‘হিংসাত্মক মনোভাব ছিল, আছে, বাড়ছে’

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২০, ০৯:৫৪

করোনার কারণে মানুষ ডিপ্রেশনে আছেন। এখন হুট করেই রেগে যাচ্ছেন। মানুষের মধ্যে যে হিংসাত্মক মনোভাব সেটা আগেও ছিল, এখন দিন দিন সেটা বাড়ছে। এ বিষয়ে ডয়চে ভেলের কথা বলেছেন আরিফ আর হোসেন। তা তুলে ধরা হলো-

প্রশ্ন : সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারীরা কিছু বিষয়ে প্রতিবাদ করেন, কিছু বিষয়ে করেন না। কারণ কী?

আরিফ আর হোসেন : আমার কাছে মনে হয় এটা মানসিক ব্যাপার। অনেকে মনে করেন, কেউ এগিয়ে আসলে আমি এগিয়ে আসব। এই কেউটা যে কাউকে হতে হবে। কেউ মনে করে না যে আমি এগিয়ে এলে আরেকজন এগিয়ে আসবে। অনেকেই মনে করে এটা নিয়ে প্রতিবাদ করা উচিত, কিন্তু মনে করে না আমারই প্রতিবাদ করা উচিত। দ্বিতীয়ত, প্রতিবাদের রেজাল্ট যে খুব ভালো হচ্ছে, সেটিও না। আমি নিজেও প্রতিবাদ করছি না, যে আমরা নিজের দুইটা মেয়ে আছে। আমরাও এটাও দেখি না যে, প্রতিবাদের কারণে কেউ তাকে অ্যাপ্রিশিয়েট করেছে। আবার কেউ প্রতিবাদ করলে সেখানে বিতর্ক শুরু হয়ে যায়। আমাদের কাছে কিন্তু এমন কোন সাকসেস স্টোরি নেই যে, প্রতিবাদের কারণে সফল হয়েছে এবং মানুষের বাহবাও পেয়েছে।

মানুষ আসলে কী দেখে প্রতিবাদের সিদ্ধান্ত নেয়? প্রতিবাদ করলে কি কোনো লাভ হয়?

প্রতিবাদ করলে নিঃসন্দেহে লাভ হয়। সামাজিক মাধ্যমে যেটা দেখা যায়, আপনি একটা প্রতিবাদ করলে এর কাউন্টার প্রতিবাদও দেখা যায়। এই কারণে অনেকে তর্কে জড়াতে চান না। আজই একটা জিনিস ভাইরাল হয়েছে, সেটা হলো যশোরের একজন ভদ্রমহিলা মোটরসাইকেলে করে গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানে যাচ্ছেন। আমি শিওর যাদের মেয়ে আছে তারা, বিশেষ করে আমার দুইটি মেয়ে আছে আমিও এই কনসেপ্টটা লাইক করেছি। আমি এটা নিয়ে লিখতে ভয় পাচ্ছি বা ভয় না পেলেও ভাবছি এটা নিয়ে লিখলে যারা গোড়া মুসলিম তারা এটা নিয়ে কথা বলবে। এই যে দ্বিধা, এটার কারণেই আমরা পিছিয়ে পড়ছি। কিন্তু প্রতিবাদ করলে লাভ হয় কি-হয় না সেটা বলার অপেক্ষাই রাখে না। অবশ্যই লাভ হয়। আরেকটা হল কি দেখে প্রতিবাদ করে? এটা শিক্ষাগত যোগ্যতা, সোশ্যাল ভিউ অনেক কিছুর উপর নির্ভর করে। আমি একটা ঘটনা যেভাবে দেখবো, গ্রামের একটা ছেলে সেভাবে দেখবে না। ইংলিশ মিডিয়ামের একটা ছেলে যেভাবে দেখবে, মাদ্রাসার একটা ছেলে সেভাবে দেখবে না।

যারা সাকিবের মেয়ের ছবিতে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করেছে তারা তো খারাপ কাজ করেছে। কিন্তু যারা এটার প্রতিবাদ করছিলেন তাদের নিবৃত্ত করেছেন সাকিবের স্ত্রী। তিনি কি ঠিক করেছেন? 

বিষয়টা আসলে ডিবেটেবল। শিশির প্রথম যে স্ট্যাটাস দিয়েছেন আমি তা অ্যাপ্রিশিয়েট করি। তিন বলেছেন, অনেক মানুষের মধ্যে দুই-চার জন কি বলল সেদিকে মনোযোগ দেওয়ার দরকার নেই। কিন্তু পরে তিনি যেটা বলেছেন, আমার পরিবারের সঙ্গে যেটা হচ্ছে সেটা নিয়ে কারো মাথা ঘামানো লাগবে না। আমার মনে হয়, এটা সে একটু বেশিই বলে ফেলেছে। আমার কাছে ভালো লাগেনি।

সোশ্যাল মিডিয়া কী মানুষের মনে হিংসাত্মক মনোভাব জাগাচ্ছে?

আমাদের এখানে দেখবেন সোশ্যাল মিডিয়ায় যে জিনিসটা থাকে ম্যানার সেটা আমরা শিখিনি। স্কুল-কলেজে আমরা এটা শিখিনি। এমনকি আমাদের কোন আইডল নেই, যাকে দেখে শিখব। সোশ্যাল মিডিয়ায় কি করতে হবে না হবে সেটা আমরা কোথাও শিখিনি। করোনার কারণে মানুষ যে পরিমান ডিপ্রেশনে আছে, তাতে দেখা যাচ্ছে সে হুট করে রেগে যাচ্ছে, রিঅ্যাক্ট করছে। হিংসাত্মক মনোভাব আগেও ছিল, এখন কেন জানি মনে হচ্ছে দিন দিন বাড়ছে।

সার্বিকভাবে মানুষের মনে সোশ্যাল মিডিয়া কেমন পরিবর্তন আনছে?

যদি খোলামেলা বলি, সার্বিকভাবে ভালো পরিবর্তন আনছে। একটা উদাহরণ না দিলেই নয়, দুই দিন আগে আমরা একটি স্ট্যাটাস দিয়েছিলাম গত মে মাসে আম্ফানে ৪০ লাখ গাছ পড়ে গেছে। এ বছর যেহেতু স্বাধীনতার ৪৯ বছর তাই আমরা উপকূলে ৪৯ হাজার গাছ লাগাবো তাও ৪৯ মিনিটে। এই স্ট্যাটাসের আধা ঘন্টায় প্রায় ২২ লাখ টাকা উঠেছে। এটা একটা উদাহরণ। এমন হাজারো উদাহরণ আছে। মানুষ আসলে বসে আছে, ভালো কাজে সহযোগিতা করার জন্য। আবার সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে খারাপ কাজও হচ্ছে। রামুর ঘটনা ঘটেছে। আসলে পজেটিভ-নেগেটিভ দুই দিকই আছে। আমার মনে হয়, পজেটিভ দিকই বেশিসোশ্যাল মিডিয়ার বিষয় দিয়ে কী বাস্তব চিত্র বোঝা যায়?

না। সোশ্যাল মিডিয়া দিয়ে মোটেই বাস্তব চিত্র বোঝা যাচ্ছে না। আপনি কারো ওয়াল পর্যবেক্ষণ করে বলতে পারবেন না সে লোকটা ভালো না খারাপ। সে শিক্ষিত না অশিক্ষিত। এখানে আসলে একটা আর্টিফিশিয়াল বিষয় থেকে যায়।

এখন করোনার বিভিন্ন বিষয়ে ফেসবুকে সমালোচনা হচ্ছে। আপনার কী মনে হয় এগুলো ইচ্ছা করলেই দূর করা সম্ভব?

আসলে সমালোচনা দূর করার কোন উপায় নেই। আমার মনে হয়, সমালোচনা হওয়া দরকার। আমার দৃষ্টিতে সমালোচনা বৃষ্টির পানির মতো। এটা একটা গাছকে বেড়ে উঠতে সহায়তা করবে, উপড়ে ফেলতে না। আমরা যে স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে নিয়ে সমালোচনা করছি, বা অন্য কাউকে নিয়ে সমালোচনা করছি, পজেটিভ সমালোচনা সবসময়ই গ্রহণযোগ্য। আমি বিশ্বাস করি, সরকার পজেটিভ সমালোচনাকে অ্যাপ্রিশিয়েট করে বা করা উচিত। স্বাস্থ্যমন্ত্রী প্রথমদিন পিপিপি বলেছেন। এরপর কিন্তু উনি আর পিপিপি বলেননি। এর কারণ একটা হতে পারে সোশ্যাল মিডিয়ায় এটা নিয়ে সমালোচনা হওয়ার পর উনি পজেটিভলি নিয়েছেন। এমন অনেক ঘটনা আছে, যেগুলো একটা ইমপ্যাক্ট ফেলতে সহযোগিতা করছে।

বিতর্কিত বিষয়গুলো কী সোশ্যাল মিডিয়া কর্তৃপক্ষ আগেই মুছে দিতে পারে? আর মুছে দিলে কী ভাল না খারাপ হবে?

মুছে দিতে পারে। কিছু কিওয়ার্ড আছে সেগুলো ব্যবহার করে মুছে দিতে পারে। কিন্তু এটা মুছে দিলে ভালো হবে না, খারাপ হবে সেটা নিয়ে বিতর্ক আছে। আসলে আমরা যারা সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করি, তারা ম্যানারগুলো জানি না। আমরা যেটাকে ফ্রিডম অব স্পিচ বলি, অনেক সময় সেটা হেট স্পিস হয়ে যাচ্ছে। তাই আমার মনে হয়, রেগুলেটরি বডির সম্পৃক্ততা দরকার। কোন সংস্থা যদি কিছু কিওয়ার্ড মুছে দেয়, সেটা নিয়ে যদি তর্ক বিতর্ক এগুতে না দেয় সেটা আমার মনে হয় বৃহত্তর স্বার্থেই করা হয়ে থাকে। (ডয়চে ভেলে থেকে সংগৃহীত)

এবিএন/সাদিক/জসিম

এই বিভাগের আরো সংবাদ