‘রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ব্যয়ভার অব্যাহতভাবে বহন টেকসই সমাধান নয়’

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ০১ জানুয়ারি ২০২০, ১২:৩০

ড. আহমেদ মুশফিক মোবারক, অর্থনীতিবিদ। যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল ইউনিভার্সিটির অর্থনীতির অধ্যাপক। দায়িত্ব পালন করছেন আবদুল লতিফ জামিল পভার্টি অ্যাকশন ল্যাবের নগর সেবা উদ্যোগ, পরিবেশ ও জ্বালানি খাতের সহপ্রধানের। গবেষক হিসেবে যুক্ত আছেন ইন্টারন্যাশনাল গ্রোথ সেন্টারের (আইজিসি) সঙ্গেও। গণিত ও অর্থনীতি নিয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে পড়াশোনা করেছেন ম্যাকালেস্টার কলেজ থেকে। পরে উভয় বিষয়ে পিএইচডি অর্জন করেছেন ইউনিভার্সিটি অব মেরিল্যান্ড থেকে। তার আগ্রহের ক্ষেত্র উন্নয়ন অর্থনীতি, আচরণ অর্থনীতি, পরিবেশ অর্থনীতি ও অভিবাসন। বিশেষত উন্নয়নশীল দেশগুলোয় পরিবেশগত ইস্যু নিয়ে তিনি বিস্তৃত গবেষণা করেছেন। বর্তমানে তিনি রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিয়ে একটি ব্যাপকতর গবেষণায় নিয়োজিত। আলোচ্য গবেষণার নানা দিক, পরিবেশের ওপর রোহিঙ্গা সংকটের প্রভাব, পুনর্বাসন প্রক্রিয়া, প্রবৃদ্ধি, অর্থনৈতিক সুফল ও বৈষম্যসহ প্রভৃতি বিষয় নিয়ে সম্প্রতি তার একটি জনপ্রিয় দৈনিকের সঙ্গে কথা হয়। তা হুবহু তুলে ধরা হলো-


প্রশ্ন : রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিয়ে গবেষণায় আপনারা উদ্যোগী হলেন কেন?

উত্তর : রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে সহিংসতাসহ নানা মানসিক পীড়ন মোকাবেলা করতে হয়েছে। সেই কারণে তাদের এখনকার মানসিক অবস্থা কেমন, তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা কেমন, তারা আদৌ কাজ করতে পারে কিনা, সেগুলো যাচাই করে দেখা। হয়তো এমন হতে পারে, তাদের ওপর দিয়ে হওয়া নির্যাতনের কারণে তারা শারীরিক-মানসিকভাবে আর সমাজের জন্য পুরোপুরিভাবে উৎপাদনশীল মানুষ হতে পারবে না। সে কথাও জানা দরকার। এটি জানা আরেকটি কারণেও দরকার, এখন পর্যন্ত সাংবাদিকসহ অন্যরা হয়তো দু-একটি ঘটনা সমীক্ষার ওপর ভিত্তি করে লেখেন যে তারা খারাপ করছে বা মিয়ানমারের সরকার-সেনাবাহিনী অন্যায় করেছে। তখন মিয়ানমার সরকার তার উত্তরে বলবে, এটা তো মাত্র এক-দুটি গল্প। এক-দুটি গল্পের ওপর ভিত্তি না করে বড় বা প্রতিনিধিত্বমূলক নমুনা নিয়ে যদি আমরা বলতে পারি, পুরো জনগোষ্ঠীর মধ্যে এত শতাংশ লোকের অবসাদ আছে বা পুরো জনগোষ্ঠীর এত শতাংশ নারীর ওপর অত্যাচার করা হয়েছে, তাহলে সেটি আরো শক্তিশালী হবে। আমরা যখন এ ধরনের বিস্তৃত তথ্য জাতিসংঘের সামনে তুলে ধরতে পারব, তখন প্রত্যাবাসন হবে কিনা তার আলোচনা চললে তা আমাদের জন্য সহায়ক হবে। আমাদের সরকারের জন্য এটি অস্ত্র হিসেবে কাজ করতে পারে যে, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর এ ধরনের অত্যাচার করা হয়েছে। একটি উদাহরণ দিই। প্রত্যাবাসন সবসময়ই স্বেচ্ছামূলক হতে হয়। জোর করে পাঠিয়ে দেয়া নৈতিক নয়। কারণ যে জায়গায় পাঠাচ্ছি, সেখানে তাদের ওপর নির্যাতনকারীরা থাকে। আসলে দেখা যায় কেউ যেতে চায় না।

এ অবস্থায় মিয়ানমার সরকার হয়তো বলা এরই মধ্যে শুরু করতে পারে বা আরম্ভ করতে পারে, ‘আমরা চাইছি তারা চলে আসুক। আমাদের দিক থেকে আমরা দরজা খুলেছি। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার পারছে না বা নিরুৎসাহিত করছে।’ এ কথাটি তো ঠিক নয়। এটি তখনই জানব, যদি আমরা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের কাছ থেকে শুনতে পারি—তাদের মানসিক অবস্থা কেমন, তারা কেন চলে যেতে ভয় পায় ইত্যাদি। তাদের জীবনে এ ধরনের যে ঘটনা ঘটেছে, এটা জানা খুব গুরুত্বপূর্ণ। বৈজ্ঞানিকভাবে বিস্তৃত নমুনা নিয়ে আমরা যেন বলতে পারি এত শতাংশ মানুষের জীবনে এ ঘটনাগুলো ঘটেছে, সেটি আলোচনার ক্ষেত্রে আমাদের জন্য সহায়ক হবে।

আরেকটি বিষয়, পুরো ঘটনার বিবর্তনটা কীভাবে, কেমন হচ্ছে, সেটিও দেখা। এটি তো শুধু একবারে দেখা যায় না। এ কারণে আমরা কাজটি বড় আকারে করছি এবং এমনভাবে করছি, যেন প্রতি বছর একই জায়গায়, একই পরিবারের তথ্য বারবার সংগ্রহ করা যায়। তাতে দেখা যাবে, সময়ান্তরে তাদের অবস্থা কেমন হচ্ছে। আরেকটি কারণ হলো, তাতে বোঝা যাবে আইওএম বা ব্র্যাক থেকে যে তাদের জন্য অনেক কর্মসূচি বা নীতিগুলো নেয়া হয়েছে, সেগুলোর প্রভাব কেমন। এতে আদৌ লাভ হচ্ছে কিনা বা নীতি পরিবর্তন করা উচিত কিনা। কর্মসূচির আগে-পরে তথ্য বারবার সংগ্রহ করা হলে বোঝা যাবে অবস্থায় কোনো পার্থক্য এসেছে কিনা। এটিও গবেষণার অন্যতম কারণ।

চূড়ান্তভাবে আরেকটি কথা বলি, পাঁচ বা ১০ বছর পর এ জনগোষ্ঠীর জন্য দীর্ঘমেয়াদি সমাধান কী। কী ধরনের সমাধান আমাদের সরকার বা জনগণ মেনে নেবে। সেটি আসলে অনেকটা নির্ভর করে রাজনীতির ওপর।

দুই বছর আগের কথা। অনেক বড় হূদয় নিয়ে আমরা অনেককে নিয়েছি। লোকজনের চিন্তাধারা ছিল তারাও আমাদের মতো মুসলমান। আমরা একসময় ভারতের শরণার্থী হয়েছিলাম। এখন আমাদের উচিত আমরা যে সাহায্যটা পেয়েছিলাম, সেটি অন্য মানুষকে দেখানো। কিন্তু দুই বছরে দৃষ্টিভঙ্গি অনেক বদলে গেছে। ধীরে ধীরে অসহিষ্ণুতা বেড়ে গেছে। এখন আমরা শুধু রোহিঙ্গা নয়, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপরও তথ্য সংগ্রহ করছি। তথ্য শুধু অবজেক্টিভ ডাটা নয়, তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা কেমন, তাদের মজুরি কেমন, আয় কেমন। আশপাশে পণ্যের দাম বেড়েছে বা কমে গেছে কিনা। এমন হতে পারে ‘বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের’ সহায়তার কারণে চাল, ডাল, তেল প্রভৃতি নিত্যপণ্য যে আসছে, তাতে হয়তো দাম একটু কমে গেছে। তাতে হয়তো স্থানীয়দের জন্য লাভই হয়েছে। কিংবা এমনো হতে পারে যে, জনবহুলতা বাড়ার কারণে তাদের ক্ষতিও হয়েছে। সেই অবজেক্টিভ তথ্যও আমরা সংগ্রহ করছি। এটি ছাড়াও তাদের দৃষ্টিভঙ্গি কেমন পরিবর্তন হচ্ছে, সেটিও আগে থেকে দেখে রাখা দরকার। কারণ সেই দৃষ্টিভঙ্গি জানা খুব দরকার। যারা ওই জনগোষ্ঠীকে (শুধু শরণার্থী নয়, স্থানীয় বাসিন্দাদেরও) সাহায্য করতে চায় তাদের জন্য জরুরি। চূড়ান্তভাবে কোন নীতি কাজ করবে বা কোন নীতি সরকার নেবে, তা বুঝতে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিও বুঝতে হয়। তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে সেটি আমরা বিশ্লেষণ করছি।

প্রশ্ন : পরিবেশের ওপর কী ধরনের প্রভাব পড়ছে সেটি আপনারা দেখছেন?

উত্তর : আমরা আপাতত পরিবারিক তথ্য সংগ্রহ করছি। পরে আমাদের ইচ্ছা, এ তথ্য স্যাটেলাইট ম্যাপের সঙ্গে একসঙ্গে একীভূত করা, যাতে আমরা দেখতে পারি বন-পরিবেশের অবস্থা কেমন। এ কারণে অনেক বড় পরিসরে গবেষণাটি করছি। এটি একীভূত করলে সেটিও বোঝা যাবে। এখন পর্যন্ত সেই কাজটি হয়নি। তবে আমাদের তা করার পরিকল্পনা আছে। আর আমরা যদি আশপাশে প্রভাব বুঝতে চাই, তাহলে তার একটি তুলনা লাগবে। আগে কেমন ছিল, এখন কেমন আছে। সেই তুলনাটা আগে-পরে করা যায়, সেটি করব। আরেকটি কাজ করছি, হোস্ট কমিউনিটির মধ্যে যারা ক্যাম্পের আশপাশে আছে তাদের তথ্য সংগ্রহ করছি; আবার যারা বেশ দূরে আছে তাদেরও তথ্য সংগ্রহ করছি। তাতে বোঝা যাবে কাছের জনগোষ্ঠীর অবস্থা এবং দূরের জনগোষ্ঠীর অবস্থার তুলনা কেমন। যদিও ছোট আকারে জরিপ বা মূল্যায়ন হয়েছে, কিন্তু কন্ট্রোল গ্রুপ নিয়ে বড় আকারের কোনো কাজ এখন পর্যন্ত হয়নি। আমরা ব্যাপক বৈজ্ঞানিক মানদণ্ডের ভিত্তিতে পুরো বিষয়টির প্রভাব খতিয়ে দেখছি।

প্রশ্ন : রোহিঙ্গাদের বিতাড়নের ক্ষেত্রে দেশটির উন্নয়ন প্যারাডক্স কাজ করেছে বলে অভিযোগ। সেই কাজটি সহজতর করতে রোহিঙ্গাদের তীব্র নির্যাতনের মুখে পালিয়ে যেতে বাধ্য করা হয়েছে। এ উন্নয়ন প্যারাডক্সকে আপনি কীভাবে দেখেন?

উত্তর : এতক্ষণ যেসব কথা বললাম, তা আমি মানবিক সংকটের দিক থেকে বলেছি। খারাপ কাজ হয়ে গেছে, এখন আমাদের চিন্তা করতে হবে আমাদের অপটিমাল পলিসিটা কী হবে। তাদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পেরেছি, ৪০ বছর ধরে মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে পদ্ধতিগতভাবে রশিটা শক্ত করার নীতি নিয়েছিল। সেটি কীভাবে? প্রথমে তাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেয়া হলো। সেটি অনেক দিন আগের কথা। অং সান সু চির বাবার আমল থেকেই এ ঘটনা। নাগরিকত্ব কেড়ে নিলে অনেক সমস্যা তৈরি হয়। অনেক কাজ করা সম্ভব ছিল, এখন আর করা যায় না। তারপর তাদের শিক্ষার অধিকারও বন্ধ করে দেয়া হলো। অথবা সেটি অনেক বেশি কঠিন করে ফেলা হলো। তারা শিক্ষা নিতে পারবে কিনা কিংবা পেশাভিত্তিক চাকরিতে ঢুকতে পারবে কিনা, সবখানেই নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হলো। এটি অন্তত ২০-২৫ বছর আগের কথা। আগের চলাচলের অধিকারও রহিত করা হলো। একজন এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে যেতে পারবে না। তাতে তো আর বাণিজ্য করা সম্ভব নয়। এমন পদ্ধতিগতভাবে মিয়ানমার সরকার রশির বাঁধন শক্ত করেছে, তারা নিয়ন্ত্রণ ধীরে ধীরে এতটা বাড়িয়েছে যে দেশ ত্যাগ করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।

প্রশ্ন : রোহিঙ্গাদের মূল ধারায় নিয়ে এলে এ সংকট তৈরি হতো না। বরং মিয়ানমারের জন্য লাভ হতো। তাহলে কেন এটি করেছে দেশটি, কেন তাড়িয়ে দিতে হবে?

উত্তর : সারা বিশ্বেই এটি হচ্ছে। ভারতে একই ধরনের কাজ হচ্ছে মুসলমানদের প্রতি। শ্রীলংকায় হয়েছে তামিলদের প্রতি। রুয়ান্ডায় হয়েছে। মিয়ানমারে হচ্ছে। এর একটি কারণ আমার কাছে মনে হয়, চূড়ান্তভাবে মানুষ খুব সাম্প্রদায়িক। আমরা নিজের গোত্রকে বেশি দেখি। যে গোত্রে বা ধর্মীয় সম্প্রদায়ে আমরা জন্মেছি তাদের ভালো বেশি দেখি। অন্য গোত্র বা ধর্মাবলম্বী হলে অতটা ভালো দেখি না। এখন ইউরোপ-আমেরিকায়ও অভিবাসীদের প্রতি একই ধরনের ঘটনা ঘটছে। যদিও ঠিক বলা যায় না যে, অভিবাসীদের কারণে অর্থনীতির অবস্থা খারাপ।

প্রশ্ন : মিয়ানমার বলছে সেখানে অবকাঠামোগত উন্নয়ন হবে, শিল্পায়ন হবে। সেটি তো রোহিঙ্গাদের উচ্ছেদের কারণ হতে পারে না?

উত্তর : যদি কোনো অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হয়, তখন লোকজন একটা অজুহাত খোঁজে কী কারণে আমার অবস্থা খারাপ। তারা ধরে নিতে পারে না, অর্থনীতিটা রূপান্তরিত হয়ে গেছে, আমার অর্থনৈতিক দক্ষতা নেই। নিজের দোষ তো ধরা যায় না। এখানে অন্য দেশের মানুষ এসেছে। তারা দেখতে ভিন্ন, তাদের আচরণ ভিন্ন। তারা এসে এ সমস্যাগুলো করছে। আর বিশ্বব্যাপী রাজনীতিবিদরা খুব সহজেই এর সুবিধা নিতে পারেন। যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থা দেখুন। সার্বিক অর্থনীতি এখনো ঠিক আছে। কিন্তু কিছু কিছু পকেটে, কিছু জায়গায় অসুবিধা হচ্ছে। সেখানকার অনেক ম্যানুফ্যাকচারিং ফ্যাক্টরি বা গাড়ি তৈরির কারখানা চীনে চলে গেছে। যখন চীনকে ডব্লিউটিওর সদস্যপদ দেয়া হলো, তখন অর্থনীতির আকার বড় হলো। এদিকে শ্রম মজুরি বেশি হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের অনেক কারখানা চীনে চলে গেল। অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেল। ফলে উৎপাদন খাতের কর্মসংস্থান কমে গেল। তখন থেকে কিছু পকেটে, যেমন মিশিগান, ওহাইও ট্রাম্পের সমর্থন বেশি। এসব জায়গায় লোকজনের অর্থনৈতিক হতাশা বেশি ছিল। কী কারণে এ হতাশা আছে? একটি কারণ হলো, চীনের সঙ্গে বাণিজ্য বাড়ার কারণে। দ্বিতীয় কারণ হলো, অটোমেশন অনেক চলে এসেছে। মজুরি বাড়ার কারণে অনেক কারখানায় মানুষের স্থলে রোবট ব্যবহার হয়। ফলে যাদের দক্ষতা নেই, তাদের অনেকের চাকরি চলে গেছে বা আয় কমে গেছে। আসলে প্রধান শত্রু হলো, যান্ত্রিকীকরণ এবং বাণিজ্য। কিন্তু লোকজনের ব্যাখ্যা হলো বাণিজ্য বা রোবট নয়, অন্য দেশের সম্প্রদায়ের মানুষ। তারা আসায় আমাদের এখানে সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। কারণ তারা আমাদের চাকরি হস্তগত করছে।

প্রশ্ন : রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে তাদের আর্থসামাজিক, সাংস্কৃতিক বিষয়টি জানা কতটা গুরুত্বপূর্ণ?

উত্তর : আমার মনে হয়, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে যারা কাজ করছেন, তারা সবাই বুঝতে পারেন যে জানাটা দরকার। ভালো নীতি প্রণয়ন করতে হলে অনেক কিছু বুঝতে হয়, সেই স্বীকৃতি আছে। বাংলাদেশ সরকারেরও আছে। কিন্তু তাদের বিষয়টি পদ্ধতিগতভাবে জানা সহজ নয়। এর একটি কারণ প্রায় ১০ লাখ লোক রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পে আছে। পদ্ধতিগতভাবে অবস্থাটা কেমন, সেটি বুঝতে একটু সময় লাগে বা কষ্ট করে বড় আকারের তথ্য সংগ্রহ করতে হয়। সেই কাজটি আমরা এখন শুরু করছি।

একটি আনুমানিক হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের খাওয়া বাবদ ব্যয় পড়ে অন্তত ২২ মিলিয়ন ডলার। সেটি তো অব্যাহতভাবে বছর বছর দেয়া সম্ভব নয়। এটি টেকসই সমাধানও নয়। কোনো সময় বাজেট ঘাটতি হয়ে যেতে পারে। নীতি এমনভাবে প্রণয়ন করতে হবে, যাতে কাজ করতে সমর্থ ও ইচ্ছুক রোহিঙ্গা তরুণ জনগোষ্ঠী কাজ করতে পারে। এমন এক কর্মসূচি তৈরি করতে হবে, যাতে তারা তাদের স্বার্থ ও দক্ষতা কাজে লাগাতে পারে। অবশ্য এটা ঠিক, তাদের কাজ দিলে স্থানীয় লোকদের ক্ষতি হতে পারে। সেটিও আমাদের বুঝতে হবে। সেজন্য আমরা কাজ করছি তাদের আসলে কী ধরনের দক্ষতা আছে, কী ধরনের কাজ তারা করতে পারে তা যাচাই করার। এমনভাবে একটি কর্মসূচি সৃষ্টি করা, যাতে স্থানীয়দের কাজের ক্ষতি না হয়।

প্রশ্ন : আপনি কি মনে করেন, রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের দুর্বলতা আছে?

উত্তর : আসলে বাংলাদেশের দুর্বলতা নয়। বরং মিয়ানমারের সবলতা। মিয়ানমার একটি সম্পদসমৃদ্ধ বড় দেশ এবং বৃহৎ অর্থনীতি। আমাদের দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের সুপারপাওয়ার, বিশেষত ভারত ও চীনের খুব ইচ্ছা যে মিয়ানমারের বাজারে নিজেদের প্রবেশ নিশ্চিত করা। ভারত ও চীন পাকিস্তান, সিকিমে  তাদের প্রভাব তৈরির চেষ্টা করছে। মিয়ানমার একটি নতুন দেশ। এটি অনেক বছর ধরে অর্থনৈতিক ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের দিক থেকে মোটামুটি বন্ধ (ক্লোজ) ছিল। বাজার কেবল উন্মুক্ত করা হচ্ছে। সেজন্য সেখানে অর্থনৈতিক সুযোগ অনেক বেশি। মিয়ানমার নিজেকে এমনভাবে রেখেছে যে চীন ও ভারত রোহিঙ্গা ইস্যুতে খুব জোরেশোরে কথা বলতে পারে না। আপেক্ষিক অর্থে সেটিই আমাদের দুর্বলতা।

প্রশ্ন : বাংলাদেশের বর্তমান প্রবৃদ্ধির ধারাকে কীভাবে বিশ্লেষণ করবেন?

উত্তর : বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এখন খুব চমকপ্রদ (ইম্প্রেসিভ)। কয়েক বছর ধরে অবস্থা অনেক উন্নয়ন হয়েছে। এর সুবাদে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ছে। কিন্তু সেটিকে স্থায়িত্বশীলভাবে বজায় রাখতে হলে দরকার কর বা রাজস্ব জিডিপি বাড়ানো। প্রবৃদ্ধি টেকসই করতে চাইলে সরকারকে অনেক বিনিয়োগ করতে হয়। প্রধানত অবকাঠামোগত বিনিয়োগ করতে হয়। বিশেষত বন্দর, সড়ক উন্নয়ন এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সংযোগ নিশ্চিতে বিনিয়োগ করতে হয়, যাতে ব্যবসা করা সহজতর হয়। মাঝখানে যখন প্রবৃদ্ধি শুরু হয়েছিল, তখন সেটি মূলত শুরু হয়েছিল পোশাক ও জনশক্তি রফতানির মাধ্যমে। অনেক বছর ধরে বিনিয়োগ হচ্ছিল না। দেশের অনেকটা প্রবৃদ্ধি ঢাকায় হয়। প্রায় ২৫ শতাংশ জিডিপি ঢাকায় হয়। প্রবৃদ্ধি স্থায়িত্বশীল করতে চাইলে অবকাঠামো ভালো করতে হবে। বিভিন্ন দেশ থেকে যখন এফডিআই নিয়ে বিনিয়োগকারীরা আসেন, তখন যেন তারা দেখতে পান এখানে ব্যবসা করা সহজ। এদিক থেকে আমরা পিছিয়ে ছিলাম। ৫-১০ বছর আগে আমাদের বিদ্যুতের সক্ষমতা কত ছিল, সেটি মনে আছে। ট্রাফিকের অবস্থা আরো খারাপ ছিল। কয়েক বছর দেখলাম যে বিনিয়োগগুলো হচ্ছে। এর একটি কারণ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কর আহরণ বৃদ্ধি এবং কর প্রক্রিয়া সহজীকরণ। কেননা টাকা ছাড়া বিনিয়োগ করা যায় না। আমাদের বিপদ ছিল, প্রবৃদ্ধি বাড়ছে, কিন্তু তা স্থায়িত্বশীল করা যাবে কিনা। আরেকটি বিষয়, ঢাকা শহর থাকার মতো জায়গা ছিল না। এখন এক্ষেত্রে অনেকটা উন্নতি ঘটেছে। এটি খুব ভালো খবর। কিন্তু আমরা আন্তর্জাতিক ‘ইজ অব ডুয়িং বিজনেস’ র্যাংকিংয়ে এখনো পিছিয়ে আছি।

উন্নয়নের ক্ষেত্রে আরেকটি পর্যবেক্ষণ হলো, আমাদের দেশ অন্য দেশের তুলনায় এনজিওগুলোকে অনেক কাজ করতে দেয়। যেমন ব্র্যাক। সংস্থাটির প্রতিটি উপজেলায় অফিস আছে। বিভিন্ন দেশে সাধারণত যেসব কাজ (শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা) সরকার করে, কিন্তু বাংলাদেশে ওই ধরনের কাজও এনজিওগুলোকে করতে দেয়া হয়। সেজন্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চেয়ে অনেক আগে থেকে সামাজিক সূচকগুলো অনেক ভালো ছিল। ভারতের কথা চিন্তা করুন। ভারতের বেশ কয়েকটি রাজ্যের জিডিপি বাংলাদেশের প্রায় দ্বিগুণ। অথচ তারা সামাজিক সূচকে পিছিয়ে। এর কারণ সামাজিক খাতে আমাদের অনেক উদ্ভাবন (ইনোভেশন) হয়েছে। আর পাবলিক সার্ভিস ডেলিভারি অনেক ভালো ছিল। এর অন্যতম কারণ সরকার পুরো কাজটি নিজের ঘাড়ে না নিয়ে তারা অন্য বেসরকারি সংস্থাগুলোকে ক্ষমতায়িত করেছে, যেমন ব্র্যাক কিংবা অন্য এনজিওগুলো। তার কারণে আমার মনে হয়, আমাদের ভিত্তি শক্ত ছিল। অর্থনৈতিক সুবিধা সৃষ্টি হওয়ায় এর সুবিধা আমরা নিতে পেরেছি।

প্রশ্ন : আমাদের অর্থনৈতিক সুবিধা তৈরি হয়েছে। আমরা কি এর সুবিধা পুরোটা নিতে পারছি?

উত্তর : পাকিস্তানের সঙ্গে তুলনা করলে বলব, আমরা আসলে অর্থনৈতিক সুবিধা কিছুটা নিতে পেরেছি। একাত্তর সালে পশ্চিম পাকিস্তানের তুলনায় আমাদের কী অবস্থা ছিল। বর্তমানে কী অবস্থা দাঁড়িয়েছে। বরং একদম উল্টে গেছে এখন।

প্রশ্ন : কিন্তু সিঙ্গাপুর বা দক্ষিণ কোরিয়ার মতো তো এগোতে পারিনি...

উত্তর : এখনো পদ্ধতিগত পরিকল্পনার ঘাটতি আছে। যেটি ঢাকার রাস্তায় বেরোলে বোঝা যায়। সিঙ্গাপুর বা দক্ষিণ কোরিয়ার রাস্তায় গেলে তাদের তুলনায় আমাদের পার্থক্য কতখানি তা বোঝা যায়। ওইসব দেশের সমর্থ ও শক্তিশালী সরকার একটি সিস্টেম তৈরি করে এবং সেই সিস্টেম অনুযায়ী সবাই চলে। তাতে ব্যবসার অনেক সুবিধা হয়, দ্রুততম সময়ে স্কুল-কলেজে-ক্লিনিকে যাওয়া-আসাসহ দেশের অন্য লাভও হয়। তবে ১০ বছর আগে আমাদের যে অবস্থা ছিল, তার তুলনায় পাঁচ বছরে অবস্থার অনেক উন্নয়ন হয়েছে। আমরা অবশ্যই এসব সাফল্য উদযাপন করব, কিন্তু এটিকে আমরা বিজয় বলব না। সিঙ্গাপুর বা দক্ষিণ কোরিয়া দূরে থাক, ভিয়েতনাম যেভাবে চলে, তার তুলনায় আমরা এখনো পিছিয়ে আছি।

প্রশ্ন : উন্নয়নের পরবর্তী ধাপে উন্নীত হতে হলে আমাদের কোথায় কোথায় পাড়ি দিতে হবে?

উত্তর : এরই মধ্যে অবকাঠামোগত বিনিয়োগের কথা বলেছি। আরেকটি হলো, পরিবেশে নজর দিতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তন এখন একটি বাস্তবতা। এ কথাও ২০-২৫ বছর ধরে শুনে এসেছি। এটা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, নিম্ন বদ্বীপ হিসেবে বাংলাদেশের ঝুঁকি অনেক বেড়ে গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে ২০ লাখ থেকে দুই কোটি লোক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, জায়গা-জমি হারাতে পারে। তারা কোথায় যাবে, সেটি প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে কিনা, কোনো প্রযুক্তি আছে কিনা যা আমরা কারিগরিভাবে সমস্যাটি সমাধান করতে পারি। সেটি সম্ভব না হলে বাস্তুচ্যুত লোকগুলো কোথায় যাবে, সেটি আগে থেকে চিন্তা করে একটি প্রস্তুতি নেয়া দরকার। এটি খুবই জরুরি।

যেসব দেশ পরিবেশের ওপর বেশি নির্ভরশীল, তারা প্রকৃতি সুরক্ষায় বেশি বিনিয়োগ করে। যেমন কোস্টারিকা। দেশটির পুরো অর্থনীতি পরিবেশের ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল। তাদের অর্থনৈতিক নীতি দেখলে বোঝা যায়, তারা পরিবেশকে বেশি প্রাধিকার দেয়। আমাদের কাছেও পরিবেশ খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ আমরা পরিবেশের ক্ষতির দিকে এগোচ্ছি।

প্রশ্ন : উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় আমাদের দেশে পরিবেশকে যথাযথ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে কি?

উত্তর : এটা ঠিক, এখনো যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়া হয়নি। পরিবেশে গুরুত্ব দিলে—সবাই বসে থেকে সরকার এটা করুক, সেটি বললে তো হবে না। সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের পরিবেশ আন্দোলনের ইতিহাস বিবেচনা করুন। দেশটিতে এ আন্দোলন ৪০-৬০ বছর আগে শুরু হয়েছে। সব দেশেই রাজনীতিবিদরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর বেশি গুরুত্ব দেন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে বিভিন্ন লোকাল গ্রুপ প্রকৃতি, পরিবেশের কথা চিন্তা করে নিজেরা সংগঠিত হলো। তারা ভোটারদের জানাল যে, বিভিন্ন কারণে পরিবেশ গুরুত্বপূর্ণ। কাজেই এ ইস্যু আমাদের মাথার সামনে রাখা উচিত। ধীরে ধীরে পরিবেশ আন্দোলন এমন একটা পর্যায়ে গেল যে, আল গোরের সময় এটি প্রধান ইস্যুতে পরিণত হলো। বাংলাদেশেও এ ধরনের আন্দোলন ধীরে ধীরে শুরু হচ্ছে। গণতন্ত্রে যদি আমরা পরিবর্তন আনতে চাই, শুধু বসে থেকে হবে না। রাজনৈতিক নেতারা চিন্তা করে এটি একসময় ব্যবস্থা করে দেবেন, এভাবে ভাবলে হয় না। গণতন্ত্র একটি অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়া। হয়তো পাঁচ-সাত বছরে অর্থনৈতিক উন্নয়নের কারণে বিভিন্ন ধরনের কাজের সৃষ্টি হয়েছে, এখন লোকজন সময় পাচ্ছে পরিবেশসহ অন্যান্য বিষয়ে চিন্তা করার। ধীরে ধীরে দেশে সচেতনতা বাড়ার মাধ্যমে চাপ সৃষ্টি করতে হবে, যাতে সরকার পরিবেশ-প্রকৃতির বিষয়ে গুরুত্ব দেয়। ইউরোপ-যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশে এভাবেই পরিবেশ আন্দোলন গড়ে উঠেছে। আমাদের তরুণদের মধ্যে সচেতনতা বেড়েছে। এ ব্যাপারে তারা সময় দিচ্ছে। কিন্তু একটি আন্দোলন গড়ে তুলতে হলে অনেক লোককে একত্র করতে হবে। এভাবেই গণতন্ত্র কাজ করে।

প্রশ্ন : আমাদের দেশে সম্পদ বা আয়বৈষম্য বাড়ছে। এটা কীভাবে মোকাবেলা করা যায়?

উত্তর : শ্রমিক শ্রেণীর আগের তুলনায় আয় বেড়েছে। আগের চেয়ে ভালো জীবনযাপন করছে। কিন্তু তারা আবার দেখছে যে, কিছু লোকের সম্পদ তাদের তুলনায় ১০ হাজার গুণ বেশি। যেসব দেশে অসমতা বেড়েছে, সেখানে এর প্রতিক্রিয়া কী দেখেছি। চিলি, ব্রাজিল এসব দেশের কথা চিন্তা করুন। আমাদের দেশের কথা চিন্তা করলে বলব, অসমতা এত বাড়তে থাকলে কোনো একটা সময় উল্লিখিত দেশগুলোর মতো একই ধরনের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক প্রতিক্রিয়া এখানেও হবে এবং সেটি হবে খুবই বিপত্তিমূলক। এটা একটা বড় সমস্যা। এখনো অন্যান্য দেশের তুলনায় আমাদের সমস্যা এতটা বাড়েনি। এর কারণ আগেই উল্লেখ করেছি, আমাদের সামাজিক সূচক অনেক ভালো ছিল। বিশেষ করে কিছু মৌলিক বিষয়, যেমন টিকাদান, খাদ্যনিরাপত্তা আমরা নিশ্চিত করেছি। সামাজিক সূচক ভালো থাকায় সব পর্যায়ের লোক উপকৃত হয়েছে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, বিষয়টি সবসময় একই রকম থাকবে। চিলি, ব্রাজিল এখন যে ধরনের সমস্যার মুখোমুখি, সেসব সমস্যা যদি আমরা না চাই, তাহলে দূরদর্শী নীতি ও পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে হবে। (দৈনিক বণিক বার্তা থেকে সংগৃহীত)

এই বিভাগের আরো সংবাদ