‘উচ্চ আয়ের দেশে উন্নীত করতে অর্থনীতিকে শিল্পভিত্তিক হতে হবে’

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০১৮, ১৩:১৭

ঢাকা, ১৭ জুলাই, এবিনিউজ : ড. সাদিক আহমেদ, অর্থনীতিবিদ। ভাইস চেয়ারম্যান, পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ (পিআরআই)। লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস থেকে এমএসসি এবং পিএইচডি সম্পন্ন করেন বোস্টন ইউনিভার্সিটি থেকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক ছিলেন। বিশ্বব্যাংকের ইয়াং প্রফেশনালস প্রোগ্রামের অধীনে যোগ দেন। এর পর তিনি বিশ্বব্যাংকের মিসর, মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা অঞ্চলের কান্ট্রি ইকোনমিস্ট; ইন্দোনেশিয়া, পিএনজি ও প্যাসিফিক আইল্যান্ডস, পূর্ব এশিয়া এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের প্রিন্সিপাল ইকোনমিস্ট; পাকিস্তান, শ্রীলংকা ও আফগানিস্তানের লিড ইকোনমিস্ট; পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের কান্ট্রি ডিরেক্টর; দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের চিফ ইকোনমিস্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বাংলাদেশের আগামী দিনের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও চ্যালেঞ্জ, বিনিয়োগ, ঋণ, বৈষম্য, দারিদ্র্য প্রভৃতি বিষয়ে একটি জনপ্রিয় দৈনিকের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। তা হুবহু তুলো ধরা হলো-

বাংলাদেশের ইনকাম স্ট্যাটাস আপগ্রেড হয়েছে। এখন আগামী দিনের চ্যালেঞ্জগুলো কেমন হতে পারে?

আমরা ২০১৫ সালে নিম্ন আয়ের দেশ থেকে নিম্নমধ্যবিত্তে উন্নীত হয়েছি। এখন এলডিসি স্ট্যাটাস থেকে বেরিয়ে আসার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এ উন্নতির প্রধান কারণ হলো, প্রবৃদ্ধি হারে দ্রুত অগ্রগতি; যা গড়ে ৪ শতাংশ থেকে বেড়ে এখন ৭ শতাংশের ঊর্ধ্বে। তাছাড়া দারিদ্র্যের হার কমানোর দিকে সরকার সবসময় জোর দিয়ে এসেছে। এর সঙ্গে কৃষি, খাদ্য, জনসংখ্যা ও রেমিট্যান্সের ভূমিকা রয়েছে।

নিম্নমধ্য আয় থেকে উচ্চমধ্য আয় এবং উচ্চ আয়ের দেশ হওয়ার যে পথ, তা অনেক বেশি চ্যালেঞ্জের। কারণ বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা অনেক বেশি। এখানে প্রযুক্তির ভূমিকা রয়েছে, দক্ষতার বিষয় রয়েছে, রফতানি বৈচিত্র্যকরণের ব্যাপার রয়েছে, ব্যয় প্রতিযোগীক্ষম হওয়ার বিষয় রয়েছে। তখন শুধু শ্রমিকের সংখ্যা দিয়ে হবে না, শ্রমিকের দক্ষতা ও পণ্যের মানও বিষয় হয়ে দাঁড়াবে। সব দেশেই এ পরিবর্তন হয়েছে। চীন যখন নিম্নমধ্য আয় থেকে উচ্চমধ্য আয়ে এসেছে, তখন ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। কারণ তারা অনেক বেশি বিনিয়োগ করেছিল, বিনিয়োগ হার ৪০ শতাংশের ঊর্ধ্বে ছিল। শহরায়ন, অবকাঠামো, জনশক্তি, প্রযুক্তি এবং গবেষণা ও উন্নয়নে অনেক বিনিয়োগ করেছিল।

চীনের উদাহরণ থেকে বোঝা যায়, নিম্নমধ্য আয় থেকে উচ্চমধ্য আয়ে যেতে হলে যে এজেন্ডা রয়েছে, তা ভিন্ন। এখন যেসব জায়গায় জোর দিতে হবে, তার মধ্যে অন্যতম হলো বিনিয়োগ। বলা হচ্ছে, আমাদের বিনিয়োগ হার জিডিপির ৩০ শতাংশ। এ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। সরকারের বিনিয়োগ দেখানো হচ্ছে সাড়ে ৭ শতাংশ, কিন্তু বাজেটে আসছে ৫ থেকে সাড়ে ৫ শতাংশ। বাকি ২ শতাংশ কোথা থেকে আসছে এবং কে অর্থায়ন করছে? যা-ই হোক, বিনিয়োগ যদি ৩০ শতাংশও হয়ে থাকে, এটিকে ৩৫ শতাংশে নিয়ে যেতে হবে। দ্বিতীয় বিষয় হচ্ছে, দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা। আমরা দেখতে পাচ্ছি, অনেক সরকারি প্রকল্পের উৎপাদনশীলতা অনেক কম। কারণ যে প্রকল্প সম্পন্ন হওয়ার কথা পাঁচ বছরে, তা শেষ হচ্ছে ১০ বছরে। ফলে ব্যয় বাড়ছে। এদিকে মনোযোগ দিতে হবে।

প্রযুক্তির দিক থেকে আমরা বেশ পিছিয়ে রয়েছি, দক্ষতার দিক থেকেও। এখন পরিবর্তন হতে হলে এগুলোয় বিনিয়োগ করতে হবে। দক্ষতার জন্য আমাদের শিক্ষার মান ও প্রশিক্ষণে জোর দিতে হবে। প্রযুক্তির জন্য অর্থায়ন লাগবে। আমাদের অবকাঠামোগত বড় ঘাটতি রয়েছে। এসব ঘাটতি মেটাতে হলে যে বিনিয়োগ দরকার, সেজন্য সম্পদ সংগ্রহের ওপর জোর দিতে হবে। জিডিপিতে ট্যাক্স রেশিও না বেড়ে উল্টো কমে গেছে। উচ্চমধ্য আয়ের স্ট্যাটাস অর্জন করতে হলে ৯-১০ শতাংশ ট্যাক্স টু জিডিপি রেশিও দিয়ে আমাদের হবে না। ১৫-১৬ শতাংশ লাগবে। এ ৯-১০ থেকে ১৫-১৬ শতাংশে যাওয়া একটা বড় চ্যালেঞ্জ। রাজস্বনীতি ও কর প্রশাসনে বিরাট পরিবর্তন আনতে হবে। 

প্রতিযোগিতামূলক হতে হলে আমাদের নীতি হওয়া উচিত গবেষণা, প্রযুক্তি ও দক্ষতাভিত্তিক। গবেষণা ও উন্নয়নে আমরা বিনিয়োগ করি মোট জিডিপির শূন্য দশমিক ১৫ শতাংশ, যেখানে দরকার ১ দশমিক ৫ থেকে ২ শতাংশ। বিনিয়োগ বাড়াতে হলে বেসরকারি খাতকে তো অবশ্যই বিনিয়োগ করতে হবে। তবে বেসরকারি খাতকে সাহায্য করার জন্য সরকারি বিনিয়োগের প্রয়োজন রয়েছে।

আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন। অতিরিক্ত বৃষ্টি হচ্ছে, নদীভাঙন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিসহ জলবায়ু পরিবর্তনের বিভিন্ন প্রভাব দেখা যাচ্ছে। এগুলো সামাল দিতে হবে। দেখা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের খারাপ প্রভাব গরিবের ওপর বেশি। উদাহরণস্বরূপ, ৪০ বছর আগে কুড়িগ্রামে দারিদ্র্যের হার ছিল ৮০ শতাংশ। এখনো তা ৭০ শতাংশে রয়েছে। এর একটি প্রধান কারণ, প্রতি বছর নদীভাঙন ও বন্যা।

উচ্চমধ্য আয় ও উচ্চ আয়ে যেতে হলে কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি দিয়ে হবে না। এখন গ্রামেও শহরের অনেক বিষয় চলে গেলেও শহুরে সেবা সেখানে অনুপস্থিত। সেবার মধ্যে রয়েছে যেমন নিরাপদ পানি। গোটা বাংলাদেশে পাইপ দিয়ে পানি সরবরাহ মাত্র ১২ শতাংশ। আবার শহরে রয়েছে স্যানিটেশন, জলাবদ্ধতা, আবাসন সমস্যা। বায়ুদূষণ একটা গুরুতর সমস্যা। শিল্পবর্জ্যের জন্য শীতলক্ষ্যা, বুড়িগঙ্গাসহ অনেক নদীর অবস্থা করুণ। এমন অনেক ইস্যু রয়েছে, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এগুলোর সমাধান করতে হবে। নগরায়ণ ও শিল্পায়নের ওপর জোর দিতে হবে। শহুরে আধুনিক সেবা যেমন— বীমা, ব্যাংকিং, আইটি সেবা গ্রামে পৌঁছে দিতে হবে। ভূমি ব্যবহারে আমাদের আরো দক্ষতার পরিচয় দিতে হবে।

সরকারি ব্যয়ের অপচয় কীভাবে রোধ করা যায়?

বাস্তবায়নের জন্য শুধু টাকা হলে হয় না, যদিও টাকার দরকার আছে। প্রস্তুতির দরকার আছে, আরো দরকার দক্ষতা, ভালো ব্যবস্থাপনা ও বাস্তবায়নের ধারণক্ষমতা। এ ফ্যাক্টরগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের দরকার আছে। প্রকল্প তৈরির সময় ব্যয় প্রাক্কলন করতে হয়। যত জটিল প্রকল্প হবে, তত দক্ষতার পরিচয় দিতে হবে। আমাদের দক্ষতা রয়েছে, তবে প্রয়োজনের তুলনায় কম। বড় প্রকল্পগুলোকে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমে টার্নকি কন্ট্রাক্ট বেসিসে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে দিলে ভালো হয়, তাহলে দেরি হলে অথবা ব্যয় বাড়লেও সেটা তাদের দায়িত্ব। তা না হলে এখন দেখা যায়, কোনো প্রকল্প শুরু হয় ৩ বিলিয়ন ডলার হিসাব নিয়ে, কয়েক বছর পর তা হচ্ছে ৪ বিলিয়ন ডলার, এরপর আরো বাড়ে। আবার অনেক প্রকল্প এমন কাউকে দেয়া হচ্ছে, যাদের পাইপলাইনে যেসব প্রকল্প রয়েছে, সেগুলোই শেষ হয়নি। নতুন প্রকল্প দেয়ার আগে মন্ত্রণালয়ের আগেকার প্রকল্প বাস্তবায়ন দক্ষতা যাচাই করা উচিত এবং চলতি প্রকল্প শেষ করার ওপর জোর দেয়া উচিত। তাছাড়া সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে চলমান প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের ওপর জোর দিতে হবে। বাস্তবায়ন ভালো না হলে জবাবদিহি করতে হবে এবং নতুন প্রকল্প থেকে বঞ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশে দক্ষতা কীভাবে বাড়ানো যায়?

এ বিষয়ে আমরা অন্য দেশ থেকে শিক্ষা নিতে পারি। চীন, কোরিয়া, জাপান যখন নিম্ন আয়ের দেশ ছিল, তখন তারা প্রত্যেকেই বিনিয়োগ করেছে প্রযুক্তি ও দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে। বিদেশে নিজেদের লোক পাঠিয়েছে জ্ঞান অর্জনের জন্য। এছাড়া বিভিন্ন দেশ থেকেও লোক এনেছে। এভাবেই জ্ঞান স্থানান্তর হয়। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে উন্নতি করতে হলে আমাদের অনেক বেশি আন্তর্জাতিক সাহায্য নিতে হবে। আমাদের লোকদের প্রশিক্ষণে পাঠাতে হবে, প্রশিক্ষণ শেষে তাদের ফিরিয়ে আনতে হবে। চীনের প্রযুক্তিগত উন্নয়ন তো রাতারাতি হয়নি। একটার পর একটা ধাপ পেরিয়ে তারপর তারা বর্তমান অবস্থানে এসেছে। চীন এখন জিডিপির ২ শতাংশ বিনিয়োগ করছে গবেষণা ও উন্নয়ন খাতে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় আমরা জোর দিয়েছি, এটা ভালো কথা। কিন্তু আমরা উচ্চশিক্ষা, সায়েন্স ও টেকনোলজি এবং দক্ষতা উন্নয়নে অনেক পিছিয়ে আছি। আমরা বলছি, কর্মসংস্থান বাড়ছে না। গ্রাম কিংবা অনানুষ্ঠানিক খাত থেকে লোক এনে তো আমি সরাসরি ম্যানুফ্যাকচারিং সেক্টরে নিয়োগ দিতে পারব না। কারণ তাদের দক্ষতার অভাব রয়েছে। সেজন্য অনেক শ্রমিক অনানুষ্ঠানিক সেবা খাতে কম আয়ের কাজ করছেন। সরকারের নিজের প্রশিক্ষণ দক্ষতা যথেষ্ট নয়, এজন্য পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপে যেতে হবে।

ফ্লাইওভারসহ বিভিন্ন প্রকল্প নেয়া হচ্ছে ঢাকার যানজট নিরসনে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে এগুলোর সুফল পাওয়া যাচ্ছে না—

শুধু ফ্লাইওভার নির্মাণ করলে সবসময় নগরায়ণের সমস্যা সমাধান করা যাবে না। একটি নগর নীতি কাঠামো তৈরি করতে হবে। আমাদের নগরের চাহিদা কী এবং টেকসই উপায়ে কীভাবে এগুলো পূরণ করা যায়, তা চিন্তা করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, এটি বাস্তবায়নের ভার কাকে দেয়া হচ্ছে। নগরের কোনো একটা ফোকাল পয়েন্ট নেই। বিভিন্ন সংস্থাকে বিভিন্ন কাজ দিলাম, তাহলে হবে না। এখন যেটা দেখা যাচ্ছে তা হলো, কারো সঙ্গে কারো কাজের সমন্বয় নেই, কেউ দায়িত্ব নিচ্ছে না। নগর এজেন্ডা এত বড় যে রাতারাতি সমাধান করা যাবে না। সমাধান করতে চাইলে পদ্ধতিগতভাবে করতে হবে। অন্যদিকে ঢাকার ওপর যে চাপ রয়েছে, তা কমাতে হবে। বিকেন্দ্রীকরণ যদি না হয়, অন্যান্য শহরের যদি উন্নতি না হয় তবে এ চাপ কমবে না। কমপক্ষে প্রত্যেক বিভাগে একটি আঞ্চলিক সিটি সেন্টার থাকতে হবে। এগুলোর উন্নতির জন্য স্থানীয় সরকারকে বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। সরকারি সবকিছু ঢাকায় ধরে রাখলে হবে না, বরং স্থানীয় সরকারকে জোরদার করতে হবে। এটি নিয়ে আমি একটি বইও লিখেছি (গধশরহম উযধশধ খরাধনষব, টচখ, উযধশধ)।

সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগও দরকার। কিন্তু বেসরকারি বিনিয়োগ তো বাড়ছে না—

বাংলাদেশে বেসরকারি বিনিয়োগের প্রভাব সরকারি বিনিয়োগের তুলনায় অনেক বেশি। তবে ৮-১০ বছর ধরে জিডিপির অংশ হিসেবে বেসরকারি বিনিয়োগের হার যতটা বৃদ্ধি পাওয়া উচিত ততটা বাড়েনি। বর্তমানে বেসরকারি বিনিয়োগ জিডিপির ২৩ শতাংশের মতো। উচ্চমধ্য আয়ের স্ট্যাটাস পেতে হলে এটাকে অন্তত জিডিপির ৪-৫ শতাংশ আরো বাড়াতে হবে। এজন্য অনেক সংস্কারের প্রয়োজন। যেমন— কস্ট অব ডুয়িং বিজনেস কমাতে হবে, রাজস্ব সংস্কার করতে হবে, আর্থিক খাতকে শক্তিশালী করতে হবে, অবকাঠামোকে শক্তিশালী করতে হবে এবং শ্রমিকের দক্ষতা বাড়ানোর ওপর জোর দিতে হবে।

অনেক কোম্পানি তো বাইরে চলে যাচ্ছে।

বাংলাদেশী কোম্পানি যদি বাইরে বিনিয়োগ করে, এতে আপত্তি নেই। বাইরে বিনিয়োগ করে যদি অর্থ আনতে পারে তাহলে তো ভালো। তবে দেশে বিনিয়োগ করতে হলে বিদ্যুৎ, জমি, পরিবহন, দক্ষ জনশক্তি প্রভৃতি দরকার রয়েছে। এগুলো যদি নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে নতুন বিনিয়োগ আসবে কীভাবে। ব্যাংকিং খাতের অবস্থাও তো ভালো না। তাই চ্যালেঞ্জ অনেক রয়েছে, তবে এগুলো যে দূর করা যায় না, তা নয়।

বেসরকারি উদ্যোক্তাদের মধ্যে অনেকেই বলেন, আমি দীর্ঘদিন কঠোর পরিশ্রম করে কাজ করার পর যে পর্যায়ে এলাম, একটি লোক ব্যাংক থেকে টাকা মেরে দিয়ে সে পর্যায়ে চলে আসছে। এ পরিবেশ যদি থাকে, তাহলে আমি কীভাবে কাজ করব?

এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ সুশাসনের ইস্যু। সরকারকে ব্যাংকিং সেক্টরের রিফর্মের ওপর জোর দিতেই হবে। সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকের নন-পারফর্মিং লোন খুব শক্তভাবে কমাতে হবে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে করপোরেটারাইজড করতে হবে এবং তাদেরকে মুনাফা অর্জন করতে হবে। ঋণ প্রদান ও তা আদায়ের ব্যাপারে কোনো ধরনের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ করা যাবে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি সক্ষমতা বাড়াতে হবে। যেসব ব্যাংকের এনপিএলের মাত্রা বেশি, সেসব ব্যাংকের দক্ষতার ওপর নজর রাখতে হবে।

সরকার বিভিন্ন জায়গা থেকে ঋণ নিয়ে প্রকল্প করছে। তবে ঋণের পরিমাণ এখনো জিডিপির তুলনায় কম। ঋণের পরিমাণ জিডিপির তুলনায় বেড়ে গেলে সংকট দেখা দেয়। যেটা মালয়েশিয়া, শ্রীলংকার ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে। এটি দেখে কি আমাদের সাবধান হওয়া উচিত নয়?

আগে থেকেই সতর্ক হওয়া ভালো। ইস্যু হচ্ছে, আমরা ডলারে যে ঋণ নিচ্ছি, তা কোথায় ব্যবহার করছি এবং কতটা কার্যকর হচ্ছে। আমরা ঋণ ডলারে নিচ্ছি, ফেরতও দিতে হবে ডলারে। এ ঋণ ব্যবহার করে আমরা যদি অতিরিক্ত ডলার আয় করতে না পারি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে, তাহলে ঋণ পরিশোধে সমস্যা হবে। 

প্রবৃদ্ধির সঙ্গে বৈষম্যও বাড়ছে। এর পেছনের কারণ কী বলে মনে করেন?

এটি উন্নয়নের বড় চ্যালেঞ্জ। দারিদ্র্য বিমোচন অনেকটা নির্ভর করে প্রবৃদ্ধির ওপর। দারিদ্র্যের হার কমলে যে বৈষম্য কমবে, এটা সবসময় সত্য নয়। এজন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির কথা বলা হয়। অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি বলতে বোঝাচ্ছে, যারা গরিব, প্রতিবন্ধী, ঝুঁকিতে রয়েছে, উন্নয়নে তাদের অংশগ্রহণ বাড়ানো। বেসরকারি খাতে কর্মসংস্থানের চাহিদা রয়েছে, কিন্তু ঠিকভাবে দক্ষ মানবসম্পদ পাওয়া যাচ্ছে না। অন্যদিকে অনেক মানুষ বেকার কিংবা কম আয়ের কাজে নিযুক্ত। আনুষ্ঠানিক খাতে কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে। আয়বৈষম্য কমাতে হলে সবার আগে শ্রমিকের দক্ষতা বাড়াতে হবে। দ্বিতীয়ত. শ্রমদক্ষতা বাড়াতে হলে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সরকারকে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। তৃতীয়ত. দরকার একটি সুশীল সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা। ২০১৫ সালে সুন্দর একটা সামাজিক নিরাপত্তা স্ট্র্যাটেজি তৈরি করা হয়েছিল, কিন্তু তার বাস্তবায়ন এখনো হয়নি। এর বাস্তবায়ন অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। যেসব দেশে বৈষম্য কম যেমন— পশ্চিম ইউরোপ, কানাডা, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, সেখানে সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা খুব ভালোভাবে কাজ করছে, সঙ্গে রয়েছে প্রগতিশীল রাজস্ব ব্যবস্থা। বাজার অর্থনীতিতে যদি আয়বৈষম্য কমাতে হয়, তবে এ দুটি হচ্ছে প্রমাণিত পদ্ধতি। আমাদের দুটোর একটাও নেই। আমাদের রাজস্ব প্রক্রিয়াকে অনেক উন্নত করতে হবে।

দারিদ্র্য কমানোর ক্ষেত্রে যেসব অঞ্চলের ওপর জোর দেয়া হয়েছে, যেমন— রংপুর, কুড়িগ্রাম; সেখানে দারিদ্র্য কমেনি। আবার যেগুলোয় কম জোর দেয়া হয়েছে, যেমন— কুমিল্লা, নোয়াখালী, তারা উন্নতি করেছে—

এখানে দুটি বিষয় কাজ করে, প্রাকৃতিক দুর্যোগের ভূমিকা ও রেমিট্যান্স। কুড়িগ্রামের পিছিয়ে থাকার একটি প্রধান কারণ প্রাকৃতিক দুর্যোগ। প্রতি বছর নদীভাঙন, বন্যা হচ্ছেই। ফলে সেখানে দীর্ঘমেয়াদি কোনো বিনিয়োগ হচ্ছে না, বেসরকারি খাত সেখানে যাচ্ছে না, অবকাঠামো উন্নয়ন ঘটছে না, ব্যাংকিং সেক্টরের প্রভাব সেখানে কম। অন্যদিকে এখানে বিদেশী রেমিট্যান্সও আসে না। সেখানকার গরিব লোকজন কৃষিকাজ এবং আশপাশের শহরে রিকশা বা ছোটখাটো কাজ করার ফলে যতটুকু আয় আসে ততটুকুই। এভাবে তো দারিদ্র্য দূর করা যাবে না। আবার কুমিল্লা, নোয়াখালীতেও প্রাকৃতিক দুর্যোগ রয়েছে। কিন্তু সুবিধা হলো, এদের একটি বড় অংশের আয় আসে রেমিট্যান্স থেকে। রেমিট্যান্সের অর্থ দিয়ে তারা পরিবার চালাচ্ছে এবং বিভিন্ন খাতে উন্নয়ন করছে। সরকারের দায়িত্ব হবে যেসব এলাকা জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে রয়েছে, তাদের দ্রুত এ ঝুঁকি থেকে মুক্ত করা। এ উদ্দেশ্যে যে ডেল্টা প্ল্যান তৈরি করা হয়েছে, সেটা দ্রুত বাস্তবায়ন করা উচিত। এছাড়া এসব অঞ্চলের লোকদের রেমিট্যান্স আয়ের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। 

দেশের রাজস্ব ব্যবস্থা নিয়ে আপনার মতামত কী?

কর ব্যবস্থা র্যাডিক্যালি পরিবর্তন করতে হবে। তবে বাস্তবায়নের ব্যাপারে প্র্যাগমেটিক হওয়া দরকার। আমাদের ধাপে ধাপে যেতে হবে। কিছু রাজনৈতিক অর্থনীতির বিষয় রয়েছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে যত দ্রুত সম্ভব ২০১২ ভ্যাট আইনটি বাস্তবায়ন করতে হবে। এটা বাস্তবায়ন করতে যদি প্র্যাগমেটিক সমঝোতা করতে হয়, তা করা যেতে পারে। দ্বিতীয়ত. আয়করের আধুনিকায়ন অত্যন্ত প্রয়োজন। এখন যেভাবে চলে তা আউটডেটেড। সেলফ অ্যাসেসমেন্ট করতে হবে কম্পিউটার দিয়ে। আয়ের উৎস দেখালে ব্যয় দেখানোর দরকার নেই। আমি ব্যক্তিগত জীবনে কী কিনি না-কিনি, তা তো সরকারের জানার দরকার নেই। এ কারণেই অনেকে কর দিতে চায় না। এ আউটডেটেড সিস্টেম থেকে বেরিয়ে এসে সহজ ব্যবস্থায় যেতে হবে। কর ব্যবস্থা পুরোপুরি কম্পিউটারাইজড করতে হবে। সবকিছু হবে অনলাইনে। করদাতার সঙ্গে ট্যাক্স কমিশনার বা এনবিআরের কোনো সম্পর্ক থাকা উচিত নয়। নির্দিষ্ট অডিট করতে হবে। এজন্য আলাদা টিম থাকবে। অনিয়ম ধরার ব্যবস্থা সিস্টেমিক রিস্ক নির্ধারণের পদ্ধতিতে কম্পিউটারাইজড করতে হবে। হয়রানি হতে হয় বলে অনেকেই ট্যাক্স ফাইল করে না। এমন ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে, যেখানে কোনো কর কর্মকর্তা করদাতার কাছে যাবেন না।

ব্যাংকিং খাতে যে অনিয়ম চলছে, তা বিনিয়োগসহ অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে কি প্রভাব ফেলছে না?

অবশ্যই। নন-পারফর্মিং লোন এখন প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার। এ ১০ বিলিয়ন ডলার কাদের? জনগণের। এ টাকাগুলো কে ফেরত দেবে? ব্যাংক খাতকে পুরোপুরি ঢেলে সাজানোর প্রয়োজন রয়েছে। আমি আগেও বলেছি, ব্যাংকিং কমিশন দিয়ে সমস্যাগুলো গভীরভাবে চিহ্নিত করতে হবে। কমিশনে অভিজ্ঞ প্রফেশনাল লোকদের নিয়োগ দিতে হবে। তারা প্রতিবেদন তৈরি করে সরকারকে দেবে। সরকার সেটি বিবেচনা করে বাস্তবায়ন করবে। এখানে সুশাসন একটা বড় ইস্যু। অনেকে ব্যাংক থেকে টাকা নিয়ে ফেরত দিচ্ছেন না, তারা ধরেই নিয়েছেন যে কিছুই হবে না। রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া সুশাসনের কোনো সমাধান নেই। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোয় দুর্নীতি ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বেশি। এ ব্যাংকগুলোকে পুরোপুরি বাণিজ্যিক করে দিতে হবে। এটি বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকিতে থাকবে। এটা পেশাদারভাবে ব্যবস্থাপনা করা হবে এবং বাজেট থেকে কোনোভাবেই একটা পয়সা দেয়া যাবে না। বাজেট আইনেই থাকতে হবে, এখান থেকে কোনো অর্থ সরকারি প্রতিষ্ঠান বা ব্যাংকগুলোকে দেয়া যাবে না। ব্যাংকিং ব্যবসায় তো ক্ষতি হওয়া উচিত নয়। ওরা ৮ শতাংশ হারে আমানত নিচ্ছে, আর ১৩ শতাংশ হারে ঋণ দিচ্ছে। ১ দশমিক ৫ থেকে ২ শতাংশের বেশি প্রশাসনিক ব্যয় হওয়া উচিত নয়, বাকিটা মুনাফা। বাংলাদেশ ব্যাংককে স্বাধীনতা দিতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্ব হবে মুদ্রানীতি তৈরি, বৈদেশিক মুদ্রাবিনিময় হার নিয়ন্ত্রণ, মূল্য ব্যবস্থাপনা, ব্যাংকিং লেনদেনে দক্ষতা বাড়ানো। অর্থ মন্ত্রণালয় রাজস্বনীতি দেখবে, ব্যাংকিং খাত নয়।  (বণিক বার্তা থেকে সংগৃহীত)

এবিএন/সাদিক/জসিম

এই বিভাগের আরো সংবাদ