ভারতীয় মেয়ে প্যান্টস্যুট পরে বিয়ে করায় কেন এত হৈচৈ

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ২৪ নভেম্বর ২০২০, ২০:৪৮

সানজানা ঋষি সম্প্রতি বিয়ে করেছেন ভারতীয় বিয়ের চিরাচরিত নিয়ম মেনেই। কিন্তু তিনি কনের চিরাচরিত পোশাক শাড়ি বা লেহেঙ্গা না পরে বিয়েতে পরেছিলেন নীলাভ-সাদা পুরোনো স্টাইলের প্যান্ট আর কোট। আর তা নিয়ে বইছে সমালোচনার ঝড়।

সানজানা বলছেন "আমি স্যুট পরেছি কারণ স্যুট আমার দারুণ প্রিয়"। তার এই পছন্দের মধ্যে দিয়ে তিনি ফ্যাশান অঙ্গনে নারী শক্তির একটা বার্তাও তুলে ধরেছেন। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, তার এই বিয়ের সাজ ভারতীয় মেয়েদের ভবিষ্যতে প্রথাগত পোশাক ছেড়ে ক্ষমতার প্রকাশ পায় এমন পোশাক পরতে হয়ত উদ্বুদ্ধ করবে।

পশ্চিমের দেশগুলোতেও গত কয়েক বছর ধরে বিয়ের কনেদের প্রথাগত পোশাকের বদলে প্যান্ট স্যুট পরে বিয়ে করতে দেখা গেছে। বিয়ের পোশাক যারা ডিজাইন করেন, তারাও প্যান্ট এবং স্যুট তাদের পোশাক সম্ভারে রাখতে শুরু করেছেন।

তারকারাও এক্ষেত্রে প্রেরণা হয়ে দাঁড়াচ্ছেন। গেম অফ থ্রোন্সের তারকা সোফি টার্নার সঙ্গীতশিল্পী জো জোনাসের সঙ্গে লাস ভেগাসে তার বর্ণাঢ্য বিয়ের অনুষ্ঠানে পরেছিলেন সাদা প্যান্ট।

কিন্তু মিস ঋষির বিয়ের সাজ ভারতীয় বিয়ের অনুষ্ঠানের জন্য খুবই প্রথাবহির্ভূত ও অস্বাভাবিক ছিল। ভারতীয় কনেরা সাধারণত বিয়েতে পরেন সিল্কের শাড়ি বা জমকালো লেহেঙ্গা। সচরাচর তাদের বিয়ের পোশাক হয় সোনালি বা রূপালির জরির জমকালো কারুকাজ করা লাল শাড়ি বা লেহেঙ্গা।

"আমি আগে কখনও কোন ভারতীয় কনেকে এই সাজে দেখিনি," বলছেন বিয়ের কনেদের নিয়ে এক সাময়িকীর সাবেক সম্পাদক নুপুর মেহতা পুরি। "ভারতীয় বিয়েতে কনে সচরাচর ভারতীয় পোশাকই পরে, সাথে মা বা দিদিমার বা তার জন্যই কেনা সোনার গহনা।

"কিন্তু সানজানার সাজ ছিল খুবই অভিনব ও নতুন। এবং একেবারে আলাদা।''

২৯ বছরের মিস ঋষি ভারতীয় আমেরিকান একজন ব্যবসায়ী এবং দিল্লিতে ২০শে সেপ্টেম্বর তিনি বিয়ে করেন দিল্লির এক ব্যবসায়ী ৩৩ বছর বয়স্ক ধ্রুব মহাজনকে।

আমেরিকায় তিনি একটি কোম্পানির আইনজীবী হিসাবে কাজ করতেন। গত বছর তিনি ভারতে বসবাসের জন্য ফিরে যান।

তারা ঠিক করেছিলেন সেপ্টেম্বর মাসে আমেরিকায় তাদের বিয়ের অনুষ্ঠান করবেন কারণ মিস ঋষির ভাই ও বন্ধুদের বেশিরভাগই থাকেন আমেরিকায়। এরপর নভেম্বর মাসে দিল্লিতে ভারতীয় প্রথায় দ্বিতীয় বিয়ের অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা ছিল তাদের। কিন্তু কোভিডের কারণে তাদের সব পরিকল্পনা "পুরো উল্টোপাল্টা" হয়ে যায়।

ভারতীয় সমাজে তাদের সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা নিয়ে নানা কথাবার্তার কারণে তাদের ওপর তাড়াতাড়ি বিয়ে করার জন্য চাপ আসতে থাকে। মিস ঋষির বাবামা "খুবই উদারপন্থী" হলেও বন্ধু মহল, পরিবারের অন্য সদস্য ও প্রতিবেশিরা তাদের তাড়াতাড়ি বিয়ে করার জন্য চাপ দিচ্ছিলেন।

"কাজেই অগাস্ট মাসের শেষ দিকে এক সকালে উঠে হঠাৎই আমি বলে ফেলি, 'চলো আমরা বিয়ে করে ফেলি'।'' মিস ঋষি বলেন, মনস্থির করার সময়েই তিনি মনে মনে ঠিক করে ফেলেছিলেন তিনি বিয়েতে কী পরবেন।

"আমি ঠিক করেছিলাম প্যান্ট আর স্যুট পরব। আমি ঠিক করেও ফেলেছিলাম আমার প্যান্টস্যুট কেমন হবে," বিবিসিকে বলেন সানজানা ঋষি।

মিস ঋষি সাধারণত অনেক পুরনো সেকেন্ড-হ্যান্ড পোশাক কেনেন। অনেক দিন আগে ইটালির একটি বুটিক দোকানে তিনি এই প্যান্টস্যুটটা দেখেছিলেন। খোঁজ নিয়ে তিনি জানতে পারেন ১৯৯০এর দশকে ডিজাইন করা সেই পোশাকটি এখনও বিক্রির জন্য রয়েছে।

তিনি বলেন আমেরিকায় তিনি যখন কাজ করতেন তিনি অফিসে প্যান্টস্যুট পরা পছন্দ করতেন, কারণ "আধুনিক মনস্ক শক্তিশালী যেসব নারী আমার আদর্শ" তারা এধরনের পোশাক পরেন।

"আমার সবসময়ে মনে হয় মেয়েরা প্যান্টস্যুট পরলে তার মধ্যে দিয়ে একটা খুবই শক্তি প্রকাশ পায়। আমার সেটা খুবই পছন্দের এবং আমি সবসময় প্যান্টস্যুট পরি।"

তিনি বলেন তাছাড়াও তাদের বিয়ের অনুষ্ঠানটা ছিল ঘরোয়া। করোনাভাইরাসের কারণে সেখানে উপস্থিত ছিলেন বর-কনে ও পুরোহিতসহ মাত্র ১১জন।

"ধ্রুবদের পেছনের বাগানে ছোট করে বিয়ের অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। আমাদের পরিবারের ঘনিষ্ঠজনরাই শুধু ছিলেন। সেখানে আমি যদি বিয়ের জমকালো পোশাক পরতাম খুবই বেমানান আর বাড়াবাড়ি লাগত,'' সানজানা বলেন।

"সানজানা আমাকে আগে বলেনি সে কী পরতে যাচ্ছে। আমার এতে কিছু এসে যায় না। কারণ সানজানা যাই পরুক, আমি জানি তাকে দুর্দান্ত লাগবে।"

তিনি বলেন, তাকে প্রথম দেখে তিনি বুঝতেই পারেননি সানজানা প্যান্ট পরে কনে সেজেছে। কিন্তু সামাজিক মাধ্যমে মিস ঋষির পোশাক বিশাল আলোড়ন ফেলেছে।

মিস ঋষি ইনস্টাগ্রামে কিছু ছবি পোস্ট করার পর তার বন্ধুবান্ধব ও তার অ্যাকাউন্টে যারা তাকে অনুসরণ করেন, তারা সানজানা ঋষি ও তার বিয়ের সাজের প্রশংসায় উচ্ছ্বসিত মন্তব্য করেছেন। ফ্যাশান ডিজাইনাররাও তার পছন্দকে অনুমোদন জানিয়েছেন।

বলিউপ প্রযোজক এবং অভিনেত্রী সোনাম কাপুরের বোন রিয়া কাপুর সামাজিক মাধ্যমে মন্তব্য করেছেন তাকে "দারুণ সুন্দর" দেখাচ্ছে।

ভারতের প্রথম সারির নারী পোশাক ডিজাইনারদের অন্যতম আনন্দ ভূষণ বিবিসিকে বলেছেন তিনি মিস ঋষির বিয়ের সাজ খুবই পছন্দ করেছেন এবং "একজন কনের সৌন্দর্য ফুটিয়ে তুলেছে এই পোশাক।"

কিন্তু কনের সাজপোশাক সংক্রান্ত কিছু অ্যাকাউন্ট তার এই ছবিগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করার পর তার বিয়ের পোশাক নিয়ে তাকে নানাভাবে সমালোচনা ও হেনস্থা করা শুরু হয়েছে সামজিক মাধ্যমে।

তাকে যারা ট্রল করছে তারা লিখেছে ভারতীয় সংস্কৃতির ওপর তিনি কালি লেপে দিয়েছেন। কেউ কেউ তার স্বামীকে সাবধান করে দিয়ে লিখেছে, আপনি একটা নজরকাড়া মেয়েকে বিয়ে করেছেন, যে নারীবাদের নামে যা কিছু করতে পারে। কেউ লিখছে, তার মন পশ্চিমা ধারায় প্রভাবিত - ভারতীয় সংস্কৃতি সে কখনই বুঝতে পারবে না।

মিস ঋষি বলেন কেউ কেউ "আমাকে মরার পরামর্শও" দিয়েছে।

সানজানা ঋষি বলছেন এই সমালোচনা খুবই একপেশে। এর কোন যৌক্তিকতা নেই। "অনেক ভারতীয় পুরুষ তো বিয়েতে প্রথাগত পোশাক না পরে প্যান্টস্যুট পরে বিয়ে করছেন হরহামেশা- তাদের নিয়ে তো কেউ প্রশ্ন তোলে না- কিন্তু মেয়েরা প্যান্ট পরলেই যত দোষ- তখন সবার বাক্যবাণ শুরু হয়ে যায়!"

"আসলে মান সমুন্নত রাখার সব দায়দায়িত্ব মেয়েদেরই। তাদের বেলায় নিয়মের ব্যতিক্রম হতে পারবে না।" তবে এটা শুধু ভারত বলে নয়। পুরুষের মত প্যান্ট শার্ট বা স্যুট পরার জন্য মেয়েদের বিশ্বের সর্বত্রই লড়াই করতে হয়েছে- আজও হচ্ছে। অনেক সংস্কৃতিতে- এমনকি আধুনিক মনস্করাও মেয়েরা প্রথাগত পোশাক না পরার সাহস দেখালে সেটাকে ভাল চোখে দেখেন না।

ফ্রান্সে ২০১৩র আগে পর্যন্ত মেয়েদের প্যান্ট পরা অবৈধ ছিল। যদিও সেই আইন বহু মেয়ে কয়েক দশক ধরে উপেক্ষা করে গেছে।

দক্ষিণ কোরিয়ায় মাত্র হালে ছাত্রীদের স্কার্ট পরার বদলে প্যান্ট পরার অনুমতি দেয়া হয়েছে। সেখানে মেয়েদের জন্য স্কুল ইউনিফর্ম ছিল শুধু স্কার্ট।

আমেরিকায় নর্থ ক্যারোলাইনার মেয়ে শিক্ষার্থীদের আদালত পর্যন্ত যেতে হয়েছে স্কুলে প্যান্ট পরার অনুমতি পাবার জন্য। সেখানে শীতকালের প্রচণ্ড ঠাণ্ডাতেও মেয়েদের স্কুলে প্যান্ট পরার অনুমতি ছিল না।

পেনসিলভেনিয়ায় ১৮ বছরের এক ছাত্রীকে মাত্র গত বছর আদালতের দ্বারস্থ হতে হয় তাকে প্যান্ট পরার অনুমতি দেবার জন্য। ঐ ছাত্রী মামলায় জেতে।

ভারতে এখনও নারীদের প্যান্ট পরার ক্ষেত্রে সামাজিক বিরোধিতা রয়েছে।

"যদিও ভারতে নারীদের শালোয়ার পরার চল শতাব্দী প্রাচীন, কিন্তু বড় বড় শহরের বাইরে, বহু রক্ষণশীল পরিবার মেয়েদের এখনও প্যান্ট বা জিনস পরতে দেয় না, " বলছেন মি. ভূষণ।

এই ফ্যাশান ডিজাইনার বলছেন, "ভারতীয় সমাজ খুবই পুরুষতান্ত্রিক। পুরুষ এখনও নারীর স্বাধীনতায় অনিরাপদ বোধ করে। ফলে নারী কী পরবে, কীভাবে চলবে, কীভাবে কথা বলবে বা হাসবে, তার আচরণ কেমন হবে, এমনকী পরিবারে সন্তান নেয়া হবে কীনা সব সিদ্ধান্তই পুরুষ নেয়, পুরুষই নারীকে বলে দেয় তাকে কেমনভাবে চলতে হবে।"

সানজানা ঋষি বলেছেন তার বিয়ের পোশাক নির্বাচন করার মাধ্যমে তিনি কোন রাজনৈতিক বা সামাজিক বার্তা দিতে চাননি। হয়ত কেউ কেউ জিনিসটাকে সেভাবে দেখছে

"আমি জানি, অন্তত ভারতে, সব নারী নিজের ইচ্ছায় সাজপোশাক করতে পারেন না। সেই স্বাধীনতা তাদের নেই। কিন্তু আমি ইনস্টাগ্রামে আমার বিয়ের ছবি পোস্ট করার পর বেশ কিছু নারী আমাকে লিখেছেন যে, তাদের বিয়েতে তারা কী পরতে চান সেকথা বাবা মা বা শ্বশুর শাশুড়িকে বলার সাহস তারা আমাকে দেখে পেয়েছেন। "

"এটা শুনে আমার একদিক দিয়ে খুবই খুশি লাগছে, কিন্তু আবার আরেক অর্থে আমি উদ্বিগ্নও। আমার মনে হচ্ছে, হে ঈশ্বর, আমি অন্য মেয়েদের বা অন্য পরিবারের জীবনে অশান্তি ডেকে আনলাম না তো?"

সানজানা ঋষির কনের সাজে এই অভাবনীয় বদল কি অন্যদের অনুপ্রেরণা জোগাবে? নাকি "এটা একটা আগুনের মত যা দপ করে জ্বলে উঠে বিতর্ক তৈরি করেছে, আবার তা ফস করে নিভে যাবে!" মন্তব্য আনন্দ ভূষণের। 

এবিএন/মমিন/জসিম

এই বিভাগের আরো সংবাদ