‘উন্নয়নের জন্য করের আওতা বাড়াতে হবে’

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ৩০ নভেম্বর ২০১৯, ০৯:৩৭

অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের সিনিয়র সচিব ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া বলেছেন, করের আওতা বাড়ানোর অনেক সুযোগ রয়েছে। রাজস্ব আহরণ একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। কোনো বছর ভালো হয়, আবার কোনো বছর খারাপ হয়। নানা প্রতিকূলতার মাঝেও সম্প্রতি রাজস্ব আহরণে যে প্রবৃদ্ধি হয়েছে তা মন্দ নয়। চলতি অর্থবছরের রাজস্ব আদায়ে আশাবাদী।

গত ২৭ নভেম্বর সচিবালয়ে আইআরডির অফিস কক্ষে একটি জাতীয় দৈনিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি একথা বলেন।

শনিবার ৩০ নভেম্বর জাতীয় আয়কর দিবস। জনগণকে কর প্রদানে উদ্বুদ্ধ করতে ২০০৮ সালে প্রথম বারের মতো আয়কর দিবস পালন শুরু হয়। জাতীয় আয়কর দিবস উপলক্ষে রাজস্ব আদায়ের পরিস্থিতি, সমস্যা, সম্ভাবনাসহ নানা বিষয়ে কথা বলেন এনবিআর চেয়ারম্যান।

এ সময় কর দিবসের তাৎপর্য তুলে ধরে তিনি বলেন, নতুন ভ্যাট আইন ব্যবসাবান্ধব। এনবিআর পুনর্গঠন করতে হবে। কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশ থেকে অর্থপাচার রোধে পুরো রাজস্ব প্রশাসনে পূর্ণাঙ্গ অটোমেশন করতে হবে। অ্যাকাউন্টিং ফার্মগুলোর কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি আনতে নীতিমালা করতে হবে।

এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, বাংলাদেশে বড় দুর্বলতা হচ্ছে কর না দেওয়ার মানসিকতা। এ সংস্কৃতি থেকে আমাদের বের হতে হবে।

জাতীয় আয়কর দিবস ২০১৯ উদযাপন উপলক্ষে শনিবার সকাল ৭টায় সেগুনবাগিচার রাজস্ব ভবন থেকে একটি বর্ণাঢ্য র‌্যালি বের হবে। অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল এতে উপস্থিত থাকবেন বলে জানানো হয়।

এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, দু'বছর আগে ৩০ নভেম্বর জাতীয় কর দিবস ঘোষণা করা হয়। ওই দিন রিটার্ন গ্রহণের শেষ দিন। কর দিবস পালনের তাৎপর্য তুলে ধরে তিনি বলেন, দেশের উন্নয়নে প্রত্যেক সামর্থ্যবানের কর দেওয়া যে নৈতিক দায়িত্ব তার গুরুত্ব বোঝানোর জন্য দিবসটি পালন করা হয়। এ ছাড়া বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত অনেক কম। বর্তমানে এটি ১০ শতাংশের মতো। এটিকে বাড়িয়ে ২০২৫ সালের মধ্যে ১৫ এবং ২০৩০ সালের মধ্যে ২০ শতাংশে উন্নীত করতে হবে। সেই লক্ষ্য অর্জনে যোগ্য সবাইকে কর দিতে হবে। এসব বিষয়ে জনগণের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করতে আয়কর দিবস পালন করা হয়।

চেয়ারম্যান বলেন, বর্তমানে রাজস্ব প্রশাসনে জনবল বাড়ানোর একটি প্রস্তাব রয়েছে। কাস্টমস এবং ট্যাক্স- দুই ক্যাডারে জনবল বাড়ানোর প্রস্তাব সরকারের সক্রিয় বিবেচনাধীন। আয়কর ও ভ্যাটে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সময়ের বিবর্তনে বিশ্বায়নের প্রেক্ষাপটে আমদানি পর্যায়ে শুল্ক্ক আদায়ের নির্ভরশীলতা ধীরে ধীরে কমে আসবে। যদিও উল্লেখযোগ্য রাজস্ব এখনও আমদানি পর্যায় থেকে আহরণ হয়। দেশীয় শিল্পের সুরক্ষায় অনেক পণ্যে নিয়ন্ত্রণমূলক ও সম্পূরক শুল্ক্ক আরোপ রয়েছে। এগুলো ক্রমান্বয়ে উঠিয়ে দিতে হবে। তখন আমদানি শুল্ক্ক (কাস্টমস ডিউটি) আহরণ আরও কমে যাবে। এই ক্ষতি পোষাতে হলে ভ্যাট এবং আয়কর আহরণে বেশি জোর দিতে হবে। তিনি বলেন, কর নেট বাড়াতে জরিপ শুরু হয়েছে। গত ৬ মাস ধরে কাজ চলছে। প্রতিটি কর অঞ্চল থেকে পৃথক কমিটি করে মাঠে জরিপ কাজে পাঠানো হচ্ছে। সহযোগী হিসেবে কিছু ছাত্রকে কাজে লাগানো হয়েছে। এ ছাড়াও আরও অনেক কার্যক্রম আছে। এখন কর শনাক্তকরণ নাম্বার (ই-টিআইএন) ৪৬ লাখ। এর মধ্যে গত বছর আয়কর রিটার্ন দিয়েছে ২২ লাখ। এবার আরও বাড়বে। এ ব্যবধান আরও কমাতে হবে। এ জন্য আয়কর রিটার্ন সংখ্যা বাড়ানোর প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

১ জুলাই থেকে নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন করা হয়। অনেকেই বলেছেন, নতুন আইন ১৯৯১ সালের পুরোনো ভ্যাট আইনের সংস্করণ। আপনি কী মনে করেন? জবাবে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, অভিযোগ ঠিক নয়। '৯১ সালের আইনটি ভালো ছিল। এটা থেকে বের হওয়া যাবে না। তবে যে সব জায়গায় সংশোধন প্রয়োজন সেগুলো করে নতুন ভ্যাট আইন কার্যকর করা হয়েছে। এ আইনটি ব্যবসাবান্ধব। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হন সে জন্য বার্ষিক ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেন (টার্নওভার) ভ্যাটের অব্যাহতি সীমা নির্ধারণ করা হয়। কেউ যাতে এ সুবিধার অপব্যবহার না করতে পারে সে জন্য প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

চলতি অর্থবছরে এনবিআরের মাধ্যমে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় ৩ লাখ ২৫ হাজার ৬০৫ কোটি টাকা। অনেকেই প্রাক্কলিত লক্ষ্যমাত্রাকে উচ্চাভিলাষী ও অবাস্তব বলেছেন। অবশ্য এমনটি ভাবেন না এনবিআর চেয়ারম্যান। তার মতে, সরকারের নীতি হচ্ছে- ক্রমান্বয়ে বাজেটের আকার বাড়িয়ে দেশের উন্নয়ন করা। কেননা, বাজেট বড় না হলে উন্নয়নের পেছনে বেশি ব্যয় করা যায় না। সাধারণত, বড় বাজেট হলে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা বেশি থাকে। কারণ, মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) সঙ্গে রাজস্ব আদায়ের সংশ্নিষ্টতা রয়েছে। তিনি বিশ্বাস করেন, বাজেটে বরাদ্দের টাকা যথাযথভাবে খরচ হলে রাজস্ব আহরণ বাড়বে।

এবার রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে কি-না জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। তবে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের চেষ্টা চলছে। এ লক্ষ্যমাত্রাকে উচ্চাভিলাষী কিংবা বাস্তবসম্মত কোনোটিই বলছি না। নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রাকে সামনে রেখে এগিয়ে যেতে হবে।

বাংলাদেশে রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত কম হওয়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে দুর্বল কর সংস্কৃতি। রয়েছে নানা প্রতিবন্ধকতা। এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, এ ক্ষেত্রে অন্যতম দুর্বলতা হচ্ছে কর না দেওয়ার মানসিকতা। এর পেছনে প্রধানতম দুটি বিষয়কে দায়ী করেন তিনি। জনগণের মনে ভয়-ভীতি কাজ করা এবং সচেতনতার অভাব। রাষ্ট্রের উন্নয়নে যোগ্য সবাইকে কর দেওয়া যে নৈতিক দায়িত্ব সে বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করা সম্ভব হয়নি। তবে পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। জনগণের মাঝে এ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ছে।

অ্যাকাউন্টিং ফার্মগুলোর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার কথা বলেন এনবিআর চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, কিছু ফার্ম একাধিক রিপোর্ট করে। একটি কর বিভাগের জন্য, অন্যটি নিজেরা রাখে। এতে করে অনেক ক্ষেত্রে কোম্পানিগুলোর আয়-ব্যয়ে প্রকৃত চিত্র প্রতিফলিত হয় না। এ নিয়ম রোধে অ্যাকাউন্টিং ফার্মগুলোকে জবাবদিহির আওতায় আনা হবে। তাদের রিপোর্ট কতটুকু বস্তুনিষ্ঠ তা যাচাই-বাছাই করা হবে। এ বিষয়ে একটি নীতিমালা করা হবে। মিথ্যা তথ্য দিলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কর ফাঁকিসহ আন্ডার ও ওভার ইনভয়েসের মাধ্যমে দেশ থেকে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ অর্থ দেশে থেকে পাচার হয়। অর্থ পাচার রোধে নানা উপায়ে কাজ করছে এনবিআর। মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া বলেন, আয় কম দেখালে তা কালোটাকা (অপ্রদর্শিত) হয়। অনেকেই হয়তো টাকা বাইরে পাঠানোর চেষ্টা করে। কিন্তু মানি লন্ডারিং বেশি হয় আমদানি-রপ্তানির আড়ালে আন্ডার এবং ওভার ইনভয়েসের মাধ্যমে। অর্থ পাচার প্রতিরোধ করতে হলে ভ্যাট, কাস্টমস ও আয়কর বিভাগের পূর্ণাঙ্গ অটোমেশন করতে হবে। এ লক্ষ্যে কাজ করছে এনবিআর।

অনেকেই বলেছেন, কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আহরণ করতে হলে এনবিআরের আমূল সংস্কার করতে হবে। এ এনবিআর দিয়ে তা সম্ভব নয়। আপনি কী মনে করেন? জবাবে তিনি বলেন, রাজস্ব বোর্ডের সংস্কার অবশ্যই করতে হবে। তবে একে মন্ত্রণালয় থেকে আলাদা করে বিভাগ কিংবা কর্তৃত্ব খর্ব করলে ভালো ফল আসবে না। এনবিআর এখন যে কাঠামোতে চলছে সেভাবেই বহাল রাখতে হবে। জনবল ও সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। বিশেষ করে ভ্যাট, কাস্টমস ও শুল্ক্ক বিভাগের মাঠ পর্যায়ে অফিস আরও বাড়াতে হবে। কর অফিস তৃণমূল পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে। তিনি মনে করেন, এনবিআরের চেয়ারম্যান একজন হওয়াতে সুবিধা আছে। অনেক কাজ একবারে সম্পন্ন করা যায়। নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো মতভেদ তৈরি হয় না।

নতুন শুল্ক্ক আইন ও আয়কর আইনের খসড়া অনেক আগেই তৈরি হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি এখনও। এনবিআর চেয়ারম্যান জানান, শুল্ক্ক আইন পার্লামেন্টে পাঠানো হয়েছে। সংসদীয় কমিটির বিবেচনার জন্য দেওয়া হয়েছে। যে কোনো সময় এটি পাস হবে। অন্যদিকে, বাংলায় অনুবাদ সম্পন্ন হয়েছে আয়কর আইন। পর্যালোচনার জন্য আইন বিশেষজ্ঞের কাছে পাঠানো হয়েছে। আশা করা যাচ্ছে আগামী এপ্রিলে মন্ত্রিসভায় এটি পাসের জন্য উপস্থাপন করা হবে।

এবিএন/জনি/জসিম/জেডি

এই বিভাগের আরো সংবাদ