বাভাবিক। চিকিৎসাশাস্ত্রের ভাষায়, এ ধরনের পায়খানাকে (Maconium) ম্যাকোনিয়াম বলে। ৩/৪ দিনের মধ্যে মলের বর্ণ হলদে বা বাদামী হয়ে যায়। অনেকসময় সবুজ বর্ণের পায়খানাও হতে পারে। তবে ২৪ ঘন্টার মধ্যে মলত্যাগ না করলে জরুরিভিত্তিতে শিশু চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। কারণ পায়ুপথে যদি ছিদ্র না থাকে বা রেকটাম নামক অন্ত্রে যদি শক্ত ম্যাকোনিয়াম আটকে থাকে তাহলে শিশু সার্জারি বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হতে হবে। অনেক সময় অপারেশনের মাধ্যমেও শিশুর পায়ুপথ ঠিক করতে হয়। আরেকটি বিষয়, প্রায় প্রতিটি নবজাতকের দেখা যায়, তা হলো অতিরিক্ত মোড়ামুড়ি বা কান্নাকাটি। যা প্রতিটি মা–বাবাকেই অস্থির করে তোলে। সাধারণত: পেটে গ্যাস হলে বা কোষ্ঠকাঠিন্য থাকলে বাচ্চা বেশি কান্নাকাটি করে। এক্ষেত্রে সিমিথিকন জাতীয় ওষুধ অনেক সময় উপকারে আসে। মল বেশি শক্ত হলে গ্লিসারিন জাতীয় ওষুধ চিকিৎসকের পরামর্শে ব্যবহার করা যেতে পারে। (সংগৃহীত)

এবিএন/ফরিদুজ্জামান/জসিম/এফডি

এই বিভাগের আরো সংবাদ